ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

(ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হক ঢাকা শহরকে হাসপাতালের আইসিইউ-তে থাকা রোগীর সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন এই “রোগীর” চিকিৎসা আবার তার জানা নেই! স্বয়ং মেয়রই যদি এইরকম অসহায় আত্মসমর্পণ করে ফেলেন, তাহলে আমরা আমজনতা যাই কোথায়!? এই লেখাটি তাই মরণাপন্ন আমাদের অসহায়ত্বের এক অর্থহীন আর্তনাদঃ “ঢাকায় থাকি” – কিংবা/এবং – “আন্দামান থেকে বলছি”—)

আমরা যারা ঢাকায় থাকি, তাদের মধ্যে কোন এক অজ্ঞাত কারণে একধরণের কৌলীন্যবোধ কাজ করে। দেশের আর সবার চেয়ে নিজেদেরকে “শ্রেষ্ঠ” কিংবা “উন্নত” ভাবার একটা Superiority Complex কাজ করে ঢাকাবাসীর মধ্যে। কেন, কে জানে! অবশ্য হতে পারে, আমাদের দেশের সবকিছুই তো ঢাকাকেন্দ্রিক; অর্থাৎ, বাংলাদেশ মানেই তো ঢাকা! ঢাকা মানেই তো বাংলাদেশ!! এ দেশের সকলপ্রকার দণ্ডমুণ্ডের যত হর্তাকর্তা তারা সকলেই তো ঢাকায় থাকেন। তাই, আমরাও যারা “ঢাকায় থাকি” তারা ভুগতেই পারি এই উন্নাসিকতায় – “কী হনু রে……!”

আর যারা ঢাকার বাইরে থাকি, অন্য কোন শহরে-নগরে কিংবা মফস্বলে অথবা কোন এক গ্রামে, তারা আবার একধরণের হীনমন্যতায় ভুগি। নিজেদেরকে একটু “খ্যাত্” ভাবি, ঢাকাবাসীর তুলনায় খুব Unsmart মনে হয় নিজেদেরকে।একই দেশের মানুষ হয়েও নিজেরাই নিজেদেরকে কেমন যেন এক নিম্নপ্রজাতির বলে মনে করি। আশ্চর্য হলেও এই অদ্ভুত Inferiority Complex-এ ভুগি আমরা; বিশেষত “ঢাকা সফরকালে” – যেন বা কোন্ দূরের এক আন্দামানবাসী!

তবে এই দুই বোধের বাইরে, মানে এই উন্নাসিকতা এবং হীনমন্যতার বাইরেও, আরেকটি সত্য কিন্তু জেগে থাকে। হু, প্রবলভাবেই থাকে। আছে। আর সেই নির্মম সত্যিটা হচ্ছে – আমরা কেউ-ই আসলে ভালো নেই। বাংলাদেশ ভালো নেই। একদম না। তবে সবচে করুণ অবস্থা ঢাকার! হু, আমাদের রাজধানী ঢাকার। গত কয়েকমাস ধরেই আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জরিপেই উঠে আসছে ব্যাপারটা।এইরকম সবগুলো মানদণ্ড কিংবা জরিপেই ঢাকা বসবাসের জন্য সবচাইতে অযোগ্য শহর বলে বিবেচিত হচ্ছে। কোন কোন জরিপে ঢাকার চেয়ে নিকৃষ্ট হিসেবে আসছে ইরাকের রাজধানী বাগদাদের নাম, কোনটাতে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের নাম। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এ দুটোই যুদ্ধ বিধ্বস্ত শহর, যুদ্ধে বিপর্যস্ত শহর। কিন্তু আমাদের ঢাকা!? কোন্ যুদ্ধে আমাদের রাজধানীর এই বিধ্বস্ততা? বিপর্যস্ততা? কেন ঢাকা মানুষের জন্য বসবাসের অযোগ্য পৃথিবীর সবচাইতে নিকৃষ্ট শহর!?

