ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

ব্যথা যখন স্নায়ূকে ছাড়িয়ে যায় তখন প্রাণবায়ু থাকলেও তা আর অনুভবে ধরা পড়ে না ।অসামঞ্জস্যতা আর উদ্ভটত্বের বোধও তেমনই ।সামঞ্জস্যতার মাঝে অসামঞ্জস্যতা ধরা পড়ে ।যখন সবকিছুই অসামঞ্জস্যতা আর উদ্ভটত্বের মধ্যে নিমজ্জিত তখন কোন্ বোধে তাকে চেনা যাবে ?তখন বোধ-অনুভব যেন বিবর্তিত হতে শুরু করে ।কবি শামছুর রাহমান লিখেছিলেন “ উদ্ভট এক উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ”। তিনি যখন লিখেছিলেন তখন হয়তো উদ্ভট উটটিকে দেখা যাচ্ছিল।এখন সেই উদ্ভট উট এতই গতিশীল এবং এতই বিচিত্র তার অবয়ব যে, তাকে আর দেখাও যায় না এবং চেনাও যায় না ।

অন্য সকল ক্ষেত্রের উদ্ভটত্ব নিয়ে মানুষকে কিছু কথা বলতে শোনা যায় । তাই অনুমান করা যায় এসব ক্ষেত্রে উদ্ভটত্ব হয়তো এখনও কিছু কিছু বোধে ধরা পড়ে ।কিন্তু একটি ক্ষেত্রে একেবারে নিশ্চুপ অবস্থা । কোন রকমেই যেন বোধে ধরা পড়ে না । সেটি হলো শিক্ষা ক্ষেত্র ।বিশেষ করে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে যে অসামঞ্জস্য এবং উদ্ভটত্ব চলছে তা নিয়ে যেন কারো কোন মাথা ব্যথাই নেই!শিক্ষা নিয়ে এমনিতেই আমাদের মাথাওয়ালাদের মাথা ব্যথাটা যেন বরাবরই কম !তারপর আবার ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে ভাববার মত ছোটখাটো মাথা ‘সারা বিশ্বের বিস্ময়’এর এ দেশে খুবই কম ।তাইতো বড় বড় বিষয় নিয়ে ভাবনার এবং কথা বলার মানুষের সংখ্যা নিতান্তই কম না হলেও ছোটখাটো বিষয় নিয়ে কথা বলার লোক খুঁজে পাওয়া ভার ।তাইতো এদেশের পন্ডিত মাথাওয়ালাদের দেখা যায় বঙ্গ সন্তানকে যোগ শেখানো আর সংখ্যা লিখনের দায়ীত্ব না নিয়েই বড় বড় সমীকরণ ফেরি করে ‘নিউরনে অনুরণন’ তুলে বেড়াতে ! মজাই আলাদা!!শিক্ষা নিয়ে কথা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিচে নামে না ।পাছে আবার মানুষ পান্ডিত্য নিয়ে ভুল বুঝে ফেলে !
আসলেইতো প্রাথমিক- মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা নিয়ে কথা বলার জন্য পান্ডিত্যের প্রয়োজন কি ?ওরা উঠুক না অমন সেই উচ্চতায় যেখানে পন্ডিতদের নজর বরাবর যায় , তা’ নিচের দিকে ফেলার তকলিফ পোহাতে হয় না!বড়জোর তাঁরা মন্ত্রীমহাশয়ের শিক্ষার উন্নয়ন চিত্রে তাঁর বিশাল বুকের মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের শুকিয়ে যাওয়া বুক কিভাবে গুমরে কাঁদে তাই দেখে আপ্লুত হতে পারেন !
