ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

কী নিঃসীম আঁধার চারদিকে! সেই নিদারুণ আঁধার ফুড়ে যে এক টুকরো আলো ছিটকে আসবে, তা-ও ঘটে না, এতটাই সঘন সে। বিশ্বাসের নড়বড়ে জমিতে দাঁড়িয়ে তবু ঠিকানা খোঁজা। শুধু জানি, বেঁচে থাকার জন্য একটি অবলম্বন দরকার, আশায় বুক বাঁধার জন্য নেতিবাচক এ সময়ে দরকার কিছু খড়কুটোর। অথচ এমনই এক অদ্ভুত দুঃসময় যখন তা-ও ভেসে যায় শ্রোতের শ্যাওলার মত। আমরা বিপন্ন হয়ে পড়ছি ক্রমশ। এক এক করে  হারিয়ে ফেলছি অস্তিত্বের ভিটেমাটি। আশা-ভরসার জায়গাটুকুও আসছে কমে। আমাদের সবকিছুর ওপর প্রাগৈতিহাসিক দানবের কালো ছায়া ছেয়ে যাচ্ছে। এক অচেনা আদিম আঁধার তলিয়ে যাচ্ছি আমরা – আস্তে আস্তে, অথচ নিশ্চিত করেই।

কিন্তু এই-ই কি সব? শেষ!? উহু, তা তো নয়। নিশ্চয়ই না। চুড়ান্ত ঠেকে গিয়েও তো মানুষ আবার ঘুরে দাঁড়ায়, দাঁড়িয়ে যায়। প্রকৃতিতে শক্তির যেমন কোন বিনাশ নেই, রুপান্তর আছে মাত্র; মানুষের অন্তর্গত শক্তিরও তো তাই – কোন বিনাশ নেই। সাময়িকভাবে হয়তো তাকে দমিয়ে রাখা যায়, দাবিয়ে রাখা সম্ভব; কিন্তু একটা সময় ঠিকই সে রুখে দাঁড়ায়; চূড়ান্ত ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ফিনিক্স পাখির মতোই ছাইভস্ম থেকেও আবার জেগে উঠে অপরাজেয় মানুষ! হু, আগুন পাখি!!

আলো আর অন্ধকারের দ্বন্দ্ব চিরকালের। শুভ-অশুভের লড়াইটাও তাই। একে অপরকে খারিজ করে দিতে চাইছে প্রতি মুহূর্তেই। একভাবে বলতে গেলে সমস্ত প্রকৃতি, আসলে এই পুরো মহাবিশ্বটারই তো উদ্ভব হয়েছে এইরকমেরই এক নিরন্তর দ্বন্দ্ব থেকে! পদার্থ বিজ্ঞানের  একটা তত্ত্ব অনুসারে, প্রকৃতিতে প্রতিটি পদার্থের একটি সমানুপাতিক প্রতিপদার্থ আছে, থাকে; পারস্পরিক দ্বন্দ্বে অব্যাহতভাবে এরা একে অপরকে খারিজ করে দিচ্ছে। তবে একটা সময়, এই নিয়ত দ্বন্দ্বের কোন এক পর্যায়ে, প্রতিপদার্থের চেয়ে পদার্থের পরিমাণ সামান্য, ক্ষুদ্রতম ভগ্নাংশের মতো সামান্য, বেশি হওয়ায় সেই টিকে যাওয়া, থেকে যাওয়া ক্ষুদ্রতম পদার্থ থেকেই মহাবিস্ফোরণ! আর সেই বিগ ব্যাং-র পর থেকেই সৃষ্টি হলো সমস্ত মহাবিশ্ব, যা আজও বিস্তৃত, সম্প্রসারিত হয়ে চলেছে, প্রতিনয়ত।

