ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

যে কোন সামাজিক সমস্যাই হোক না কেন কতকগুলো সুবিধা প্রাপ্তির জন্য তা যারা সৃষ্টি করে তাদের দ্বারা যে সেই সমস্যার সমাধান হতে পারে না সেটাই স্বাভাবিক ।যৌক্তিক কারণেই এ ধরণের সমস্যা যখন তারাই সামাজিক চাপে সমাধানের ভনিতা করতে যায় তখন তা কথায়ই বাজে এবং বাগাড়ম্বরের মধ্যদিয়ে সমাজের মধ্যে আরো বিস্তার লাভ করে ঘনীভুত হয় এবং পাকা আসন পায় ।বাংলাদেশে শাসক শ্রেণীর স্বার্থে সৃষ্ট অসংখ্য সমস্যার একটিরও যে তাদের দ্বারা সমাধান না হয়ে কিভাবে বিস্তার লাভ করে সমাজের গভীর দেশ পর্যন্ত পাকা আসন গেড়ে বসেছে এবং কিছু কিছু শাসক শ্রেণী দ্বারা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে তা এদেশের সাধারণ মানুষকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই । এমনই এক সমস্যা হলো এখানে কোচিং বাণিজ্য সমস্যা ।সব সময়ই যে বিষয়টি দেখা যায় তা হলো এখানে শাসক শ্রেণীর বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচালকেরা সমস্যার কারণের দিকে কখনোই না গিয়ে উপর উপর বাগাড়ম্বরপূর্ণ কথার মাধ্যমে সমস্যার বিস্তার ঘটিয়ে থাকেন । এঁদের বুদ্ধিজীবী পদবাচ্যের মধ্যে ফেলা যায় না সে কারণে এঁদের শাসকশ্রেণীর বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচালক নামেই অভিহিত করা যায় ।এ সমস্ত লোকেরা কোচিং বাণিজ্য , কোচিং বাণিজ্য করে চিৎকারের মধ্য দিয়ে এ বাণিজ্যের যতটা প্রসার ঘটিয়ে দিয়েছেন এঁদের এই উপর উপর চিৎকার না থাকলে এ মাত্রায় এ বাণিজ্যের প্রসার লাভ এত দ্রুত হতে পারত না । বর্তমানে এর প্রসার এমন পর্যায়ে গিয়েছে যে , শাসক শ্রেণিকে এখন এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হচ্ছে । অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় কোচিং বাণিজ্যের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্যই যেন এ নিয়ে এত হৈ চৈ আর বাগাড়ম্বর ।

বর্তমান সরকার কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করার জন্য(?) একটি নীতিমালা প্রণয়ন করেছে । এ নীতিমালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত বিষয় হলো স্কুল বা কলেজের কোন শিক্ষক তাঁর নিজ প্রতিষ্ঠানের কোন শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে বা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না । এমনকি কোন বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টারেও পড়াতে পারবেন না । তবে তাঁরা টাকার বিনিময়ে অতিরিক্ত ক্লাশ(!) নিতে পারবেন । সে জন্য আবার সরকার প্রতি বিষয়ের জন্য টাকাও নির্ধারণ করে দিয়েছে । শিক্ষকগণ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পড়াতে পারবেন না এ নীতিমালায় এমন কথা বলা হলেও তাঁদের কিন্তু কোচিং করাতে বা প্রাইভেট পড়াতে বাধা নেই এ নীতিমালা অনুসারে । অন্য প্রতিষ্ঠানের (!) শিক্ষার্থীদের শিক্ষকগণ নিজ বাসায় পড়াতে পারবেন! এখানে অবশ্য লেজেগোবরে করে এ নীতিমালায় বলা হয়েছে যে , তাঁরা সর্বোচ্চ দশজন পড়াতে পারবেন ।

সরকারের এসব কোচিং সংক্রান্ত নীতিমালা দেখে মনে হচ্ছে মাথায় ব্যাথা হলে পায়ে পানি ঢালার প্রেসক্রিপশনও যেন এখানে অচল এ যেন মাথায় ব্যাথা হলে মাথায় বাড়ি দেওয়ার বা পাকুড় গাছের গোড়ায় পানি ঢালার প্রেসক্রিপশন । সরকারের এসব নীতিমালা যে হাস্যকর এবং কতকগুলো উপদেশ দানের চেয়ে বেশিকিছু নয় তা কী শাসকশ্রেণীর যে সব কুবুদ্ধিবৃত্তিক পরিচালকের মাথা থেকে এসব এসেছে তাঁরা এবং সরকারের কর্তাব্যাক্তিরা জানেন না ? এসব যে এভাবে কার্যকর হবার নয় তা তাঁরা ভাল করেই জানেন । তাঁরা এমন বোকা নন যে জনগণ যা বুঝতে পারছেন তা তাঁরা বুঝতে পারছেন না । তারপরও তাঁরা এসব করছেন এ কারণে যে, বিষয়টি এখন জনসাধারণের গলার গাঁড় হয়ে উঠেছে । এ অবস্থায় কিছু বাগাড়ম্বর প্রয়োজন হলেও শুধুমাত্র এ জন্যও তাঁরা তা করেননি । তাঁরা এটা করেছে বাগাড়ম্বরের প্রয়োজনেও বটে এবং সবচেয়ে বেশি যে প্রয়োজনে করেছে তা হলো বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের জন্য ।

প্রথমেই যে বিষয়টি লক্ষ্য করার মত তা হলো শিক্ষকগণ কোচিং ঠিকই করাতে পারবেন , প্রাইভেট ঠিকই পড়াতে পারবেন কিন্তু অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের , নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নয় ।এখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে সরকার কিভাবে সনাক্ত করকবেন? নাকি শিক্ষকগণ বা শিক্ষার্থীরা সরকারকে এমনই আধ্যাত্নিক ভজন করেন যে সরকার যা বলবে তা তারা স্বতঃস্ফুর্তভাবে অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন? নাকি তাঁরা মনে করবেন এগুলো পালন না করলে পাপ হবে? তাহলে আর নীতিমালা প্রণয়নেরই বা দরকার কি আর শাস্তি বিধানেরই বা দরকার কি ? সর্বোচ্চ দশজন পড়ানোর যে বিধান রাখা হয়েছে তাই বা সরকার কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন ? এসব প্রশ্ন মতলববাজ , শিশু বা পাগল না হলে যে কোন স্বাভাবিক মানুষের মাথায় আসবে । এতো গেল প্রশ্নের একদিক ।প্রশ্নের অপরদিক হলো একজন শিক্ষকের বাসায় তাঁর নিজ প্রতিষ্ঠানের যে কোন সংখ্যক শিক্ষার্থীর একসাথে হয়ে যাওয়া , শিক্ষকের বাসায় গিয়ে কোন রুমে বসায় , শিক্ষকের সাথে কথা বলায় বা তাঁর কাছ থেকে একটা কিছু শেখায় দোষ, এমন কোন গণতান্ত্রিক আইন আছে কি ? নাকি সেচ্ছ্বাচারী আর সৈরাচারী উপায় ছাড়া আইনের উৎপত্তি নাই ?

