ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

বন্যা নিয়ন্ত্রনের কথা বলে বারাক নদীতে পানিবিদ্যুৎ উৎপাদনের এই প্রকল্প এখন চরম হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে খোদ ভারতসহ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জনজীবনে। ১৯৩০ সালের দিকে আসামের কাছাড় উপত্যকায় সংঘটিত এক ভয়াবহ বন্যার পর একটি দীর্ঘমেয়াদী বন্যা নিয়ন্ত্রন পরিকল্পনা গ্রহন করা ভারত সরকারের পক্ষ থেকে। যার অংশ হিসেবে ১৯৫৪ সালে ভারতের ‘সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশন’ একটি বহুমুখী জলাধারের জন্য সমীক্ষা চালায়। মাইনাধর, ভুবনধর ও নারাইনধর নামক তিনটি স্থান বাঁধ নির্মাণে প্রস্তাবিত হলেও প্রকৌশলগত কারণে বাতিল হয়। ১৯৭৪ সালে টিপাইমুখ বাঁধের চুড়ান্ত স্থান নির্ধারিত হয়। স্থানটি তুইভাই নদী ও বরাক নদীর সঙ্গমস্থল থেকে ৫০০ মিটার ভাটিতে এবং বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে ২০০ কিমি উজানে।

টিপাইমুখ নিয়ে উৎকণ্ঠা শুধু বাংলাদেশেই নয় বরং ভারতের ‘সাতবোন’ রাজ্যের মণিপুর, আসাম ও মিজোরামের মানুষের মধ্যেও রয়েছে। সম্প্রতি ভারতের ওই রাজ্যগুলোর ৩০টি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নিয়ে গঠিত হয়েছে ‘কমিটি অন পিপলস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ (কোপে)। টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণে ওই অঞ্চলের সাম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবাদে তারা ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ভারত সরকার উত্তর-পূর্ব ভারতে ২২৬টি বড় বাঁধ নির্মাণের সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ করছে। লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ৫০ বছরের মধ্যে ৯৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করার। ইতিমধ্যে সেখানে ১৬টি বৃহৎ বাঁধ চালু হয়েছে এবং ৮টি বৃহৎ বাঁধ নির্মাণাধীন।

সচেনত জনসাধারণের পাশাপাশি ১৯৯৫ সালে মনিপুরের মুখ্যমন্ত্রী মন্ত্রীসভায় এই বাঁধ নির্মাণ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত জানান। এবং ১৯৯৮ সালে মনিপুরের পার্লামেন্টেও এই বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ২০০১ সালের দিকে মনিপুরের সংগ্রামী জনতার আন্দোলনকে ভারত রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী দিয়ে দমনের উদ্দেশ্যে জারি করা হয় প্রেসিডেন্টের শাসন। এভাবে মনিপুরবাসীর গণতান্ত্রিক অধীকার খর্ব করেই ২০০১ সালে মনিপুর রাজ্যের সম্মতি আদায় করা হয় প্রকল্পের পক্ষে। এরপর থেকে নিয়মিত ভাবে রাজ্য ও কেন্দ্র সরকার যুগপৎভাবে অগ্রাহ্য করে চলে জনগনের মতামত, প্রস্তাব, প্রতিবাদ, বিক্ষোভ। নভেম্বর ২০০৩ এ মনিপুরের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, গ্রাম কমেটি, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা আন্দোলন, পরিবেশ সংগঠন সকলে মিলে ‘নর্থ-ইর্স্টান ইলেক্ট্রিক কর্পোরেশনে’র কাছে টিপাইমুখের বিরোধিতা করে স্মারকলিপি জমা দেয়। বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বা সরকার এর বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করেই ২০০৬ সালে সম্পূর্ণ অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়, সকল গণতান্ত্রীক রীতিনীতি মাড়িয়ে নিজেদের লোক নিয়ে আয়োজন করে ‘জন শুনানী’ নাটকের। এভাবেই ‘সেভন সিস্টার’সহ পিছিয়ে পড়া রাজ্যগুলোতে পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের দাবিদার ভারত চরম অগণতান্ত্রীক ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন কয়েম রেখেছে।

