ক্যাটেগরিঃ কৃষি

 

কৃষিকে একটি বছর খুব কাছ থেকে দেখা এবং লদ্ধ অভিজ্ঞতা থেকে কোন মন্তব্য করা কঠিন! তাও আবার সারা দেশের কৃষি নয় । কোন একটা অঞ্চলের কৃষক, তাদের জীবন, চিন্তা, আবেগ, চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ যা কোন মতেই সারাদেশের চিত্র হতে পারে না। তার পরেও বাংলাদেশটা খুব ছোট এবং এখানকার মানুষের নৃ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য তথা কৃষ্টি-কালচার বিশেষত কৃষির সাথে জড়িত মানুষের জীবন ধারা ও কর্ম পদ্ধতি প্রায় একই রকম বলেই প্রতীয়মান। কৃষিজীবিদের একটি বড় অংশ তথা প্রায় এক কোটি মানুষ ভূমিহীন। অধিকাংশ আবাদি জমি যাদের দখলে প্রকৃতপক্ষে তাদের মূল পেশা কৃষি নয়। কৃষিজীবীদের অধিকাংশের ই নিজস্ব কোন আবাদি জমি নেই। আমার আলোচনার মূখ্য বিষয় বিগত এক বছরে কৃষকের আবাদ পদ্ধতিতে যে বিষয় গুলো আমার নজরে এসেছে এবং আমাকে ব্যথিত করেছে তাই। এখানকার কৃষি জীবীদের মূল ফসল ধান। অন্য ফসলও ফলে তবে সীমিত পরিসরে। সবজির আবাদ তেমন হয়না বললেই চলে।

অধিক মাত্রায় ধান আবাদের পেছনের কারণ বহুবিধ। অন্যতম কারণ অন্য ফসল চাষের তুলনায় ধান চাষে নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না বিধায় অপেক্ষাকৃত পরিশ্রম কম আবার মৌসুম শেষে গোলাভরে যায়। লাভ ক্ষতি তাদের কাছে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। মৌসুম শেষে বাড়ি ভর্তি সোনালী ধান এটা ভাবতেই তাদের সুখ। ঘরে ভাত থাকলে লবণ দিয়েও আমরা খেতে পারি যার দরুণ আমরা ভেতো বাঙ্গালি খেতাবও কব্জা করে নিয়েছি।

বিগত বছর ধানের নিম্ন বাজারদর থাকায় কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। শুধু নিম্ন বাজার মূল্যকেই ক্ষতির একমাত্র কারণ বলে মেনে নেয়া যায় না। কৃষক নিজেও অনেকাংশে দায়ী। আমার কর্ম এলাকার কৃষকদের নিকট থেকে ধান আবাদের তথ্য নিতে গিয়ে দেখা গেছে প্রতি মণ ধানের উৎপাদন খরচ প্রায় ৭০০-৭৫০/- টাকা। অথচ বাজার মূল্য ৫৫৯-৬০০ টাকা। আসলেই কি এত টাকা খরচ হতে পারে? তাদের দেয়া তথ্যমতে ধানের আধুনিক জাত, জাতের বিশুদ্ধতা, ফলন, আবাদ সময় ও আবাদ পদ্ধতি কি এ সম্পর্কে সঠিক ধারণা যে তাদের নেই তা পরিষ্কার বোঝা যায়। আধুনিক জাত ও প্রযুক্তি সম্পর্কে নিম্ন ধারণার পাশাপাশি এসব প্রযুক্তি গ্রহণে তথা আবাদে নিবিড়তা আনয়নেও তাদের প্রচন্ড অনীহা রয়েছে।

বোরো ই আমাদের ধান আবাদের প্রধান মৌসুম। ধানের ফলনও এ মৌসুমে বেশি। যার দরুণ বর্ষার পানি নদী, খাল, জলা, মাঠ থেকে নেমে যাওয়ার সাথে সাথেই কোন রকমে মাটিতে মই দিয়ে বোরো আবাদের প্রাথমিক কাজ তথা বীজ তলা তৈরী শুরু হয়ে যায়। বীজ তলা তৈরীর সময় হয়েছে কি না বা বীজের উৎস ঠিক আছে কিনা বা বীজ শোধন করা দরকার কিনা এসব বিবেচ্য বিষয় নয়। ফলে বীজের নিম্নমান ও বীজ শোধন না করায় বীজ বাহিত রোগের কারণে সুস্থ সবল চারা পাওয়া যায়না। আদর্শ বীজ তলা সম্পর্কে তাদের ধারণা কম বা ধারণা থাকলেও শ্রম বেশি লাগবে ভেবে মাটি জেগে ওঠার সাথে সাথেই এলোপাথাড়ি বীজ ছিটিয়ে রেখে আসে। পরবর্তীতে জমিতে স্থানান্তরের পূর্ব পর্যন্ত তেমন আন্তঃপরিচর্যাও করে না।

