ক্যাটেগরিঃ শিল্প-সংস্কৃতি

 

প্রতি বছরের মত এবারও শত বছরের পুরাতন মেলা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দুবলিয়া গ্রামে।দুবলিয়া গ্রাম পাবনা সদর উপজেলায় অবস্থিত।ঐতিয্যবাহী এ মেলার ইতিহাস ঘাটলে জানা যায় এটি গ্রামীণ বিনোদনের অন্যতম উৎস নৌকা বাইচ ঘিরে জন্ম লাভ করেছিল।অতীতে এ অঞ্চল বর্ষায় প্লাবিত হতো। তখন দূর দূরান্ত থেকে গ্রামীণ জনগন এ অঞ্চলে এসে বাজার-ঘাট করতো।অতীতকাল থেকেই দুবলিয়া বাজার ব্যবসা বাণিজ্যে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল।সময়ের সাথে সাথে এখন আর সেই অবাধ জলরাশি ঢেউ খেলে না এ অঞ্চলে।তাই দুবলিয়ার এই ঐতিহ্যবাহী মেলা আর নৌকা বাইচ কেন্দ্রীক হয় না। যদিও কোনো কোনো বছর গ্রামের পাসেই অবস্থিত বিশাল একটি জলধারে (কোল নামে পরিচিত স্থানীয়দের মাঝে) ছোট পরিসরে নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয়।এখন মূলত এ মেলা প্রতি বছর দূর্গা পূজার প্রতীমা বিসর্জন এর পরের দিন অনুষ্ঠিত হয় দুবলিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও হাজী জসীম উদ্দিন ডিগ্রী কলেজ মাঠ প্রাঙ্গনে। তবে এ মেলা বিস্তৃতি লাভ করে দুবলিয়া বাজার থেকে শুরু করে সাদুল্লাহপুর স্কুল মাঠ পর্যন্ত।আজ থেকে দশ বছর আগেও এ মেলা প্রতীমা বিসর্জনের পরে জমে উঠতো, এখন তা বেশ আগে থেকেই শুরু হয়।যদিও তা পূর্নতা পায় বিসর্জনের পরে। এখন প্রায় মাস ব্যাপি এ মেলা স্থায়ী হয়।সাধারন মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতা কর্মীদের মাঝেও উৎসব বিরাজ করে মেলা ঘিরে।মেলায় রাজনৈতিক নেতারা তাদের রাজনৈতিক কর্মকান্ডেও অংশগ্রহন করে।এবার সামনেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন তাই মেলা হয়ে উঠেছে আরো বেশী তাৎপর্যপূর্ণ।

মেলা সম্পর্কে জানতে চাইলে দুবলিয়ার মাদক ও ইভটিজিং বিরোধী আন্দোলনের সভাপতি আল-রিয়াদ খান জনি বলেন ”এই মেলা দুবলিয়া অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ব্যপক ভূমিকা রাখে। তবে আমরা অতীতে মেলায় বিচ্ছিন্নভাবে মাদক বিক্রির অভিযোগ পেয়েছি। তাই প্রশাসনের কাছে এ বিষয়ে আরো বেশী আন্তরিকতা আশা করছি যাতে এ ধরণের কোনো ঘটনা না ঘটে।সেই সাথে মেলায় ইভ টিজিং এর মত কোনো ঘটনা যাতে না ঘটে সে জন্য প্রশাসন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সজাগ থাকবার আহ্বান করছি।নির্বিঘ্নে ও সুন্দরভাবে এই উৎসব শেষ হবে, আমি সেই আশা ব্যক্ত করছি”।

গ্রামীণ জীবন ও অর্থনীতিতে এই মেলা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।দুবলিয়া গ্রামের ধর্মীয় সম্প্রীতি সারাদেশের কাছে উদাহরন হয়ে  উঠেছে। এই মেলাকে ঘিরে প্রতিটি পরিবারে উৎসবের আমেজ বিরাজ করে। হিন্দু ও মুসলিম পরিবারের সবাই এই উৎসবকে তাদের জীবনে আলাদা করে ঠাই দিয়েছেন। একে অপরকে শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় সিক্ত করে যেন এটাই প্রমাণ করেন বাঙলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র।দুবলিয়ার সহনশীল সমাজ ব্যবস্থা ও পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ এই জনপদ কে পরিবর্তন করে দিয়েছে, সব ধর্মের লোকের জন্য করেছে নিরাপদ আশ্রয়।