আসলে সরকারে এসব হাস্যকর এবং বাগাড়ম্বরপূর্ণ কর্মকান্ডের মধ্যদিয়ে মানুষ যে সমস্যার মধ্যে আছে তার কি কোন সমাধান হবে? এ প্রশ্নের মধ্যদিয়ে আরো কতকগুলো প্রশ্ন এসে যায় । তা হলো _ মানুষ আসলে এ সংক্রান্ত কোন্ কোন্ সমস্যার মধ্যে আছে? এসব সমস্যার কারণ কি ? এসব সমস্যা কিভাবে সমাধান করা সম্ভব ?এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলে একটু পিছন থেকে আসা দরকার ।যখন প্রতিষ্ঠান গড়েই ওঠেনি তারও আনেক আনেক আগে থেকে মানুষ ব্যাক্তির কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহন করে আসছেন । ভারত বর্ষের শিক্ষার ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে এখানেও প্রতিষ্ঠানের বাইরে শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যাক্তির ভুমিকা কতটা ব্যাপক । সেসব আলোচনার এখানে খুব একটা অবকাশ নেই ।সেসব বাদ দিলেও প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের গৃহশিক্ষকের নিকট থেকে বা প্রাইভেট শিক্ষকের নিকট থেকে পাঠ গ্রহনের ইতিহাসও সেই প্রাচীনকাল থেকেই । এটা শুধু আমাদের দেশেই নয় গোটা পৃথিবীতেই দেখা যাবে । কিন্তু হতাশ এবং নির্বাক হওয়ার মত বিষয় হলো এই যে, এখানকার কিছু শিক্ষিত পন্ডিত শিক্ষার বিবেচনার মাথা খেয়ে ব্যক্তির কাছে শিক্ষা গ্রহন বা প্রাইভেট পড়ার বিষয়ে কয়েক হাত লাফিয়ে উঠে এমনসব কথা বলেন শুনলে মনে হবে যেন প্রাইভেট পড়া এবং পড়ানো দুটোই পাপের কাজ । তাদের কথাতে তাঁরা যাঁদের কাছ থেকে প্রাইভেট পড়েছেন তাঁদের শ্রদ্ধা সন্মান করার সৌজন্যতো দুরে থাক চরম অবজ্ঞা এবং তাচ্ছিল্যই ফুটে ওঠে । তাঁরা স্বীকারই করতে চান না যে, তাঁরা একসময় কারো কাছে প্রাইভেট পড়েছেন ।যখন তাঁরা প্রাইভেট পড়ার বিষয়ে চরম অবজ্ঞা করে বক্তৃতা করছেন তখনও তাঁদের বাসায় গেলে হয়তো দেখা যাবে তাঁদের পরিবারের শিক্ষার্থীরা গৃহশিক্ষকের নিকট অথবা অন্য কোথায়ও গিয়ে প্রাইভেট পড়ছে । কোন সংকটের কারণ অনুসন্ধান না করে তা সমাধান করা সম্ভব নয় ।কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য আমাদের এখানকার পণ্ডিতগণ যে কোন সংকটকে ওপর ওপর দেখে বাজার দরে কথা বলতে লেগে যান । জনপ্রিয় হওয়ার এ এক বড় উপায় । যে দেশের পন্ডিতরা জনপ্রিয় হওয়ার মোহে সব সময় বিভোর থাকেন । যে দেশের পণ্ডিতগণ পাণ্ডিত্যে অর্জিত এবং তোয়াজে অর্জিত পুরস্কারে ড্রয়িংরুম সাজিয়ে রাখেন এবং সেসব দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে নানা মিডিয়াম্যানের সাথে কথা বলে নিজেদের পান্ডিত্যের সীমানা দেখিয়ে দেন দেশবাসিকে ।সেই দেশে বর্তমানে শিক্ষার সংকট যেভাবে ঘনীভুত হয়ে চরম অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে সেটা হওয়াই স্বাভাবিক । কারণ এসব পন্ডিতেরা যা সংকটই নয় তা নিয়ে যত কথা বলেছেন , শিক্ষার বড় বড় ক্ষত দেখেও তত কথা তো দুরে থাক একটি বাক্যও ব্যয় করেননি ।
এবার বর্তমান সংকটের দিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক।বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো স্কুল-কলেজ আর এখন শেখানোর এবং শেখার জায়গা নয় ।হাতে গোনা কয়েকটি স্কুল -কলেজ বাদ দিলে দেশের সকল স্কুল -কলেজকে আর শেখানোর জায়গা বা শিক্ষাকেন্দ্র না বলে এগুলোকে পরীক্ষাকেন্দ্র বলা ভালো ।বিষেশ করে সুনামধন্য(?!) স্কুল-কলেজগুলোকে আর পরীক্ষাকেন্দ্র ছাড়া আর কিছুই বলা চলে না । তা হবেই বা না কেন ? সরকারগুলোর লিখিত এবং অলিখিত শিক্ষানীতির মধ্যে যেখানে শেখানোর কোন নীতি নেই , আছে শুধু যেন-তেন প্রকারে ফলাফল করানোর নীতি সেখানে সুনামধন্য হতে গেলে এ ধরণের প্রক্রিয়া ছাড়া আর উপায় কি ?যেসব স্কুল-কলেজে এক সময় পড়ালেখার সংষ্কৃতি ছিল সেগুলোও এখন শীর্ষস্থান দখলের প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের উপর উপর কতকগুলো ফলাফল করাতে পড়ালেখা এবং শেখানোর সংস্কৃতি বিসর্জন দিয়ে এখন শর্টকাট পথে শুধুমাত্র পরীক্ষায় ভাল ফল করার সংষ্কৃতি তৈরী করেছে ।সরকার যতই সৃজনশীলতা ইত্যাদির বাগাড়ম্বর করুক একজন শিক্ষার্থীর শেখা-জানার চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা হয় একমাত্র তার রেজাল্টের মাধ্যমে । আর এই রেজাল্টের শীর্ষদেশ ছুঁতেও তেমন শেখা-জানার প্রয়োজন নেই । কারণ এখানে যে কোন পাবলিক পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা নকল করবে কি? এখানেতো প্রশ্ন পত্রই হরদম নকল হচ্ছে । এ নকলের মধ্যেও বেশ শৃঙ্খলা আছে । যে আলোচ্য বিষয় থেকে এ বছর প্রশ্ন হয়ে গেল সে আলোচ্য বিষয় থেকে কোন ক্রমেই কোন ধরণের প্রশ্নই আর আগামী বছর আসবে না । গত বছরের প্রশ্নগুলো থেকে আগামী বছর আনেকগুলো প্রশ্ন হুবহু এসে যাবে ।