ক্যাটেগরিঃ কৃষি

 

সুজলা, সুফলা, শস্য, শ্যামলা বাংলার রয়েছে ঐতিহ্যবাহী কৃষ্টি ও গৌরবময় কালচার। গোলা ভরা সোনালী ধানের পাশাপাশি পুকুরে মাছ, পৌষ-পার্বনে নানা রকমের বাহারি পিঠা-পায়েসের সাথে ছিল সারা বছর ধরে নানা ধরনের সুস্বাদু দেশি ফলের সমাহার।বিদেশি শাসন ও শোষণের যাঁতাকলে পড়ে বাংলার মানুষ হারিয়েছে সর্বস্ব, হয়েছে দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর। ক্ষুধা ও দারিদ্রের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের প্রত্যয়ে প্রায় সাত কোটি জনগোষ্ঠী নিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল। সেই ভূখণ্ড চার দশক পরে আজ ষোল কোটি মানুষের পদভারে প্রকম্পিত। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে দিনের পর দিন জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে, বাড়ছে খাদ্য চাহিদা। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটাতে আবাদি জমির পরিমাণ একটুও বাড়েনি বরং কমেছে এবং কমেই চলেছে। এর সাথে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে অবিনাশী ছোয়া লেগেছে কৃষিতে। ক্ষরা, অনাবৃষ্টি, ঋতু পরিবর্তন, মরুকরণ ও লবণাক্ততার কবলে পড়ে কঠিন সময় পার করছে দেশের কৃষি। প্রতিকূলতা সত্বেও ক্ষুধা ও দারিদ্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমরা চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে পেরেছি কিনা এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেয়া সম্ভব না হলেও সন্দেহাতীত ভাবেই বলা যায় যে, দেশে অনাহারী মানুষের সংখ্যা বিগত দশক গুলোর তুলনায় অনেক কমেছে।

দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড কৃষিতে ফলিত গবেষণা, গবেষণালব্ধ প্রযুক্তি কৃষি সম্প্রসারণের মাধ্যমে দ্রুত কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছানো ও দেশের আপামর কৃষক কুলের অক্লান্ত শ্রমে ও ঘামে আজ আমরা চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্নতার প্রায় দ্বারপ্রান্তে পৌঁছুতে পেরেছি। যা দেশের কৃষিতে একটি বড় অর্জন হলেও খাদ্য নিরাপত্তার সার্বজনীন সংজ্ঞানুসারে নিশ্চিত করতে পারেনি আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা। অর্থাৎ আমাদের প্রয়োজনীয় সকল প্রকার খাদ্য দ্রব্য আমাদের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমানে নেই এবং সহজ লভ্যও নয়। চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের মাধ্যমে অনাহারী মানুষের জন্য দুবেলা দু মুঠো ভাতের সংস্থান করা সম্ভব হলেও প্রকৃত অর্থে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। কারন হিসেবে বলা যায় সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় ছয়টি খাদ্য উপাদানের মধ্যে শর্করা ছাড়া অন্যান্য উপাদান যেমন ভিটামিন, খনিজ, প্রোটিন ও চর্বির মত উপাদান গুলো পরিমিত মাত্রায় সরবরাহে ভাত ব্যর্থ।

ভিটামিন ও খনিজের প্রধান উৎস সবজির উৎপাদন বিগত সময়ে কিছুটা বাড়লেও ফলের উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়েনি। এর পেছনের অনেক গুলো কারনের মধ্যে ব্যাপক আকারে দেশীয় ফলদ বৃক্ষের নানান জাত রোপণ ও সংরক্ষণ না করা অন্যতম। এর ফলে দেশীয় অনেক ফলদ বৃক্ষ আজ বিলুপ্তির পথে। স্থানীয় ফলের জাত গুলির বিলুপ্তির কারনে চাহিদার তুলনায় ফলের সরবরাহ অনেক কম। অনেক সময় টাকা থাকা সত্বেও সরবরাহ না থাকায় ফল কিনে ক্ষেতে পারছেন অনেকেই। বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ তথা দেশের প্রায় ৭৫-৮০ ভাগ মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। ফলের চাহিদা ও যোগানের মধ্যে সমতা আনয়নের জন্য সারা দেশে ব্যাপক আকারে ফলদ বৃক্ষ রোপণ করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে মান সম্পন্ন চারার অভাব ফলদ বৃক্ষ সম্প্রসারণের বড় অন্তরায়।

