ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

উপমহাদেশ ব্রিটিশরা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ভয়াবহ জীবাণু ছড়িয়ে দিয়ে গেছে। এর হৃদয় বিদারক পরিণতি আমাদের অনাগত আরো কয় প্রজন্মকে ভোগ করতে হবে এটা অনুমান করা কঠিন। সম্ভবত অসম্ভব। এমনও হতে পারে উপমহাদেশের অস্তিত্ব অবধি এ জীবাণু থেকে আমাদের নিস্তার নাই। এটা এমনই এক ভয়াবহ সংক্রামক জীবাণু!

ক্রিপস্ মিশন, ক্যাবিনেট মিশন ইত্যাদি উদ্যোগ পণ্ড হয়ে যাওয়ার পর ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগের ধারণা জনগণের মধ্যে ক্রম শক্তিশালী হতে থাকে। ‘৪৬ এর শেষের দিকে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে ভারত ভাগ এবং বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগের সিদ্ধান্ত মোটামুটি চূড়ান্ত হয়ে আসে। এরপর থেকে ধীরে ধীরে বাংলা, পাঞ্জাব, আসামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে হিন্দু- মুসলমান দাঙ্গা প্রকট থেকে প্রকটতর হতে থাকে। রক্ত গঙ্গা বয়ে যেতে থাকে দাঙ্গ কবলিত অঞ্চলে। রেহায় পায়নি তুলনামূলকভাবে অনেক দূরবর্তী অঞ্চল নোয়াখালী।

যে ঘটনা বলতে চাচ্ছিলাম। মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে গত ২৭ই মার্চ সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার ফতেপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মঞ্চস্থ হয় শক্তিমান লেখক আবুল মনসুর আহমদের বিখ্যিাত ‘হুজুর কেবল’ নাটকটি। স্থানীয় পত্রিকার এক রিপোর্টার ঐ নাটকে হযরত মুহাম্মদ (স.) নিয়ে কটূক্তি করা হয় বলে রিপোর্ট করে। ব্যাস, এতেই শুরু হয় অনাকাঙ্খিত সাম্প্রদায়িক গ্যানজাম।৩১ই মার্চ থেকে মুসলমানরা চড়াও হয় স্থানীয় হিন্দুদের উপর। শুরু হয় জ্বালাও-পোড়াও, ভাঙ্গচুর, লুটপাট। অসহায় হয়ে পড়ে হিন্দুরা। আতঙ্কগ্রস্ত হিন্দুরা যে যার মত এলাকা ত্যাগ করতে থাকে। অনেকে আশ্রয় নেয় প্রতিবেশী মুসলমানের বাড়িতে।

শুনেছি, ‘হুজুর কেবলা’ নাটক অবলম্বনে ‘ভন্ড নবী’ নামে হিন্দু শিক্ষকরা এ নাটক মঞ্চস্থ করে। এ কথাটা আমার সম্পূর্ণ ঝুট বলে মনে হয়েছে। কারণ ঐ এলাকায় হিন্দুরা সংখ্যায় কম । তাঁরা এহেন সাহস করবে বলে মনে হয় না। যদি করেই থাকে, মুসলমানদের দায়িত্ব কী হতে পারত? যা ঘটেছে তা কোন মতেই নয়। কারণ ইসলাম এমনটি বলে না।

ফতেপুরের ঘটনার প্রতিবাদে ঢা.বি.র জগন্নাথ হলের ছেলেরা যা করলো তাও মানতে পারছি না। ‘৪৬, ‘৪৭ এর দাঙ্গার পরিণতি সম্পর্কে যারা জানে তাঁদের একমত হওয়ার কথাও নয়। আমাদের ভূমিকা হওয়া দরকার ছিল মহাত্মা গান্ধী , নেহেরু, মাওলানা আবুল কালম আযাদ, আবুল হাশিম প্রমুখের মত। ঢা.বি. জগন্নাত হলের ছেলেদের থেকে জাতি এটা আরো বেশি আশা করে। কারণ এ রকম পাল্টা-পাল্টি প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতি আরো বেগতিক, বেপরোয়া করে তোলে। ইতিহাসের শিক্ষা তো এমনি। আমাকে সবচেয়ে হতাশ করেছে সুরঞ্জিত সেনের মত ঝানু দায়ত্বশীল লোকের মন্তব্য। ঐ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় জগন্নাত হলের ছেলেদের আচরণ নাকি তাঁকে আপ্লুত ও উদ্বেলিত করেছে। আফসোস সেন সাহেব!

সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা মানুষকে দিশেহারা করে দেয়। খুবই অসহায় করে দেয় সবাইকে। বিশেষত যারা মধ্যস্থতা করতে চায়। যারা এ পরিস্থিতি বন্ধ করতে চায়। চরম শোচনীয় অবস্থার মুখোমুখি হয় সংখ্যালঘুরা। এহেন পরিস্থিতিতে প্রধানতম দায়িত্ব বর্তায় রাষ্ট্রের উপর। আমাদের রাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে বলে আমার মনে হয়।

এগুলি বিশেষ পরিস্থিতি। এ সব ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিকের সচেতনভাবে সঠিক দায়িত্ব পালন করা নৈতিক কর্তব্য।