এসব কথা এ কারণে বলা যে, প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষা নিয়ে যে উদ্ভট কর্মকান্ড চলছে এদেশের পন্ডিতগণ যদি সেদিকে একটু দৃষ্টি দেওয়ার কষ্ট করতেন তা হলে এমন উদ্ভট কর্মকান্ড কখনোই চলতে পারত না ।এসব ক্ষেত্রে শেখানোর নীতি হলো বাচ্চাদের মাথায় পেরেক ঠুকে ‘জ্ঞান’ ঢুকানোর নীতি ।মাথায় পেরেক ঠুকে জ্ঞান ঢুকানোর চেয়ে অজ্ঞানই করা যায় ভাল। আসলে হচ্ছেও তাই । জ্ঞানের বহরে আমাদের বাচ্চারা আজ সবই প্রায় অজ্ঞান !সেখানে সাধারণ বিচার বোধ বলে আর কিছুই থাকছে না ।সরকার মুখে যাই বলুক বা লিখে যাই প্রকাশ করুক কার্যকলাপে তার যে শিক্ষানীতি দেখা যাচ্ছে বিশেষ করে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে ,তা হলো বাচ্চাদের মাথায় কোন রকম প্রশ্ন আসার সুযোগ না দেওয়া ।আর এ নীতি কার্যকর করার এক মাত্র উপায় হলো তাদেরকে অধিন, পরাধীন এবং প্রচন্ড চাপের মধ্যে রাখা । কার্যত চাপ নীতিই হলো বাংলাদেশের শিক্ষানীতি ।এখানে বাচ্চাদের শিক্ষায় কোন আনন্দ নাই ।তাই কোন প্রশ্নও নাই । কারণ গ্রহন করার জন্য প্রশ্ন কখনোই নিরানন্দের মধ্যে হতে পারে না , মাথায় আসার কোন সুযোগ থাকে না ।
প্রশ্ন করে শেখার আনন্দ বাচ্চারা কিভাবে পাবে ?যেখানে শুরুটাই হয় লাভ-ক্ষতির হিসাব দিয়ে ।পরবর্তী জীবনে লাভতো বটেই শিক্ষা জীবনেও কোন্ তৈরী প্রশ্নের উত্তর পড়লে পরীক্ষায় ফলাফলের ‘লাভ’ ভাল হবে , কোন্ সব বিষয় বাদ দিলে পরীক্ষার ফলে কোন ক্ষতি নেই এসব আগেকার দিনে শিক্ষার্থীরা কিছুদুর যাওয়ার পর থেকে শুরু করলেও এখন তা শুরু করতে হচ্ছে প্রাথমিক পর্যায়েরও একবারে শুরু থেকে ।পরীক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাশ-ফেলের খড়গের তলায় বাচ্চাদের মাথাটা চেপে ধরা হচ্ছে একেবারেই শুরু থেকে । যে সব দেশে রাষ্ট্র তার জনগণের শিক্ষাকে একটুখানি নিশ্চিত করতে চায় সেসব দেশে যখন এ পর্যায়ে কোন রকমের পরীক্ষার ব্যবস্থাই রাখা হয় না ।বাচ্চাদের শেখা ও শেখানোর জন্য পরীক্ষার গুরুত্ব কতখানি ?পরীক্ষার চাপে একটা পর্যায় পর্যন্ত বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায় পর্যন্ত বাচ্চারা কি পরাধীন হয়ে যায় না ? তারা কি স্বাধীন থাকতে পারে ? আর স্বাধীন থাকতে না পারলে কি কারো শেখার জন্য বা গ্রহনের জন্য মাথায় কোন প্রশ্ন আসতে পারে ? লাভ-ক্ষতির হিসাব দিয়ে , প্রতিযোগিতার ফর্মূলা বাতলিয়ে বাচ্চাদের পরীক্ষায় ভাল করায় উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে কিন্তু শেখায় আগ্রহী করে তোলা যায় কি ?