টিপাইমুখ বহুমুখী জলবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্পর্কে ভারত সরকার ২০০৯ সালে তিনটি সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। প্রায় ৪০০ পৃষ্ঠার বিশাল এ সমীক্ষা প্রতিবেদনে আরো অনেক বিষয় বিস্তারিত উঠে এসেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ‘নর্থ ইস্টার্ন ইলেকট্রিক পাওয়ার করপোরেশন লিমিটেডে’র ওয়েবসাইটে তিনটি শিরোনামে সম্পাদিত এ সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশিত করেছিলো। বাস্তবায়িত হলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় ‘এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট’ নামে একটি সমীক্ষা চালানো হয়। এ ছাড়া ‘এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট প্লান’ এবং এবং বাঁধ ভেঙে গেলে দুর্যোগ মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণে ‘ড্যাম ব্রেক অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্লান’ নামে আরো দুটি সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়। শেষের সমীক্ষাটি করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় পানি কমিশন।

প্রতিবেদনে ১৬২.৮ মিটার উঁচু এ বাঁধের ফলে ১২ হাজার ৭৫৮ বর্গকিলোমিটার অববাহিকা এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বিশাল অংশ পড়েছে বাংলাদেশের মধ্যে। কিন্ত সমীক্ষা চালানো হয়েছে শুধু ভারতীয় অংশের বাঁধের ডানদিকে মনিপুর ও বামদিকে মিজোরাম রাজ্যে। ১৬২.৮ মিটার উচ্চতার টিপাইমুখ বাঁধ একটি ‘রকফিল ড্যাম’; অর্থ্যাৎ নদীর প্রবাহকে গ্রানুলার (দানাদার) মাটি দিয়ে ভরাট করা হবে এবং পানির প্রবাহকে এক বা একাধিক পানি অভেদ্য স্তর (যেমন স্টীল পাইল বা কনক্রীট, বা প্লাস্টিক পর্দা) দিয়ে রোধ করা হবে। বাঁধের কারণে সৃষ্ট জলাধারের ফলে প্লাবিত এলাকা ৩১১ বর্গকিলোমিটার, যার প্রায় শতকরা ৯৫ ভাগই মনিপূর রাজ্যের আর বাকী ৫ ভাগ মিজোরাম রাজ্যের। এই বিশাল আকৃতির কৃত্রিম জলাধারের ফলে বিপুল পরিমান এলাকা পানির নিচে নিমজ্জিত হবে। এর ফলে মানুষের ঘরবাড়ি আবাদী জমিসহ বনভূমি ও অন্যন্য উদ্ভিদ পানির নিচে তলিয়ে পচে গিয়ে বিপূল পরিমান কার্বন নিঃসরণ করে বায়ুমন্ডলে গ্রীন হাউস গ্যাস বাড়াবে। যার ভুক্তভোগী হবেন ওই অঞ্চেলের মানুষসহ আশেপাশের ব্যপক অংশের জনগণ।

