ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

 

চলছে সারা দেশে একযোগে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা-২০১৬। প্রায় ৩০ লক্ষ শিশুরা এমন কি একজন ৬৫ বছর বয়স্ক মহিলা (মাদারীপুর) অংশগ্রহণ করেছে এই পরীক্ষায়। ৫ম শ্রেণিতে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা নিয়ে চলছে এক ধরনের বিতর্ক। এমনও হতে পারে ২০১৭ সাল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা আর অনুষ্ঠিত হবে না। সে যাই হোক, আমার দৃষ্টিতে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার মূল্যায়ন –

দৃশ্যপট ১ :

প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার আগের দিন কেন্দ্রে সকল শিক্ষকদের (যারা কেন্দ্রে কক্ষ পরিদর্শক  হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন) নিয়ে একটি মিটিং হচ্ছে। হল সুপার এবং কেন্দ্র সচিব (কেন্দ্রের প্রধান শিক্ষক) কক্ষ পরিদর্শকদের উদ্দেশ্যে যা বললেন,

“এটি খুব ছোট শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা। ওরা অনেক কিছুই বোঝে না। এমন কি এই বয়সে একজন শিক্ষার্থী ঝরে পড়ুক, তা নিশ্চয়ই আপনারা চান না। সুতরাং যতটুকু সাহায্য করা প্রয়োজন করবেন। আরও একটি কথা এখানে স্থানীয়রা দু-একজন  পরীক্ষার হলে যেতে পারে, তাদের বাধা দেওয়ার দরকার নেই।”

দৃশ্যপট ২ :

অন্য একটি পরীক্ষা কেন্দ্রের প্রধান,

“এটিই ৫ম শ্রেণির শেষ পরীক্ষা। সুতরাং আমরাও চাইনা কেউ ফেল করুক। সরকারও চায় না কেউ ফেল করুক। সুতরাং যা করার করবেন।”

পরীক্ষা কেন্দ্রের তথ্য:

কেন্দ্র ১ :

কক্ষ পরিদর্শকের বক্তব্য: “বিভিন্ন স্কুলের প্রধান শিক্ষক বা স্থানীয় ব্যক্তি এবং শিক্ষক প্রতিনিধিরা পরীক্ষার হলে ঢুকে শিক্ষার্থীদের ৬৫ নম্বরের নৈর্ব্যক্তিক ও সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর সঠিক করে দিয়েছে। আমাদের বলার কিছু ছিল না।”

কেন্দ্র ২ :

কক্ষ পরিদর্শকের বক্তব্য: “এই কেন্দ্রে শিক্ষার্থী মাত্র ৩০০ এর কাছাকাছি। এখানের আপ্যায়ন অনেক ভালো। এবং সকল স্কুলের শিক্ষকরা নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নোত্তর সঠিক করে একটি স্ক্রিপ্ট তৈরি করে সকল শিক্ষার্থীর হাতে দিয়েছে।”

শিক্ষার্থীর মন্তব্য:

শিক্ষার্থী – ১ :

“এত ভালো পরীক্ষা জীবনেও দিইনি। সবই দেখে দেখে লিখেছি।”

শিক্ষার্থী – ২ :

“আমি জুতার মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলাম। পরে কলম ফেলার নাম করে দেখে লিখেছি।”

শিক্ষার্থী – ৩ :

অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থী: “আমি অবশ্যই A+ পাবো।”

শিক্ষার্থী – ৪ : 

“পরীক্ষার হলের স্যাররা তো সবই বলে দিয়েছে। আরও আমার বন্ধুর কাছ থেকে দেখে লিখেছি।”

পরীক্ষা সম্পর্কে শিক্ষকের মন্তব্য ১ :

“পরীক্ষা হলে যদি এ অবস্থা চলতে থাকে, তবে এত কঠিন এবং সৃজনশীল প্রশ্ন করে লাভ কী? এর থেকে আগেই ভালো ছিল, মুখস্ত করে লেখা যেত এবং সবই কমন পড়ত।”

শিক্ষকের মন্তব্য – ২ :

“সকলের সমান সুযোগ থাকা প্রয়োজন। যাদের স্কুলে কেন্দ্র হয়, তারা সুযোগ পাবে আর অন্যরা পাবে না। এটা কেমন কথা!”