একটা সময় পর্যন্ত প্রাথমিক পর্যায়ে শুরু থেকে বিদ্যালয়গুলোতে অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা হত।যদিও এ পর্যায়ে পরীক্ষা রাষ্ট্রের জনগণের শিক্ষার দায়ীত্ব এড়ানোর কৌশল তবুও তা অন্ততঃ বিদ্যালয়গুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল ।যে সব রাষ্ট্র জনগণের শিক্ষার দায়ীত্ব যে মাত্রায় এড়িয়ে যেতে চায় না সেসব রাষ্ট্রে এসব পর্যায়ের পরীক্ষা সেই মাত্রায় শিথিল এবং বিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ সেই মাত্রায় আনন্দদায়ক ।এ্ জনগোষ্টি যখন বিদেশীদের শাসনাধীনে ছিল তখনও সেই বিদেশী অগণতান্ত্রিক শাসকেরা জনগণের শিক্ষার দায়ীত্বকে এমনভাবে এড়িয়ে যায়নি যেমনভাবে এখন দেশীয় ‘গণতান্ত্রিক’ শাসকেরা ধোকাবাজির মাধ্যমে তা এড়িয়ে যাচ্ছেন ।জনগণের শিক্ষার দায়ীত্ব এড়িয়ে যাওয়ার জন্য ধোকাবাজি বহু বিচিত্র পথে ঘটছে ।প্রাথমিক পর্যায়ে বিনামূল্যে বই দেওয়া নিয়ে শিক্ষা কর্তাব্যাক্তি এমনভাবে কথা বলেন যেন এসবের টাকা জনগণের নয় , যেন কোন জমিদারি থেকে নিয়ে আসা টাকায় এসব করা হচ্ছে !শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়তো এর ফিরিস্তি দিতে জনগণের টাকায় অফসেট কাগজে রঙিন ছবি সংবলিত বই-ই ছেপে ছাড়লেন!সে বইয়ের মধ্যে আবার তিনি একসময় ছাত্র রাজনীতি করতেন সেই ছবিও শোভা বর্ধন করছে! ‘সততার’ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ মন্ত্রীমহোদয় বিনামূল্যে বই বিতরনের জন্য মেলা করেন!এসব উদ্ভটত্ব হার মানে যখন বাচ্চাদের সেই বইয়ের দিকে তাকানো যায় ।বইয়ে রঙিন ছবির নামে যা দেওয়া হয়েছে তার দিকে তাকানো যায় না ,কষ্ট করে তাকালে তা মনে কোন আনন্দের ভাব আনে না ।দুই মাস না যেতে বইয়ের পৃষ্ঠাগুলো হাওয়ায় ভেসে যেতে চায় পৃথিবীর মহাকর্ষের টান উপেক্ষা করে , এমনই তার বাঁধাই !এসবকেও হার মানায় যখন বইয়ের পাতায় পাতায় তাকালে অসংখ্য ভুল চোখে পড়ে ।ভুলের তোয়াক্কা শিক্ষানীতির মধ্যে নেই । সেজন্য বইয়ে যদি ভুল থাকে শিক্ষকগণ পরীক্ষায় সেটাই লিখতে বলেন ।তা না হলে পরীক্ষায় নম্বর পাওয়া যাবে না ।এখানে শিক্ষার নিয়ত হলো পরীক্ষা পর্যন্ত ।তারপর শিক্ষা তামাদি হয়ে যায়! ‘পড়ে ভুলে গিয়ে যা’ অবশেষ থাকে’ এ শিক্ষানীতিতে শিক্ষার সংজ্ঞা তা’ নয় ।এখানে শিক্ষার সংজ্ঞা হলো ‘কু-যুক্তি , কু-তর্ক আর অসার পান্ডিত্য ফাটিয়ে স্বার্থসিদ্ধির জন্য শিক্ষিতের খাতায় নাম পাড়ানো’।মানুষের সমাজ , প্রকৃতি ,বিশ্বজগৎ বুঝতে পারা এবং সে সৌন্দর্য্যে সৌন্দর্য্য সৃষ্টির লক্ষ্য এ শিক্ষানীতির নয় ।তাই পরীক্ষার ফলাফলই এ শিক্ষানীতির শেষ ঠিকানা ।সে জন্য পরীক্ষা নিয়েই এ নীতির সকল কথা , সকল আয়োজন ।তাতে সুবিধা অনেক। অন্ধ মনিবের(জনগণ)পাতে বসে চতুর বিড়াল(শাসক শ্রেণি)বিনা ঝুঁকিতে নিরাপদে সব মাছটুকু খেয়ে যেতে পারে অবাধে ।