৩১১ বর্গকিলোমিটার প্লাবিত ভূমির অধিকাংশই আসাম, মনিপুর ও মিজোরামের আদিবাসী অধ্যুষিত। সরকারী তথ্য অনুযায়ী ১৪৬১ হামার পরিবার এবং জিলিয়ানগ্রং নাগা উপজাতিদের এক তৃতীয়াংশ তাদের আবাসস্থল ছাড়তে বাধ্য হবে। যদিও সরকারী তথ্যে আক্রান্ত গ্রামের সংখ্যায় নানা হেরফের দেখা গেছে। ২০০০ সালের হিসেব মতে ৮টি মাত্র গ্রাম ক্ষতিগ্রস্থ হবে। ১৯৯৮ সালের তথ্যে এই সংখ্যা ছিল ১৫টি এবং ১৯৮৪ সালে তা ছিল ৩১টি। কয়েকটি স্বাধীন সংস্থার হিসেবে হামার আর নাগা উপজাতিদের ৯০টির মত গ্রামের তথ্য পাওয়া গেছে। এই সমস্ত গ্রামের আওতাধীন সকল জমিজমা, ফসল এবং গ্রামবাসীর জীবিকার অন্যান্য মাধ্যমাও সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হবে। এছাড়াও ‘বরাক-প্রপাতে’র মত আনেক ধর্মীয় তীর্থস্থান তলিয়ে যাবে। আর এই সব কিছুই জাতিসংঘ ঘোষিত আদিবাসী অধিকার ও স্বার্থ পরিপন্থি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাঁধ এলাকাটি নিন্ম ও মাঝারি ভূমিধ্বস প্রবণ এলাকা এবং ভারতের ‘ভি’ ভূমিকম্প জোনের মধ্যে পড়েছে। নির্মাণকাঠামোর নকশা প্রস্তুতের আগে দিল্লি সরকারকে আরো ব্যাপকভাবে পর্যবেক্ষণের সুপারিশ করা হয়েছে। তা ছাড়া এ ধরনের বিদ্যুৎ প্রকল্পে বনের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। মনিপুর রাজ্যে ৮ হাজার ৪০০ একর এবং মিজোরাম রাজ্যে ১ হাজার ৪৮৯ হেক্টর সংরক্ষিত বন ধ্বংস হবে। এ ছাড়া আরো প্রায় ২৭,২৪২ হেক্টর বন ধ্বংস হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর সাথে জীববৈচির্ত্য ধ্বংসের বিষয় তো আছেই। ২১ প্রজাতির প্রাণী এখানে বিপন্ন প্রায়। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বনভূমি মেডিক্যাল, হারবাল ও জেনেটিক্যালসহ বিভিন্ন কারণে খুবই সমৃদ্ধ। এখানে রয়েছে চারটি বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ।

বাঁধের জলাধারে জমা বিপুল পরিমাণ পানি বাঁধের ভিত্তি ভূমি এবং এর আশপাশের শিলাস্তরের উপর ব্যাপক চাপ তৈরি করবে। অল্প অঞ্চলের এই বিপুল চাপ ঐ অঞ্চলের শিলাস্তরের ফাটলকে সক্রিয় করে তুলবে। সাধারণত পানির যে চাপ (porous pressure) মাটির নীচের সচ্ছিদ্র শিলাস্তরের ফাঁকে ফাঁকে জমে থাকে তা বাঁধের পানির ভারে এবং শিলাস্তরে চুইয়ে যাওয়া বাড়তি পানির প্রভাবে স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যাবে। পানির এই চাপ বেড়ে যাওয়া ছাড়াও বাড়তি পানির রাসায়নিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার কারণেও ফাটলের দুদিকের শিলাস্তর যা এমনিতেই টেকটোনিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার কারণে পরস্পর থেকে দুরে সরে যেতে চায় কিন্তু পরস্পরের মধ্যকার ঘর্ষনের শক্তির কারণে একত্রিত থাকে, সেটা যেকোন সাময় বাড়তি চাপ সহ্য করতে না পেরে চ্যূতি বা স্লিপ-স্ট্রাইকের সৃষ্টি করবে; ফলে ভূমিকেম্পের কেন্দ্র সৃষ্টি হয়ে ভূমিকম্প চারিদিকে ছড়িয়ে পরবে। জলাধারের প্রভাবে ভূমিকম্প প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার এই বিষয়টিকে বলা হয় Reservoir Induced Seismicit (RIS)। এভাবে ভূমিকম্প বাড়ার বিষয়টি প্রথম নজরে আসে ১৯৩২ সালে আলজেরিয়ার ‘কুয়েড ফড্ডা’ বাঁধের ক্ষেত্রে। পরবর্তিতে বিশ্বের বিভিন্ন ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চলে বাঁধের সাথে ভূমিকম্প বেড়ে যাওয়ার এমন নজির পাওয়া গেছে কমপক্ষে ৭০টি। বিষয়টি ভারতের অজনা নয়, কেননা এ যাবত কালে বিশ্বের সবচেয়ে তীব্র মাত্রার জলাধার প্রভাবিত ভূমিকম্প (RIS) হয়েছে খোদ ভারতের মহারাষ্ট্রের ‘কয়না বাধে’র কারণে ১৯৬৭ সালের ১১ ডিসেম্বর। ৬.৩ মাত্রার এই ভূমিকম্পটি এমনকি তার কেন্দ্র থেকে ২৩০ কিমি দূরেও তীব্র আঘাত হেনেছিল। এতসব জেনেশুনেও ভারত যে জায়গায় টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ করছে সেটা সারা দুনিয়ার ৬টি ভয়ংকর ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকার মধ্যে অন্যতম। এ অঞ্চলটিতে এত বেশী ভূমিকম্পের কারণ, অঞ্চলটি যে সুরমা-গ্রুপ শিলাস্তর দ্বারা গঠিত তার বৈশিষ্টই হলো অসংখ্য ফাটল আর চ্যুতি।

