ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

যাঁতা কলে ‘পিষ্ট হওয়া’ কথাটির সাথে সবাই কম-বেশি পরিচিত ।প্রাকৃতিক ঘটনাবলী যতই দুঃখজনক হোক , যতই কষ্টের হোক যেমন সাইক্লোন,টর্নেডো,জলোচ্ছ্বাস,বন্যা, খরা , সুনামি ইত্যাদিতে মানুষের জীবন যতই লন্ডভন্ড হয়ে যাক না কেন মানুষ কখনোই এসব ঘটনাকে যাঁতা কলে পিষ্ট হওয়া বলে না ।কিছু মানুষ যখন অন্য মানুষকে কতকগুলো নিয়ম চাপিয়ে হোক বা বল প্রয়োগে হোক শোষণ করে, দাবিয়ে রাখে , জীবনকে দুর্বিসহ করে তোলে , মানুষের জীবনে দম বন্ধ অবস্থা তৈরী করে তখন মানুষ জাঁতা কলে পিষ্ট হওয়ার কথা বলে। বিশেষ করে রাষ্ট্র যখন তার শোষণের সমস্ত হাতিয়ারগুলো উদ্যত করে দমনমূলক নীতির মাধ্যমে ব্যাপক অধিকাংশ মানুষকে শোষণ করে তখন মানুষ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জাঁতা কলে পিষ্ট হওয়ার কথা বলে ।এদিক দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ জাঁতা কলে পিষ্ট হয়ে চলেছে জন্মলগ্ন থেকে। ১৯৭১ সালের আগে রাষ্ট্র যন্ত্রটি ছিল অন্যদের হাতে। শোষণে জর্জরিত মানুষ ভেবেছিলেন রাষ্ট্রটিকে অন্যের কবল থেকে মুক্ত করলে সেটি আর যন্ত্র থাকবে না ।সেটি হবে মানুষের জীবন গড়ার, মানুষের মত বাঁচার এক সহায়ক প্রতিষ্ঠান ।তা’ হবে সমাজের শোষণ দূর করে সমতার এবং সকলের জন্য মর্যাদার সমাজ গঠনের ভিত্তিভূমি।

তা’ হয়নি। ১৯৭১ সালে গণমানুষের সংগ্রামে-লড়াইয়ে সকল নির্মমতা আর বীভৎসতার বিরূদ্ধে দাঁড়িয়ে বহু মানুষের জীবন উৎসর্গের মধ্যদিয়ে অন্যের হাত থেকে রাষ্ট্রটিকে মুক্ত করা হয়েছিল। রাষ্ট্রের নাম পাল্টে দেওয়া হয়েছিল বটে ।কিন্তু রাষ্ট্রটিকে ‘জনগণের’ হতে দেওয়া হয়নি । দখল করে নেওয়া হয়েছে জনগণের সংগ্রাম আর আত্নোৎসর্গকে। রাষ্ট্রটি ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’ই থেকে গিয়েছে। রাষ্ট্রটি যখন অন্যের হাতে ছিল , অন্য নামে ছিল, সে হাতের এবং নামের পরিচয়েই তার শোষণের চরিত্র বুঝা যেত ।যখন হাত বদল হয়েছে , নাম বদল হয়েছে তখন থেকে হাত এবং নামের পরিচয় থেকে তার শোষণ বুঝবার উপায় নেই । হাতের পরিচয় ভাল, নামের পরিচয়ও ভাল ।কিন্তু মানুষ-ব্যাপক অধিকাংশ মানুষ তাঁদের প্রত্যাশার কিছুই পাননি।অথচ এই মানুষগুলোই রাষ্ট্রের প্রাণস্পন্দন-রাষ্ট্রের অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখেছেন,যেমনটি রেখেছিলেন এর হাত বদল এবং নাম বদলের আগেও ।আগেও তাঁরা যেমন শোষিত-বঞ্চিত হয়েছেন এখনও তেমনই শোষিত-বঞ্চিত হচ্ছেন,তবে ভিন্ন হাতে এবং ভিন্ন নামে ।মানুষ জাঁতা কলে পিষ্ট হয়ে চলেছেন আগের মতই এবং ক্ষেত্র বিশেষে আগের চেয়েও বেশি ।কিভাবে মানুষ জাঁতা কলে পিষ্ট হয়ে আসছেন এবং হচ্ছেন তা’ ব্যাপক অধিকাংশ মানুষ তাঁদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে জানেন ।সে চিত্র তুলে ধরা এ লেখার উদ্দেশ্য নয় ।জাঁতা কলের দুই পাটের পরিচয় বর্ণনা করাই এ লেখার উদ্দেশ্য ।