কার দোষে? কার পাপে? শুধু কি সরকার দায়ী? প্রশাসন দায়ী? কেবল নষ্ট রাজনীতির কারণেই হচ্ছে এমনটা? আমরা এই দেড় কোটি “মানুষ”, যারা ঢাকায় থাকি, আছি – আমাদের কোন দায় নেই? দায়িত্ব নেই? একটুকুও না!? ঢাকাকে নিংড়ে, ছিবড়ে সুযোগ-সুবিধার পুরোটুকুই তো হাতিয়ে নিচ্ছি আমরা, ছিনিয়ে নিচ্ছি। অথচ তার সুস্থ যত্নের বেলায়, সুষ্ঠু বিকাশের প্রশ্নে এই আমরাই আবার চূড়ান্ত নির্বিকার। উদাসীন। ঢাকা যদি এই বিশ্বের সবচাইতে নিকৃষ্ট শহর হয়, তাহলে অবধারিতভাবেই আমরা ঢাকাবাসীরা এই পৃথিবীর সবচাইতে নিকৃষ্ট, নোংরা, অযোগ্য নাগরিক। হু, এ তো খুব সরল সমীকরণ। সহজ হিসাব। তাই না!?

তা-ই তো। আর কেন-ই বা বলবো না এইভাবে? ঢাকায় কী নেই? কে নেই? এ দেশের যতো শ্রেষ্ঠ জ্ঞানীগুণী, শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী তাদের প্রায় সকলেই ঢাকায় আছেন, থাকেন। দেশসেরা চিকিৎসক-প্রকৌশলী-শিক্ষক-আমলা- ব্যবসায়ী -কর্পোরেট ব্যাক্তিত্ব, সবাই-ই তো ঢাকাতেই। ঢাকারই। সব ভালো প্রতিষ্ঠান, সব ভালো স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, সব ভালো ক্লিনিক-হাসপাতাল, সব ভালো মিডিয়া হাউস, শিল্পকলা-চিত্রকলা-নৃত্যকলা, সব ঢাকায়। স-ব! আমাদের যা কিছু ভালো, যা কিছু শ্রেষ্ঠ – সবটাই তো ঢাকায়। ঢাকার। অথচ তারপরও আলোর নিচে অন্ধকারের কী এক অপ্রতিহত দাপট! কেমন এক আদিম বিপন্নতা এইখানে, চারপাশে! কেন? কেন হলো এমনটা? কেন হবে এমনটা? তবে কি অতি সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট হলো না-কি!?

‘সমকাল’-এ সেদিন বুড়িগঙ্গার একটা ছবি ছাপা হয়েছে – উফ্! অবিশ্বাস্য!! অকল্পনীয়!!! বাংলাদেশের ‘সিডনি’ হাতিরঝিল ইতোমধ্যেই পরিণত হয়েছে ভাগাড়ে, পত্রপত্রিকা আর টিভিতে আসছে খবরগুলো। প্রায় দিনই এক কিংবা একাধিক নবজাতকের লাশ মিলছে এই মহানগরের ডাস্টবিনে, ড্রেনে। আহ্! অথচ কী আশ্চর্য, এই শহরে তবু সূর্য ওঠে, সূর্য ডুবে! বৃষ্টি নামে! প্রেমের কাঁপন জাগে হৃদয়ে! কী বিপ্রতীপ এক বিবমিষা!!

আসলে কাকে কী বলবো? আমরা সবাই-ই তো মুখোশআঁটা এক একজন “ভালো মানুষ”! আত্ন-সর্বস্বতার ক্লেদাক্ত ভূমিতে দাঁড়িয়ে চামড়া বাঁচাবার স্বার্থপর চেষ্টা সবার। আর তা-ই তো, দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ধরে একটু একটু করে আমাদের প্রিয় ঢাকা সারা পৃথিবীতে নিকৃষ্ট থেকে নিকৃষ্টতম শহরে পরিণত হওয়ার পরও কী নির্লজ্জ স্বাভাবিক আমরা! কী নির্লিপ্ত উদাসীন! নতুন শিশুর জন্য কী অঙ্গীকার করবো আমরা, নিজেদের জন্যই তো বাসযোগ্য আবাসের ছাড়পত্র পাইনি এখনও। হয়তো পাবোও না! কোনদিনই না!

তাই, “কাকে ঘৃণা করো তুমি? এ আমার, এ তোমার পাপ……!!”

 

tanvir13a@yahoo.com