ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

অনেকটা পথ হেঁটে এসে জানলাম এ পথের পথিক আমি নই। আমার বরং শিউলি ফুলে ভরা সবুজ ঘাসকেই বেছে নেওয়া উচিৎ ছিল। স্ববিরোধী এই ঘটনা প্রবাহে নিজেকে তুচ্ছ করে আর লাভ কী হবে? লাভের হিসাব অবশ্য আমার নেই কিন্তু এই যে অন্তর আত্নার প্রতিনিয়ত মৃত্যু হচ্ছে তার তো একটা গোপন বেদনা আছে, সেই গারো মনোবেদনায় আর কতক্ষন নিজেকে ভুল বুঝিয়ে রাখা যায়? তোমরা হয়তো দশটা গল্প শোনাবে,হয়তো বলবে আরো তো আছে অনেকেই!তাতে কি আমার একটা ফুলের বাগান গড়ে উঠবে? তোমরা হয়তো ভাব সবাই ঈর্ষাপরায়ণ কিন্তু আমি তো ভালবেসেছিলাম আমাকে,তোমাকে আর সবাইকে।

মনটা ভিষন খারাপ,চরম অস্বস্তি নিয়ে আছি। জীবনে কি পরাজিত হয়েই রয়ে যাব? শেষ কবে জিতেছিলাম ভুলে গেছি।পড়ন্ত বিকালে এক খেয়ালী প্রজাপতি আমাকে তার মায়ায় ডুবিয়েছিল। সেই মায়া কাটিয়ে উঠতে চরম মূল্য দিয়েছি। বিশাল সমুদ্রের মাঝে একা ভেসেছি,ডুবেছি আর জীবনের প্রতি তীব্র অবহেলা করেছি।সেই অবহেলার ধারাবাহিকতায় পড়াশোনা শেষ করে ঢাকায় আসলাম নতুন জীবনের খোজে। চাকরী খুজে চলেছিলাম কিন্তু কিছুই হচ্ছিলো না। শেষ পর্যন্ত একটি কলেজে ঢুকলাম। আমার মনের মাঝে শিক্ষকতার প্রতি আগের থেকেই টান ছিল নানান কারনে। ভালই আনন্দে ছিলাম সেই দিনগুলিতে।তখন মিরপুর কাজীপাড়া থেকে উত্তরা তে কলেজ করতাম। কলেজ, ক্লাশ, বাসায় ফেরা কাজীপাড়া বাস স্টান্ডের পাসের টোঙ ঘরে চা খাওয়া আর সবার সাথে আড্ডা দেয়া। খুব সুন্দর সময় কাটছিল। আমার দেশের বাড়ির অনেকেই মিরপুর এলাকায় থাকতাম তাই বড় ভাইদের সাথে নিয়মিত দেখা হতো ওই চায়ের দোকানে। আমি ছিলাম তাদের মাঝে সবার ছোট কিন্তু তারা আমাকে বন্ধুর মত দেখতো। মাত্র ছয় মাস আগের কথা এখন সব কেমন অতীত হয়ে গেলো। সকাল আটটার মাঝে উত্তরায় আসা আবার বিকাল পাচটায় কলেজ থেকে বের হয়ে বাসায় ফেরা খুব কষ্ট হতো মিরপুর থেকে তবুও ভালই ছিল জীবন।

হঠাৎ বাসা পাল্টাতে হলো। তাই ভাবলাম উত্তরার দিকেই চলে আসি। নতুন ঠিকানায় আমার আই বি এ এর বন্ধুদের সাথে উঠলাম।এদিকে অফিস পরে কলিগদের সাথে আড্ডা বেড়ে গেল কারন সবাই প্রায় এক এলাকাতেই থাকতাম। আমার খুব কাছের একজন কলিগ বন্ধু ছিল। সে আমাকে অনেক কিছুতে উৎসাহ দিতো, এখনও দেয়। তাকে অনেক জ্বালিয়েছি,এখনও জ্বালাই সুযোগ পেলেই।এখন সে খুব ব্যস্ত। সবাই নিজ জীবন নিয়ে ব্যস্ত। আজ রানওয়ে,কাল ডিয়া বাড়ীতে ঘুরতে যাওয়া,এসব করেই সময় যাচ্ছিলো।সেই কলিগ বন্ধুটিও কিছুদিন পর জব ছেড়েছে, আমি যে সব কারনে ছেড়েছি সেই সব কারনেই। কলেজ,অফিস, কলিগদের সাথে আড্ডা দিয়ে বাসায় ফিরে বন্ধুদের সাথে আবার গল্প-গুজব…দিনগুলি মধুর চলছিল।খুব স্বচ্ছল ছিলাম না কিন্তু সুখেই চলছিলাম। যদিও কিছু হতাশা ছিল।