যাঁতা কলের দুই পাট থাকে। প্রত্যাশা অনুযায়ি বস্তুকে পিষ্ট করার জন্য উপরের পাটকে গতিশীল থাকতে হয় ।শুধুমাত্র উপরের পাটকে গতিশীল থাকলেই চলে না। আপাতঃ বস্তু বান্ধব নীচের পাটের উপর বস্তু রাখতে হয় ।এর জন্য আবার নীচের পাটকে নড়বড়ে হলে চলবে না ।তাকে উপরের পাটের সাথে দৃঢ়তার সাথে সহ অবস্থানে থাকতে হয়।সহ অবস্থানে রাখবার জন্য বিচ্ছিন্ন দুই পাটের মধ্যে দৃঢ় দন্ড ব্যবহার করে সে ব্যবস্থা করা হয় ।শুধু এ অবস্থা হলেই চলে না নীচের পাটকে উপরের পাটের সহ অবস্থানে থাকতে হয় বটে তবে তাকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে উপরের পাটের বিরোধিতা করতে হয় ।তবেই পিষ্ট করার কার্য সিদ্ধ হয় ।

এতক্ষণ বস্তু অর্থাৎ ধান, গম ,ডাল ইত্যাদি পিষ্ট করার জাঁতা কলের বর্ণনা দেওয়া হলেও শাসক শ্রেণির মানুষকে পিষ্ট করার বা শোষণের জাঁতা কলের গঠনও অভিন্ন।এ জাঁতা কলের উপরের গতিশীল পাট সম্পর্কে মানুষ নানা সময়ে না বিভ্রান্তির মধ্যে পড়লেও তাকে চেনা যায় এ অর্থে বিভ্রান্তি অনেক কম ।অনেক সময় চিনতে ভুল হলেও অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তার পরিচয় উন্মোচিত হয়ে পড়ে ।শোষণে অর্থাৎ পিষ্ট করার কাজে এ পাট গতিশীল বলে বহু চেষ্টায়ও পরিচয় গোপন রাখা সম্ভব হয় না ।মুখোশ সহজেই খুলে পড়ে ।

বিভ্রান্তি হয় নীচের গতিহীন পাট নিয়ে । নানা কারণেই এ বিভ্রান্তি হতে পারে ।একে তো শোষণে(পিষ্ট করার কাজে) আপাত গতিহীন।তারপর আবার কার্যকলাপে (কথাবার্তায়)উপরের পাটের বা শাসক শ্রেণির বিরোধী ।এসব কারণে বিভ্রান্তি তৈরী হয় ।এ বিভ্রান্তি থেকে আবার উপরের পাট সম্পর্কেও ঘোর লাগে, মাঝে মাঝে তাদেরকেও চিনতে ভুল হয়ে যায়। শাসক শ্রেণির আধুনিক শোষণ কৌশল হল বিরোধিতার মাধ্যমে সকল শোষণকে পরিশুদ্ধ করিয়ে নেওয়া। বিরোধিতায় পরিশুদ্ধ নয় এমন শোষণ শাসক শ্রেণির জন্য বিপদের কারণ হতে পারে। তাছাড়া শোষণের যৌক্তিক একটি ভিত্তি দাঁড় করানোর জন্যও বিরোধিতার প্রয়োজন পড়ে ।জনগণের উপর কোন বাড়তি শোষণের আইন বা ফরমান জারি করতে হলে তাকে অবশ্যই বিরোধিতায় পরিশুদ্ধ হতে হয় ।তা’ না হলে জনগণের পক্ষ থেকে বিরোধিতা উঠলে সবকিছু তছনছ হয়ে যেতে পারে । সে জন্য গোপনে সহ অবস্থানে রেখে শাসক শ্রেণীকে বিরোধিতার জন্য জাঁতা কলের নীচের পাট তৈরী করতে হয় ।দুই পাটকে সহ অবস্থানে রাখবার দৃঢ় দণ্ডের কাজটি কখনোবা সুশিল সমাজ বলে কথিত লোকেরা ,কখনোবা রাষ্ট্রের স্থায়ী সংস্থাসমূহ,কখনোবা আন্তর্জাতিক মুরুব্বিরা করে থাকে ।

