ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

“এদেশের মানুষ এখন আর রাজনীতি নিয়ে ভাবে না, যতটা আগে ভাবতো। ভাবে কি?” এই ভাবনাটা একান্তই আমার। দ্বিমত আসবেই এবং তা নিশ্চিত। একদশক আগেও কোন না কোন ভাবে রাজনীতি মানুষকে বেজায় ভাবাতো। রাজনীতি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সবকিছুর নিয়ন্তা হলেও তা মানুষকে এখন আর সেভাবে স্পর্শ করছে না। অন্তত আগে যেভাবে করত, সেভাবে করছে না।

এটা হতে পারে বিএনপি মাঠের দল নয়, তাই বিএনপির পক্ষে রাজনীতির মাঠ গরম রাখা সম্ভব না হওয়াতে এমনটা মনে হচ্ছে।আওয়ামী লীগ এই মুহূর্তে সরকারের বাইরে থাকলে হয়তো এমনটা মনে না-ও হতে পারতো। আওয়ামী লীগের ২১ বছর অন্তত আওয়ামী লীগকে তেমনটাই চিনিয়েছে।

সব সরকারের আমলেই বিরোধী দলের উপর সরকার খড়গহস্ত ছিলো। এই বাস্তবতা মোকাবেলা করেই আওয়ামী লীগ মাঠ দখলে রাখতে পারতো। বিএনপি এটা পারছে না, পারার কথাও না। সেটা ভিন্ন আলোচনা বটে। কিন্তু মানুষ কি কিছুটা হলেও রাজনীতি বিমুখ হয়নি, অন্তত এক দশক আগের তুলনায়?

তরুণরা আগের চেয়ে অনেক বেশি রাজনীতি বিমুখ নিঃসন্দেহে। তরুণদের একটা অংশ হয়তো চরমপন্থার মত অন্ধ রাজনীতিতে জড়াচ্ছে, কিন্তু সেটা সংখ্যায় কত? যে কোন চরমপন্থাই এদেশের মানুষ স্বভাবজাত কারণে গ্রহণ করে না। বিভ্রান্ত তরুণদের চরমপন্থায় ঝোঁকার প্রবণতা বিরাটভাবে নিচে নেমে গেছে গুলশানে জঙ্গিকাণ্ডের পর।

তরুণরা তো বটেই, প্রায় সবাই এখন দারুণ রকমের অর্থনীতিবাদী। যদিও অর্থনীতির ঘনীভূত রূপই রাজনীতি। অবশ্য বামপন্থীদের বয়ান এটি। মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে স্বচ্ছল আয়-রোজগার আর শ্রী বৃদ্ধি নিয়েই বেশি মনোযোগি, সেখানেই বেশি সময় দিতে চায়। খালেদার জেল-জরিমানা তাই কাউকে ভাবায় না। অন্তত আগের মতো বেপরোয়া ভাবে তো ভাবায়ই না। হাসিনা হলে মাত্রাটা কিছুটা বাড়তো, বাড়তো কি?

মানুষকে এখন প্রাত্যাহিক জীবন-যাপনের সংকটের দিকে মনযোগ দিতে হয় না। গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ সে ঠিকমতো পায়, দাম বাড়লেও পায়। কুইক রেন্টালে হাজার কোটি টাকা লুটপাটের খবর সংবাদপত্রে প্রকাশ পেলেও তার পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস পেতে সমস্যা হয়না। আগের মত ঢাকার অলিতে গলিতে পানি বিদ্যুতের হাহাকারে মিছিল মিটিং হয়না। হয়না, বিদ্যুতের দাবিতে শনির আখড়ায় মাননীয় সংসদ সদস্যকে ধাওয়া দেয়ার মত ঘটনা। স্বভাবতই মানুষ এখন ভিন্ন কিছু নিয়ে ভাবার অবকাশ পায়। সংসার সাজাবার উপায় নিয়েই ভাবাটা স্বাভাবিক। সেটাই তো হওয়া উচিত। খালেদা-হাসিনা কে নিয়ে ভাববার সময় কই তাদের?

নিজের নিরাপত্তার ইস্যুতেও মানুষ আগের চেয়ে সচেতন সজাগ বেশি। অনেক ক্ষেত্রে এটির উন্নতিও উল্লেখযোগ্য। নিরাপদ কেউই নয়, কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি নিশ্চয় মানুষকে স্বস্তি দেয়, শান্তি দেয়, স্বাভাবিক থাকতে দেয়। হাতে হাতে পিস্তল থাকার সেই সাধারণ চিত্র আর নেই। তবে, ঘটনা নিশ্চয় আছে এ জাতীয়। আর যেসব গায়েবি অপহরণ গুম-হুমকির ঘটনা ঘটে, সেসব যে রাজা-রাজরার ব্যাপার, উলুখাগড়ার করণীয় কিছু নেই, সেটা মানুষ বোঝে। তাই তার প্রতিক্রিয়াও নেই। অর্থাৎ রাজনৈতিক সক্রিয়তা নেই।

মানুষ তো উন্নতি চায়। সেটা যেনতেন প্রকারে হলেও চলবে। প্রশ্ন ফাঁসে পরীক্ষা পাশ সহজ হলেও নিজের ও সন্তানের নৈতিকতার মৃত্যু তাই তাকে ভাবায় না। কোন প্রতিক্রিয়া তার নেই। না অভিভাবক হিসেবে, না মানুষ হিসেবে। অর্থাৎ এক্ষেত্রেও কোন বক্তব্য বা যুথবদ্ধতা বা রাজনীতি নেই।

হালের রাজনীতি বলতে যা আছে তাও তো কেবলমাত্র প্রচারযন্ত্র ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নির্ভর। এসবে মুখ দেখানোই রাজনীতি এখন। রাজনীতি আর রাজপথের বিষয় বা রাজার নীতি নেই। শহুরে লোকজনের বসার ঘরে বহু আগেই ঢুকেছিলো, এখন সেটা ফেসবুক আর টিভি পর্দায় ঘুরছে মাত্র।

বাংলাদেশের এখন যা প্রবণতা, অর্থনীতিতে বিরাট এই উলম্ফন হবারই ছিল। তাই হচ্ছে। ৮০-৯০’র দশকের প্রথাগত রাজনীতির চল আর নেই। মানুষও অনেক বেশি পরিশীলিত, আধুনিক, ভোগ নির্ভর। উপভোক্তা হিসেবে মানুষকে তৈরি করে দিচ্ছে অর্থনীতিই।

কিন্তু রাজনীতি কি একেবারেই নেই? দেশের মানুষ সত্যিই রাজনীতি বিমুখ হচ্ছে দিনকে দিন? তাহলে দেশ-কালের নিয়ন্ত্রক বা প্রতিভূ কে হবে?

এই বিরাজনীতিকরণের সুফলটা কার ঘরে যাবে? উপভোক্তা তার নিরবিচ্ছিন্ন ভোগের ব্যাঘাতে প্রতিক্রিয়া দেখাবে না? সেটাই কি নতুন রাজনীতি? কিংবা সেটাই কি এই সময়ের রাজনীতি?