ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাস্থ্য

বাংলাদেশে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা’ – এ শ্লোগানটি এতোবার উচ্চারিত হয়েছে নানাস্থানে, নানাভাবে যে এটাকে এখন বেদবাক্যের মতো মনে হয়। কিন্তু স্বাধীনতার প্রায় সাড়ে চার দশক পরও এই স্লোগানটি অদ্যাবধি স্লোগান হিসাবেই রয়ে গেছে এবং আরও সাড়ে চার দশকেও এ শ্লোগান বাস্তবে পরিণত হবে কিনা সেটা যথেষ্ট সন্দেহের বিষয়। এবং এ ব্যাপারে আশাবাদী হবার বদলে আমাদেরকে বারবার আশংকায়ই ডুবে যেতে হয়। এখনও এই দেশের ৪০ ভাগ মানুষ যথাযথ স্বাস্থ্যসেবার বাইরে। তাই যখনই হাওয়ায় ভেসে আসে এই শ্লোগানটি তখন একে বড্ড নির্মম ও নিষ্ঠুর প্রহসনের মতো লাগে। দেশের আপামর দরিদ্র সাধারন জনগণের সঙ্গে এ যেন এক পৌশাচিক রসিকতা!

addiction-treatment

মানুষের মৌলিক পাঁচটি অধিকারের একটি যে চিকিৎসা তা আমাদের বারবার স্মরণ করতে ও করিয়ে দিতে হয়। শিক্ষা না হলে হয়তো মানুষ বাঁচবে, কিন্তু চিকিৎসা না পেলে মরবার আশংকা থাকে। অনেকটা খাদ্যের মতোই দরকারী, অথবা খাদ্যের চাইতেও জরুরী কখনো কখনো। অথচ সাধারন মানুষ জানে না তার চিকিৎসার অধিকারের কথা। আর এই না জানাটাই বলে দেয় যে আমাদের দেশের বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থায় মানুষের আস্থা একেবারে তলানীতে এসে ঠেকেছে। চিকিৎসার কথা এসে পড়লে গরীবেরা আতংকিত হয়ে যায়, আর ধনীরা হয় বিরক্ত। গরীবের আতংকের কারণ সাদামাটা – কোথায় যাবে, কী করবে বুঝে উঠতে পারে না; ফি দিয়ে ব্যবস্থাপত্র কেনার সামর্থ্য অনেকেরই নেই; আর যাদের সেটা আছে তারা শুধু ব্যবস্থাপত্রই কেনে, ঔষধ কেনা হয় না আর। সরকারি হাসপাতাল পর্যন্ত যায় যারা তারা গিয়ে দেখে অপেক্ষা করছে কঠিন দুর্ভোগ – অযত্ন আর অবহেলা। অন্যদিকে ধনীরা পয়সা দিয়েই কিনতে পারে চিকিৎসা সুবিধা, তাদের জন্য আছে ক্লিনিকগুলো। কিন্তু রোগী হিসাবে যতোটা মনযোগ পাওয়া দরকার ততোটা পাচ্ছেনা – এ অসন্তোষ থেকে তারা ছুটছে ন্যুইয়র্ক-লন্ডন-সিঙ্গাপুরে। ধনীর জন্য তবু পথ খোলা থাকে, কিন্তু সাধারণ মানুষজন তো নিরুপায়।

 

নতুন নতুন হাসপাতাল যদিও খোলা হচ্ছে, কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় এগুলো খুবই অপ্রতুল এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অকার্যকর। স্বাস্থ্যখাতে মাথাপিছু যে বরাদ্দ তা দিয়ে একজন মানুষের দু’চার দিনও চিকিৎসা চলে কিনা সেটা নীতিনির্ধারকেরাই ভালো বলতে পারবেন। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতে জনপ্রতি যতটুকু বরাদ্দ থাকার কথা তার মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। সেখানেও আঞ্চলিক বৈষম্য আছে, শহরে-গ্রামে নির্লজ্জ ফারাক থাকে। ডাক্তার প্রতি রোগীর যে সংখ্যা তা খুবই অস্বস্তিকর (১:৩০০০, ভাগ্যিস সব রোগী ডাক্তারের কাছে ছুটে যাবার সুযোগ পায় না!), আর সরকারি যে কাঠামোটা তার অবস্থাও বেহাল। হয়তো বলা হবে যে ইউনিয়ন পর্যন্ত চিকিৎসা কার্যক্রম ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আগের তুলনায় বেশিই বটে। কিন্তু কতোটুকু বেশি আর কতোটাই বা কার্যকর ? বিভিন্ন রিপোর্টমতে, থানা হাসপাতালগুলোর ৫০ ভাগ শয্যাই অব্যবহৃত থাকে প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাবে। আর হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ও জনসংখ্যার অনুপাতও বেশ কৌতুককর – ১:২০০০। এছাড়াও রয়েছে ডাক্তারের অভাব, ঔষুধপত্রের অপ্রতুলতা। অবস্থাটা এতোই নিম্নমানের যে মানুষজন সর্বস্ব বিক্রি করে হলেও ক্লিনিকগুলোতেই যেতে চায় চিকিৎসা সুবিধা কিনবে বলে, তবু সরকারি হাসপাতালে যেতে চাইবে না। আজকাল যায়ও না ।

 

সংবাদপত্রে প্রায় প্রতিদিনই চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রতিবেদন ও অভিযোগ পাওয়া যায়। এ সবের অনেকগুলো আবার বেশ ভয়াবহ। চিকিৎসা কাঠামোর রন্ধ্রে-রন্ধ্রে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে – এ অভিযোগটাও বেশ পুরনো। চিকিৎসকদের ভূমিকা কি হওয়া উচিত ও প্রত্যাশিত, তা বলবার অপেক্ষা রাখে না। অথচ তাদের অবহেলার কারণে রোগী মারা যাচ্ছে পর্যন্ত – এ ধরণের খবর এখন নিয়মিতই সংবাদপত্রে আসছে। ঢালাওভাবে সকল চিকিৎসককে অভিযুক্ত করা হচ্ছে না, কিন্তু এ সকল অভিযোগও তো মিথ্যা নয়।

 

আমরা এ অবস্থার অবসান চাই। কারণ তা আমাদের অধিকার। সরকারি চিকিৎসার দ্বারস্থ যাদের হতে হয় না তাদের অবশ্য মাথাব্যথা থাকার কথা নয়। সরকারি ওপরওয়ালারাই যে আজকাল শুধু বাইরে যান তা নয়, স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বিরোধীদলীয় ‘দেশপ্রেমিকরা’ও লন্ডন-ন্যুইয়্যর্কে-সিঙ্গাপুর-ব্যাংককে যান। দেশীয় চিকিৎসায় আস্থা নেই বুঝলাম, কিন্তু একে বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকরী করার উদ্যোগও তো নেই। সংখ্যাগরিষ্ঠ গরীব মানুষেরা বোবা, এরা হা করে তাকিয়ে থাকে, নয়তো বুক চাপড়ায়; করুণ আর্তনাদে জীবন ভরিয়ে দেয়। কিন্তু তবুও তাদের অন্যতম মৌলিক অধিকারটি থেকে যায় ধরাছোঁয়ার অনেক বাইরে; দূরে, অনেক দূরে। কিন্তু এভাবে তো চলতে পারে না, চোখ-মুখ বুঁজে থাকলেও তো কিছু হবে না; উদ্যোগ এখনই নিতে হবে – বেলা কিন্তু বয়ে যাচ্ছে !