শাসক শ্রেণী বা জাঁতা কলের উপরের পাট যেমন নানা উপাদানে গঠিত তেমনই তাকে কার্য সিদ্ধিতে বা শোষণে স্বার্থক করতে বিরোধিতাকারী নীচের পাটও নানা উপাদানে গঠিত ।আনেক সময়ই এ উপাদানগুলোকে চিনতে ভ্রান্তি লাগে। নানা নামে এরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ।কেউবা দারিদ্র্য দূরীকরণে মহান ব্রত নিয়ে সেই নামে ,কেউবা উন্নয়নের নামে ,কেউবা গণশিক্ষা বিস্তারের নামে ,কেউ আবার শিশুশ্রমের বিরূদ্ধে সোচ্চার হয়ে ,কেউ বিশেষ মতবাদের তকমা গায়ে পরে ।এরকম অসংখ্য নামে অসংখ্য পরিচয়ে জাঁতা কলের নীচের পাটের উপাদান সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে । এরা কখনোবা একজোট হয়ে কখনোবা পালাক্রমে উপরের পাটের বিরোধিতা করে চলেছে ।সকল বিরোধিতা বিরোধিতা নয়।একটি বিজ্ঞাপনের উদাহরণ দেওয়া যাক-এক সময় ঢাকা শহরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একটি বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড দেখা যেত ।বিলবোর্ডটি আমার মনে বেশ কৌতূহল সৃষ্টি করেছে এবং ভাবিয়েছে। আপাততঃ দেখলে এর বক্তব্যকে ধূমপান বিরোধী বলে মনে হবে।এর ওপর একদল তরুণ-তরুণীর ছবি। দেখতে তারা খুবই প্রাণবন্ত এবং এসংক্রান্ত কথা লেখা আছে আর এসবের কারণ হিসাবে বলা হয়েছে তারা ধূমপান করে না ।অতি চমৎকার । এতটুকুর মধ্যে কৌতূহলের কিছু নেই । কৌতূহল সৃষ্টি হল বিজ্ঞাপন দাতার পরিচয় দেখে ।বিজ্ঞাপন দাতার পরিচয় হলো –ব্রিটিশ আমেরিকা টোব্যাকো কোম্পানি লিঃ। এ প্রতিষ্ঠানটির কাজই হল ধূমপানের সামগ্রী তৈরী করা এবং বাজারজাত করা এবং এর মধ্য দিয়ে মুনাফা করা ।যে উদ্দেশ্য থেকে এরকম একটি প্রতিষ্ঠান ধূমপানের ‘বিরূদ্ধে’ বিজ্ঞাপন প্রচার করে ঠিক একই উদ্দেশ্যে শাসক শ্রেণির আপাত বিরোধী একটি অংশ তারই সহ অবস্থানে থেকে তাদের বিভিন্ন কার্যকলাপের বিরোধিতা করে থাকে ।কিন্তু শাসক শ্রেণি ব্যাপক অধিকাংশ মানুষকে যে রাজনীতি দিয়ে দাবিয়ে রাখে এবং শোষণ করে তার বিপরীতে জনগণের রাজনীতি তো থাকতেই হবে। আর সে রাজনীতিতে ব্যাপক মানুষের পক্ষে দাঁড়াতে গেলে তো শাসক শ্রেণির সকল প্রকার নিপীড়নমূলক এবং শোষণমূলক কার্যকলাপের বিরোধিতা করতেই হবে ।তাই কে প্রকৃত বিরোধিতা করছে আর কে তাদের শোষণ পরিশুদ্ধ করার জন্য বিরোধিতা করছে বুঝা যাবে কি করে ?কারো মনের খবর তো পাওয়া মুশকিল!মুশকিল বলেই তো বহু সংখ্যককে দেখা যায় যাঁদের অনেকেই এখনও জীবিত আছেন;একসময় শোষিত-বঞ্ছিত মানুষের প্রতি ‘দয়ার্দ্র’ হয়ে তাঁদের ‘উদ্ধার’ করতে নিজেদের সহজ বর্ণাঢ্য জীবনের সুখ-শান্তি ‘ত্যাগ’ করে নিজেদের জন্য নয় সম্পূর্ণরূপে জনগণের জন্য কিছু একটা করার জন্য মাঠে নেমেছিলেন।এদের বেশিরভাগই বিশেষ মতবাদ এবং তত্ত্বকে বুকে চেপে ধরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ।কিন্তু এক সময় দেখা গেল জনগণকে উদ্ধার না করে নিজেরাই জনগণের কাঁধে চড়ে বসলেন। তাঁদের অনেকেই জাঁতা কলের উপরের পিঠে পরিণত হয়েছেন ।যাঁরা উপরের পিঠে পরিণত হয়েছেন তাঁদের তো চেনা যায়।কিন্তু নীচের পিঠকে চেনা যাবে কিভাবে?

