ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

যখন এদেশের টিভি চ্যানেলগুলো যখন চাহিদা অনুযায়ী পুরোপুরি প্রস্ফুটিত হলোনা, তখন সেই অপূর্ণতা পূরন করতে হাজির হয়ে গেলো পাশের দেশের স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো। যখন এদেশের বিকাশমান চিকিৎসা ব্যাবস্থা সবসময় সব রোগীর চাহিদা ভরসা মেটাতে পারেনা, তখন পাশের দেশের হাসপাতালগুলো এদেশের রোগীদের নিজেদের মার্কেটের অংশ করতে সবসময় দুই হাত বাড়িয়ে রাখলো। কারন এতেই তাদের লাভ। এটাই তাদের দেশপ্রেম। তারা চায় নিজ দেশের বিকাশ। কট্টরভাবে হোক বা সহজভাবে, দিনশেষে সব দেশই হয় নিজ দেশের জন্য দেশপ্রেমিক। দেশপ্রেম ও উন্নতি নিয়ে অনেক কিছু শেখার আছে তাদের কাছ থেকে।

এবার আসি আমাদের দেশের কথায়। শিক্ষায় ভ্যাট বসানো অযৌক্তিক এটি বোঝার মতো প্রজ্ঞা এদেশের হর্তাকর্তাদের নেই সেটি বিশ্বাস করা কঠিন। এদেশের মন্ত্রীসভায় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশুনা করা মন্ত্রী আছেন। আছেন অনেক ত্যাগী নেতা। তবু উনারা নিজ দেশের সন্তানদের প্রতি স্বপ্রণোদিত হয়ে বিমাতাসুলভ আচরণ করছেন এটি মানতে মনের ভেতর কোথায় যেন আপত্তি হয়।

বাংলাদেশে আনুমানিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হচ্ছে ৫ লাখ। আর তারা গড়ে প্রতি বছর ধরে নেই ১ লাখ টাকা টিউশন ও অন্যান্য ফি দিচ্ছে। তাহলে প্রতি বছর টিউশন ফি দেয়া হচ্ছে আনুমানিক ৫ হাজার কোটি টাকা। এখন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলো না থাকলে শিক্ষার্থীরা কই পড়তো? দেশে সুযোগ না থাকলে বাধ্য হয়ে অনেকেই দেশের বাইরে পড়তে যেত। একসময় চল ছিলো ভারতের হায়দ্রাবাদ, পশ্চিমবঙ্গ আর ব্যাঙালোরে যেয়ে পড়াশুনা করার। তাহলে এই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কারনে দেশের হাজার কোটি টাকা দেশেই থাকছে। পাশাপাশি সার্ক অঞ্চলের অন্যান্য দেশ থেকেও অনেক শিক্ষার্থী শান্তির পরিবেশ পেয়ে এখানে টিউশন ফি দিয়ে পড়তে আসছে। এদেশের সুনাম ও রেমিট্যান্স বাড়ছে। আর দেশের সন্তানরাও দেশেই থাকছে। তবু কেন নিজে নিজে শান্তিতে থাকা এই শিক্ষাক্ষেত্র নিয়ে এত টানাটানি?

কিছুটা ব্যাখ্যা হয়তো খুঁজে পেয়েছি সাংবাদিক গোলাম মোর্তোজার ফেসবুক স্ট্যাটাসে। তিনি বলেছেন এই ভ্যাট বসানো বিশ্বব্যাংক এর দেয়া ফর্মূলায় হয়েছে। একদিকে হচ্ছে বিশ্বব্যাংক, দিনশেষে যেটি আসলে একটি ব্যাংক এবং তারা  উপরওয়ালাদের   যার যার নিজ দেশের লাভই দেখবে। অন্যদিকে আমরা তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে প্রেস্ক্রিপশন খেয়ে খেয়ে এখন অভ্যস্ত। অর্থাৎ এখানে স্বার্থের খেলায় দেশ নয়, বিদেশী মহলের স্বার্থ নিয়েও ভাবাটা যথেস্ট যুক্তিসংগত।

এখন এদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরী হলে ছাত্ররা কই যাবে? লাভ কার হবে? একটু পিছনে ফিরে তাকাই। বাংলাদেশে যখন গার্মেন্টস শিল্প অস্থিতিশীল হলো তখন মালিক পক্ষ চাইলো নিজেদের দিকে ন্যায় আর শ্রমিকপক্ষ চাইলো নিজেদের প্রতি ন্যায়। কেউ কাউকে বুঝলোনা। ভাবলো লাভ ক্ষতি বুঝি এই দুইপক্ষের মাঝে থাকা দড়ি টানাটানি। এখানে আর কারো লাভ নেই।

