ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

সময়ের অভাবে লেখায় আমি নিয়মিত না। তবুও মাঝে মাঝে হৃদয়ে নাড়া দেয়। মস্তিষ্কে যাতনা অনুভব করি। এই যাতনাবোধ থেকেই আজকের কলম যুদ্ধ।

বিষয়টি দেখলেই অনেকের চোখ ছানাবড়া হবার কথা! তবে একটু বিশ্লেষণ না করলেই নয়। বিষয়টির মধ্য থেকে আমি তিনটি শব্দকে একটু হাইলাইট করতে চাই। ১) ধর্ষন,  ২) যৌনতা ও ৩) মিডিয়া।

এটুকু পড়েই অনেকে এই সাইট থেকে বের হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করবেন। তাদের প্রতি নিবেদন রইল অন্তত এই ব্লগটি সম্পূর্ণটা পড়ুন।

যা বলছিলাম – শব্দ তিনটি বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন নেই তবুও একটু —

১) ধর্ষন : জোরপূর্বক / অনিচ্ছা সত্ত্বেও যৌন মিলন ঘটানো।

২) যৌনতা: সংজ্ঞায়িত যৌন মিলন।

৩) মিডিয়া: প্রচার মাধ্যম।

সমাজবিজ্ঞানের বিশ্লেষণে – মানুষ যত শিক্ষিত হবে, ততো স্বাধীনচেতা হবে। এতে যেমন বাল্যবিবাহ কমবে, মেয়েরা কর্মমূখী হবে; তেমনি বিবাহ বিচ্ছেদ / কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ বাড়বে। আমার মতে, বিশ্লেষণটি পজিটিভ গুরুত্ব বহন করে।

পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষ থেকে আমরা কম বয়সেই যৌনতা উপভোগ করতে পারি। এজন্য আমাদের বিবাহের বয়সও কমানো হয়েছে। তবুও আমরা নারী পুরুষ নির্বিশেষে ধর্ষনের স্বীকার।

ধর্ষনের রকম-সকম:

  • গাড়িতে গার্মেন্টসকমী ধর্ষন
  • বাড়ির মালিকের দ্বারা গৃহকর্মী ধর্ষিত
  • শিক্ষকের দ্বারা ছাত্রী ধর্ষিত
  • প্রাইভেট শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষিত
  • মাদ্রাসার শিক্ষক দ্বারা ছাত্র যৌন হয়রানী
  • স্বামীর বন্ধুদের দ্বারা গৃহবধু ধর্ষিত
  • অফিসের বসের মাধ্যমে ধর্ষিত
  • ৪ বছরের শিশু ধর্ষিত
  • দাদা কর্তৃক শিশু নাতী ধর্ষন    ………

কেন আমাদের শিশুরা ধর্ষিত হবে? এর জন্য দায়ী কে / কারা?

আমাদের সমাজব্যবস্থা, আইন-শৃঙ্খলা এবং সর্বোপরি মিডিয়া – ই এর জন্য দায়ী বলে আমার মনে হয়। যৌনতা মানুষের অন্যতম শারীরিক চাহিদা মধ্যে একটি। খাদ্য যেমন আমাদের শারীরিক চাহিদা। যৌনতাকে ততটুকু না ভাবলেও এর কাছাকাছি ভাবা উচিত। অথচ আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় এখনো গতানুগতিক ধারা বহমান। যদি কোন স্বামী / স্ত্রী মারা যায়, তবে সন্তানরা একটু বড় হলেই তাদের বিবাহ করতে দেয় না। অথবা অনেকেই সন্তানের কথা ভেবে আর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন না। এক্ষেত্রে অবশ্য সবসময় একটি Philosophy কাজ করে। সৎ মায়ের / সৎ বাবার ঘরে সন্তান ভালো থাকবে না। আমি এই নীতির ঘোর বিরোধী। কারণ কেবলমাত্র সন্তানের কথা ভেবে কারোর যৌনতা বা শারীরিক জৈব চাহিদা নষ্ট হয়ে যাবে তা আমি বিশ্বাস করি না। বিশ্বাস করতে হলে আবার ফিরে যেতে হবে সতীদাহ প্রথায়। অবশ্য এক্ষেত্রে সংস্কার আনতে হবে। সৎদাহও সংযুক্ত করতে হবে। নইলে অবিচারের রাজ্যে বসবাস করার বিকল্প নেই। সামাজিক পরিবর্তনে আমাদের সকলকে আরো সচেতন হতে হবে। পরিবারের অন্য সদস্যদের ভূমিকা রাখতে হবে জোড়ালো। কেবলমাত্র ভালোবাসা দিয়ে শারীরিক চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। তার জন্য অন্য একটি মনের সাথে একটি শরীরও প্রয়োজন।