রাজনীতি, রাজনীতিই হলো চেনার সবচেয়ে ভাল বলা চলে একমাত্র উপায় ।মানুষের জীবনের যে কোন রকমের সমস্যার বিশেষ করে সেই সব সমস্যা যা সম্পূর্ণরূপে প্রাকৃতিক নয় সমাধানের দর্শনগত ভিত্তি হলো রাজনীতি। তা সে ব্যাক্তিগত হোক আর সমষ্টিগত হোক ।আসলে সম্পূর্ণরূপে প্রাকৃতিক না হলে নিতান্তই ব্যাক্তিগত সমস্যা বলে কিছু থাকতে পারে না ।তাই রাজনীতি মানুষের জীবনের সাথে দর্শনগত ভাবেই যুক্ত। দর্শনগত ভাবে রাজনীতি দুই রকমের । এক হলো কোন একটি স্থান-কালের সমাজের বা গোটা মানব সমাজের সমস্যাকে সমন্বিতভাবে না দেখে ব্যাক্তিগত বা গোষ্ঠীগতভাবে সমস্যাকে দেখা এবং সে লক্ষ্যেই তা সমাধান করার রাজনীতি। অনিবার্যভাবেই এ রাজনীতিতে ব্যাপক অধিকাংশের শোষণই হয়ে ওঠে ব্যাক্তিগত,গোষ্ঠীগত বা শ্রেণীগত সমস্যা সমাধানের উপায় ।আমরা এখন যে উপায়ের সাথে পরিচিত এবং যার দ্বারা আক্রান্ত ।অপর রাজনীতি হলো কোন নির্দিষ্ট স্থান-কালের সমাজের এবং ব্যাপক অর্থে গোটা মানব সমাজের সমস্যাকে সমন্বিত করে দেখা এবং সমন্বিতভাবে তার সমাধানের রাজনীতি। যা’ হলো দর্শনগত ভাবে ব্যাপক অধিকাংশের রাজনীতি ।

