ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

হলিউডের ছবিতে নায়কের দূর্দান্ত সব কারিশমায় বিমোহিত হয় তরুণ-তরুনীরা। নায়কের অথবা নায়িকার গায়ের ব্লেজারটা দেখে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করে বসুন্ধরা সিটি অথবা যমুনা ফিউচার পার্কে। তারপর কিনে ক্ষান্ত হয়,তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে। এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশের মানুষের উপর সবচেয়ে বেশী প্রভাব হিন্দী সিনেমার। শিক্ষিত,অর্দ্ধ শিক্ষিত,অশিক্ষিত প্রায় সবাই হিন্দী সিনেমা দেখে। নায়ক সালমান খানের হাতের ব্রেসলেট হাতে নিয়ে জিম করছে আর পাশের বন্ধুকে বলছে দেখতো আমাকে সাল্লুর মত লাগছে কিনা? সিক্স প্যাক,এইট প্যাকের শরীরের স্বপ্ন দেখছে তরুণেরা। এরকম চিত্র আমাদের পরিচিত হয়ে উঠছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারনে। ভয়াবহ ব্যাপার ঘটছে যখন একটি সিরিয়ালের নায়িকার নামে বিকানও ড্রেস না পেয়ে কোন তরুণী আত্নহত্যা করছে বা তা না পেয়ে সংসার ভেঙে যাচ্ছে। এই চিত্রগুলো ক্রমশ খুব পরিচিত হয়ে উঠছে আমাদের সমাজে।

সম্প্রতি ধর্ষণও ফ্যাশানের মতই আমাদের দেশে অনুকরণীয় হয়ে উঠছে বলে মনে হচ্ছে। ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বরে দিল্লিতে চলন্ত বাসে জ্যোতি সিং নামের এক নারী ধর্ষণের শিকার হন। তার অল্প কিছু দিন পরেই মানিকগঞ্জে ১৭ বছর বয়সী এক পোষাক শ্রমিককে একইভাবে ধর্ষণের চেষ্টা চালায় বাসচালক ও তার সহকারী। এখন মাইক্রোবাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটলো। এর মধ্যেই আবার ট্রাকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে গাজিপুরে।এই অবস্থা চলতেই থাকবে যদি না সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে না পারে রাষ্ট্র। আমরা কিছুদিন আগে খেয়াল করলাম পহেলা বৈশাখে টিএসসিতে একদল ছেলে তরুনীদের উপর হামলে পড়লো।আপনজনদের কাছে থেকে ছিনিয়ে নিয়ে অসভ্যতা করলো।এ ধরণের ঘটনা হিন্দী সিনেমায় ও ভারতের বাস্তব জীবনে অহরহ ঘটছে যা আমরা দেখতে পাই।  এতো মানুষের মাঝ থেকে মাত্র কয়েকজন তার প্রতিবাদ করলো। সেই প্রতিবাদকারী ছেলেদেরকে আমার অভিবাদন। কিন্তু আশ্চর্য হলাম যখন জানলাম পাসেই পুলিশ দাঁড়িয়ে ছিল কিন্তু কিছুই করে নাই। রাষ্ট্র কি তাহলে নিরবে উৎসাহ দিচ্ছে এমন ঘটনার? রাষ্ট্র যদি বিচার করতে গড়িমসি করে তবে কি তা উৎসাহ নয়? আজ পর্যন্ত সেই ঘটনার কোন অপরাধি গ্রেফতার হয় নাই। শুধু কিছুদিন আগে কয়েকজনের ছবি প্রকাশ করেছে পুলিশ আর বলেছে এদেরকে চিনলে ধরিয়ে দিন। এই হলো ক্রাইম পরবর্তি পুলিশের তৎপরতা।কিছুদিন আগে মোহাম্মদপুর প্রিপ্রায়টরী স্কুলের বাচ্চা দুইটা মেয়েকে যৌন হয়রানি করলো ক্যান্টিন বয়, তার কি কোন বিচার হয়েছে? প্রথমে সেটাকে তো গুজব বলে চালাতে চাইলো। পরে ঠিকই বের হয়ে আসলো প্রকৃত ঘটনা। তাহলে আমাদের  নারীরা,শিশুরা কোথায় নিরাপদ? অবাক করা ঘটনা হলো সেই স্কুলের ভাইস প্রিন্সিপাল একজন নারী এবং সে ধর্ষণকারিদের পক্ষ নিয়েছিলেন।

গত ২২ মে একজন গারো মেয়ে চলন্ত মাইক্রোবাসে ধর্ষিত হয়েছে। মেয়েটি যমুনা ফিউচার পার্কে একটি দোকানে বিক্রমকর্মী ছিল। কিছুদিন আগে একলোক,একজন বিদেশী নারী ও পুরুষ নিয়ে সেই দোকানে এসেছিল। তারপর তাকে জিজ্ঞেস করেছিল কি নাম? বেতন কত? এই বেতনে চলে কিনা? সেই লোকটিও ছিল সেই মাইক্রোবাসে ধর্ষনকারীদের মাঝে। তারা পোষাক-আশাকে ছিল ভদ্রলোক এবং শুদ্ধ বাংলায় তারা কথা বলছিল বলে মেয়েটির দেয়া তথ্য থেকে জানা যায়। এমন ভদ্রবেশী ধর্ষক আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে অহরহ। রাষ্ট্র যদি এমন ঘটনার বিচার দ্রুত না করে তবে দিনদিন এই সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।আমরা এক্ষেত্রেও দিল্লীর সেই ঘটনার সাথে মিল খুজে পাচ্ছি। মেডিকেলের সেই ছাত্রী বাসে ধর্ষিত হয়েছিল আর এই মেয়েটি মাইক্রোবাসে।কিছুদিন আগে ময়মনসিংহের ত্রিশালে একজন গৃহকর্মী চলন্ত বাস থেকে লাফ দিয়ে ধর্ষণের হাত থেকে বেচেছেন। পরে এলাকাবাসী বাসচালককে আটক করে পুলিশে দেন। মনে হচ্ছে এটি নতুন ফ্যাশানে পরিণত হচ্ছে। আগে বাড়ি,অফিসে,পরিত্যাক্ত জায়গায় ধর্ষণের খবর পাওয়া যেত এখন স্কুলে,বাসে,মাইক্রোবাসে ধর্ষণের খবর পাওয়া যায়।

ধর্ষণ প্রতিরোধে আমাদের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। রাষ্ট্র যেমন তরিৎ বিচারের ব্যাবস্থা করবে ঠিক তেমনই সমাজের সকল স্তর থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে ধর্ষণের বিরুদ্ধে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিতবর্তন আনতে হবে। নারীকে সন্মান করাতে শেখাতে হবে পরিবার ও শিক্ষা ব্যবস্থা থেকেই। শিক্ষা ব্যবস্থা হতে হবে মানবতা বান্ধব।সেখানে যেমন জটিল গণিত থাকবে তেমনি থাকবে পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ শেখানোর নানান কৌশল।

 

লেখকঃ তানজির খান
কবি ও ব্লগার
tanzirrkhan@gmail.com