মানুষের জীবনও তো তেমনি। মানুষের পৃথিবীটাও তাই। শক্তির বিপরীতে অপশক্তি। আলো আর অন্ধকার। শুভ আর অশুভ। অপশক্তি দাঁড়িয়ে আছে, থাকে মিথ্যের উপর ভর করে, অশুভ অন্ধকারে। কিন্তু মিথ্যে তো বিনাশী; এর ধ্বংস হবেই। আজকের পৃথিবীতে মানুষের যে অবস্থান, মনুষ্যত্ব যেখানে গিয়ে ঠেকেছে, তার পরিণতি আরও করুণ, আরও ভয়ংকর হতে পারে। একটা সময় এমনও মনে হতে পারে যে, মানুষ আর মানবতা হয়তো বিলুপ্তই হয়ে যাবে! কিন্তু, প্রকৃতির নিয়ম আর ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলছে, এই অন্ধকারতম বিপর্যয়ও মানুষ কাটিয়ে উঠবে। হু, পারবে। শুভশক্তির আলোয় দূর হয়ে যাবে সব অন্ধকার; ধুয়ে-মুছে যাবে অশুভ যতো আবর্জনা আর জঞ্জাল। যুগে যুগে শুভ শক্তিকে ধংস করার, সমূলে উপড়ে ফেলার অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। অনেক। কিন্তু ধ্বংস হয় নি। হবেও না। বিলীন করা যায় নি। যাবেও না।

রবীন্দ্রনাথ যেমন বলতেনঃ ‘আমারে তুমি অশেষ করেছ, এমনি লীলা তব।/ ফুরায়ে গেলে আবার ভরেছ, জীবন নব নব।’ – এমন কথা অবশ্য রবীন্দ্রনাথই বলতে পারেন, তাঁকে দিয়েই সম্ভব – আলোর ডানায় তিনি উড়েছেন সারা জীবন। তাই, আজও তিনি অশেষ। অন্ধকারের মানুষেরা (না-কি অমানুষ!?) সেটা পারে না। সম্ভবই না। আলো তাদের শত্রু। হু, নিশাচরের যাত্রা নিশিথেই শেষ হয়। নবজীবনের উন্মেষ তো আসলে রাতে সূর্যোদয়ের স্বপ্ন মাত্র। মানুষেরই স্বপ্ন থাকে, আছে; তাই ফুরিয়ে গেলে আবার ভরে উঠবে মানুষের জীবন, পৃথিবী। হু, আলোয় ভুবন ভরা। আমাদের মুক্তি তো আলোয় আলোয়!!

মানুষের পুনরুজ্জীবন হবেই। একবার। আবার। বারবার। প্রতিবার। পাথরে পাথর ঘঁষে যারা আগুনের ফুলকি ছড়িয়েছিল প্রাচীন অরণ্যে, তারা তো শুধু সেঁকে নেয়নি পশুদের  মাংসপিন্ডগুলো; বরং তারা জীবনের স্যাঁতস্যাঁতে পাতা মেলে ধরেছিল উনুনের উপর। অন্ধকার গুহাগুলো একসময় হয়ে উঠলো আমাদের জীবন্ত সংস্কৃতির ঘর-বাড়ি। হু, মরা গাঙে আবার জোয়ার আসবে, খরার দেশও সবুজে ছেয়ে যাবে। নিদারুণ আঁধার কাটেনা যদিও, জঞ্জালও বাড়েই শুধু; তারপরও সোনার কাঠি-রুপোর কাঠির যে ঘুমে ঘুমিয়ে আছে রাজ্যপাট-রাজকন্যা, সেই কাঠিটি পাল্টে দিতে পারে সাহসী রাজকুমার। আলোকিত মানুষেরাই পারে অমানিশা ভেঙে আলো আনতে। সিন্দাবাদের ভূতের মত চেপে বসা অন্ধ নিয়তিকে পাল্টাতে পারে স্বপ্নবান জীবনমুখী মানুষেরাই। হু, আলোর পথে মানুষের যে যাত্রা তা থামবে না। কখ্খনো না। এই মহাযাত্রা হোঁচট খেতে পারে, কিন্তু কখনোই থমকে যাবে না। একদম না। আলোর তৃষ্ণা মেটানোর অপ্রতিরোধ্য আবেগে যে যাত্রা, অশুভ অন্ধকারের কি সাধ্যি তাকে ঠেকায়!?