কাজেই এখানে রেজাল্ট করার জন্য সীলেবাসের সবকিছু শেখা-জানার প্রয়োজন নেই ।এমনকি সম্পূর্ণ উল্টা ধারণা নিয়েও শীর্ষ ফলাফল করা সম্ভব হয় । অর্থাৎ এমন শীর্ষ ফলাফল করা অনেক শিক্ষার্থীর চেয়ে এ পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহন করতে পারেননি এমন মানুষকে এদিক দিয়ে এগিয়েই রাখা যাবে ।

স্কুল-কলেজগুলোতে এখন শেখানোর সংষ্কৃতির পরিবর্তে প্রতষ্ঠিত হয়েছে রেজাল্টের সংষ্কৃতি । আর রেজাল্টের সংষ্কৃতি মানেই শুধুই পরীক্ষা । নানা নামের নানা আয়তনের পরীক্ষা ।যেহেতু শেখানোর কোন কারবার নেই তাই এতসব পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা হয়ে ওঠে দিশেহারা । এসব পরীক্ষার উদ্দেশ্যও সরল নয় । এসব পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের মধ্যে কার কোন জায়গায় দুর্বলতা আছে সে সব চিহ্নিত করে তার প্রতি যত্নশীল হওয়ার জন্য নেওয়া হয় না ।এসব পরীক্ষা যেন নেওয়াই হয় শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের হেনস্থা করার জন্য ।প্রতিটি পরীক্ষায় বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিষয়ে ফেল করে বা তাদের ফেল করানো হয়। এসব ফেল হওয়া বা ফেল করানোতে সংশ্লিষ্ঠ শিক্ষকের কোন লজ্জা নেই । বরং যে বিষয়ে যত ফেল করবে সেই বিষয়ের শিক্ষকের তত গর্ব । কারণ ফেল করালে রোজগার বাড়ে । সংশ্লিষ্ঠ শিক্ষকেরও রোজগার বাড়ে , শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও রোজগার বাড়ে । এখন ফেলের সাথে সরাসরি টাকার সম্পর্ক ।ফেল করালেই পরবর্তী ধাপে উত্তীর্ণ করানোর জন্য কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নির্ধারণ । কোন কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আবার নিষ্ঠুরতা খানিকটা কমিয়ে রিটেক(পূনঃ পরীক্ষা)ইত্যাদির বাহানায় ফি এর নামে টাকা আদায় করে থাকে । এমন অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে টেষ্ট পরীক্ষায় অনির্বাচিত করে অভিভাবকদের নিকট থেকে মুচলেকা নিয়ে টাকা জমা রেখে পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহনের সুযোগ দেওয়া হয় । সে টাকার পরিমাণ বিশাল অংকের । কতগুলো বিষয়ে ফেল করেছে তার উপর ভিত্তি করে এক লক্ষ থেকে কয়েক লক্ষ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে । মুচলেকার শর্ত হলো শিক্ষার্থী যদি পাবলিক পরীক্ষায় ফেল করে তাহলে জমা রাখা টাকা আর ফেরৎ দেওয়া হবে না । যেহেতু বিশাল অংকের টাকার সাথে সম্পর্কিত কাজেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এসব শিক্ষার্থীকে ফেল করানোরই নানা আয়োজন করা হয়ে থাকে । এখন আবার সরকারের তরফ থেকে শিক্ষার্থীদের রেজাল্ট ঘোষনার সাথে সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থানও ঘোষনা করা হয় । বাংলাদেশে সবকিছুকেই কলুষিত করার জন্য সব রকমের আয়োজনই সরকারগুলোর পক্ষ থেকে করা হয়ে থাকে । এখানে ভাল করার বাগাড়ম্বরে যা কিছুই করা হয় তা এমনসব মতলব বাজির জন্য করা হয় যে , সে বিষয় কলুষিত না হয়ে পারে না । শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এভাবে স্থান নির্ধারণ করায় শিক্ষার সংস্কৃতিটাই আশংকাজনকভাবে কলুষিত হচ্ছে । একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে থেকে একটি সেশনে কতজন নিবন্ধিত হলো তার ওপর হিসাব না করে কতজন পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করল তার উপর ভিত্তি করে সরকার ঐ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পাশের হার , জিপিএ ৫ এর হার নির্ধারণ করে থাকে ।এটাকে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সুযোগ হিসাবে নিয়ে থাকে । সেটাই স্বাভাবিক । কারণ একটি দুর্নীতি আর একটি দুর্নীতেকে উৎসাহিত করে ।শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্থান নির্ধারণের সরকারি এমন হিসাবের সুযোগ নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের উপর আর্থিক তো বটেই চরম অমানবিক আচরণ করে থাকে ।