ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

এ পর্যন্ত যত মানুষকে নোবেল প্রাইজ দেওয়া হয়ছে তাঁদের সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে যোগ্য লোক । বিভিন্ন জন অনেকের নোবেল প্রাইজ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা সমালোচনা করেছেন এবং এখনও করছেন,ভবিষ্যতেও করবেন ।কারণ পক্ষ-বিপক্ষ নির্ণীত হয় দেখার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ।নোবেল প্রাইজ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা সমালোচনার বিষয়টি মূলতঃ রাজনৈতিক । সে কারণে বিজ্ঞান বিষয়ে নোবেল প্রাইজ নিয়ে বিপক্ষে সমালোচনা অনেক কম।তার পরের বিষয় গুলো রাজনীতির যত কাছাকাছি থাকে , রাজনীতির ওপর যত বেশি প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে সেসব বিষয়ে নোবেল প্রাইজ নিয়ে আলোচনা এবং সমালোচনা দুই-ই বেশি ।বিজ্ঞানের ব্যবহার এবং প্রয়োগ নিয়ে রাজনীতি যতটা স্পষ্ট এর তত্ত্ব নিয়ে রাজনীতি ততটা স্পষ্ট নয়। তবে তত্ত্ব নিয়েও রাজনীতি আছে তা’আনেক গভীর বলে অতটা দৃশ্যমান নয় । অনেকটাই পদার্থ বিজ্ঞানের সমীকরণ এবং জীব বিজ্ঞানের সমীকরণের মত ।জীব বিজ্ঞানের সমীকরণ হবে এত গভীর এবং বিশাল যাকে আর সমীকরণের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায় না। সে কারণে বিজ্ঞানের তত্ত্বের রাজনৈতিক দিকটি গভীরতায় অস্পষ্ট হয় বলে এ বিষয়ে নোবেল প্রাইজ নিয়ে বিতর্ক কম ।

ভাষাগতভাবে না দেখে রাষ্ট্রীয়ভাবে দেখলে বাংলাদেশ থেকে নোবেল প্রাইজের মত বিশাল মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার একজনই পেয়েছেন। তিনি ড. মুহাম্মদ ইউনূস ।এ কারণে এ পুরস্কার নিয়ে এবং তাঁকে নিয়ে ব্যাপক মানুষের আগ্রহ এবং আবেগ দুই-ই বেশি। তাঁকে যে এ পুরস্কার তাঁর যোগ্যতার নিরিখেই দেওয়া হয়েছে এ বিষয়ে সন্দেহের কিছু থাকার কথা নয়। ড. ইউনূসের বিরূদ্ধে যাঁদের কোন ব্যাক্তিগত আক্রোশ বা শত্রুতা নেই কিন্তু রাজনৈতিকভাবে গ্রামীণ ব্যাংক,ক্ষুদ্র ঋণ এসবের বিরোধিতা অনেক আগে থেকেই করে আসছেন তাঁরাও তাঁর নোবেল প্রাইজ পাওয়ার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি এবং তুলবারও কথা নয় ।কিন্তু এক শ্রেণির রাজনীতিক আছেন যাঁরা নোবেল প্রাইজ দাতা প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের প্রতিষ্ঠান বলে মনে করেন।তাই ক্ষেত্র বিশেষে নোবেল প্রাইজ প্রাপ্ত কোন কোন লোকের যোগ্যতা নিয়ে ওজর আপত্তি মূলক কথা অভিযোগের সুরে বলে থাকেন ।তাঁরা ‘যোগ্যতা’কে একই দৃষ্টিকোণ থেকে একই বাটখারায় মাপার চেষ্টা করেন । এর রাজনৈতিক এবং দর্শনগত দিক কোনভাবেই বিচারের মধ্যে নিতে পারেন না ।

