ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

মানব জীবন কত রকম ভাবে যাপিত হতে পারে তার ইয়াত্তা নেই। রাত তখন প্রায় সাড়ে চারটা, মেসের এক ছোট ভাইয়ের বাড়ী থেকে আম এসেছে সেটা আনতে যাচ্ছি খিলক্ষেত বাস স্টান্ডে। ফুট ওভার ব্রীজ পার হচ্ছি,হালকা বাতাস বইছে আর অনাগত আমের কল্পিত ঘ্রাণ এসে লাগছে নাকে।ওভার ব্রীজ থেকে নামতেই ঢাকা শহরের পরিচিত দৃশ্য, একজন ঘুমাচ্ছে ওভার ব্রীজের নিচেই। অতি পরিচিত দৃশ্য তবুও ভাবনা এসে ভর করলো। ভাবলাম জীবনের কত রঙ।কোনও টা রঙিন, কোনও টা সাদাকালো,কোনও টা আবার ধূসর। ওই যে শুয়ে আছে যে মানুষ,তারও নিশ্চই আত্বীয়-পরিজন আছে বা ছিল। সে এখন এই ওভার ব্রীজকেই তার পৃথিবী ভাবছে হয়তোবা। মনে হলো হঠাৎ করে আমি যদি রাস্তায় মারা যাই তবে কি কি হতে পারে। এক. মৃত্যুর পর কেউ হয়তো ফোন নিয়ে আমার পরিবারকে জানাবে। যদি ফোনটাও এক্সিডেন্ট এ নষ্ট হয়ে যায়!যদি কোন চোর ফোনটা সাথে সাথে পকেট থেকে নিয়ে অফ করে দেয়,তখন? দুই. মানিব্যাগে আইডি কার্ড খুজে বাড়ী তে যোগাযোগ করবে কেউ নিশ্চই। মনে পড়লো মানিব্যাগে তো আইডি কার্ড রাখি না। মানিব্যাগে আইডি কার্ড রাখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলাম। তিন. বেওয়ারিশ লাশ চলে যাবে আঞ্জুমান মফিদুলে। শেষ পর্যন্ত তিনটি ঘটনার জন্যই প্রস্তুতি নিয়ে ঢাকার শহরে আছি। আর ওই মানুষটার শুধু তৃতীয় অপশন খোলা আছে। বিধাতার কাছে প্রার্থনা পৃথিবীর সবার সব বেদনা মুছে যাক। সবাই তার কাঙ্ক্ষিত জীবন খুজে পাক।

ল্যাম্পপোস্ট,আমি ও একটি পাখি

গত বেশ কিছু দিন হলো খুব দুঃসহ কষ্টে আছি চাকরী নেই বলে। আগামী মাসে এই ছোট্ট রুমের ভাড়া দিতে পারব কিনা জানিনা। হয়তো জীবন এমনই। আমার জীবনটা বেশীর ভাগ সময় কেটে গেল নানান অবহেলায়। কখনও আমি অবহেলা করেছি আমাকে আবার কখনও জীবন আমাকে অবহেলা করেছে। বিলাসীতায় ভেসে যেতে কখনই চাই নাই।চেয়েছিলাম মনের মত একটা জীবিকা নির্বাহ করে,পিঠে রৌদ মেখে সবুজ লতাপাতায় হাত রেখে আর শিউলী ফুল কুড়িয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিব। কিন্তু তা আর হয়ে উঠলো না।

মানুষের আসলে দিন শেষে একটি পরম মমতার আর আস্থার জায়গা দরকার হয়। যদি আব্বা বেচে থাকতেন তাহলে নিশ্চই জীবনটা এত শূন্য হতো না আমার। অন্তত সাহস পেতাম যেকোন যুদ্ধে জয়ী হবার। কেউ যদি জানে তার অন্তত কান্নার একটা জায়গা আছে,যার কাছে জীবনের সব ব্যার্থতা অকপটে বলে দিক নির্দেশনা চাওয়া যায় তাহলে সব কাজেই আত্নবিশ্বাস থাকে যা সফল হতে সাহায্য করে। আমার দুঃখ আমি আব্বাকে হারিয়েছি এইচ এস সি পাস করার পরপরই। সেই পথও খোলা নেই।

সেদিন মধ্যদুপুরে কয়েকটা কবিতার লাইন মাথায় খেলা করছিল। লাইনগুলো ছিল এমন-
ধূসর স্বপ্নে নিরবে ঘুরছে মরু বেদুঈন
তপ্ত দুপুরে তৃষ্ণা নিয়ে একা প্রেমহীন।
ফিরতে হবে এবার ভরা শূন্যতায়
এই নগর ছেরে বিরহী জোছনায়।

মাস ফুঁড়িয়ে আসছে বাড়ির মালিকের ছবি ভেসে উঠছে চোখে। জীবন যদি রাস্তায় নামিয়েই দেয় তবে ফুট ওভার ব্রীজ বেছে নিবো,একটু হেসে শুয়ে থাকা সেই মানুষকে বলব ”মামা চলে এলাম”। নিশচই সেখানে বাসা ভাড়া দেবার কোন প্রয়োজন থাকবে না।

তানজির খান

কবি,ব্লগার ও বেকার

Email: tanzirrkhan@gmail.com

https://www.facebook.com/tanzir.khan.3