শিক্ষকের মন্তব্য – ৩ :

“কি আর বলবো ভাই! ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে শিক্ষকের কোন মর্যাদাই রইল না। এমন কি অভিভাবকরাও সম্মান করা ভুলে গেছে।”

অভিভাবকের মন্তব্য – ১: 

“আমাদের থেকে ঐ কেন্দ্রে সুযোগ-সুবিধা অনেক বেশি। আপনারা ঐখানে কেন্দ্র নিতে পারেন না?”

অভিভাবকের মন্তব্য – ২ : 

“এটা তো সেই ৭২ সালের মতো পরীক্ষা।”

 

PEC মূল্যায়নে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী:

একটি দেশের উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হচ্ছে তার শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন। এবং শিক্ষা ব্যবস্থার fundamental পর্যায় হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে বাংলাদেশ সহ ১৩ টি দেশের আর্থিক সহায়তায় চালু রয়েছে Third Primary Education Development Program (PEDP-III). যা শেষ হবে ২০১৮ সালে। এই প্রোজেক্টের সময় শেষ হতে বাকি আছে মাত্র ২ বছর। অথচ এই প্রোজেক্টের সিংহভাগ প্রকল্প এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। যেমন: সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ডিজিটালাইজড করা, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা ইত্যাদি।

হতে পারে এ কারণেই প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা বহাল থাকবে ২০১৮ পর্যন্ত।

নতুবা, আমরা একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে ঠাঁই পেতে প্রয়োজন শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন। অর্থাৎ শিক্ষার হার বাড়াতে বহাল থাকবে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা। কারণ – একটি দেশের উন্নয়নের সূচক পরিমাপ করা হয় তিন ভাবে:

১. Income per Capita (মাথাপিছু আয়)

২. Health (স্বাস্থ্য)

৩. Education (শিক্ষা)।

মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে আমরা একটু পিছিয়ে আছি। আমাদের কাছে আলাদিনের আশ্চার্য প্রদীপ নেই, যা দিয়ে আমরা রাতারাতি আয় বাড়াতে পারি।

স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে অবশ্য আমাদের উন্নয়ন ভালো। আমাদের মাতৃমৃত্যুর হার, এমন কি শিশু মৃত্যুর হার খুবই কম। যা সাফল্য।

তাহলে শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নয়ন ঘটিয়ে আমরা খুব সহজেই উন্নয়নের সূচক বাড়িয়ে নিতে পারি। তাই হয়তবা এই প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা বহাল থাকবে। আমরা সকলেই দুর্নীতিমুক্ত একটি জাতির স্বপ্ন দেখি। কিন্তু তার দেখা কবে বা কিভাবে সম্ভব তা বোধগম্য নয়; যখন একজন কোমলমতি শিশুর মাঝে পরীক্ষা কেন্দ্রে দুর্নীতির বীজ বোপন করে দিচ্ছি। এবারে প্রায় ৩০ লাখ শিশু প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে। এরা নিশ্চয়ই একদিন এই জাতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবে। কখনও কি সে ভুলতে পারবে আজকের দিনটিকে?

পক্ষান্তরে, আমি শিক্ষক হিসেবে গর্বিত, আমি পিতা হিসেবে গর্বিত, আমি আমি মাতা হিসেবে গর্বিত যে, আমার সন্তান A+  পেয়েছে।

একবারও কি ভেবে দেখেছেন আমার সন্তানকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে আমি গর্ববোধ করছি? ভুলে যান মিছে প্রাপ্যতা। ফিরিয়ে আনুন আরো একবার – “আমার সন্তান ও তার ভবিষ্যৎ”