আমাদের দেশের আইন-শৃঙ্খলা পর্যালোচনা করলে পুঁথিগত বিদ্যার মতই মনে হয়। বিচারপ্রার্থীরা সব সময়ই হুমকীর সম্মূখীন হয়, তাদের অভিযোগ থানায় নিতে গড়িমসি করা হয়, বিচারে কাল ক্ষেপন করা হয়, সর্বোপরি আপসের প্রস্তাব দেওয়া হয়। বিশেষ করে যৌন হয়রানির স্বীকার মেয়েরা / তাদের পরিবার সামাজিক লজ্জার ভয়ে মুখ খুলতে পারে না। যারা মুখ খোলে তাদেরকে লোয়ার ক্লাসের মেয়ে বলে আখ্যায়িত করা হয়। সমাজ তাদের ধীক্কার জানায়। তাদের সাথে কেউ সংসার করতে আগ্রহ প্রকাশ করে না। অথচ যারা ধর্ষন করে, তারা আইনের মারপ্যাচে বের হয়ে গর্ব করে ঘুরে বেড়ায়। এই জন্য আমরা আইনের প্রতি আস্থা রাখতে পারি না। আর ধর্ষকদের মধ্যে কোন ভয় ভীতি কাজ করে না। এমন কি তাদের পরিবার গর্ব করে বলে বেড়ায়, মিথ্যা কেসে আমার ছেলেকে ফাসানো হয়েছিল। ছি: , কী লজ্জা!

আমাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে মিডিয়ার ভূমিকা অনস্বীকার্য। বর্তমান সমাজে মিডিয়া ছাড়া আমাদের চলাই কঠিন। সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত মিডিয়ার মধ্যে পত্রিকা, টেলিভিশন উল্লেখযোগ্য। সমাজ পরিবর্তনে মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু সমাজকে কলুষিত করতেও মিডিয়াকে দায়ী করা যায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে। একটি বাস্তবতা উল্লেখ করতে চাই, আমি যখন বাংলাদেশ বেতারে প্রথম নাটক লিখি, তখন নাটক বিভাগের পরিচালক ছিলেন আব্দুল আজিজ। আমার একটি নাটক ‌’আত্মাহুতি’ প্রচারের ক্ষেত্রে উনি আমাকে ডাকলেন নাম পরিবর্তন করার জন্য। আমি সবিনয়ে কারণ জিজ্ঞেস করলাম। উনি বললেন, “নাটকের প্রেক্ষাপটের সাথে নামটি বেশ মানানসই। কিন্তু আমরা একটা বড় মিডিয়া। তাই আমরা চাচ্ছি না এই শব্দটির সাথে সাধারণ মানুষের পরিচিতি ঘটুক। যারা জানে তারা জানুক। কিন্তু সকলের মধ্যে শব্দটি প্রচলিত হলে একটি ধারণার জন্ম নিবে। অনেকেই ভাবতে শিখবে তাহলে এভাবেই আত্মাহুতি দেওয়া সম্ভব। আমরা মানুষের মনে এই ধারণাটি স্থায়ী করতে চাই না।” এর পর আমি নাটকটির নাম বদলিয়ে রেখেছিলাম ‘অস্তমিত সূর্য’।

আমাদের মিডিয়ার কর্ণধাররা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন আমি কী বলতে চাচ্ছি। আমরা প্রতিনিয়ত পত্রিকা খুললেই দেখতে পাই কয়েকটি ধর্ষনের খবর। টিভি খুললেই ব্রেকিং নিউজ দেখি ধর্ষনের। কেন এই ‘ধর্ষন’ শব্দটিকে এত সহজবোধ্য করে তুলছেন? কেন দাদা জানবে ৪ বছরের নাতীকে ধর্ষন করা সম্ভব? কেন মানুষ জানবে শিশুকে ধর্ষন করা সম্ভব? এটি অবক্ষয়। এটি শব্দ বিভ্রাট। এটি মিডিয়ার দৈন্যতা। এতে বাড়িয়ে দিচ্ছে ধর্ষকদের দৌরাত্ম্য। অথচ মিডিয়া যদি প্রচার করতো অমক ধর্ষকের ফাঁসী হয়েছে। তাহলে নিশ্চয় কমতো ধর্ষনের ঘটনা। মিডিয়া যদি পুলিশের সহযোগিতার জন্য কাজ করতো তাহলে এটি আরো তরাণ্বিত হতো। আমরা আর দেখতে চাইনা কোনো ধর্ষনের ঘটনা হোক ব্রেকিং নিউজ। দেখতে চাই ফাঁসির ঘটনা। বিচারের ঘটনা।

আমাদের কোমলমতি শিশুদের ‘ধর্ষন’ শব্দটির সাথে পরিচয় ঘটাতে চাইনা। সকল মানুষের মধ্যে নৈতিক পরিবর্তন চাই। চাই সামাজিক পরিবর্তন। চাই তরাণ্বিত বিচারিক ব্যবস্থা। যারা ধর্ষক তারা নিশ্চয় আমাদেরই কারো ভাই, কারো সন্তান; তাদের দায় আমাদেরই নিতে হবে। তাদের পরিবর্তন আমাদেরই করতে হবে।

সকলকে নিয়ে আমরা একটি সুন্দর সমাজ ব্যবস্থা চাই। যেখানে পুলিশের খাতায় কোনো অভিযোগ থাকবেনা, মিডিয়ায় কোন ব্রেকিং নিউজ থাকবেনা, পত্রিকায় কোনো খুন-ধর্ষনের খবর থাকবেনা। শুধু থাকবে উন্নত জাতির স্বপ্ন। উন্নয়নের পথে পদযাত্রা।