বিদ্যালয়ের দিকে তাকিয়ে দেখুন সেখানে কোন খেলার মাঠ নাই ।মফস্বলে কিছু থাকলেও যা’ আবার দিনে দিনে নিঃশেষ হয়ে চলেছে,রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরগুলোতেতো নেই-ই ।রাস্তা শেষেই বিল্ডিং । বিজ্ঞাপনে প্রকাশ তার আবার কোন কোনটি এসি(AC)করা ।সেসব বিল্ডিংয়ে বাচ্চাদের ঢুকিয়ে নিয়ে মাথায় পেরেক ঠুকে যা’ ঢুকিয়ে দেওয়া হয় তাকে আর যাকিছুই বলা হোক না কেন শিক্ষা বলা যায় না ।এসব শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বাস্তব কান্ডজ্ঞান কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় , সমাজ সম্পর্কে , প্রকৃতি সম্পর্কে , বিশ্বজগৎ সম্পর্কে কি বাস্তব জ্ঞান তৈরী হয় তার প্রমাণ নানাভাবে পাওয়া যায় ।বেশ কয়েকটি পরীক্ষার দৌড় দৌড়িয়ে এক পর্যায়ে গিয়ে শিখতে হয় একের সাথে এক যোগে দশ হয় !দৌড়ের মধ্যদিয়ে শিক্ষার্থী এতটুকু কান্ডজ্ঞান শিখতে অক্ষম হয় যে, একের সাথে এক যোগ করলে সব সময় দুই-ই হয় কিন্তু দুই লেখার প্রতীক-পদ্ধতি অনেক রকম হতে পারে ।দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে বাচ্চাদের জ্যামিতি পড়ানো এবং শেখনো(?) শুরু হয়ে যায় । অথচ অনেক দৌড় সম্পন্ন করে পরিশ্রান্ত সে যখন একদিন জানতে পারে ঘুর্ণনের পরিমাপ হলো কোণ , তখন সে অবাক হওয়ার ক্ষমতাও আর রাখে না শুধু ফ্যাল-ফ্যাল করে তাকিয়ে ভাবে যে, এই সহজ কথাটি এতদিন তাদের যেসব বই পড়ানো হলো তাতেতো ছিল না !শিক্ষার মধ্যকার বড় বড় ফাঁক আর বড় বড় ধোঁকাবাজি আড়াল করার জন্য বড় বড় আওয়াজ দিতে হয় , সাইনবোর্ড লটকাতে হয় । এরকমই এক আওয়াজ পরীক্ষার প্রশ্নের নাম ‘সৃজণশীল’ দেওয়া ।সৃজনশীল পদ্ধতি নামে আলাদা কোন পদ্ধতি পৃথিবীর আর কোথায়ও আছে কিনা তা গবেষণার বিষয় হতে পারে ।কারণ, শিক্ষা যদি তা শিক্ষা হয় তাতো এমনিতেই সৃজনশীল । প্রশ্ন পত্র প্রণয়নকে সৃজনশীল নাম দেওয়া শিক্ষার মধ্যকার ফাঁক আর ধোঁকাবাজিকে আড়াল করতে গিয়ে ফাঁস করে দেওয়া ।সত্য আড়াল করতে গেলে তা’ এমন করেই ফাঁস হয়ে যায় !শিক্ষাদান ঠিকঠাক মত হলে প্রশ্ন প্রণয়ন পদ্ধতি বিচিত্র উপায়ে হতে পারে । তার জন্য এভাবে গালভরা নাম দেওয়ার কি অর্থ থাকতে পারে ?এমন নির্দিষ্ট করে দেওয়া হলে নাম সে যাই হোক না কেন সেটা অসৃজনশীল হতে বাধ্য ।হচ্ছেও তাই এবং ভবিষ্যতে আরো হবে ।
এসব বাগাড়ম্বরের মধ্যে এখন প্রাথমিক পর্যায়েই দুই দুটি পাবলিক পরীক্ষার আয়োজন করা হয়েছে ।তার মধ্যে আবার একটি নেওয়া হচ্ছে তাদেরই তৈরী শিক্ষানীতির স্পষ্ট লংঘন করে ।এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় হয় সরকারের তৈরী শিক্ষানীতি মানেন না অথবা সরকারের নীতিই এমন যে জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য লিখত নীতি হবে এক এবং কার্যকরী নীতি হবে আরেক ।বর্তমানে পঞ্চম শ্রেণি শেষে ‘সমাপনী’পরীক্ষা নামে জাতীয় পর্যায়ে একটি পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে । এ পরীক্ষার গুণাগুন বর্ণনা করতে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রী একাধিকবার বলেছেন ‘এর ফলে শিক্ষার মান বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ঝরে পড়া হ্রাস পেয়েছে’।