ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

পড়ালেখা করার জন্য গত চার বছর ধরে সিলেটে ছিলাম। এখন সময় শেষ। ফিরে যেতে হবে বাসায়। জীবনে প্রথমবার নিজের পরিবার, কাছের মানুষ, বন্ধুরা, সবাইকে ছেড়ে এসে শুরু হয় আমার মেস জীবন। এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা, মানিয়ে নেবার চেষ্টা আর চারপাশের নতুনে মোড়া জীবনটা গত চার বছরে অনেকটাই নিজের হয়ে গেছে। আজকে যখন ফিরে যাবার জন্য সব গোছগাছ করছি , কেন জানি চার বছর আগের সেই অনুভুতিটা দেখা দিচ্ছে। মনে হচ্ছে, আমি আমার নিজের বাসা ছেড়ে যাচ্ছি।

নিজের বাসাই তো! যে ঘরটাতে আমি গত চারটি বছরের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছি সেটা নিজের ঘর হবেনা কেন? ফার্স্ট ইয়ার এ থাকতে যেকোনো ছুটির জন্য হন্যে হয়ে থাকতাম। কবে বাসায় যাব, মাথার মধ্যে খালি এই চিন্তা। আর শেষের দিকে এসে ভাবতাম কবে এই পরিচিত মেসের দেয়ালে ফিরে আসব।

খারাপ লাগছে। মনে হচ্ছে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা থেকে এখন নিয়মতান্ত্রিক স্বাধীনতার দুনিয়াতে প্রবেশ করব। যখন তখন লাফালাফি, চিৎকার চেঁচামেচি করা যাবেনা। রাত বিরাতে বাসায় ফেরা, ইচ্ছে হলে না ফেরা কিংবা রাত তিনটায় চা খেতে নামা বন্ধ হতে যাচ্ছে।

বন্ধুরা নেই, বাঁদরামিও নেই। যে জীবনে ফিরে যাচ্ছি সেটা অনেক সাজানো গোছান। এই মেস লাইফ আমাক শিখিয়েছে কিভাবে ময়লা বা ময়লাতর কাপর চোপড় সাতদিন পড়া যায়। মাসের পর মাস আমার বিছানায় মশারি লাগানো থাকতো। আমার কাজ ছিল সকালে মশারি থেকে বের হওয়া র রাত্রে এসে সেই মশারির ভেতরে ঢুকে যাওয়া। আহহহা………কি সুখের দিন।

সমস্যা যে ছিলনা তা না। বেশি সমস্যা টা হতো খাবার নিয়ে। এখানেও শিখেছি। মা-বাবার আদরের দুলাল, এখানে এসেই জেনেছি মানুষ কতটা বাজে রান্না খেয়েও জীবন ধারন করতে পারে। জেনেছি পাতলা হলুদ পানিকেই ডাল বলে, ভাত পুড়ে গেলেও খাওয়া যায়, বা খেতে হয়, কিংবা ভাত জিনিষটা গলতে গলতে পায়েশের কাছাকাছি এসে যেতে পারে। শিখেছি একটা মুরগিকে সহজেই ৩০ টুকরো করা যায়। মাছ রান্না মানে এই নয় যে মাছ ই রান্না হয়েছে, মাছের কাঁটা রান্না হলেও একি নাম হয়।

তারপর ও সিলেটে আমার দিন সুখের ছিল। অসসসাধারন বৃষ্টি, অসামান্য পূর্ণিমা আর চমৎকার পরিবেশ। বেশ চলছিল। কত অজস্র স্মৃতি, কত ঘটনা সব কি আর লেখা যায়? বা লেখা উচিৎ? থাকুক বাকি কথা আমার ভেতর। যাই, গোছগাছ করতে হবে। শুধু শেষে বলতেই হয়, তুমি মোরে অশেষ করেছ দান। এই সময়গুলো চাইলেও কোনদিন ভুলতে পারবনা।