ড. ইউনূস একজন অত্যন্ত দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ এ ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করার মত কোন কারণ এ পর্যন্ত দেখা যায়নি ।তাঁর দৃষ্টির গভীরতাও অনেক। যদি বলা হয় পৃথিবীতে যত ব্যাক্টেরিয়া আছে তার মোট ওজন দৃশ্যমান সকল প্রাণী এবং উদ্ভিদের মোট ওজনের চেয়ে বেশি –তাহলে সাধারণভাবে ব্যাপক অধিকাংশ মানুষেরই দৃষ্টি এবং বোধের নাগালের মধ্যে তা পড়বে না ।কিন্তু ড. ইউনূস অর্থনীতির ক্ষেত্রে এমন একজন মানুষ যাঁর চোখে এমন সব বিষয় অত্যন্ত সুষ্পষ্টভাবে ধরা পড়ে ।ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক প্রবাহের সমষ্টি থেকে যে এক বিশাল প্রবাহের সৃষ্টি হতে পারে তা এ ক্ষেত্রে তাঁর মত দূরদৃষ্টির মানুষের পক্ষেই বুঝা সম্ভব ।ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে পৃথিবীব্যাপী যে ধারণা এবং কাজ তা’ ড. ইউনূসই প্রথম করেননি । কিন্তু তিনি যেটা করতে পেরেছেন তা হলো একটি ভাবাদর্শের মধ্যদিয়ে তার ব্যাপকতা সৃষ্টি ।আর এই ভাবাদর্শ কোন্ সমাজ বাস্তবতার মধ্যে এবং কোন্ আর্থসামাজিক-সাংষ্কৃতিক অবস্থার মধ্যে সমাজের মধ্যে প্রোথিত এবং কার্যকর করা যায় তার পাঠও তাঁর ভালভাবে জানা ।আর এখানেই ড. ইউনূসের সাথে অন্য ক্ষুদ্র ঋণ কারবারিদের পার্থক্য ।এখানেই ড. ইউনূসের বিশেষত্ব ।বর্তমানে শাসক শ্রেণির ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এবং ড.ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের মধ্যে যে টানাপোড়েন চলছে তাকে সঠিকভাবে দেখতে এবং বুঝতে হলে এ দিকটায় দৃষ্টি দিতে হবে ।

রাষ্ট্রিক এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক এবং তার রাজনীতির ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ এবং ড. ইউনূস উভয়ই পুঁজিবাদী ধারণার পৃষ্ঠপোষক । এদিক দিয়ে তাদের মধ্যে একটি সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গিগত মিল থাকাই স্বাভাবিক এবং তা আছে ।অপরদিকে পুঁজি গঠন প্রক্রিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি এবং পদ্ধতি তাদের এক নয় ।রাষ্ট্রীয় শাসক শ্রেণির একমাত্র দল হিসাবে আওয়ামী লীগ হঠাৎ করেই রাষ্ট্রীয় , সামাজিক এবং জনগণের সাধারণ সম্পদের মালিক বনে বসে ।পুঁজি গঠনের যেসব প্রক্রিয়া আছে তার মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অথচ দ্রুত প্রক্রিয়ায় এ দলের লোকেরা হঠাৎই পুঁজিপতি বনে বসেন ।সে দিক থেকে ড. ইউনূসের পুঁজি গঠন প্রক্রিয়া ভিন্ন ।পুঁজি গঠনের ক্ষেত্রে তিনি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রবাহ থেকে বিশাল প্রবাহের ধারণা দ্বারা চালিত হন ।এজন্য তিনি প্রথমতঃ অবহেলিত মানুষের শ্রমশক্তির উপর নির্ভর করেন ।এদিক দিয়ে আওয়ামী লীগ ও ড. ইউনূসের মধ্যে পুঁজি গঠন প্রক্রিয়ার পদ্ধতিগত বিরোধ সুষ্পষ্ট ।তাই বলে এ বিরোধ এমন বৈরী নয় যে, এর ফলে তারা একে অপরকে উচ্ছ্বেদ করতে চাইবে বা পরস্পর পরস্পরের স্থায়ী কোন ক্ষতি চাইবে ।বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভিতরের এবং বাইরের অনেক পৃষ্ঠপোষক ড. ইউনূসের সাথে কাজ করেছেন এবং সহমত পোষন করেছেন ।বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্ণর ড. আতিউর রহমান ‘ড. ইউনূসকে কেন নোবেল প্রাইজ দেওয়া হচ্ছে না’ শিরোনামে দৈনিক পত্রিকায় কলাম লিখেছেন তাঁকে নোবেল প্রাইজ দেওয়ার বহু আগে ।হঠাৎ করে ক্ষমতাসীন দল এবং ড. ইউনূসের মধ্যে এমন বিরোধের সূত্র একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতে হবে ।