যেখানে এ পর্যায়ে জাতীয়ভাবে এমন একটি পরীক্ষার কথা তাদেরই তৈরী শিক্ষানীতির মধ্যে নাই ।শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রসঙ্গে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এ উল্লেখ আছে –‘পঞ্চম শ্রেণি শেষে উপজেলা /পৌরসভা/ থানা(বড় বড় শহর)পর্যায়ে সকলের জন্য অভিন্ন প্রশ্নপত্রে সমাপনী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে’।পঞ্চম শ্রেণি শেষে পরীক্ষার নাম সমাপনী দেওয়া ,যেখানে এ শিক্ষানীতিতেই প্রাথমিক পর্যায়কে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বলা হয়েছে ;এ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারত ।প্রশ্ন উঠতে পারত উল্লেখিত উপজেলা /পৌরসভা/ থানা(বড় বড় শহর)পর্যায়ে এ পরীক্ষা নেওয়া নিয়ে ।যদিও এ পরীক্ষা উল্লেখিত পর্যায়ের অভিন্ন প্রশ্নপত্রে স্ব স্ব বিদ্যালয়গুলোই পরিচালনা করবে নাকি ঐ পর্যায়ে তা সামগ্রিকভাবে পরিচালিত হবে তার কোন সুষ্পষ্ট উল্লেখ নেই ।যেমনটি স্পষ্ট করে বলা হয়েছে অষ্টম শ্রেণি শেষে অনুষ্ঠিত পাবলিক পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবোর্ড দ্বারা পরিচালিত হবে ।এ থেকে ধরে নেওয়া যায় শিক্ষানীতিতে যা বলা হয়েছে তার অর্থ দাঁড়ায় শুধু মাত্র ঐ পর্যায়গুলিতে অভিন্ন প্রশ্ন পত্র প্রণীত হবে কিন্তু পরীক্ষা পরিচালনা করবে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় ।এখন প্রশ্ন হলো সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় তাদের নিজ নিজ শিক্ষার্থী মূল্যায়ন করলে তা পক্ষপাতহীন বা ন্যায্য হবে কিনা ।একথার জবাবে বলা যায় এমন প্রশ্ন যেখানে উঠতে পারে সেখানে শিক্ষায় কতখানি ফাঁক এবং ধোঁকাবাজি আছে এবং সেখানকার শিক্ষার দশা কি তা বুঝতে আর অসুবিধা হওয়ার কথা নয় ।যাঁর কাছ থেকে একটি শিশু শিক্ষা গ্রহন করছে তিনি সেই শিশুর শিক্ষা মূল্যায়নে পক্ষপাতহীন থাকবেন না এমন ভাবনা ভাবায় যে বাস্তবতা সে বাস্তবতা এ ক্ষেত্রে এক বিরাট ভয়াবহতাকেই দেখিয়ে দেয় ।এতকালতো তাই হয়ে এসেছে । তাও আবার এতকাল প্রাথমিক পর্যায় পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ছিল ।এর পর একজন শিক্ষার্থীকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হতো ।সেক্ষেত্রে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দেওয়া সার্টিফিকেটেইতো তা চলতে পারত এবং চলে আসছিল । এ নিয়েতো কেউ কখনো প্রশ্ন তোলেননি বা সন্দেহ পোষণ করেননি।তাহলে এখন সেই শিক্ষকদের মর্যাদার জমিন থেকে কে সরিয়ে দিল যার ফল এই দাঁড়াল যে ,শিক্ষক কর্তৃক প্রদানকৃত এ পর্যায়ের একটি সার্টিফিকেটের ওজন এমনই কমে গেল যাতে তার ওজন বাড়ানোর জন্য বিদ্যালয়ের বাইরে থেকে তা সংগ্রহ করতে হবে?এমন আরো অনেক প্রশ্ন উঠতে পারে বলে শিক্ষানীতির মধ্যে পরীক্ষা পরিচালনার কথা স্পষ্ট করে বলা হয়নি । আর এ কারণেই শিক্ষানীতি অনুসারে এ পর্যায়ের সার্টিফিকেট বিদ্যালয় কর্তৃক দেওয়ারই ইঙ্গিত পাওয়া যায় ।