ভূমিকম্পের দরুন সৃষ্ট সম্ভাব্য বিপর্যয় ছাড়াও ড্যামের আরেকটি বড় হুমকি হচ্ছে অতি বৃষ্টির ফলে ড্যামের ওপর দিয়ে পানি উপচে পড়ার সম্ভাবনা। এ ধরনের ঘটনা বিরল নয়। ১৯১৭ সালে মধ্য প্রদেশের ‘টিগরা ড্যাম’ ওভারটপিংয়ের কারণে বিধ্বস্ত হয়ে ১০ হাজার লোক প্রাণ হারিয়েছেন। ১৯৫৮ সালে মধ্য প্রদেশের ‘কদম ড্যাম’, ১৯৫৯ সালে গুজরাটের ‘কারলা ড্যাম’, ১৯৬০ সালে মহারাষ্ট্রের ‘পানসেট ড্যাম’, ১৯৬৭ সালে পাঞ্জাবের ‘নানক সাগর ড্যাম’ এবং ১৯৭৯ সালে গুজরাটের ‘মাচ্চু-২ ড্যাম’ ওভারটপিংয়ের কারণে বিধ্বংস হয়ে হাজার হাজার লোকের প্রাণহানি ঘটিয়েছিল। এইভাবে ১৯৭৫ সালে অতিবৃষ্টির ফলে চীনের হুনান প্রদেশের ‘বানকিয়াও ড্যাম’ বিধ্বস্ত হয়। ফলে জলাধারের পানি ১০ কিলোমিটার প্রশস্ততা ও ৩ থেকে ৭ মিটার উচ্চতা নিয়ে ঘন্টায় ৫০ কিলোমিটার বেগে ৭টি অঞ্চলকে আঘাত হানে। এতে তাৎক্ষাণিকভাবে ২৬,০০০ লোক মৃত্যু বরণ করে এবং ১,৪৫,০০০ লোক বন্যার তোড়ে ভেসে যায়। ফলে নিহতদের সংখ্যা দাঁড়ায় ১,৭১,০০০ এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১ কোটি ১০ লাখ পরিবার। এই দুর্ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপটে আশঙ্কা হয়, যদি টিপাইমুখ ও ফুলেরতলে বিপর্যয় ঘটে, তাহলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মণিপুর, আসাম ও মিজোরাম অঞ্চলের সাথেসাথে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল লাশের সমুদ্রে পরিণত হবে। আর তারা হবেন ভারতের সস্তা বিদ্যুতের বলি।