ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, ভ্রমণ

 

লেখার শুরুতেই পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই আমাদের দুবলিয়া একটি সুন্দর ছায়া সুনিবিড় গ্রাম,যা পাবনা জেলায় অবস্থিত।এখানে রয়েছে বিচিত্র বিটপীর সমাহার।প্রতিটি রাস্তার পাস দিয়ে রয়েছে সারি সারি সবুজ বৃক্ষরাজী। দেখে মনে হয় এ যেন একটি জীবন্ত কবিতা বা উপন্যাস। দুবলিয়ার মাটিতে পা রাখতেই হিমেল হাওয়া ছুয়ে যায়, প্রাণ জুড়িয়ে আসে। যে কেউ এই গ্রামের মায়ায় জড়িয়ে যাবে একবার গ্রামে প্রবেশ করলেই।

দুবলিয়া আশেপাসের অঞ্চলের শিক্ষা,ব্যবসা ও উন্নয়নের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বহু বছর ধরে সুবিদিত হয়ে আসছে।যদি দুবলিয়ার অর্থনৈতিক পরিসীমা নির্ণয় করি তবে তা দুটি ইউনিয়ন অন্তর্ভুক্ত করবে।সেগুলো হলো ১। সাদুল্লাপুর ইউনিয়ন ২।চরতারাপুর ইউনিয়ন ।মোটা দাগে ইউনিয়ন দুটির একক পরিচয় বহন করে দুবলিয়া। সে ক্ষেত্রে দুটি ইউনিয়নকে একত্রে বৃহত্তর দুবলিয়া বলতে পারি। এই দুটি ইউনিয়নের অর্থনিতীর চালিকা শক্তির উৎস হিসেবে পরিগণিত হয়েছে দুবলিয়া। গ্রামীণ জীবনে গতির সঞ্চার হয়েছে, নাগরিক প্রায় সকল সুযোগ সুবিধা পৌছে গেছে মানুষের কাছে। গ্রামের পাস দিয়ে রাস্তা ধরে বয়ে গেছে বিশাল জলাশয় যেটা ”কোল” নামে স্থানীয়দের মাঝে পরিচিত যা এক সময় পদ্মা নদীর সাথে একাকার ছিল। এই বিশাল জলাশয়ে যে মাছ চাষ হয় তার উপর বহু পরিবার নির্ভর করে। এর মাধ্যমে যেমন অর্থনৈতিক ভাবে অনেক পরিবার স্বাবলম্বী হয়েছে আবার স্থানীয় বাজারের চাহিদাও পূরণ হচ্ছে। এখান থেকে সংগৃহীত মৎস দেশের বহু জায়গায় পৌছে যাচ্ছে জাঁতীয় চাহিদা মেটানোর জন্য।

বৃহত্তর দুবলিয়ার পাটোয়া-খালিশপুর-সাদুল্লাপুর সংলগ্ন বিশাল কোল(জলাশয়)

বৃহত্তর দুবলিয়ার পাটোয়া-খালিশপুর-সাদুল্লাপুর সংলগ্ন বিশাল কোল (জলাশয়)

দুবলিয়া গ্রামে ১৯৬০ সালে গড়ে উঠে প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ”দুবলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়”। তারপর থেকেই একটি অন্ধকার সমাজকে আলোর দিকে ধাবিত করতে ভূমিকা পালন করে আসছে আমাদের প্রিয় দুবলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়। দিন দিন প্রতিষ্ঠানটি বেড়ে উঠেছে একটি সফল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে।এই স্কুলের বহু প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী আজ দেশের নানান গুরুত্বপূর্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন। যেমন রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা, ঠিক তেমনই ভাবেই অনেক উদ্যোক্তা তৈরী হয়েছেন দুবলিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকেই। যারা দেশের অর্থনিতীর চাকা কে সচল করে রাখতে অবদান রাখছেন প্রতিনিয়ত।এমনকি এই স্কুলের অনেক প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী কর্মরত আছেন দেশ বিদেশে। আশির দশকের শেষের দিকে দুবলিয়াতে আরো দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে। যার একটি হলো ”ফজিলাতুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়” যেটি স্থানীয় সমাজ সেবক মাহাতাব উদ্দীন বিশ্বাসের মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত।তবে এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা এলাকার কৃতি স্বন্তান,বিদ্যা উৎসাহী সমাজ সেবক মরহুম লুৎফর রহমান খান। এই প্রতিষ্ঠানটি নারী শিক্ষা বিস্তারে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে আসছে। একটি দেশ তখনই এগিয়ে যাবে যখন সেই দেশে নারী শিক্ষা বিস্তার লাভ করবে এবং নারীরা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহন করবে। এই বালিকা বিদ্যালয়টি তার জন্ম লগ্ন থেকেই নারী শিক্ষার অগ্রগতিতে অগ্রদূত হিসেবে কাজ করছে। আশির দশকের শেষে আরো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয় ” হাজী জসীম উদ্দিন ডিগ্রী কলেজ” নামে এটিও সমাজ সেবক মাহাতাব উদ্দীন বিশ্বাসের বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত। তবে এই প্রতিষ্ঠানের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছেন মরহুম নওশের আলী মন্ডল নামের আলোকিত একজন মানুষ।এই কলেজ প্রতিষ্ঠায় মরহুম লুৎফর রহমান খানও বিশেষ গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রেখেছেন। আমাদের এই দুবলিয়া অঞ্চলের অগ্রগতিতে মরহুম নওশের আলী মন্ডল,মরহুম লুৎফর রহমান খান ও মহাতাব উদ্দীন বিশ্বাস এর মতো আলোকিত মানুষের অবদান রয়েছে। যারা আজকের তরুণ সমাজের কাছে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিগণিত হয়েছেন।

দুবলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়

দুবলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়,দুবলিয়া,পাবনা

হাজী জসীম উদ্দীন ডিগ্রী কলেজ

হাজী জসীম উদ্দীন ডিগ্রী কলেজ

দুবলিয়া গ্রামটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক বিরল উদাহরন। এখানে মূলত হিন্দু ও মুসলিম পরিবার বাস করে। যাদের মাঝে আছে এক উদার মেলবন্ধন।এখানে যেমন হিন্দুরা মুসলিমদের নানান ধর্মীয় উৎসবে যোগ দিয়ে রাঙিয়ে তোলেন,তেমনই মুসলিমরাও হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসবে যোগ দিয়ে তা সার্বজনীন করে তোলেন। উদাহরন সরূপ বলা যায় হিন্দুদের বৃহত্তর ধর্মীয় উৎসব দূর্গা পূজা ও মুসলিমদের ঈদের কথা। দুবলিয়ার সবচেয়ে বড় উৎসব দুবলিয়ার ঐতিহ্যবাহী মেলা যা অনুষ্ঠিত হয় দূর্গাপূজাকে ঘিরে। কিন্তু এই উৎসব ধর্মের গন্ডি পেরিয়ে আজ সার্বজনীন সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। যদিও কথিত আছে এই মেলার ইতিহাস গ্রামীণ নৌকা বাইচ প্রতিযোগীতার সাথে জড়িয়ে আছে। কিন্তু বাস্তবতায় আজ তা অনুষ্ঠিত হয় দূর্গাপূজার পরদিন থেকে। এই মেলা দুবলিয়ার মেলা নামে পরিচিত। মেলাকে ঘিরে গড়ে উঠে নানান ব্যবসা বাণিজ্য। সারা বছর কামার,কু্মোর,ফার্নিচার প্রস্তুতকারী সহ নানান পেশার মানুষ হরেক রকম পন্য তৈরী করে এই মেলার অপেক্ষায় থাকে। যা গ্রামীণ অর্থনিতীতে ব্যপক ভূমিকা পালন করে আসছে।নানান অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে বহু বিনিয়োগকারী মেলায় বিনিয়োগ করে থাকেন। আমরা জানি অর্থনিতীতে মানি সার্কুলেশন বা অর্থের প্রবাহের বিকল্প নেই। সঠিক অর্থ প্রবাহই একটি দেশের অর্থনিতীকে সুসংঘঠিত করে। সে বিবেচনায় দুবলিয়ার মেলা অনেক বড় ভূমিকা পালন করে আসছে গ্রামীণ অর্থনিতীতে। উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতায় কালে কালে দুবলিয়াতে গড়ে উঠেছে স্কুল,কলেজ,ব্যাংক সহ নানান সরকারী-বেসরকারী অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

আমাদের এই গ্রাম বাংলাদেশের যে কোন গ্রামের জন্য একটি আদর্শ গ্রাম। দুবলিয়া বাংলাদেশের ছোট্ট আলোকিত একটুকরো  ভূখন্ড, এ যেন শান্তির অপার এক খোলা আকাশ। বাংলাদেশের প্রতিটা গ্রাম সুখী,সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে সেই সাথে আমাদের দেশ হবে বিশ্বের জন্য অনুকরণীয় এই কামনায় শেষ করছি লেখা।

লেখকঃ তানজির খান

কবি ও ব্লগার

মেইলঃ tanzirrkhan@gmail.com