এসবের কোনকিছুর তোয়াক্কা না করে এবং সরকারী শিক্ষানীতির সুষ্পষ্ট লংঘন করে এখন পঞ্চম শ্রেণি শেষে জাতীয় পর্যায়ে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে !নিজেদেরই তৈরী শিক্ষানীতিকে উপেক্ষা করে এমন একটি পরীক্ষার পক্ষে শিক্ষামন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে অদ্ভুৎ অদ্ভুৎ সব কথা বলেছেন । তিনি বলেছেন এ পরীক্ষা নেওয়ার ফলে শিক্ষার মান বেড়েছে ।তাঁকে বিনয়ের সাথে প্রশ্ন করা যেতে পারে পর্যায়টা একবার ভাবুন, প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার মান কি পরীক্ষার ফল দ্বারা নির্ণীত হবে?এ পর্যায়ে একটি সার্টিফিকেট এই জন্য প্রয়োজন পড়তে পারে যে, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গেলে তা’ হবে তার পরিচয় ।এখনতো সেটাও আর প্রয়োজন পড়ার কথা নয় । কারণ প্রাথমিক পর্যায়কে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করা হয়েছে ।তারপর যদি ধরেও নেওয়া হয় যে ,প্রাথমিক পর্যায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করা হলেও এখনো অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে অনেককে অন্য মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যেতে হয় ,তাহলেও বলা যায় সে ক্ষেত্রে এতকাল যা’ হয়ে আসছিল তাতে সমস্যা কোথায়?এ পরীক্ষা নেওয়ার পক্ষে বাকি থাকে একটি যুক্তি ।তা হলো পঞ্চম শ্রেণি শেষে যারা ঝরে পড়বে তাদের জন্য এ সার্টিফিকেট মহামূল্যবান হতে পারবে!এ যুক্তি দিলে এপর্যায়ে ঝরে পড়া যেমন স্বীকার করে নেওয়া হয় তেমনই দায় এড়ানোর ব্যবস্থাও করা হয় ।অবশ্য এ পরীক্ষা নেওয়ার পক্ষে শিক্ষামন্ত্রী এ যুক্তি দিচ্ছেন না ।বরং তিনি উল্টো কথাই বলেছেন ।তিনি বলেছেন এ পরীক্ষার ফলে ঝরে পড়ার হার কমে গিয়েছে। এ ধরণের যে কোন কথার পক্ষে দুটি বিষয় যুক্তি হিসাবে উপস্থাপিত হতে পারে, একটি বিষয় হলো তথ্য-উপাত্ত অপর বিষয় হলো বিচারবোধ ।এ ধরনের জরীপ কখন কার পক্ষ থেকে করা হয়েছে তা আমাদের জানা নেই ।কাজেই জরিপের ভিত্তিতে শিক্ষামন্ত্রী এ দাবি করেননি ।তাহলে বাকি থাকে বিচারবোধ।যারা ঝরে পড়বে না তাদের জন্য এ সার্টিফিকেট কতটা গুরুত্বপূর্ণ?তাহলে এর দ্বারা ঝরে পড়া কমবে কি করে ?তাহলে কি তিনি পঞ্চম শ্রেণিরও আগের ঝরে পড়ার কথা বুঝিয়েছেন?তার মানে দমটা যাতে পঞ্চম শ্রেণি শেষে ছাড়ে সেই ব্যবস্থাই করা হয়েছে!সেই জন্যই হয়তোবা মনের কোণের সত্যটি বা অভিলাষ বা বাসনা যাই বলা হোক না কেন ঝরে পড়েছে এ পরীক্ষাটির ‘সমাপনী’ নামে ।অনেক ধোঁকাবাজির নিচে চাপা দিলেও সত্য চাপা পড়ে না তা এভাবেই ভেসে ওঠে ।কোন পরীক্ষার নাম ‘সমাপনী’ আছে বলে আমাদের জানা নেই ।অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষার পর্যায় বা ধাপ নির্ধারণের পরও পঞ্চম শ্রেণি শেষে জাতীয় পর্যায়ে পরীক্ষা নেওয়া এবং তার নাম ‘সমাপনী’ রাখার মাধ্যমে সরকারের কোন্ গোপন অভিলাষ সত্যরূপে ভাসিয়ে তুলছে?