আগেকার দিনেও পাবলিক পরীক্ষার আগে নিজ প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনী পরীক্ষায় খুবই অল্প সংখ্যক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে অনির্বাচিত হওয়ার মত ঘটনা ঘটত । কিন্তু সে ক্ষেত্রে কোন মতলববাজির লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের অনির্বাচিত করা হত না । এই মতলববাজি দুই ধরণের দেখা যায় । এক হলো অনির্বাচিত করে বিপুল পরিমাণ টাকা আদায় করা এবং আরেক হলো জিপিএ ৫ এবং পাশের হার বাড়ানোর জন্য বিশেষ করে জিপিএ ৫ এর হার বাড়ানোর জন্য বহু সংখ্যক শিক্ষার্থীকে পাবলিক পরীক্ষায়ই অংশগ্রহন থেকে বঞ্চিত করা হয় ।এ কাজ করতে তাদের কোন অসুবিধা নেই কারণ এসব শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা পয়সা যা নেওয়ার তা নেওয়া হয়ে গিয়েছে । এখন ঐ সব শিক্ষার্থী এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে থেকে গেলেও প্রতিষ্ঠানের লাভ , চলে গেলেও কোন ক্ষতি নাই ।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ফেল করানো নিয়ে যে সব কর্মকান্ড করে তার মধ্যে উপরে উল্লেখিত বিষয়গুলোও বেআইনি হলেও এমন কতকগুলো কাজ করা হয় যা যে কোন সাধারণ মানুষের কাছেও চুড়ান্ত মাত্রায় আইনের লংঘন বলেই মনে হবে । শিক্ষার্থীদের ফেল করিয়ে তাদের অভিভাবকদের তলব করে তাদের দিয়েই পাঁচশত থেকে হাজার টাকার স্ট্যাম্প ক্রয় করিয়ে সেখানে মুচলেকা দিতে বাধ্য করা হয় এবং ভয়ভীতি প্রদর্শণ করে তাদের নিকট থেকে নানা অজুহাতে বিপুল পরিমাণ টাকা আদায় করা হয় ।এ সব কিছুই ঘটে চলেছে সরকার এবং শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের নাকের ডগার ওপর বসে । নীতিহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিভাবে শিক্ষার্থীদের নীতি শেখাবে? আনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে যারা অঙ্গিকার করে যে , যারা জিপিএ ৫ বা গোল্ডেন ৫ পেয়ে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হবে তাদের বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুযোগ দেওয়া হবে । এই আশায় বহু সংখ্যক শিক্ষার্থী সে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয় । কিন্তু দুই মাস পরই তাদের ফেল করিয়ে সে অঙ্গিকার বাতিল করা হয় ।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যে সব অনৈতিক এবং অন্যায়ভাবে মুনাফা অর্জনের ফন্দি আর মতলবে মেতেছে তার সাথে শিক্ষার সামনে আগানোর কোন সম্পর্ক না থাকলেও শিক্ষা সংস্কৃতির অবনতির সম্পর্ক অবশ্যই আছে ।শিক্ষা ক্ষেত্রে এর সাথে সম্পর্কিত শীর্ষ প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়ে সব চেয়ে নীচের প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত যে চাতুরির সংস্কৃতি তৈরী হয়েছে তাতে করে এসব প্রতিষ্ঠান মানব উন্নয়নের পরিবর্তে মানব অবনয়নই করতে পারবে । বিবেক-বোধ সম্পন্ন , আত্নসন্মান সম্পন্ন মননশীল মানুষ তৈরী না করে এসব প্রতিষ্ঠান চতুর মানুষই তৈরী করতে পারে এবং তাই করছে ।শিক্ষার্থী , শিক্ষক , অভিভাবকের মধ্যে কোন শ্রদ্ধা-ভক্তি ,স্নেহ এবং সন্মানের সম্পর্কের যেন আর লেশমাত্র উপস্থিত নেই । স্কুল-কলেজে অনুপস্থিতির জন্য আগেও সাজা-শাস্তি ছিল । কিন্তু সেগুলো ছিল সম্পূর্ণরূপে একাডেমিক এবং তার মধ্যে কোন কপতা , ভন্ডামির ব্যাপার ছিল না । কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি দেখলে দেখা যাবে বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে অবৈধভাবে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার একটি ফন্দিতে পরিণত হয়েছে । রাজধানী সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশকিছু স্কুল-কলেজে কড়াকড়ির(!) নামে একদিনের অনুপস্থিতিতে হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং তা রীতিমত আদায় করা হয় । জরিমানার বিষয়টি কলেজ পর্যায়ে না হলেও স্কুল পর্যায়ে আগেও ছিল । কিন্তু তা এতই কম ছিল যে , এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে কখনই কারো মনে হওয়ার আবকাশ ছিল না । আবার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দরখাস্তের মাধ্যমে তা মওকুফ করে নেওয়ার সরল ব্যবস্থা ছিল ।সে দরখাস্তে অভিভাবকের স্বাক্ষরকেই সন্মান করা হতো ।