দর্শনগত এবং মূলগতভাবে রাজনীতি এই দুই ধরণের হলেও লক্ষ্য বাস্তবায়নের কর্মপদ্ধতি উভয় রাজনীতির ক্ষেত্রে আনেক । শ্রেণি স্বার্থের রাজনীতির শোষণ এক সময় ছিল খুবই সরাসরি । এই শোষণের জন্য জনগণকে দাবিয়ে রাখার জন্য মুখোশে ঢাকা কোন কৌশল ছিল না । ফলে নির্মমতা খুবই চোখে পড়ত ।সংখ্যা গরিষ্ঠ তাতে বিক্ষুব্ধ হতেন , বিদ্রোহ করতেন। যা ছিল শ্রেণি স্বার্থের রাজনীতির জন্য হুমকি এবং বিপদজনক। ফলে শ্রেণীগত ঐক্যের এবং সমন্বয়ের প্রয়োজন পড়ে। সে সমন্বয়েরই আরেক নাম গণতন্ত্র ।আসলে শ্রেণি বিভক্ত সমাজে গণতন্ত্র রাজনীতির কোন মৌলিক ধরণ নয় ।আমরা যে গণতন্ত্রের সাথে পরিচিত তা একই শ্রেণির মধ্যে ক্ষমতার বন্টন এবং হাতবদলের উপায় মাত্র ।বাংলাদেশে এই পদ্ধতি পরিপক্কতা পায়নি। তাই প্রায়ই একই শ্রেণির লোকদের মধ্যে অপরিপক্ক ঝগড়া দেখা যায় । তবে শ্রেণি শোষণ জারি রাখার জন্য , জনগণের বিক্ষোভ –বিদ্রোহকে পাশ কাটাতে তাদের মধ্যকার পরিপক্ক ঝগড়ার প্রয়োজন আছে।সেদিক দিয়ে তাদের মধ্যকার ঝগড়া তাদের প্রয়োজনেই তারা করে থাকে। এখানকার সকল শ্রেণির বিকাশের দিকে না তাকালে এসব ঝগড়াকে অপরিপক্ক বলে মনে হতে পারে কিন্তু শ্রেণীগুলোর বিকাশের দিক দিয়ে দেখলে আর তা মনে হবে না ।

শাসক শ্রেণির শ্রেণি স্বার্থের গণতন্ত্রকে ‘গণতন্ত্র’রূপে চেনাতে জাঁতা কলের নিচের পাটের লোকেরা জনগণকে ভ্রমে ফেলে দেন ।তাঁদের আক্ষেপটা শুধু এই যে ,ভোট দিয়েও গণতন্ত্র পাওয়া গেল না !গণতন্ত্র কিভাবে পাওয়া যাবে? দর্শনগতভাবে গণতন্ত্র তো রাজনীতির কোন মৌলিক ধরণ নয়।তা সে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র এবং শিক্ষকগণ যতই গণতন্ত্রের সংজ্ঞা মুখস্ত করুন না কেন ।জাঁতা কলের উপরের পাটের দ্বারা বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। উপরের পাট দ্বারা নীচের পাট তৈরীই জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য ।

শাসক শ্রেণির রাজনীতিতে প্রভাব আছে অথচ রাজনৈতিক পরিচয়দানে অক্ষম বিশিষ্টজন,সুশীল সমাজ বলে পরিচয়দানকারী সংগঠন,শ্রেণি রাজনীতির পরিচয়দানে অক্ষম সকল স্বেচ্ছাসেবামূলক সংগঠন,রাজনৈতিক লক্ষ্যবিহীন বিভিন্ন সংগঠন, টেলিভিশনের টক শোতে রাজনৈতিক পরিচয় দানে অক্ষম ব্যাক্তির শাসক শ্রেণির রাজনৈতিক পরিচয় বহনকারী লোকের সাথে তুমুল বিতর্ককারী, রাজনীতির সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে শাসক শ্রেণির কোন অংশের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকা সংগঠনসহ আরো অনেক উপাদান দিয়ে জাঁতা কলের নিচের পাট গঠিত।এসব অবস্থান থেকে শাসক শ্রেণির কোন কাজের বিরোধিতা করার শেষ অর্থ দাঁড়ায় সেই কাজকে পরিশুদ্ধ করা। এসব বিরোধিতাকারীগণ বা সংগঠনসমূহ বুঝেই হোক বা না বুঝে হোক জনগণকে পিষ্ট করার জাঁতা কলের নিচের পাটে পরিণত হন ।

