ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

পরম শত্রু নয়, আপন মানুষদেরকেই তো বলতে শুনেছি যে, খুবই জঘন্য একটা দেশ – এই দেশ, বাংলাদেশ। কে থাকে এখানে! আপন মাটিতে থুথু ফেলে চলে যাওয়া – দূরে, অন্য কোথাও, সৌভাগ্যের খোঁজে – এ-ও তো আমাদের অভিজ্ঞতারই অংশ। আমাদের ভালবাসা বড় ভঙ্গুর। মুড়মুড় করে ভেঙে যায় সে দুঃখের দিনে। ভাঙুক। দূরে চলে যাওয়া, সে-ও মানা যায়। কিন্তু থুথু – সেটা!?

 

সবাই যেন পালাতে চায়! এ কথা অবশ্য ঠিক যে, একটা গভীর সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আত্নপক্ষ সর্মথনের জন্য পলাতকদের চারপাশে ছড়ানো আছে অজস্র উপাদান। কী আছে এখানে? মধ্যযুগের উল্কি-আঁকা একঘেঁয়ে অভাবের সব নোংরা হতদরিদ্র মানুষজন আর ভাঙাচোরা ঘরবাড়ি ছাড়া! গ্লোবাল পৃথিবীর আলো-বাতাস আর আবহাওয়াও তাদেরকে ভিন্ন স্বপ্ন দেখাচ্ছে। ইয়ং বেঙ্গলদের মতো ওরাও ভাবছে মুক্তি বঙ্গে নেই, আছে পাশ্চাত্যে। পাশ্চাত্য মানে স্বর্গ। সেই স্বর্গ আবার শুধু ভূগোলের নয়, ভাষারও। কৈফিয়ত দিচ্ছে ওরা – বাংলাদেশে খেয়ে-পড়ে টিকে থাকা চলে, কোনরকমে বেঁচে থাকাও চলতে পারে; কিন্তু চকচকে ঝকঝকে জীবন যাপন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে সম্পদ কই? কোথায় সুশাসন? চিহৃ পর্যন্ত নেই নীতি-নৈতিকতা-নিয়ম-মূল্যবোধ’র। কেন মমতা থাকবে এর প্রতি? মমতা নেই।পথহারা তারুণ্য তাই সাতসমুদ্র তেরোনদী পাড়ি দেয়। কিংবা সমুদ্রে ডুবে মরে, অথবা মরুভূমিতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়; তবু ফিরেও তাকায় না পেছনে! যেখানে থাকে তার মাতৃভূমি কিংবা মা-ই আসলে!

 

হু, নিদারুণ আঁধার কাটেনা যদিও, জঞ্জালও বাড়েই শুধু; কিন্তু সেই একাত্তরে, আজকের চেয়ে কি পরিস্থিতিটা ভালো ছিলো? তখনকার সংকট, দুর্যোগ কিংবা বিপর্যস্ততা কি আজকের বাংলাদেশের চেয়ে কম ছিলো? অথচ আমাদের জাতির জীবনের সবচাইতে বড় সংকটের সময়টায়, সেই কঠিনতম অন্ধকার দিনগুলোতে আজকের মতো সেদিন যদি সবাই পালাতে চাইতো কিংবা আত্নসমর্পণ করতাম আমরা সবাই, তাহলে!? এই দেশ কি স্বাধীন হতো কখনো? আমরা কি মুক্ত হতে পারতাম পরাধীনতার গ্লানি থেকে? হু, একদিন এই আমরাই তো দেশকে বাঁচাবো বলে হানাদারদের সঙ্গে লড়েছি। এক ইঞ্চি ভূমি ছাড়তে প্রস্তুত ছিলাম না আমরা সে দিন! যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি, মুক্ত করেছি নিজেদেরকে। পালিয়ে গেলে পারতাম? উহু, দূরে সরে গেলে পারতাম না, দেশকে বুকে তুলে নিয়েছিলাম বলেই পারলাম।কঠিন সেই সংকল্প, নিদারুণ সেই প্রচেষ্টা। অথচ আজ সেই মুক্ত স্বাধীন দেশ ফেলে পালাতে চাই আমরা। কিন্তু কেন? আরব-আমেরিকাকে নিজের দেশ মনে করবো বলেই কি তবে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম আমরা একাত্তরে? আজকের এই নির্লজ্জতার জন্যই কি সেদিন লাখ লাখ মানুষ আত্নাহুতি দিয়েছিলো!?