সেখানে এর জন্য আর ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনের প্রয়োজন পড়ত না । কারণ অনেক সময়ই বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতির জন্য ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনের ব্যাপার ছাড়াও অনেক বৈধ কারণ থাকতে পারে । তার জন্য অভিভাবকের স্বাক্ষরই যথেষ্ট ছিল । কিন্তু এখন যেহেতু টাকা হাতিয়ে নেওয়াই প্রধান উদ্দেশ্য কাজেই অভিভাবকের স্বাক্ষরতো দুরে থাক অভিভাবকের উপস্থিতিও সেসব প্রতিষ্ঠানের জন্য যথেষ্ট হয় না ।সেখানে অভিভাবকের স্বাক্ষরতো দুরে থাক তার সাক্ষাতেও কাজ হয় না । ডাক্তারি সার্টিফিকেট লাগে তাও আবার শোনা যায় পরিচিত প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার না হলে হবে না । অর্থাৎ যেন তেন প্রকারেই হোক না কেন টাকা আদায়ই হলো প্রধান উদ্দেশ্য ।এতে করে কাকে অসন্মান করা হলো, কাকে অবিশ্বাস করা হলো তাতে কিছুই যায় আসে না ।এসব প্রতিষ্ঠানে টিকে গিয়ে একজন শিক্ষার্থী যে সংষ্কৃতি নিয়ে বের হবে তা দিয়ে সমাজের মধ্যে সে কি করবে? মানুষকে অসন্মানিত করা , অসামঞ্জস্য কাজ করা , অযৌক্তিক কথা বলা থেকে শুরু করে নানা অপরাধ করতে কি তাদের শিক্ষায়-সংষ্কৃতিতে বা বিবেকে বাধবে?

এখন প্রশ্ন হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এমন ভন্ডামি-কপটতা-চাতুরী এবং মুনাফা করার যায়গায় পরিণত হলো কেন ? এর কারণ পর্যায়ক্রমে সরকারগুলোর শিক্ষানীতি এবং শিক্ষা নিয়ে সরকারী বাগাড়ম্বর আর কপটতা- ভন্ডামির মধ্যে খুঁজলে পাওয়া যাবে ।শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ কম এবং বাড়ানো দরকার এটা সত্য । এক সময় বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী যখন অন্য অবস্থানে ছিলেন তিনিও তাই বলতেন । কিন্তু ধারাবাহিকভাবে শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রকৃত বরাদ্দ কমলেও শিক্ষামন্ত্রী এখন এ বরাদ্দেই খুশি । কিন্তু কম বরাদ্দের কথা বাদ দিলেও যে বরাদ্দ দেওয়া হয় তা সঠিক পরিকল্পনার মধ্যদিয়ে ব্যয় হচ্ছে বলা
কঠিন ।বিষয়টি সহজেই বোঝা যাবে যদি শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে দেওয়া বইয়ের দিকে তাকানো যায় ।শিক্ষার্থীদের একটুখানি ভালোমানের বইয়ের দাবি দীর্ঘদিনের ।এরই পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে শিক্ষা মন্ত্রনালয় থেকে প্রচার করে আসা হচ্ছিল ভালো কাগজে রঙিন বই শিক্ষার্থীদের দেওয়া হবে ।আমাদের দেশে আগাগোড়াই একটি ব্যাপার লক্ষ্য করা যায় যে, সরকারের পক্ষ থেকে দায়ীত্বপ্রাপ্ত যে কেউই যখনই কোন অর্থ বিষয়ের কাজ করেন তখন যে তাঁরা শুধু সে কাজের তত্ত্বাবধায়কের নির্বাহী দায়ীত্ব পালন করেন এবং এ জন্য জনগণের নিকট থেকে উপযুক্ত বেতনও পান এবং এসব কাজের জন্য টাকা যে তারা নিজেদের ঘর থেকে দেন না , এ যে জনগণেরই টাকা তা তাঁরা যেন ভুলেই যান ।আমাদের শিক্ষামন্ত্রীর অবস্থাও তা থেকে ব্যতিক্রম নয় । শিক্ষার্থীদের বই দেওয়া নিয়ে তিনি এমন সব আচরণ করেছেন তা দেখলে মনেই হয় না তিনি জনগণের টাকায় তা করছেন । মনে হয় তিনি শিক্ষার্থীদের করুণা করছেন যেন । বিরাট বিরাট প্যান্ডেল করে বিশাল বিশাল আয়োজনের মাধ্যমে তা করেছেন এই প্রগতিশীল শিক্ষামন্ত্রী ।তাঁর মহৎ কাজের এবং শিক্ষাক্ষেত্রে বিশাল উন্নয়নের ফিরিস্তি দিয়ে নিজের নামে ঢোল পেটাতে জনগণেরই টাকায় তাঁর নামে বই ছেপেছেন এককালের এই গরীবের বন্ধু ! অথচ সেই বইয়ের কি অবস্থা ? তাঁর নামে ঢোল পেটাতে যে কাগজে এবং যে মানের (অপ্রয়োজনীয়) ছবি দিয়ে তিনি বই ছেপেছেন জনগণেরই টাকায় শিক্ষার্থীদের বইয়ের মান তার ধারে কাছেতো নয়ই বরং যোজন -যোজন দুরে । তিনি শিক্ষার্থীদের রঙিন বই দেননি , বইতে রঙ লাগিয়েছেন । এমনই রঙ লাগিয়েছেন যে , তাতে ছবি চেনা না গেলেও আলো প্রতিফলিত হয়ে শিশুদের দৃষ্টি শক্তিকে ঝাপসা করে । জানি না হয়তো তিনি এও বলতে পারেন এর মধ্যেও শিক্ষার মান উন্নয়নের সহনশীলতার শিক্ষা আছে! রঙের কথা বাদ দিয়ে বইয়ের বাঁধাইয়ের দিকে যদি তাকানো যায় তাহলে বলতে হয় বইয়ের পাতাগুলো দুইবার উল্টানোর পর তৃতীয়বার উল্টাতে গেলে আর পাতা খুঁজে পাওয়া যায় না । পাতাগুলো গতিশীল হয়ে এদিক ওদিক ছুটতে থাকে অথবা বইটিই দুই তিন খন্ডে বিভক্ত হয়ে যায় ।এ ক্ষেত্রে গরীবের বন্ধু তিনি হয়তো বলতে পারেন একটু কষ্ট করে বইগুলো শেলাই করে নিলেইতো হয় , বিনা মূল্যে রঙ লাগানো বই দেওয়া হচ্ছে এইতো বেশী !!