সারাদেশে কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের হর্টিকালচার সেন্টার সহ বেসরকারি পর্যায়ে গড়ে ওঠা নার্সারী সমূহ ফলদ বৃক্ষের চারার যোগান দিচ্ছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এসব প্রতিষ্ঠান বীজ ও কলমের মাধ্যমে বহু পূরানা ও প্রচলিত পদ্ধতিতে চারা বর্ধন করে যাচ্ছে। বীজ থেকে প্রাপ্ত চারায় নিচু জাতের সাথে সংকরায়নের ফলে মাতৃগাছের গুনাগুণ বজায় থাকছে না এবং অনেক ক্ষেত্রেই ফলন ও মান খারাপ হয়ে যায়। বীজের চারা থেকে ফল পেতে দীর্ঘদিন অপেক্ষাও করতে হয়। মাতৃ গাছ রোগাক্রান্ত হলে তা চারায় ও সংক্রামিত হয়। সারা বছর বীজের সরবরাহ থাকেনা বিধায় বছর ব্যাপী চারা তৈরী করা যায় না। কিছু কিছু ফলদ বৃক্ষে খুব কম বা একদমই বীজ হয় না। তাদের বর্ধনের একমাত্র উপায় কলম। কলমের চারায় মাতৃ গাছের গুনাগুণ সংরক্ষিত ও সল্প সময়ে ফল হলেও সকল সময়ে কলম করা সম্ভব নয়। কলমের মাধ্যমে মাতৃ গাছের রোগ নূতন চারায় সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে বিধায় ফলনও কম হয়। বেসরকারি নার্সারী গুলো তাদের উৎপাদিত চারার উচ্চমূল্য হাকায় এবং চারার গুনগত মান নিয়ে সন্দেহ থাকায় ফলদ বৃক্ষের সম্প্রসারণ বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে।

স্বল্প সময়ে মাতৃ গাছের অবিকল গুন সম্পন্ন ব্যাপক পরিমাণে চারা তৈরীতে বিশ্বব্যাপি টিস্যু কালচার প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। টিস্যু কালচারের মাধ্যমে মাতৃ উদ্ভিদের সামান্য একটু মেরিস্টেমেটিক টিস্যু ব্যবহার করে চারা তৈরী করা হয় বিধায় মাতৃ উদ্ভিদের কৌলিক বৈশিষ্ট সংরক্ষিত হয় কিন্তু মাতৃ গাছের কোন রোগ চারায় সংক্রামিত হয়না। এর মাধ্যমে সারা বছর ধরেই চারা তৈরী করা যায় তথা মৌসুম জনিত কোন বাধা নেই।এ প্রযুক্তির মাধ্যমে অল্প কিছু কোষ কলা থেকেই অনেক চারা উৎপাদন করা যায় যা মাতৃ গাছের ক্লোন হওয়াতে ফলন কমেনা বরং বাড়ে। আমাদের দেশে টিস্যু কালচার প্রযুক্তিটি এখনও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রয়েছে। কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আলুর বীজ উৎপাদনে টিস্যু কালচার প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও ফলদ বৃক্ষের চারা বর্ধনে এর ব্যবহার চোখে পড়ার মত নয়। মাশরুম উন্নয়ন জোরদারকরন প্রকল্প বর্তমানে সারাদেশে ষোলটি হর্টিকালচার সেন্টারে টিস্যু কালচার ল্যাব স্থাপন করেছে যা বর্তমানে মাশরুমের টিস্যু কালচারের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। অবকাঠামো গত উন্নয়নের মাধ্যমে এসব ল্যাবে মাশরুমের টিস্যু কালচারের পাশাপাশি ফলদ বৃক্ষের চারা উৎপাদন করে স্বল্প সময়ে খুবই কম মুল্যে মানুষের কাছে পৌছে দেয়া সম্ভব। পুষ্টি নিরাপত্তা তথা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কৃষিতে টিস্যু কালচার সহ সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিকল্প নেই।

