ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

বাসের চাপে হাত কাটা পড়ার পর যখন রাজীবের মৃত্যু হল, মনকে আর সান্ত্বনা দিতে পারছিলাম না। এরপর  বনানীতে বাসের চাপায় পা হারানো রোজিনা হাসপাতালে মারা গেল। নয়াপল্টনে দুইটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে এক যাত্রী নিহত হয়েছে কয়েকদিন আগে। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে আরো অসংখ্যজন।

দিনের পর দিন যানবাহন চালকদের এমন নির্মম দায়িত্বহীন আচরণ অকালে কেড়ে নিচ্ছে এইসব অসহায় মানুষের প্রাণ আর আমরা কয়েকটা দিন প্রতিবাদ জানিয়ে হাল ছেড়ে দিচ্ছি। ওদিকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারে ক্ষতিপূরণ দেয়ার সরকারি সংস্কৃতি দায় এড়িয়ে যেতে সাহায্য করছে ক্রমাগত।

ঢাকা শহরের বেশির ভাগ মানুষ বাসে চড়ে যাওয়া-আসা করে। যদিও ঢাকার বাসে চড়ে কোথাও যাওয়ার মতো বিরক্তিকর কিছু হতে পারে না। এর কারণ বাসচালক এবং হেলপারদের যত্রতত্র যাত্রী তোলা। প্রত্যেকটি স্টেশনেই তারা যাত্রী তুলে নেওয়ার জন্য থামবে – যাত্রী থাকুক আর নাই থাকুক।

আবার না থেমেও কোনো উপায় নেই। বাস আসা মাত্রই মানুষ তাতে উঠে পড়ার জন্য হুমড়ি খায়। সেই সুযোগে একদল বাসচালক মেতে ওঠে প্রতিযোগিতায়। কে কার আগে বেশি যাত্রী তুলবে, এই নিয়ে চলে নির্লজ্জ তামাশা। এই ব্যাপারটা সাধারণত বেশি হয় অফিস চলাকালীন সময়ে।

বাসে চড়ার বিব্রতকর পরিস্থিতিও কম নয়।একদিন দেখি এক অল্পবয়সী মেয়ে বাসের ভিতর থেকে বের হতে পারছে না। সে ছিল পেছনের দিকের একটি সিটে বসা। আর বাস ভর্তি যাত্রী। এক চুল ফাঁকা জায়গাও নেই যে কেউ পেছন থেকে স্বচ্ছন্দে দরজা পর্যন্ত  পৌঁছুতে পারে। সুতরাং  মেয়েটিকে প্রায় চিড়ে-চ্যাপ্টা হয়ে বাস থেকে নামতে হল। একটি মেয়ের জন্য এর চাইতে বিব্রতকর আর কিছু হতে পারে না। পেছন থেকে চিৎকার করে মেয়েটির যাওয়ার জন্য পথ করে দেওয়ার কথা বলা হলেও ভিড়ের কারণে তা সম্ভব ছিল না।

ঘন্টার পর ঘন্টা বাসের ভিতরে দাঁড়িয়ে থেকে গন্তব্যে যাওয়া ঢাকা শহরের সাধারণ মানুষদের কাছে  নিত্যদিনের ঘটনা। উপরন্তু ট্রাফিক জ্যামের কারণে এই বিরক্তির মাত্রা চরমে পৌঁছে যায়। একবার ভাবুন,  বাস এক চুলও নড়ছে না, আপনি প্রচণ্ড গরমে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে আছেন আর ঘামছেন। তার উপর আপনার দামি মোবাইল ফোনটি যদি কেউ আলতো করে পকেট থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়, তাহলে তো  কথাই নেই।

শোনা যায়, বাস চালক ও হেলপারদের সাথে এইসব চোরের যোগসাজোশ রয়েছে। ইদানিং আরো বড় বড় ডাকাতির কথা শোনা যাচ্ছে। দূর-পাল্লার (যেমন ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে) বাসগুলোতে চালক ও পরিবহন মালিকদের সাথে যোগসাজোশে এইসব ডাকাতেরা আজকাল অভিনব কায়দায় যাত্রীদের ব্যাগ ও অন্যান্য মূল্যবান সম্পত্তি লোপাট করে নিয়ে যাচ্ছে। আমার এক আত্মীয় সম্প্রতি এই ধরনের একটি ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন।