শিক্ষকতা পেশায় অভিজ্ঞ হওয়ার পাশাপাশি কলেজের নানান ছিদ্র চোখে পড়তে শুরু করলো। চেষ্টা করলাম সবকিছু ঠিক করতে কিন্তু সেই মানসিকতা যদি কলেজ প্রাশাসন না দেখায় তবে আমি আর কি করতে পারি।এভাবে চললো কিছুদিন।শেষ পর্যন্ত চাকরীটা ছেড়েই দিলাম। সন্মান আর সন্মানী দুইটাই দরকার, তবে সন্মানটাই আগে আমার কাছে।দুইটার খুব ভাল ব্যালান্স থাকা চাই। তারা আমাকে নানান ভাবে ফেরানোর চেষ্টা করেছে শুধু যা প্রয়োজন সামগ্রিক শিক্ষার মান উন্নয়নে, ছাত্রছাত্রীদের কল্যাণে সেটাই করবে না। আমি শুধু একটি কথাই বলেছিলাম ”ভাত ছিটালে কাকের অভাব হয় না কিন্তু এই ‘খান’ কে পাওয়া যায় না” তা আমি যত কষ্টেই থাকি না কেন। তারপর কেটে গেলো তিনমাস। না আমি এখনও জব পাই নাই।সময়টা ধূসর থেকে ধূসরতর হয়ে যাচ্ছে।প্রায় দিনই ফোন করে কিছু হলো কিনা জানতে চায় আম্মা, আমি বলি হবে এইতো কথা হচ্ছে। আসলে কিছুই হচ্ছে না।

কতজন বললো হবে,আপনি অনেক মেধাবী।কয়েকদিনের মাঝেই অনেক সুযোগ আসতেছে,ব্যবস্থা করে দিব অল্পদিনের মধ্যেই।আমিও বললাম আপেক্ষায় থাকলাম। এখন তারা কেউ ফোন দিলেও ধরে না।গত কয়েক দিনে একটা কবিতা লিখে ফেললাম।নাম দিলাম ”বরুনার প্রেতাত্না”।পাঠকের জন্য নিচে দিয়ে দিলাম কবিতাটা।

মলিন কবিতাটা রঙিন করে দিবো,
কত জন কত কথা দিলো
অথচ দিন শেষে সবার উপর বোষ্টুমি অথবা বরুনা
নয়তো নাদের আলীর প্রেতাত্না ভর করলো।

সবাই নাদের আলী হয়ে গেলো,
কেউ কথা রাখলো না।
ইচ্ছে হলেই নাদের আলী হওয়া যায়,
যায় বরুনা অথবা বোষ্টুমি হওয়াও
কিন্তু মানুষ হওয়া যায় না।

সবাই নাদের আলী আর বরুনা হয়ে গেলো। আর আমি? না সুবর্ন কঙ্কন পরা কোন রমনীর অথবা লাঠি লজেন্সের দিকে তাকিয়ে থাকি না, সে অভ্যাস বা রুচি আমার  কোন কালেই  ছিল না। আমি শুধু আমার জীবনের দিকেই তাকিয়ে আছি এক দৃষ্টিতে।

গতকাল শুক্রবার অনেকদিন পর মিরপুর দশ নাম্বারে গিয়েছিলাম একটু কাজে। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। আমার অতীতের গন্ধে আমি তখন মাতাল সাইবেরিয়ান পাখি প্রচন্ড শীত শেষে যেন ফিরে এসেছি নিজ ভূমিতে। ফোন বেড় করে আস্তে করে খুব প্রিয় এক বড় ভাইকে ফোন দিয়ে বললাম ভাই আমি শাহ আলী মার্কেটের পেছনে একটা কাজে এসেছি। উনি বললেন তুমি ওইখানেই দড়াও একটুও নড়বে না আমি আসছি এখনি। ৩০ মিনিটের রাস্তা উনি ১৫ মিনিটে এসে হাজির। বুকে জড়িয়ে ধরলেন আমাকে। খুব কষ্টে চোখের জল সংবরন করেছি। তারপর যাপিত জীবনের নানান গল্প করলাম। কত কথা বলে শেষ করা যায়? না যায় না। কত কথা না বলাই থেকে গেলো। আমি আসলে চা, সিগেরেট কিছুই খাই না।এক কথায় আমার কোন নেশাই নেই কবিতা লেখা ছাড়া। কিন্তু এই প্রিয় বড় ভাইয়ের সাথে বসলে ব্লাক নামে একটা সুমিষ্ট সিগেরেট আছে সেটা খাই। মনে পড়ে আমি আর ভাই মাঝে মাঝে ঘটা করে টেনশান করতাম। দুই জন হঠাৎ করেই বলতাম অনেকদিন টেনশান করা হয় না চলেন টেনশান করি! এই টেনশান করা মানে আমরা দুই জন কোথাও বসব আর উনি উনার রেগুলার ব্রান্ডের সাথে আমার জন্যে একটা ব্লাক নিবে। দুই জন সিগেরেট ফুকবো আর দুঃখ,কষ্ট শেয়ার করব। হঠাৎ মেঘ কালো করে বৃষ্টি আসার হুমকি দিলো, আমি বললাম আজ উঠি। উনি কিছুতেই যেতে দেবেন না। বললেন বাসায় চলো। আমি তাকিয়ে ছিলাম আর বললাম অন্যদিন। তারপর হাটছিলাম আর ভাবছিলাম অতীত কখনও অনেক সুখের হলেও তার মাঝে একটা সূক্ষ্ম বেদনা সব সময় বাস করে।

আমার মাঝে মাঝে মনে হয় একটা যদি কিছু হতো যাতে বদলে যাবে সবকিছু।তাতে বদলে যাবে আমার পোড়া দিন আর এই বিশ্বের সবার সকল বেদনাগুলো লুভ্যর মিউজিয়ামে মোনালিসার সাথে এক ফ্রেমে আটকে যাবে। জানি এ এক অলীক কল্পনা। তবুও ভাবতে ভাল লাগে।

তানজির খান
কবি,ব্লগার ও নাগরিক সাংবাদিক
ইমেইলঃ mtanzirkhan@gmail.com

ফেইসবুক প্রোফাইল লিংকঃ  https://www.facebook.com/tanzir.khan.3