 

আজকের মতো সেই বাহান্ন কিংবা একাত্তরেও যদি আমরা শুধু নিজেদেরকে নিয়ে, নিজেদের স্বার্থের কথাই কেবল ভাবতাম, তাহলে হয়তো চিরকালের দাস হয়েই বাঁচতে হতো আমাদের, এখনো উর্দুভাষী ক্রীতদাস হয়ে থাকতে হতো! অন্ধকার এমনি এমনি কাটে না, আলো দিয়ে তাকে দূর করা চাই। একটা প্রজন্ম এই দেশকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে, আরেকটা প্রজন্মকে এই দেশকে অশুভ অন্ধকারের নাগপাশ থেকে মুক্ত করতে হবে। পালিয়ে গেলে তো হবে না। আত্নসমর্পণে কোন মুক্তি নেই, কখনো ছিলোও না।

 

প্রায় চার কোটি বেকারের এই দেশ থেকে যে বেকার সে যেতেই পারে কাজের আশায়, ভবিষ্যত সুখের আশায়। কিন্তু যার অভাব নেই সে-ও তো অস্থির হয়ে উঠেছে, পারলে এখনই পালায় – শুধু নিজের জন্য, নিজেরই স্বার্থে! কতজন বাঙালি আজ আছে এই বাংলাদেশে, বুকে হাত দিয়ে যারা বলতে পারবে, সুযোগ পেলেও তারা বিদেশে যাবে না? পালাবে না!? যারা পালিয়ে যায়, তাদের অনেকেই অবশ্য আত্নপ্রতারণাকে ঢাকতে চায় এই বলে, সচ্ছলতা এলেই যুদ্ধে যাবে ওরা আবার, গায়ে মাখবে আপন কাদামাটি। কিন্তু কতো টাকা হলে ফিরতে পারবে ওরা – মৌলিক এই প্রশ্নে ধরা পড়ে যায় যেন হঠাৎ, হো হো করে হেসে উঠে বিদ্রুপের ছলে; “ফিরবো না, ফিরবো না”– তখন আক্রোশের মতোই শোনায় ওদের কণ্ঠস্বর।

 

কিন্তু ছিঁড়ে-খামচে এগিয়ে যাবার মধ্যে তো বাঁচে না জীবনের অর্থ। বৈষম্যই জন্ম দেয় অন্ধকারের। সে-ই আমাদের আদিপাপ। দূর করতে হবে ওই পাপটা। আমরা হতাশ হবো কেন? আমাদের প্রাণের শেকড় তো কাদামাটির গভীরে গাঁথা। আমরা পৌঁছে যাবো আসল জায়গায়, ভিড়ের মাঝে আর নিঃসঙ্গ হয়ে থাকবো না। যদিও জানি, আমাদের আশাগুলো মরে যাচ্ছে, অন্ধকার জমে উঠছে অবিশ্বাসের। আমাদের অভিজ্ঞতাও একটু একটু করে ভেঙে দিচ্ছে সব স্বপ্নকে। কিন্তু, আমাদের অভিজ্ঞতাই তো সব নয় ইতিহাসে। হু, ইতিহাসে তো পিছু হটা নেই, শুধু এগিয়ে চলা জীবনের মহাসড়ক ধরে। থামা যাবে না। হাল ছাড়াটাও বোকামী। চলতে হবে। নামতে হবে পথে। পথে নামলেই পথ চেনা যায়।…… আমরা আমাদের ভাষায় কথা বলবো, নিজেদের মানুষের মধ্য দিয়ে কথা বলবো। হু, “বন্ধু, তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও!” আর, “পথে এবার নামো সাথী, পথেই হবে পথ চেনা”……

 

আমরা উগ্র রক্ষণশীলদের সন্ধান করবো না, অতি প্রগতিশীলদের তো একেবারেই নয়; কেননা এই দুই দলের রয়েছে দুই রকমের বিচ্যুতি। একজন সংকীর্ণমনা, অন্যদল অনুকরণ প্রিয়। উভয়েই বাতিকগ্রস্ত, মাত্রাজ্ঞানহীন। আসলে এ পথ এবং ও পথ নয়, আমাদের সত্যিকার সাধনা হচ্ছে অন্য পথের। যে পথে সংকীর্ণতা ও অতি উম্মুক্ততার দীনতা, অতিরেক আর নির্বুদ্ধিতার জঞ্জাল সাফ করা হয়ে গেছে। যে পথ ইঙ্গিত দিচ্ছে বিদ্রোহ ও সৃজনশীলতার। বাংলাদেশকে যেমন, আমাদেরকেও তেমনি – বাঁচাবে সচেতনতা, সংকল্প ও সংগ্রাম। স্থিতি মানে মৃত্যু, গতি মানে জীবন। আর জীবন হচ্ছে দৃশ্যমান সংগ্রাম।

 

আমরা যেন ভুলে না যাই, যে জীবন একবার পালিয়ে যায়, তা আর ফিরে না! কখনোই না……