মূল জমিতে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে চারার বয়স ধানের ফলন কে বেশ প্রভাবিত করে। বাস্তবিক অর্থে তারা প্রায় সব সময়ই অধিক বয়সী চারা ক্ষেতে লাগায় এবং কোন কোন ক্ষেত্রে বীজ তলায় চারার বয়স ৯০ দিন পর্যন্ত হয়ে যায়। ফলে লাগানোর সপ্তাহ খানেকের মধ্যে ধানের থোড় বের হয়ে আসে। তখন মই দিয়ে থোড় আসা ধান ভেঙ্গে দিয়ে পুনরায় সার প্রয়োগ করে যে ফলন ঘরে তোলেন তা মূলত রেটুন (সেকেন্ডারি কুশি বা ধান কাটার পর গোড়া থেকে যে ধান বের হয়), মূল ফসল নয়।

সার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কৃষকদের ধারণা খুবই কম বা কোন উৎস থেকে এ ব্যাপারে পরামর্শ পেলেও বাস্তবায়নের আগ্রহ কম। গুটি উরিয়া ব্যবহারে সারের অপচয় ২৫-৩৫% কমানো যায়। কৃষক যে কারণে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে চায়না। প্রথমত, ধান লাইন করে লাগতে হয়।  দ্বিতীয়ত, গুটি একটি নির্দৃষ্ট দূরত্বে পুতে দিতে হয়; তৃতীয়তঃ গুটি প্রয়োগ করলে ধান সবুজ হতে একটু বেশি সময় লাগে। সাধারণত প্রতি দু গোছা পরপর গুটি ব্যবহার করার নিয়ম থাকলেও প্রতি গোছা পরপর তারা গুটি পোতেন। গুটি ব্যবহারে ধান পাশের ক্ষেত থেকে সবুজ হতে একটু বেশি সময় লাগে। এ সময়টাতে তারা আবার ইউরিয়া উপরি প্রয়োগও করে। অতিরিক্ত ইউরিয়া প্রয়োগ একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ বাড়ায় অন্যদিকে তেমন ধানকে নানান প্রতিকূলতা ও রোগের প্রতি সংবেদনশীল করে তোলে। প্রকারান্তে ধানে চিটা সহ নিম্নফলন হয়।

পানিব্যবস্থাপনা ধান ফসলের বৃদ্ধির বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করলেও এ সম্পর্কে আমাদের কৃষকদের সুষ্ঠ কোন ধারণা নেই। পানি সেচ পুরোপুরি ব্লক ম্যানেজারের নিয়ন্ত্রণে বিধায় এখানে কৃষক তেমন ভূমিকা পালন করতে পারে না। ফলশ্রুতিতে চাষী সঠিক সময়ে চারা লাগাতে ব্যর্থ হয় বা চারার বৃদ্ধির সংকট কালে সঠিক মাত্রায় সেচ হয়ত দেয়া হয়না। বিদ্যুৎ নির্ভর সেচ ব্যবস্থায় বিদ্যুতের অভাবেও যথাসময়ে সেচ দেয়া সম্ভব হয়না। জমিতে পানি ব্লক ম্যানেজার দিয়ে দেয় বলে ধান লাগানোর পর কৃষক ক্ষেতে তেমন একটা যায়না বললেই চলে। তাই সেচের পাশাপাশি রোগ পোকা ও আগাছা ব্যবস্থাপনা সঠিক সময়ে হয়না।

সহজ কথা হল সঠিক জাতের বীজ, বীজ শোধন, সঠিক পদ্ধতিতে চারা তৈরী, সুষ্ঠ সার, পানি, আগাছা, রোগ ও পোকা ব্যবস্থাপনা না করাতে একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং ফলনও কম হয়। ফলাফল একক প্রতি নেট উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। এ সব কিছুই কৃষকদের অবহেলা জনিত। কৃষি সম্পর্কে তাদের চিন্তা হল বাপ-দাদা করে এসেছেন, আমাদের ও করতে হবে। বাস্তবতা হল; অন্যান্য ব্যবসার মত কৃষিও যে একটি ব্যবসা, এখানেও যে বিনিয়োগের বিপরীতে লাভ-ক্ষতি নিয়ে ভাবনার বিষয় বা হিসাব নিকাশ থাকতে পারে এ ব্যাপারে তাদের তেমন কোন ভাবান্তর নেই। ধান বুনেছি একটা কিছু আসলেই হল, এটাই মোদ্দাকথা।

অর্থনীতির মেরুদণ্ড কৃষি কবে পাবে আধুনিকতার ছোয়া; কৃষক দেখবে লাভের মুখ; মানসম্মত কৃষি পণ্য কবে আমরা কিনতে পারব সহনশীল বাজার মূল্যে। এটাই প্রশ্ন!? উত্তর সময়ের হাতেই ছেড়ে দিলাম।

 

***

কৃষি পণ্যের চাহিদা, উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা, যা দেখছি