ফাঁকা কথা আর ফাঁপা রাগ- (কোন কোন অঞ্চলে বলে বেঁড়ে রাগ) এর ধরণ দেখেই মানুষ বুঝতে পারে এর দৌড় কতদুর । বিশেষ করে বিপুল মুনাফার হাতছানিতে যারা শিক্ষা ব্যবসায় নেমেছে তারাতো খুব ভাল করেই বুঝতে পারে কোন্ কথার কার্যকারিতা কতখানি হতে পারে । এর প্রমাণ পাওয়া গেল যখন বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ভর্তি ক্ষেত্রে অসম্ভব এবং অবিশ্বাস্য রকমের বেশি টাকা লুটপাট করছিল তখন শিক্ষা মন্ত্রীর কার্যকর পদক্ষেপের পরিবর্তে তাঁর বেঁড়ে রাগ প্রদর্শণের ফলে শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের কতখানি মাশুল দিতে হয়েছে তা থেকে ।শিক্ষামন্ত্রী ঘোষনা করেছিলেন অতিরিক্ত টাকা নেওয়া যাবে না এবং যে সব অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়েছে তা ফেরৎ দিতে হবে । পত্র পত্রিকার খবরে দেখা যায় এ বিষয়ে তিনি খুব খুব্ধ হয়েছিলেন । প্রচন্ড খুব্ধ হওয়া এবং সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়াকেই বলা হয় বেঁড়ে রাগ ।শিক্ষামন্ত্রীর এ বেঁড়ে রাগ মনে হয় সংশ্লিষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা বুঝতে পেরেছিলেন । সে জন্য তাঁরা ভুক্তভোগীদের একটি টাকা তো ফেরৎ দেনইনি উপরন্তু অনেক শিক্ষার্থীকে নাজেহাল করেছেন এবং অনেককেই আবার নতুন করে ভর্তি পর্যন্ত হতে হয়েছে । শিক্ষামন্ত্রীর এক বেঁড়ে রাগের মাশুল ভুক্তভোগীদের এভাবেই দিতে হয়েছে ।শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্য করা যাবে না বলছেন হরদম । অথচ কোন প্রতিষ্ঠানের ওপর এ বিষয়ে তাঁর মন্ত্রনালয়ের যেন কোন নিয়ন্ত্রনই নেই ! শিক্ষার্থীদের বেতন নির্ধারণে সরকারের কোন নিয়ন্ত্রন নেই , যে প্রতিষ্ঠানের যেমন ইচ্ছা তেমনই নির্ধারণ করছে । ভর্তি ফি লাগামহীন তারও কোন নিয়ন্ত্রন নেই । বাধ্যতামূলক কোচিং প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই করানো হয় । তাও আবার এসব কোচিং কোন শিক্ষার জন্য নয় নিছক টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য ।শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোই যখন নানারকমের বাণিজ্য করছে, সুদখোর মহাজনের মত আচরণ করছে; তখন শিক্ষামন্ত্রী কোচিং নিয়ন্ত্রনের(!) আর এক বাগাড়ম্বরী নীতিমালা প্রকাশ করেছেন । যে নীতিমালা দেখে যে কেউ বলতে পারে এ কার্যকর হবার নয় । বরং তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ব্যাপারে যে বৈধ ক্ষমতা দিয়ে দিয়েছেন তাতে সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগিরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন না জানি এবার আবার কি হয় !ক্ষমতা পাওয়ার আগে থেকেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাধ্যতামূলক কোচিং এর যন্ত্রনায় শিক্ষার্থীরা যখন অতিষ্ঠ তখন তাদের হাতে কোচিং করানোর বৈধ ক্ষমতা দিচ্ছেন একদিকে আবার কোচিং নিয়েই তিনি ব্যঙ্গ -রঙ্গ করছেন । এ এক অদ্ভুত বৈপরিত্য । তিনি তো আবার এক সময় বৈপরিত্যের ঐক্যে বিশ্বাসী ছিলেন ! সবকিছু ছাড়লেও হয়তো এটুকু এখনও ছাড়েননি!! এ ধরণের বৈপরিত্যের ঐক্য না বলে সমন্বয় বলা যায় । এ সমন্বয়ে ব্যক্তি বিশেষের উন্নতি হতে পারে কিন্তু জনগণের কোন লাভ তাতে হয় না ।

সরকারগুলোর শিক্ষানীতির মধ্যে শিক্ষার্থীদের কোচিংএ নিক্ষেপ করার জন্য প্রয়োজনীয় ধাক্কার সব রকমের ব্যবস্থাই আছে । এখানে সরকারের শিক্ষানীতি বলতে শুধুমাত্র একটি বইয়ের মধ্যে লিখিত তাদের বক্তব্য এবং পরিকল্পনার কথা বুঝলেই চলবে না । আসলে শিক্ষা নিয়ে বাস্তবে সরকার যে সকল কর্মকান্ড করে থাকে তাকেই সরকারের তথা শাসক গোষ্ঠীর শিক্ষানীতি হিসাবে ধরতে হবে ।এ প্রসঙ্গে প্রথমেই যেটা বলা প্রয়োজন সেটা হলো বই পুস্তকের নিম্ন মান । এই নিম্ন মান উভয় দিক থেকেই । অর্থাৎ বই পুস্তকের চেহারার দিক থেকেও বটে এবং বিষয় বস্তু আলোচনার দিক থেকেও বটে । প্রথমে বই পুস্তকের চেহারার কথা যদি বলা যায় তাহলে বলতে হয় বই পুস্তকের এমন বেহাল চেহারা পৃথিবীর আর কোন সভ্য দেশে আছে কিনা তা বলা মুশকিল ।নিম্ন মানের কাগজ , অত্যন্ত নিম্নমানের বাঁধাই এবং ছাপার মানও অত্যন্ত নিম্ন মানের । দেখলেই মনে হবে এ যেন খুবই এক দায়সারা কাজ করা হয়েছে ।