তিনি ‘হ’ আদ্যক্ষরের একটি বহুল পরিচিত পরিবহন সার্ভিসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসে চড়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাচ্ছিলেন। বাসে ওঠার সময় যথারীতি তিনি তার লাগেজটি সুপারভাইজরের সহায়তায় সংরক্ষিত স্থানে রেখে ট্যাগটি ঠিক ঠিক বুঝে নিয়েছিলেন। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর পরে তিনি তার লাগেজ বুঝে নিতে গিয়ে দেখেন তা আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

পরিতাপের বিষয় হল ব্যাগের ভিতরে ছিল দুইলক্ষ টাকা। তারপর তো বাস কাউন্টারে কর্তৃপক্ষের সাথে হৈ চৈ, থানায় ফোন ইত্যাদি। তিনি পুরো টাকা ফেরত চাইলেন কিন্তু পরিবহনের মালিকপক্ষ ৯০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণের কথা বলে আপোষ করতে চা্ইল। পুলিশ এসে দুইজন কর্মচারীকে ধরে এক রাত জেলে রেখে পরের দিন ছেড়ে দিল। কিন্তু টাকা আর উদ্ধার করা গেল না।

এবার আসি সড়ক দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে। সারা বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনার কারণে প্রতি বছর প্রায় ১৩ লাখ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে যার ৯৩ শতাংশ সংঘটিত হয় বাংলাদেশের মত নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে। সড়ক দুর্ঘটনায় আমরা তারেক মাসুদের মত অনেক খ্যাতনামা মানুষদেরও হারিয়েছি। শুধুমাত্র ২০১৭ সালেই এদেশে ৪২৮৪ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে।এই সব দুর্ঘটনা পরিবহন সেক্টরে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এবং চালকদের বিচার-বিবেচনাহীন আচরণের যে সংস্কৃতি- তারই পুঞ্জীভূত ফসল।

বিশেষজ্ঞরা প্রধানত অনিয়ন্ত্রিত গাড়ি চালনা, স্থানীয়ভাবে নির্মিত ফিটনেসহীন যানবাহনে যাত্রী ও পণ্য আনা নেওয়া, ওভারটেকিং, বিরতিহীন ড্রাইভিং, অদক্ষ চালক, ট্রাফিক আইন অমান্য করা এবং আইন প্রয়োগে ব্যর্থতাকেই  সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।এর সাথে রয়েছে তদারকি ও গণসচেতনতার অভাব। এ বিষয়ে আশু মনোযোগ দেয়ার সাথে সাথে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার (যেমন ব্র্যাক, নিরাপদ সড়ক চাই) সহায়তায় চালকদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারে। নাগরিক যন্ত্রনার অন্যতম অনুষঙ্গ পরিবহন ক্ষেত্রকে ঘিরে তাই প্রয়োজন যথাযথ পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধান। নয়তো এই অরাজকতা চলতেই থাকবে।

বাড়ছে মানুষ। তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দালানকোঠা, যানবাহন আর ফ্লাইওভার। বাংলাদেশের উন্নয়নের খবর ঢাকঢোল পিটিয়ে সাড়ম্বরে ঘোষনা করা হয়েছে। কেবল আকাশছোঁয়া দালান, বড় বড় উড়াল সেতু, আর শয়ে শয়ে বিপনিবিতান নির্মাণ করলেই কি উন্নত হওয়া যায়?

এ প্রসঙ্গে নচিকেতার দু’লাইন গান মনে পড়ছে, “ভিড় করে ইমারত আকাশটা ঢেকে দিয়ে চুরি করে নিয়ে যায় বিকেলের সোনারোদ /ছোট ছোট শিশুদের শৈশব চুরি করে গ্রন্থকীটের দল বানায় নির্বোধ / এরপর চুরি যায় বাবুদের ব্রিফকেস, অথবা গৃহিনীদের সোনার নেকলেস…।”

সবিস্ময়ে ভাবি, সত্যিই তো!

সূত্র:
(১) http://www.who.int/features/factfiles/roadsafety/en/
(২) NCPSRR report, 2018
(৩) NCPSRR report, 2018