পঞ্চম শ্রেণি,যখন পরীক্ষাকেন্দ্রীক পড়ালেখা বাচ্চাদের না বুঝালেই ভাল, সেখানেই ‘সমাপনী’ নাম দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে পরীক্ষার আয়োজন করে ছোট ছোট বাচ্চাদের এক পাবলিক পরীক্ষার মধ্যে নিক্ষেপ করা জনশিক্ষার পক্ষের কোন কারণে নয় ।এ কাজ সরকার দুটি কারণে করছে ।একটি হলো রাজনৈতিক এবং অপরটি বাণিজ্যিক ।রাজনৈতিক এ কারণে যে ,ঝরে পড়াতে সরকারগুলোর অন্য কোন অসুবিধা না থাকলেও ভোটের রাজনীতির জন্য অসুবিধা আছে ।আবার ঝরে পড়া নিরসনও সরকারের কাম্য নয় । সেখানেও সরকারের অসুবিধা আছে ।এ শুধু এ সরকারের নয় শাসক শ্রেণির সব সরকারের জন্যই বটে ।এর একটি ধোঁকাবাজি সমাধান সরকারগুলোর জন্য প্রয়োজন ।এ কারণেই জনশিক্ষা সম্পর্কে নিজেদের কথার দায়কে অসার ‘ওজনদার’ সার্টিফিকেটের নিচে চাপা দেওয়ার জন্য এমন একটি পরীক্ষা নিয়ে বাগাড়ম্বর এবং এর আয়োজন করা হয় ।এতো গেল ঝরে পড়াদের নিয়ে রাজনীতির বিষয় যারা টিকে থাকল তাদের ক্ষেত্রেও এ পরীক্ষার রাজনীতি আছে ।সে রাজনীতি শিক্ষা দর্শনের রাজনীতি ।শিক্ষার লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য শুধুমাত্র পরীক্ষাকেন্দ্রীক করা হলে শিক্ষার দর্শন সম্পূর্ণরূপে বদলে যায় ।যে দর্শন একজন শিক্ষার্থীকে স্বার্থপরতা এবং লাভের দিকেই তাড়িত করে ।শিক্ষার এমন দর্শনই শাসক শ্রেণির জন্য সুবিধাজনক । এই দর্শনের বাইরে ছিটেফোটাও যাতে আর কিছু না থাকে সে কারণেই এত অল্প বয়স থেকেই শিক্ষাকে সম্পূর্ণরূপে পরীক্ষামূখী করে তোলার জন্যই এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে ।
রাজনৈতিক দিকের সাথে সাথে বাণিজ্যিক দিকও এ পর্যায়ের পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তের পিছনের গুরুত্বপূর্ণ কারণ ।একথা সবাই মানবেন যে, যত পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় তার মেধ্যে পঞ্চম শ্রেণি শেষে প্রাথমিক ‘সমাপনী’ পরীক্ষায় শিক্ষার্থী সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ।এত বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থীকে ঘিরে এমন এক অসার পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে অনেক রকমের ব্যবসায় শুরু হয়েছে ।এ ব্যবসার মধ্যে সবচেয়ে রমরমা হলো গাইড , টেস্ট পেপারস,সাজেসন্স ,সুপার সাজেসন্স ইত্যাদির ব্যবসা ।সকল শিক্ষার্থীকে এসব এক বা একাধিক গাইড কিনতে বাধ্য হতে হচ্ছে ।বিদ্যালয়ের চাপসহ নানা কারণেই তাদের এসব ক্রয় করতে হচ্ছে । তার মধ্যে এসব গাইডের কোন কোনটিতে সমাপনী পরীক্ষার রুটিন সহ সরকারী বিভিন্ন শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষর সংবলিত বিভিন্ন ঘোষনা সংযোজন করা হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের অন্ধকারে রাখা সৃজনশীল প্রশ্নের নমুনা সেসবের মধ্যে দেওয়া হয়েছে ।