প্রসঙ্গ সৌদি খেজুরঃ প্রিন্টিং ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার কল্যানে ময়মনসিংহের ভালুকায় সৌদি আরবের খেজুরের বিখ্যাত জাত আজওয়াহ খেজুরের বাগান গড়ে ওঠার সফল কাহিনী অনেকেই জেনেছেন। খেজুর পাগল সৌদি আরব প্রবাসীর বাগানে ধরতে শুরু করছে তার স্বপ্নের খেজুর আজওয়াহ। প্রতি কেজি খেজুর বাগান থেকেই বিক্রি করছেন তিন হাজার টাকা দরে। প্রতিটি অফ-সুট বা সাকার (মাতৃ গাছ থেকে বের হওয়া চারা) বিক্রি করছেন এক থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা দরে । অবস্থানগত কারনে বাংলাদেশ পাম জাতীয় গাছ তথা তাল, সুপারী, নারকেল ও খেজুরের বহু পুরানা আবাস। খেজুর গাছের কথা আসলেই মনে পড়ে যায় এর সুমিষ্ট রস ও গুড়ের কথা। রসনায় স্বাদ যোগানো পিঠে পায়েসের কথা কোন ভাবেই ভুলবার নয়। মানিকগঞ্জের হাজারী গুড় ও ফরিদপুরের বিখ্যাত গুঁড় ও চোখের তাড়ায় ভেসে ওঠে। দেশী জাতের খেজুরের ফলের মান আরব্য দেশে উৎপাদিত জাত গুলোর মত না হলেও আরব্য জাত গুলো যে আমাদের দেশে চাষ করা সম্ভব তা বুঝতে বাকী থাকার কথা নয় কারো। তার পরেও বহু বছর লেগেছে আমাদের দেশে চাষ হতে, তাও আবার ক্ষুদ্র পরিসরে।

খেজুর পরপরাগী ফসল হওয়ায় বিভিন্ন জাতের মধ্যে সংকরায়ন হয় খুব সহজেই। ফলে এর কৌলিতাত্বিক বিশুদ্ধতা নষ্ট হয় এবং বীজের মাধ্যমে বংশ বিস্তার করলে মা গাছের বৈশিষ্ট্য বজায় থাকেনা। কৌলিতাত্তিক বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য অফ-সুট বা সাকারের মাধ্যমে এর বংশ বিস্তার করা হয়। একটি মা গাছ সারা জীবনে ৭-১০ টি অফ-সুট বা সাকার উৎপাদনে সক্ষম। আমাদের দেশীয় জাতে এ ধরনের অফ-সুট চোখে পড়েনা বললেই চলে। আবাদ সম্প্রসারণে অফ-সুট বা সাকার এক দেশ থেকে অন্য দেশে বহন করা কষ্ট সাধ্য। এর মাধ্যমে আবাদ সম্প্রসারণে রোগ জীবানু বিশ্বের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভবনা থাকে। আবার সংখ্যায় অফ-সুট কম হওয়ায় সল্প সময়ে একটি পুর্নাঙ্গ বাগান স্থাপন করা কঠিন। এ সমস্যা সমধানে টিস্যু কালচার প্রযুক্তি বহুদূর এগিয়েছে। টিস্যু কালচারের মাধ্যমে একটি মাত্র অফ-সুট থেকে এক হাজার থেকে দশ হাজার চারা তৈরী করা সম্ভব এবং একটি মাত্র মাতৃ গাছ থেকে প্রায় ষাট হাজার চারা তৈরী করা যায়। এতে জাতের বিশুদ্ধতা রক্ষার পাশা পাশি বাংলাদেশের আবহাওয়ার সাথে দ্রুত খাপ খাওয়ানো সম্ভব। টিস্যু কালচারের মাধ্যমে প্রাপ্ত চারা ০৪ (চার) বছরেই ফলন দিতে সক্ষম যেখানে বীজ থেকে প্রাপ্ত চারা হতে ফলন পেতে প্রায় দশ থেকে বার বছর লেগে যায়। খেজুর লবণাক্ততা ও খরা সহনশীল বিধায় আমাদের দেশের পরিবর্তিত জলবায়ুতে সহজেই খাপ খাওয়ানো সম্ভব।

শুধু সৌদি খেজুরই নয় ফুল ও শোভাবর্ধনকারী লতা ও গুল্ম, সবজি ফসল ও ফলদ বৃক্ষের জাত উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও বর্ধনের পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে টিস্যু কালচার অনন্য অবদান রাখতে সক্ষম। শুধু প্রয়োজন অবকাঠামোগত উন্নয়ন।