ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 
11_Private+University+Student_Protest_Dhanmondi_shankar_130915_130915_0014

প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক বা অনলাইন মিডিয়াতে আমরা যে সংবাদ পাই তা হয় নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে তথ্যমূলক বা নির্দিস্ট দৃষ্টিভংগিতে উপস্থাপন করা কোন সংবাদ। এক্ষেত্রে, সংবাদ অবশ্যই জনমতের, যুক্তির ও সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে উপস্থাপন করা উচিৎ। কিন্তু শিক্ষার উপর আরোপিত ভ্যাট নিয়ে যে ছাত্রআন্দোলন হলো, তাতে কিছু মিডিয়ার,  সাংবাদিকের নেগেটিভ জার্নালিজম দেখে সত্যিই মর্মাহত হতে হয়। এই ছাত্র আন্দোলন নিয়ে অনেক কিছু ছিলো মিডিয়াতে প্রকাশ করার। সেগুলো বাদ দিয়ে কিনা ‘সেলফি উৎসব’ এবং অন্যান্য নিম্নরুচির খবর মিডিয়াতে প্রকাশ করা হলো যা স্রেফ এসব খবর তৈরি করা মিডিয়া পক্ষগুলোর মেধার অভাব, সংকীর্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও নৈতিক দৈন্যতার পরিচয় দেয়। বেশিরভাগ মিডিয়াই এই গনজাগরনের পক্ষে সঠিক সংবাদ প্রকাশে বড় নিস্প্রাণ ছিলো। স্বত্বঃস্ফুর্ততার অভাব চোখে লেগেছে। যেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশের গুরুত্বপুর্ন নাগরিক নয়, তাদের কর্মকাণ্ড পজিটিভ ভাবে হাইলাইট হবার যোগ্য নয়।

কিন্তু লাভ হয়নি। সত্য কতভাবেই আর ঘুরিয়ে দেখা যায়! এই যেমন কিছু মিডিয়ার চেষ্টা ছিলো যাতায়াতে জনদূর্ভোগ দেখিয়ে জনস্বার্থ আর গনআন্দোলনকে উল্টো দুই মেরুতে দেখানোর। কিন্তু পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরা সবাই তাদের ক্যামেরার সামনে ঘাম মুছে হাসিমুখেই দেশের সন্তানদের আন্দোলনের পক্ষে মত দিয়েছেন। শত ভোগান্তির বিনিময়ে হলেও আন্দোলন সফল হবার আশা প্রকাশ করেছেন। মিডিয়াতে কেউ কেউ আবার এটাকে ‘অরাজকতা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। নিজ দেশের জনগণের যৌক্তিক দাবি আদায় করতে স্বতঃস্ফুর্ত ও শান্তিপূর্ন আন্দোলনকে যদি অরাজকতা বলা হয় তাহলে একে বিরক্তিকর নেগেটিভ জার্নালিজম ছাড়া আর কিছুই বলার থাকে না।

যাই হোক, এই নিস্প্রাণতার ফলও মিডিয়াগুলো পেয়েছে। সোশ্যাল সাইটে তাদের সংবাদ নিয়ে হাসাহাসি হয়েছে। ট্রল হয়েছে। মিডিয়ার উপর ভরসা ম্লান হয়েছে মানুষের। একসময় মিডিয়া বাদ দিয়ে সোশ্যাল সাইটে নিজেদেরই আপলোড করা ছবি আর সংবাদ দিয়ে মিডিয়ার দায়িত্ব সাধারন মানুষ নিজের কাধেই তুলে নিয়েছে। তাই যে মিডিয়াগুলো এই আন্দোলনে কোন ভালো দিকই খুঁজে পায়নি, তাদের জন্য এই আন্দোলনের কিছু সফল দিকের তালিকা উল্লেখ করা হলো। আশা করি এই আন্দোলন সংক্রান্ত সংবাদ উপস্থাপনে এরপর আর তাদের পজিটিভ থিমের অভাব হবে না।

১) বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে শান্তিপূর্ন আন্দোলন।
২) রক্ত ঝরেছে শুধু আন্দোলনকারিদের। অন্য কারো নয়। ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়ে সবার মন জয় করে তরুণ-যুবাদের এই সফল আন্দোলন।
৩) গণতান্ত্রিক ভাবে প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীর সম অংশগ্রহনে এই আন্দোলন।
৪) কোন ব্যাবস্থাপক, ব্যানার, কমিটি বা কমান্ড ছাড়াই অদ্ভুতভাবে শুধু এক মানসিকতায় এক বিশ্বাসে বিলীন হয়ে এই আন্দোলন।
৫) কোন প্রকার শেল্টার, প্রভাবশালীর প্রভাব, শক্তিশালীর শক্তি, অর্থশালীর অর্থ ছাড়াই সাধারন মানুষের সাধারন নৈতিকতা বোধ থেকে এই আন্দোলন।
৬) কোন ব্যাক্তি বা গোষ্ঠীর নিজস্ব লাভ বা ক্ষতির বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়ে শুধু একটি মাত্র যৌক্তিক দাবি ও সে দাবি আদায়ের আন্দোলন।
৭) মধ্যবিত্তের অধিকার ও শিক্ষার মর্যাদাবোধ রক্ষার আন্দোলন।
৮) বুলেটের বদলে ফুল দেবার আন্দোলন।
৯) যানবাহন ভাঙচুর ও বোমাবাজিবিহীন আন্দোলন।
১০) কোন নতুন নেতা বা স্টার তৈরি না করে সব ঘরের সব সন্তান এক কাতারে একসাথে সমগুরুত্ব ও সমঅবদানের ভিত্তিতে নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করে এই আন্দোলন।
১১) পাবলিক, প্রাইভেট, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাজন ভেঙ্গে দেশের ভবিষ্যত কাণ্ডারি সকল তরুনদের মাঝে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মহামূল্যবান ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্য এনে দেয়ার পটভূমি করে দিয়েছে এই আন্দোলন।
১২) যুব সমাজের একটি বিশাল অংশকে ‘ফার্মের মুরগী’ ট্যাগ থেকে অকুতভয় ও সাহসি ব্যাক্তিত্বের কাতারে আসার এই আন্দোলন।
১৩) ইভ টিজিং / যৌন নির্যাতনের উদ্বেগজনক পরিসংখ্যানের বর্তমান এই সময়ে তরুণ-তরুণীদের পারস্পারিক সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ সহযোগে কোন প্রকার কলুষতা বিহীন চমৎকার সহাবস্থানে করা এই আন্দোলন।
১৪) শুধুই জনগনের, জনগনের জন্য ও জনগনের দ্বারা এই আন্দোলন। গণতান্ত্রিক দেশে গনতান্ত্রিক উপায়ে গণতান্ত্রিক দাবি আদায়ের অসাধারন উদাহরণ এই আন্দোলন।
১৫) বৃদ্ধ, শিশু, রোগীদের অসুবিধার প্রতি নজর রেখে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর খাবারের প্রতি খেয়াল রেখে, পুলিশ ভাইদের সাথে সেলফি তুলে, সাংবাদিকদের সহযোগিতা করে অত্যন্ত মানবিক পথে করা এই আন্দোলন।
১৬) রাবার বুলেটের আঘাতে ক্রোধান্বিত হয়ে সীমা লংঘন না করে, নেগেটিভ মিডিয়ার রিপোর্ট ও অনলাইনের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে, খবর বিনিময়ে কোন সংবাদ মাধ্যমের উপর ভরসা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেরাই নিজেদের খবরের মাধ্যম হয়ে প্রতি ক্ষেত্রে উত্তেজনা নয় প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে অত্যন্ত বিচক্ষন এই আন্দোলন।
১৭) এদেশের আন্দোলনে ব্যাবহৃত ডিকশনারিতে নতুন নতুন ও অভিনব স্লোগানের যোগান দেয়া এই আন্দোলন।

সবশেষে বলা যায়, যে মিডিয়া ও মিডিয়া সম্পৃক্ত ব্যক্তিত্বরা শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের সময় চোখ বুঁজে উল্টোরথে ছিলেন, আজকে ব্যার্থতা তাদেরই হয়েছে। আজ হয়তো তারাও তৃপ্ত হতে পারতেন, আনন্দে সামিল হতে পারতেন। কিন্তু যতবার এই ইতিহাস নিয়ে কথা উঠবে, অযৌক্তিক নেগেটিভ জার্নালিজম করায় তাদের তখন চুপ করে থাকতে হবে, কারন এই ইতিহাসে গর্ব করার মতো কিছুই তারা করেনি, বরং আস্থা ও পাত্তা হারিয়েছেন জনসাধারনের।