এমন বাঁধাই যে, নতুন করে সেলাই না করলে শিক্ষার্থীর পক্ষে তা ব্যবহার করা কোন মতেই সম্ভব নয় । এমন অবয়বের বই শিক্ষার্থীদের টানে না । এর পরে বলা যায় বইয়ের ভিতরের কথা । বানান ভুল , তথ্য ভুল যেন খুবই সাধারণ ব্যাপার । প্রথম শ্রেণী থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত সকল বই পুস্তকে এ অবস্থা চোখে পড়ার মত । ভুল ছাড়াও শব্দ ,বাক্য ,লাইন উধাও হয়ে যাওয়াও প্রায়ই দেখা যায় । এ ছাড়াও আছে আলোচনার দুর্বোধ্যতা এবং দুর্বলতা । প্রায়ই এসব আলোচনা শিক্ষার্থীদের নিকট দুর্বোধ্য থেকে যায় , তাদের মনে কোন বুঝ সৃষ্টি করতে পারে না । অনেক সময় শিক্ষার্থীদের মনে সম্পূর্ন উল্টা বুঝও তৈরী করে ।জাতীয় শিক্ষাক্রম এবং পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের বইয়ের ভেতরের অবস্থা যে ভাল তা নয় , সেখানেও অসংখ্য ভুল লক্ষ্য করা গেলেও এসব বইয়ের অঙ্গিকের বেহাল দশার সুযোগে এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবসার সাথে যোগসাজসের সুযোগে শিক্ষার্থীদের ওপর কতকগুলো যে বাড়তি বই চাপিয়ে দেওয়া হয় সেগুলোর মান এতই নিম্ন যে , সেগুলো না পড়ে বরং অশিক্ষিত হয়ে থাকাও ভাল ।

বই-পুস্তকের পরে বিদ্যালয়ের প্রসঙ্গে আসা যায় । স্কুল-কলেজের বেশকিছু অসঙ্গতির কথা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। সে সবের বাইরে এ প্রসঙ্গে আরো যে সব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা হলো সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর মধ্যে চূড়ান্ত মাত্রার বৈষম্য । এমনই বৈষম্য যে, তা একটি দেশের সামগ্রিক শিক্ষার জন্য তা অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং বিপজ্জনক পর্যায়ের । এখানে যে বিভিন্ন ধারার শিক্ষা বিরাজমান সেসব বাদ দিলেও শুধু মাত্র প্রধান ধারার দিকে তাকালেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আকাশ-পাতাল বৈষম্য লক্ষ্য করা যাবে ।এ বৈষম্য শিক্ষকদের যোগ্যতা এবং শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে যতটা তার চেয়ে বেশি সরকারি প্রচার, পক্ষপাতিত্ব , পৃষ্ঠপোষকতায় । সরকারগুলো এ কাজ তাদের শ্রেণী স্বার্থেই দীর্ঘদিন ধরে করে আসছে । এর মাধ্যমে সরকারগুলোই দীর্ঘদিন ধরে এসব উপরের সারির প্রতিষ্ঠান , এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদেরকে শিক্ষা বাণিজ্যকরণের কাজে উৎসাহ এবং শক্তি যুগিয়ে আসছে এবং এখন তা অত্যন্ত ভয়াবহ আকবস্থার সৃষ্টি করেছে ।সরকারের আচরণ এবং কর্মকান্ড দেখে সাধারণ বিচারবোধে কখনোই মনে হওয়া সম্ভব নয় যে ,সরকার সামগ্রিকভাবে দেশের মানুষের শিক্ষা নিয়ে ভাবছে বা সে অনুযায়ী কাজ করছে । সরকারের সকল কর্মকান্ড এবং হৈচৈ শুধুমাত্র এ ধরণের উপরের সারির কতকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীক । সরকার যেসব প্রতিষ্ঠান এবং সেখানকার শিক্ষার্থীদের নিয়ে শিক্ষার উন্নয়নের ফিরিস্তি ঝেড়ে থাকে সেগুলোর মধ্যে আছে এ ধরণের উপরের সারির কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শহর-নগর অঞ্চলে উচ্চ মুনাফার আশায় এবং নেশায় গড়ে ওঠা উচ্চ মাত্রার বাণিজ্যিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান । এর বাইরের অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে সরকারের নির্লিপ্ততাই চোখে পড়ে । এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেন সরকার যাদের নিয়ে হৈচৈ করছে সেখানে যেতে না পারা কার্যত যারা শিক্ষা থেকে ছিটকে-ঝরে এখনও পড়ে যায়নি কিন্তু দিন গুনছে সব সময় তাদেরই আশ্রয়স্থল । শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের এ নীতির সুযোগ নিয়ে সারা দেশে ব্যাঙের ছাতার মত আনাচে কানাচে গড়ে উঠছে অসংখ্য কথিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ।এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল কার্যক্রমই পরিচালনা করা হয় সরকারী যেসব কথিত নিয়ম- নীতি আছে সেগুলোরও তোয়াক্কা না করে ।