শাসক শ্রেণি প্রণীত কোন গণবিরোধী আইন,জনগণের জীবনযাপনের ব্যয় বৃদ্ধিসহ শোষণের ফর্মুলা তৈরীর প্রাক্কালেই জাঁতা কলের নীচের পাটের বিরোধিতা চোখে পড়ে ।এসব বিরোধিতা ঐসব ফর্মুলা পাকা না হওয়া পর্যন্ত চলে।অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে বসে শাসক শ্রেণির লোকদের নিয়ে তুমুল বাকবিতন্ডা হতে দেখা যায়। এসব বাকবিতণ্ডায় শেষ পর্যন্ত শাসক শ্রেণির লোকদের জয়ী করানো হয় ।এ যেন ম্যাচ পাতানো খেলার মত ।রাজনৈতিক পরিচয়দানে অক্ষম অর্থনীতিবিদ,সমাজ বিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, নানা নামের গবেষক এবং নানা নামের সংগঠন এসব বাকবিতণ্ডায় অংশগ্রহন করে থাকেন ।এসব বাকবিতন্ডা সকলই শেষ পর্যন্ত সিগারেটের প্যাকেটের গায়ে লেখা- ‘ধূমপানে মৃত্যু হয়’ জাতীয় অর্থহীন বিরোধিতায় পরিণত হয় ।আসলে অর্থহীন হয় জনগণের দিক দিয়ে দেখলে। কার্যত সিগারেটের প্যাকেটের গায়ে লেখা বা এদের বিরোধিতা কোনটাই অর্থহীন নয় ।এসবের অর্থ বুঝা যাবে জাঁতা কলের নিচের পাটের কার্যনীতি থেকে ।আজকাল শাসক শ্রেণির বহু শোষণমূলক নীতি বাস্তবায়নে বা জনগণের উপর বিনা বিক্ষোভে বা বিনা বিদ্রোহে চাপিয়ে দিতে এ এক কার্যকরী কৌশল ।স্থানীয়ভাবে বিতর্কের আয়োজন করা হয় ,আলোচনার আয়োজন করা হয় । আয়োজন করা হয় টেলিভিশনে, নানা নামের গোলটেবিলে ।

রাজনৈতিক পরিচয়ের জন্য কাউকে সাংগঠনিক পরিচয় দিতে হবে বা থাকতে হবে এমন নয় ।কিন্তু রাজনৈতিক দর্শনের পরিচয় অবশ্যই থাকতে হবে ।কারণ শাসক শ্রেণির কোন শোষণমূলক নীতির বিরোধিতা যদি জনগণের পক্ষে হয় তবে অবশ্যই জনগণের পক্ষের রাজনীতিই হবে তার চালিকা শক্তি। তাই দর্শনগত ভাবে তাঁকে সেই রাজনৈতিক পরিচয় অবশ্যই দিতে হবে । এখানে ‘আমি কোন পক্ষ নই,আমি ভাল মানুষ’ মার্কা পরিচয়ে বাকবিতণ্ডায় হেরে যাওয়া বা ক্ষান্ত দেওয়া পাতানো ম্যাচ খেলে নিজে জাঁতা কলের নিচের পাটে পরিণত হওয়া ছাড়া আর কিছু নয়। রাজনৈতিক পরিচয়ে বিতর্কে হারা বলে কিছু নেই ,তখন আর সেটা বিতর্ক থাকে না জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে পরিণত হয় । অধিকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত সে লড়াইয়ের শেষ বলেও কিছু থাকে না ।জনগণের যে কোন অধিকার অর্জনের লড়াইয়ে বিজয় লাভের ক্ষেত্রে জাঁতা কলের নিচের পাট চেনা অত্যন্ত জরুরী।