ফলে অভিভাবকেরা পারুক বা না পারুক এসব গাইড তাঁদের কিনতেই হচ্ছে ।এসবের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার ব্যবসায় চলছে ।গাইড ব্যবসায় ছাড়াও এ পর্যায় থেকেই রমরমা কোচিং ব্যবসায় চলছে । শিক্ষার্থীরা বাধ্য হচ্ছে কোচিং করতে ।পরীক্ষা গ্রহনের সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া সকল স্তরেই বলা যায় জনশিক্ষার দায়ীত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের হাত-পা একেবারে তোলা ।শিক্ষা দানের ক্ষেত্রে যে যেমন খুশি সিদ্ধান্ত নিতে পারে ।কাজেই বিদ্যালয়গুলোর সিদ্ধান্তই এখানে চূড়ান্ত । বিশেষ করে নামকরা বিদ্যালয়গুলো । এরা যেমন করাবে শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকেদের তাই করতে হবে । এই পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে এসব বিদ্যালয়ের ভিতরে এবং বাইরে নানা রকমের ব্যবসা চলছে ।
অনুসন্ধিৎসু হয়ে জানতে চাওয়া বা জ্ঞান অর্জন এক রকম আর শুধুমাত্র ফলাফলের জন্য বাইরে থেকে চাপিয়ে দিয়ে শিশুর প্রাণশিক্তিটুকু নিংড়ে নেওয়া আরেক রকম । বাচ্চাদের জন্য এ পরীক্ষার ভয়াবহ দিকটি এটিই ।এই বয়সেই ফলাফলের জন্য তাদের ওপর যে বোঝা চাপানো হচ্ছে তাতে ভবিষ্যতে তাদের নির্বোধ হওয়ার সমূহ আশংকা তৈরী হচ্ছে ।চিন্তা করে তারা কিছুই করতে পারছে না । কোনকিছুই করতে পারছে না ভাল লাগা থেকে ।ভাল লাগা থেকে অন্য বইপুস্তক পড়াতো দুরে থাক এসব বাচ্চাদেরকে স্বাভাবিকভাবে একটু খেলাধুলা করার সময় পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে না ।এরকম পরিস্থিতিতে তথাকথিত ‘ভাল ফল’ দেখেই শিক্ষামন্ত্রী বলে দিচ্ছেন শিক্ষার মান বাড়ছে!!ছোট ছোট বাচ্চাদের অনুসন্ধিৎসু এবং নির্মোহ জানার আকাঙ্খাকে বিতাড়িত করে শুধুমাত্র ফলাফলমূখী করে তুলে তাদেরকে নির্বোধ বানানোর ব্যবস্থা গ্রহন শাসক শ্রেণির নানা হিসাব মেলানোর জন্য করা হলেও তা জাতির জন্য কোন কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না ।বাচ্চাদের জানার প্রতি নির্মোহ আগ্রহ সৃষ্টি করে শেখানোর পরিবর্তে শুধুমাত্র পরীক্ষার ফলাফলের দিকে তাড়িত করতে তাদের ওপর এমন চাপ সৃষ্টি মাখনের ওপর পাথর ভাঙা ছাড়া আর কিছু নয় ।এই মাখনের ওপর পাথর ভাঙার সরকারি মজা বেশ বোধগম্য কিন্তু এতে জনগণের এবং জাতির সর্বনাশ ।
শাসক শ্রেণির খুদ-কুঁড়োর দিকে চেয়ে থাকার বাইরে দেশে নিশ্চই বুদ্ধিজীবি , শিক্ষাবিদ , গবেষকসহ চিন্তাশীল মানুষ আছেন । সকলেরই কর্তব্য এই সর্বনাশা কর্মের বিরূদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং তা বন্ধ করতে সরকারেক বাধ্য করা ।