ফলে এগুলো হয়ে উঠছে যার যা খুশি তাই করার এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মনে অত্যন্ত নিম্নমানের চিন্তা-চেতনা আর সংষ্কৃতি ঢুকিয়ে দেওয়ার এক একটি কেন্দ্র ।এগুলোকে সরকারী অনুমোদনপ্রাপ্ত ক্ষমতাধর এক একটি উচ্চ মুনাফার কোচিং সেন্টার ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না ।শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারগুলোর গলাবাজি ছাড়া আর যে কিছুই দেখা যায় না তার একটি প্রমাণ হলো , রাজধানীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে সরকারী প্রাথমিক , মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক স্কুল প্রায় একেবারেই প্রতিষ্ঠিত না করা ।সরকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে না তুলে সরকার বরং সরকারী জায়গা-জমি দখল করে উচ্চ মুনাফার বাণিজ্যিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ায় উৎসাহ এবং সহযোগিতা করে যাচ্ছে । সে জন্য সরকারী জমি দখল করে রাতারাতি এ ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে ।

শিক্ষার্থীদের কোচিংমুখী করার জন্য শিক্ষার এসব বেহাল দশা এবং বাণিজ্যিকীকরণতো আছেই এর সাথে আছে সরকারের পরীক্ষা নীতি এবং মূল্যায়ন নীতি ।সামগ্রিকভাবে শিক্ষাদানের দায়ীত্ব না নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতার মধ্যে ঠেলে দিয়ে শুধু বিচারকের আসনে বসাই যেন সরকারের শিক্ষা নীতি । সেকারণে শিক্ষার মান উন্নয়ন থকে নিয়ে সকল কথাই সরকার বলে থাকে ফলাফলকে কেন্দ্র করে ।আগে এগুলো বলা হতো এস.এস.সি এবং এইচ. এস.সি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে ।এখন শিক্ষার মান উন্নয়ন বিষয়ক সরকারী বাগাড়ম্বরী কথার ব্যাপ্তি বেড়েছে । সরকার আরো দুটি পাবলিক পরীক্ষা চাপিয়ে দিয়েছে । পঞ্চম এবং অষ্টম শ্রেণী শেষে আরো দুটি পাবলিক পরীক্ষার আয়োজন করা হয়েছে । গৃহ শিক্ষকের নিকট পড়া ছাড়া ব্যাচ করে প্রাইভেট পড়া বা কোচিংমূখী হওয়ার বিষয়টি নবম শ্রেণীর আগ পর্যন্ত সেরকমভাবে ছিল না ।তবে রাজধানী ঢাকাতে ভাল স্কুলে ভর্তির লড়াইকে কেন্দ্র করে প্রাথমিক পর্যায়ে ভর্তি কোচিং সেন্টার গড়ে ওঠে ।কিন্তু পঞ্চম এবং অষ্টম শ্রেণী শেষে পাবলিক পরীক্ষার আয়োজন করার পর থেকে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের কোচিং এর দিকে ঠেলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় । এ পর্যায়ে পাবলিক পরীক্ষার প্রয়োজন কতটুকু তার কোন গঠনমূলক ব্যাখ্যা সরকারের তরফ থেকে নেই । প্রতিযোগিতা ছাড়া সামগ্রিকভাবে শিক্ষার মান উন্নয়নের সরকারী কোন পদক্ষেপ নেই । প্রতিযোগিতার মধ্যে ঠেলে দিয়ে মানুষকে দিশেহারা করে তোলাই মানুষকে তার সন্তানের শিক্ষার জন্য কোচিংমুখী করে তুলেছে ।

নিম্ন মানের বই , শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্যাপক বৈষম্য ,সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যা ইচ্ছে তাই করার ক্ষমতা ,পরীক্ষার ফলাফলকেই সামগ্রিকভাবে শিক্ষার মান উন্নয়নের একমাত্র মাপকাঠি হিসাবে নির্ধারণ করা , ফলাফলের মাপকাঠিতে শুধু শিক্ষার্থীদেরই নয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্যাটাগোরাইজড করা ,সরকারের পরীক্ষা নীতি ,এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রনহীনতা উপরন্তু ক্যাটাগোরাইজেশনের নামে এসব প্রতিষ্ঠানের কোটি টাকার বিজ্ঞাপনের কাজ সরকারের তরফ থেকে করে দেওয়া , নতুন সরকারী প্রতিষ্ঠান গড়ার পরিবর্তে সরকারের পক্ষ থেকেই সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মান নিম্নগামী করার মাধ্যমে সেগুলোকে ধ্বংস করা , সরকারী ঘুষ বাণিজ্য এবং পৃষ্ঠপোষকতায় অত্যন্ত উচ্চ মুনাফাকেন্দ্রীক এবং নিয়ন্ত্রনহীন নিম্নমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে তোলা ইত্যাদিই শিক্ষাকে কোচংমূখী করে তুলেছে । এসব বিষয়ের উপর দৃষ্টি না দিয়ে এবং সঠিক পদক্ষেপ না নিয়ে শুধুমাত্র কোচিং নিয়ে মাঝে মাঝেই ফাঁকা কথা বলার অর্থ কোচিং এরই বিজ্ঞাপনী কাজ করে দেওয়া । কোচিং নিয়ে বর্তমানে সরকারী অকার্যকর ফাঁকা কথা তাই প্রমাণ করছে । ভুতে পাওয়া সর্ষে দিয়ে ভুত তাড়ানোর ফাঁকা আওয়াজই দেওয়া যায় ভুত তাড়ানো যায় না ।