পুঁজিবাদী অর্থনীতির মধ্যে অন্তর্নিহিত অনেক সংকট এ যাবৎকালে দেখা গেছে ।পুঁজি গঠন এবং এর চলাচলের মধ্যে দ্বন্দ্ব সব সময়েই থেকে গিয়েছে । একনও পর্যন্ত পুঁজি গঠনের মূল উৎসরূপে মানুষের শ্রমের বিকল্প কিছু গড়ে ওঠেনি ।আপাতঃ দৃষ্টিতে বিকল্পরূপে যা’ কিছু দেখা যায় সেসব প্রযুক্তি এবং যন্ত্রেরও প্রাথমিক উৎসও মানুষের শ্রমই বটে ।পুঁজির গঠনে মানুষ যেমন গুরুত্বপূর্ণ আবার পুঁজির চলাচলের জন্যও মানুষ গুরুত্বপূর্ণ ।পুঁজি এমন জিনিস যে তা স্থির থাকতে পারে না ।তা গতিশীল এবং তার গতির ক্ষেত্র মানুষের সমাজ । পুঁজির সেই গতি মানুষের কল্যাণ থেকে ধ্বংস পর্যন্ত বিস্তৃত ।মানুষের সমাজে দারিদ্র্য একটি সীমার নীচে থাকলে সেখানে পুঁজির গঠন এবং তার গতি উভয়েরই সংকট সৃষ্টি হয় ।কিন্তু পূর্ব সৃষ্ট পুঁজি তো গতিশীল । সে পুঁজি প্রবাহের পথ খুঁজে ।সে প্রবাহের জন্য বড় বড় পথ আছে । এসব বড় পথের মধ্যে আছে বিশ্ব ব্যাংক ,আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল( আই.এম. এফ ), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক(এডিবি)সহ বিভিন্ন অর্থলগ্নিকারক প্রতিষ্ঠান ।এসব প্রবাহের বেশিরভাগই হয় আন্তঃরাষ্ট্রীক ।সরাসরি মানুষের সমাজে পুঁজির চলাচলের জন্য আরো অনেক ছোট ছোট পথ প্রয়োজন ।ছোট বড় সকল পথেরই একটি সাধারণ লক্ষ্য থাকে । সে লক্ষটি এরকম- ‘রুগির অসুখ নির্মূল করা নয় , কিছুটা প্রশমিত করে চিকিৎসার দৌড়ের মধ্যে রাখা’ ।পুঁজির সরাসরি দরিদ্র্য মানুষের শ্রমশক্তির কাছে যাওয়ার ,সেখান থেকে তার কলেবর বৃদ্ধি করার অনেক পথের মধ্যে একটি পথ হলো ক্ষুদ্র ঋণ ।এটি পুঁজিবাদী প্রক্রিয়ার জালের যে অসংখ্য তন্তু থাকে তার একটি ।কিন্তু এই ক্ষুদ্র ঋণ প্রক্রিয়াটির একঘেয়েমি এবং প্রাণহীন অবস্থা থেকে ড. ইউনূস এতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছেন ।তা সেখানে পুঁজির মুনাফার হার যত বেশিই হোক না কেন ।আমি এখানে সুদের কথা বলব না ।আমি অর্থনীতি সম্পর্কে তেমন কিছু জানি না । তবে এটুকু বুঝি সুদ হলো একটি বরাবর অবস্থা যা’ মুদ্রাস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য বিধানের কাজ করে । তাই সুদ নামক বিষয়ের মধ্য দিয়ে বাড়তি বা সৃষ্টির কোন হিসাব মেলে না ।তাই মুনাফা কথাটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয় । যদিও তাকে সব সময়ই সুদের আড়ালে রাখার চেষ্টা করা হয় ।

ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে সংগঠিতভাবে অবহেলিত দরিদ্র মানুষের শ্রমকে টানার জন্য বিশেষ করে সবচেয়ে অবহেলিত নারী শ্রমকে টানার জন্য তাদেরকে শুধুমাত্র ক্ষুদ্র ঋণই দেননি,ব্যাংক বিপুল মুনাফা করলেও একটি ভাবাদর্শ সৃষ্টি করে এসব মানুষগুলোর মনে এর মালিকানার তৃপ্তি এনে দিতে সক্ষম হয়েছেন। পুঁজিবাদের জন্য এ এক স্বস্তির ব্যাপার ।কারণ এতে মুনাফা করা সত্ত্বেও এসব শ্রমের মালিকদের সম্পদের মালিক না হওয়ার বঞ্চনার ক্ষোভে বিদ্রোহী হয়ে ওঠার ভয় থাকে না ।তাই ড. ইউনূসের এই ভাবাদর্শিক পন্থা পুঁজিবাদের পৃষ্ঠপোষক এবং তাত্ত্বিকদের নিকট খুবই আকর্ষণীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ তো বটেই সারা পৃথিবীতেই বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন স্থানের মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা বুঝে সেখানে পুঁজিবাদী রাজনীতির প্রভাব সৃষ্টির জন্য এ অর্থনৈতিক পন্থা বেশ গুরুত্ব পায় ।সেটাকেই আরো বেগবান এবং মহিমান্বিত করার রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেই ড. ইউনূস এবং তাঁর গ্রামীণ ব্যাংককে নোবেল প্রাইজ দেওয়া হয় ।কিন্তু এ প্রাইজ এমন এক সময় দেওয়া হয় যখন ছিল এ অর্থনৈতিক পন্থাটি বিকাশের ‘পূর্ণিমা’ ।

ড. ইউনূস ক্ষুদ্র ঋণের সাথে সাথে যে ভাবাদর্শে অবহেলিত গ্রামীণ নারীদের শ্রমকে সংগঠিত করতে পেরেছিলেন তার জন্য এক ধরণের সমাজ বাস্তবতার প্রয়োজন পড়ে ।যে সমাজ বাস্তবতা হলো আনুগত্যমূলক সমাজ বাস্তবতা ।এই আনুগত্যমূলক সমাজ বাস্তবতার অনেকগুলো শর্তের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো স্বল্প যোগাযোগ বা যোগাযোগহীনতা এবং প্রযুক্তি ও তথ্য প্রবাহের অপ্রতুলতা ।বাংলাদেশের মানুষের দারিদ্র্য পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে অবনতি হলেও , দরিদ্র মানুষের কাছে ব্যাক্তিগত বা পারিবারিক পর্যায়ে প্রযুক্তি সেভাবে না পৌঁছালেও সামগ্রিকভাবে গত দশ বছরের মধ্যে খুব দ্রুতই এসবের পরিবর্তন ঘটে গেছে ।সাধারণভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং তথ্য যোগাযোগ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে । সেজন্য দশ বছর আগেও ড. ইউনূসের ভাবাদর্শ যেভাবে ঋণগ্রহীতাদের মোহাবিষ্ট করে আনুগত্যে ধরে রাখতে পারত এখন আর সেভাবে সম্ভব হচ্ছে না ।মোহাবিষ্ট আনুগত্যের কারণে ঋণগ্রহীতাদের শ্রমে যে মুনাফা হতো তা তাদের চোখে ধরা পড়ত না ।মালিকানার কথা মুখে বলে দিলেই তারা নিজেদেরকে ধন্য মনে করতে পারত।এখন আর তেমনটি হচ্ছে না ।

তাছাড়া এক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে ।বিভিন্ন এনজিও সহ অনেক ক্ষুদ্র ঋণ কারবারি এই অবহেলিত এবং সস্তা শ্রম বাজারে প্রবেশ করেছে ।ড. ইউনূসের ভাবাদর্শ এবং আকর্ষণীয় কথার প্রভাব বলয় সংকুচিত হয়ে আসায় অন্য প্রতিষ্ঠানের সাথে গ্রামীণ ব্যাংকের পার্থক্যও আর থাকছে না ।

