ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

গিয়াস উদ্দিন সেলিম বিরহ ও বিয়োগ থেকে বের হতে পারলেন না। ‘স্বপ্নজাল’ নিটোল প্রেমের গল্প। এই উপমহাদেশের দগদগে ঘা সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশভাগের উপযোগিতা নিঃশেষ ধরে নিয়ে সেটা চিত্রায়নের গল্প। বাংলাদেশে নির্মিত চলচ্চিত্র এটি। হোক সেটা বাণিজ্যিক বা শৈল্পিক। প্রেম ভালবাসা থেকে গিয়াস উদ্দিন সেলিম এখনো বের হতে পারেননি।

 

 

গিয়াস উদ্দিন সেলিমের মনপুরা নিটোল নিখাদ প্রেমের গল্পের বয়ান। স্বপ্নজালেও প্রেম আছে। নির্মাতার কাছে হয়ত প্রেমটাই মুখ্য ছিল। সাথে গল্পের ভার বাড়াতে আন্তধর্মীয় প্রেম। ধর্মীয় সংখ্যালঘুর ভিটেমাটি-ব্যবসা দখল ও প্রাণে হত্যা। গিয়াস উদ্দিন সেলিম তার মেজাজ ধরে রেখে ‘মনপুরা’র মতো স্বপ্নজালেও নায়ক অথবা নায়িকার মৃত্যু ঘটিয়েছেন। বিরহে কাতর করতে চেয়েছেন। বিয়োগের ব্যাথায় নীল করতে চেয়েছেন দর্শককে। তবে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়, মনপুরায় দর্শক যেভাবে কাতর হতে পেরেছিলো স্বপ্নজালে সেভাবে পারেনি। মনপুরায় দর্শক যদি ডুকরে কেঁদে থাকে তাহলে স্বপ্নজালে দর্শককে ভাবতে হয়েছে এই প্রেমের এই পরিণতির জন্য তাদের কাঁদা উচিত হবে কি না!

বিয়োগের আগ পর্যন্ত স্বপ্নজালে যেভাবে এপার বাংলা ওপার বাংলা এসেছে, ধর্ম এসেছে সেটা এদেশের চলচ্চিত্রের দর্শকের কাছে একেবারেই নতুন। গল্প যদিও নতুন না। সে কারণে দর্শক কিছুটা হলেও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগেছে। এই কারণে আবেগের জায়গায় তাকে মগজ খাটিয়ে প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে হয়েছে সম্ভবত।

এই গল্প আমরা অহরহই পাই। স্বপ্নজালের প্রেম গৎবাঁধার দায় থেকে উদ্ধার পেতে পারতো যদি নায়ক হিন্দু এবং নায়িকা মুসলমান পরিবার থেকে দেখানো হতো। এরকম আন্তধর্মীয় প্রেম কি এদেশে হয়না? সেই বাস্তবতা দেখানো কি এদেশে সম্ভব?

কিন্তু একেবারেই নতুন এবং বলা উচিত অলীক ব্যাপার হচ্ছে নিপীড়নে আক্রান্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘুর পরিবারটির এদেশে ফিরে এসে স্বাভাবিক বসবাস শুরু করতে পারাটা। বাস্তবে এমনটা ঘটে থাকলেও সে খবর আমাদের জানা নেই। আদৌ কি এমনটা ঘটার বাস্তবতা বাংলাদেশে আছে?

সংখ্যালঘু পরিবারটির ভিটেমাটি-ব্যবসা দখল ও প্রাণ হত্যাকারীর পরিণতিও বাস্তবতা বিবর্জিত কখনো কখনো। নির্মাতা হয়তোবা দেখাতে চেয়েছেন অন্যায়ের পরিণতি এমনই হয় এবং সেটা আপনা আপনিই। গল্পকারের নিষ্কলুষ মনের শুভ আকাঙ্ক্ষারই ফসল যে, নিপীড়নের শিকার হওয়া পরিবারটি দেশে ফিরে আসছে, বিচার চাইছে, বিচার পাচ্ছে। অর্থাৎ দেশভাগের যে বিবমিষা, আস্থাহীনতার যে সংকট, সেটা আর নেই। সংখ্যালঘুর সহায়-সম্পদ দখল এবং তাকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের যন্ত্রণার প্রতিকার পাওয়া যায় এদেশে। তাই ফিরে আসবার আস্থা পাচ্ছে। তাহলে কি বাংলাদেশে ৪৭ এর দেশভাগের উপযোগিতা আর নেই? ঠিক এ জায়গাটাতেই দর্শককে মগজ খাটাতে হয়েছে।

 

 

প্রেমের বিয়োগে মুসলমান নায়কের মৃত্যু আর হিন্দু নায়িকার অন্যত্র পাত্রস্থ হবার পরিণতি তাই দর্শককে মন খুলে কাঁদতে বা আবেগে ভাসতে দেয়নি। মনপুরায় যেটা শতভাগ দিয়েছিলো। এই বিচারে গৎবাঁধা প্রেমের বাইরে স্বপ্নজালে নতুনত্ব আছে বৈকি। কিন্তু আপামর দর্শকের মানস কি তৈরি? সাতচল্লিশের দেশভাগের উপযোগিতা নিঃশেষ হওয়াটা হজম করতে পারবে তো? নির্যাতনকারী সংখ্যাগুরুকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন, ভয়ংকর পরিণতি, সংখ্যালঘুর নিজের ভিটেমাটি ফিরে পাওয়া আর সব শেষে মুসলমান নায়কের মৃত্যু দর্শকের মনে উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করলে আমরা কিন্তু অবাক হবো না।

স্বপ্নজালের নির্মাণশৈলী অসম্ভব ভালো লেগেছে। পরিমণি কে এভাবে আর কেউ উপস্থাপন করতে পারেনি। ‘পরিমণি’ নামটা কার দেয়া জানি না। তবে, আরো সুন্দর নামের দাবিদার পরিমণি।নায়কের অভিনয় ছাড়া অন্য সবার অভিনয়ই এক কথায় দারুণ। ফজলুর রহমান বাবু নিজেকে কোন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন সেটা হয়তো তিনি নিজেও জানেন না। সবশেষে, আশাকরি নিজের দেশ ও দশকে নিয়ে গল্পকারের এই স্বপ্নজালিক বয়ান যথার্থই হোক। সেটাই চাই।