ইতোমধ্যে মেলা জমে উঠতে শুরু করেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসবারপত্র এসে পৌছে গেছে মেলা প্রাঙ্গনে। মুড়ি,মুড়কি,সাচ,বাতাসা সহ নানান মিষ্টিদ্রব্য বিক্রি হচ্ছে। সংসারের ছোট ছোট প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে পসরা বসিয়েছেন ক্ষুদ্র দোকানি।শিশু,কিশোরদের আকৃষ্ট করছে বাহারি রঙের হাতে তৈরী খেলনা।ফেরিওয়ালা বাশী ও বেলুন বিক্রি করছে পায়ে হেটে। ঝালমুড়ি,চানাচুর ও হরেক রকম ভাজাপুরা বিক্রি হচ্ছে দেদারছে।নাগরদোলা ও রেল গাড়ী সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে।

কামার, কুমোর, আসবারপত্র প্রস্তুতকারক, ছোট ও মাঝারী নানান ব্যবসায়ী সারা বছর ধরে হরেক রকম পণ্য তৈরী করেন এ মেলায় বিক্রয় করবার জন্য।তাই সারা বছরই এখানে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড চলতে থাকে। দুবলিয়া বাজারে কাঠের আসবারপত্রের ব্যবসা ঘিরে প্রায় শতাধিক তরুণ উদোক্তা গড়ে উঠেছে।যারা অত্যন্ত আত্ন-বিশ্বাসের সাথে তাদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করে যাচ্ছে। এ থেকে বিপুল সংখ্যক জনগনের কর্মসস্থানের সমস্যা সমাধান হয়েছে। তারা খুব সহজেই ব্যবসায় নামতে পারছে কারন এ মেলা, বিশেষ করে আসবারপত্র ব্যবসায়ীদের জন্য, একটি সু-সংগঠিত বাজার তৈরী করতে সক্ষম হয়েছে। সারাদেশে থেকে আসা নানান ব্যবসায়ীদের মাঝে যোগাযোগের একটি অন্যতম মাধ্যম হয়েছে এ মেলা। তাই আজ দুবলিয়ার একজন আসবারপত্রের ব্যবসায়ী ঢাকার শহরে তার পণ্য পৌছে দিতে পারছে খুব সহজেই।এখন তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কাজের ফরমায়েশ পায়।এছাড়াও মেলা ঘিরে অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী দেখতে পাওয়া যায় যারা এখানে বিনিয়োগ করে থাকেন।এভাবেই এগিয়ে চলছে দুবলিয়ার অর্থনীতি। যে জনপদ এক সময় অবহেলিত ছিল তা আজ ব্যবসা, বাণিজ্যে মহীরুহ উঠেছে।

বেঁচে থাকুক ঐতিয্য, বেঁচে থাকুক বাঙালীর কৃষ্টি-কালচার। সবার মনে এখন একই আশা যেন মেলা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে পারে।একটি সুখি, সমৃদ্ধ জনপদ হিসাবে সারাদেশের কাছে দুবলিয়া উদাহরন হিসাবে গড়ে উঠবে সেই আশা স্থানীয় বাসিন্দাদের।

ফটোগ্রাফার ছিলেন সারফুল আলম খান টুটুল।

লেখকঃ তানজির খান
কবি, ব্লগার ও নাগরিক সাংবাদিক
mtanzirkhan@gmail.com

সাচ,বাতাসা,কদমা মেলার অন্যতম আকর্ষন।

গ্রামীণ সংসারের নানান প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।

 

বাজারের মিষ্টির দোকানেও মেলার বিশেষ আয়োজন।

 

রেলগাড়ি

 

ছোটদের খেলনার দোকান।

 

স্কুল মাঠজুরে বসেছে আসবারপত্রের দোকান।

 

শহুরে খেলনাও এসেছে ফেরিওয়ালার হাত ধরে।

 

সামনেই শীত আসছে তাই বসেছে কম্বলের দোকান।

 

মেলায় এসেছে বাহারি খাট।

 

আসবারপত্র

 

আসবারপত্র

 

নাগরদোলা

 

মিষ্টিদ্রব্য

 

আসবারপত্র

মেলার ঐতিয্য হাতে তৈরী খেলনা।