শুধু ঋণগ্রহীতাদের নয় গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মচারী এবং কর্মীবাহীনিদেরও একটি ভাবাদর্শের মধ্যে রাখা হতো ।সামাজিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের সাথে সাথে এখন সেটাও আর সম্ভব হচ্ছে না ।এক সময় শিক্ষিত যুবকেরা গ্রামীণ ব্যাংকে শুধু চাকরিই করত না তার ভাবাদর্শেও প্রভাবিত হতো ।কিন্তু সামাজিক পরিস্থিতি পাল্টানোর কারণে তো বটেই দিনে দিনে গ্রামীণ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অসার দৃষ্টিভঙ্গিগত কারণে এখন আর সেরকমের নাই ।ঋণগ্রহীতাদের মত কর্মচারীরাও বুঝে চলেছেন যে ভাবাদর্শ গ্রামীণ ব্যাংকের লেবাস মাত্র এর আড়ালে তা ব্যাক্তিগত পুঁজি গঠনকারী একটি প্রতিষ্ঠান । তাই তাঁরা তাঁদের গা থেকে ভাবাদর্শের লেবাস খুলে ফেলতে শুরু করেছেন । এখন যারা আছেন তার বেশিরভাগই শুধুই বেতনভুক কর্মচারী ছাড়া আর কিছু নয় ।

ড. ইউনূস অত্যন্ত দূরদৃষ্টি সম্পন্ন একজন মানুষ । টাকা (সম্পদ ) নির্মাণের কারিগর কে তা তিনি বুঝেছিলেন ।তিনি বুঝেছিলেন গ্রামের গরীব নারী বঞ্চিত এবং অবহেলিত হলেও তাঁদের শ্রম অবহেলার নয় । তাই তিনি তাঁদের মধ্য থেকে তাঁদের শ্রমশক্তিকে বাঁচিয়ে রেখে সেখান থেকে মুনাফার মাধ্যমে পুঁজি গঠনের সম্ভাবনা দেখেছিলেন । সে দিক দিয়ে তিনি সফল ।এসব গরীব মানুষের শ্রম থেকে মুনাফার মাধ্যমে বিশাল পুঁজি তিনি গঠন করতে পেরেছেন ।কিন্তু পুঁজির ধর্ম হলো তা মুনাফার সন্ধান করবে ।শুধু মুনাফার সন্ধানই নয় , যেখানে মুনাফা সবচেয়ে বেশি পুঁজি সেদিকেই ধাবিত হবে ।গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে যে পুঁজি গঠিত হয় প্রথম থেকেই তা বেশি মুনাফার পথ খুঁজে ফেরে ।সে কারণেই দেখা যায় ড. ইউনূস ক্ষুদ্র ঋণ , ক্ষুদ্র ব্যবসায় , ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোগ ইত্যাদির কথা বললেও প্রথম থেকেই তাঁর পুঁজি বড় ঋণ , বড় ব্যবসায়, বড় উদ্যোগের মধ্যে যেতে থাকে ।বড় বড় ক্ষেত্রগুলো খুঁজে ফিরতে থাকে । গ্রামীণ ফোন, গ্রামীণ চেক,গ্রামাঞ্চলের বিপুল পরিমাণ সরকারী জলাভূমিতে মাছ চাষ সহ বড় বড় প্রকল্প এবং উদ্যোগের মধ্যে তাঁর পুঁজি স্বাভাবিকভাবেই যেতে থাকে । পুঁজির এই গতিকে দোষ দেওয়ার কিছু নেই । এটা পুঁজির স্বাভাবিক ধর্ম ।এখানে ড. ইউনূসেরও ক্ষমতা নেই পুঁজির এই গতিকে রোধ করা বা নিয়ন্ত্রন করা ।তাই ড.ইউনূস যতই বলেন ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্যকে যাদুঘরে পাঠাবেন ততই তাঁর জড়ো করা পুঁজি তাঁর এ কথার বিরুদ্ধাচরণ করে ।তাই তিনি যত বড় আওয়াজ দেন এদিক দিয়ে সে আওয়াজের অন্তঃসারশূন্যতা ততই বড় হয়ে বেজে ওঠে ।