মাঝখান দিয়ে যা হবার হলো। বাংলাদেশের প্রচুর বড় বড় অর্ডার পাশের দেশ পেয়ে গেলো, ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে তাদের পোশাক শিল্পে প্রবৃদ্ধি দাড়ালো ১৩.৪%, আর এ বছর জানুয়ারিতে তাদের প্রবৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় বাড়লো ৮.৭%। পাশাপাশি প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে এদেশের গার্মেন্টস ও বায়িং হাউসেও বিদেশিদের ক্ষমতা বাড়তে লাগলো। আর আমাদের নিজেদের গড়া এই পোশাক শিল্প নিজেদের হাতেই ক্ষতিগ্রস্থ হলো। নিকট অতীত অস্থিতিশীলতার এই ইতিহাস থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিৎ। আজকে যদি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা বিঘ্নিত হয়, সেশনজট বা হয়রানি বাড়ে, তাহলে একটি আস্থাহীনতা তৈরী হবে। অনেক অভিভাবক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্তান ভর্তি করাতে ভরসা পাবেন না। আর অন্যদিকে তো সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়েও সিট সং্খ্যা সীমিত।

আর তখন সুযোগ নিতে যৌক্তিকভাবেই অন্যদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, বিশেষ করে প্রতিবেশি দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঝাঁপিয়ে পড়বে। পত্রিকায়, ফেসবুকে, টিভিতে তাদের ক্যাম্পাসের বিজ্ঞাপন ছেয়ে যাবে। দ্বিধায় ভুগতে থাকা অভিভাবক চোখ খুললেই দেখবেন তাদের বিজ্ঞাপন। মস্তিস্ক তখন অন্যদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকেই যাবে।

এখন ৭.৫% ভ্যাট নিয়ে টানাটানি হচ্ছে, তখন ১০০% টিউশন ফিই দেশের বাইরে চলে যাবে। এদেশে থাকবেনা। ফেসবুকে ইতিমধ্যেই পাশের দেশের এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞাপন পেজ দেখলাম। বাংলা ভাষায়।

ইস্যুটা শুধু ভ্যাট নয়। ভ্যাটকে কেন্দ্র করে স্বাভাবিক কারনেই অস্থিরতা তৈরী হচ্ছে। অস্থিরতার ক্ষতি হতে পারে সুদূরপ্রসারি। কী গ্যারান্টি আছে আজকের ভ্যাট মেনে নিলে কাল আরো নতুন প্রেস্ক্রিপশন আসবে না? কি গ্যারান্টি আছে যে আজকে সব শর্ত প্রাইভেট ভার্সিটি মানলে কাল মেডিক্যাল সেক্টর, ব্যাংক সেক্টর বা অন্য ক্ষেত্রগুলোতেও নতুন নতুন শর্ত আরোপ হবে না? সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বোঝা চাপানোর শর্ত আসবে না?

জনগন চুপচাপ মেনে নিলে এটা হর্তাকর্তাদের জন্যও ঝামেলা হয়ে যায়। অনেক নেগোশিয়েশন এ তারা যুক্তি খুজে পায়না। তারা তখন বলতে পারেনা ” সর‍্যি এটি করা যাবেনা, আমরা অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু জনগন মানছে না, তাই তোমার শর্ত বাদ”।

উপরের কথাগুলো অযৌক্তিক নয়। ভবিষ্যতে ক্ষতি হবার সম্ভাবনা তখন সব টিউশন ফি সাথে করে নিয়ে একজন বিদেশে পড়তে চলে যাওয়া শিক্ষার্থীর চেয়ে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আর সামগ্রিকভাবে দেশেরই হবে। তাই এখন এই পক্ষ ওই পক্ষ করে নিজেরা তর্ক না করে সবার এক কাতারে আসা উচিৎ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থ আসলে এদেশের সব নাগরিকের স্বার্থ। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকেও এগিয়ে এসে উদ্যোগী হতে হবে নিজ শিক্ষার্থীদের সুবিধা অসুবিধা আর বৈষম্য মেটাতে। আদতে ভবিষ্যত ক্ষতি হবার সম্ভাবনা তাদেরই বেশি।

কারন হচ্ছে আপন দুইপক্ষের রেষারেষিতে তৃতীয় পক্ষের লাভটাই বেশি হয়। আর তৃতীয় পক্ষ বেশিরভাগ সময় আপন কেউ হয়না। আপন সবসময় নিজের মানুষরাই হয়। সময় থাকতে সব পক্ষই প্রজ্ঞার পরিচয় দিক। দেশটা যখন সবার, সবার স্বার্থই এখানে এক সুতোয় গাঁথা।