গ্রামীণ ব্যাংক ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে অবহেলিত নারীদের শ্রম সংগঠিত করে সেখান থেকে মুনাফার মাধ্যমে পুঁজি সংগ্রাহক একটি ব্যাংক হলেও শুরু থেকেই এর গ্রাহকদের কাছে তা নিছক একটি ব্যাংক হিসাবে আবির্ভুত হয়নি। এর ভাবাদর্শের কারণে গ্রাহকদের কাছে তো বটেই সমাজের নানা স্তরের মানুষের নিকট, বিশেষ করে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশের নিকট এটি নিছকই একটি ব্যাংক নয় ।এর মূল উদ্দেশ্য মুনাফা অর্জনের মাধ্যমে পুঁজি সংগ্রহ হলেও ভাবাদর্শ এবং কিছু কর্ম পদ্ধতির কারণে এসব মানুষের কাছে এর বৈশিষ্ট্য এবং গুরুত্ব অন্যান্য ব্যাংক থেকে ভিন্ন ।সেজন্য এ ব্যাংকটি নিয়ে এসব মানুষের মধ্যে এক ধরনের সেন্টিমেন্ট লক্ষ্য করা যায় ।এ সেন্টিমেন্ট বহুগুণে বৃদ্ধি পায় ড. ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংককে নোবেল প্রাইজ দেওয়ার পর থেকে ।কিন্তু নোবেল প্রাইজ যখন দেওয়া হয় তখন এ ব্যাংকটির বিকাশ শীর্ষ বিন্দুতে পৌঁছে পড়তে শুরু করেছে ।এর কারণগুলো পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে ।কিন্তু ভাবাদর্শের ফলে উল্লেখিত মানুষের মধ্যে এ ব্যাংকটির রাজনৈতিক আদর্শিক দর্শনগত প্রভাব বেশ গভীর ।কাজেই এর ভাবাদর্শিক সেই পরিচয়টি চুপসে গিয়ে নিতান্তই একটি ব্যাংক হিসেবে এর টিকে থাকা পুঁজিবাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দর্শনের এক বিরাট পরাজয় । তাই এর পড়ন্ত বেলায় বিতর্ক অনিবার্য হয়ে ওঠে ।সে কারণে এর গৌরব গাথার পাশাপাশি সাম্প্রতিক কালে একে বেশ কিছু বিতর্কের মধ্যে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায় ।ড. ইউনূসও বেশ কিছু বিতর্কের জন্ম দেন ।কর ফাঁকি সম্পর্কিত বিতর্কের মধ্যেও তিনি গরীব মানুষদের স্বার্থেই তা করেছেন বলে বিতর্ককে আরো বাড়িয়ে দেন ।

গ্রামীণ ব্যাংকের ভাবাদর্শে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সুবিধাপ্রাপ্ত দেশী বিদেশী সকলেরই এর পড়ন্ত বেলার পাঠ আছে ।সে কারণে বিভিন্ন দিক থেকে এর সম্পর্কে বিভিন্ন ধরণের পূর্বাভাস দেওয়া শুরু হয়ে যায় ।এসব পূর্বাভাস অভ্যন্তরীণ অনিবার্যতাকে আশংকা হিসাবে নিয়ে নয়, বাইরের কোন শক্তির প্রভাবে এর ক্ষতির আশংকা করে । যে বাইরের শক্তি ছিল কল্পনার বর্তমান শাসক দল আওয়ামী লীগ তাকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছে ।তারা পড়ন্ত সেই ভাবাদর্শের ক্ষতির দায়ভারটুকু যেচে নিয়ে নিল ।এতে যে রাজনৈতিক দর্শনের ক্ষতির আশংকা তা আওয়ামী লীগেরও বটে ।কারণ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দর্শন এ থেকে ভিন্ন কিছু নয় ।কিন্তু আওয়ামী লীগ আবার শাসকশ্রেণী হিসাবে তার গঠনগত অনিবার্য কারণে যখনই ক্ষমতায় যায় তখনই তার রাজনৈতিক দর্শন বলে কিছুই থাকে না । তাই তাদের কথাবার্তা এবং কার্যকলাপের কোন রাজনৈতিক কার্যকারণ নির্ণয় করা কঠিন ।গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডে ড. ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংকের আপাত ক্ষতি মনে হলেও এতে মেরে বাঁচিয়ে দেওয়ার মত লাভও আছে ।বাংলাদেশ সহ গোটা পৃথিবীতেই মেরে বাঁচানোর মত একটি ব্যাপার রয়ে গেছে ।বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই মেরে বাঁচানোর প্রভাবই এখানকার শাসক শ্রেণির টিকে থাকার শক্তি বা ভিত্তি । তাই এর মধ্যদিয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের যে দশাই ঘটুক ড. ইউনূসের ভাবাদর্শের পরাজয় ঘটেছে এ কথা বলা যাবে না ।