ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

আগামী ২১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের সর্ব বৃহৎ পাবলিক পরীক্ষা ।প্রাইমারি স্কুল সার্টিফিকেট(পি.এস.সি) পরীক্ষা।সবচেয়ে বড় এই পাবলিক পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করতে যাচ্ছে দশ থেকে বারো বছর বয়সের শিশুরা ।বাংলাদেশে রাজনৈতিক- অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মাঝে মধ্যেই শাসক শ্রেণির লোকদের ঘোরতর সব তামাশার সাথে এদেশের মানুষ প্রায়ই পরিচিত হন।শিক্ষা ক্ষেত্রেও তামাশা লেগেই আছে । তবে গত তিন বছর ধরে যে তামাশা চলছে এতবড় ঘোরতর তামাশা অতীতে আর দেখা যায়নি ।

গত ৪ নভেম্বর আরেক অপ্রয়োজনীয় পাবলিক পরীক্ষা জে.এস.সি’র শুরুর দিন শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন ‘এসব পরীক্ষার ফল দশ বছর পর পাওয়া যাবে’।তিনি ঠিকই বলেছেন ।দশ বছর পর ফল ঠিকই পাওয়া যাবে ।তবে সে সময় থেকে দেশের এক বিপুল সংখ্যক মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতা এবং অধিকার হরণের দায়ে তিনি দোষী হবেন ।শুধু শিক্ষা মন্ত্রীই নন দোষী হবেন এমন এক ঘোর তামাশার মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা বুদ্ধিজীবী,শিক্ষাবিদ,শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি ,শিক্ষক,সাংবাদিক, ছাত্র,আইনজীবি,রাজনীতিবিদ সহ যাঁরা এ বিষয়ে চিন্তা করতে পারেন , মত গঠন করতে পারেন সবাই ।সবাইকেই এর গ্লানি বহন করতে হবে ।চেহারা যত চকচকেই হোক, ক্ষমতা যত গভীরই হোক ইতিহাসের এক শ্রেণির মানুষ যেমন গ্লাডিয়েটরদের জীবন বিনাশী নির্মম লড়াই করানোর দায়ে ধিকৃত হন তেমনই ছোট ছোট শিশুদের আজকের অধুনিক গ্লাডিয়েটর বানিয়ে নিদারুণ প্রতিযোগিতার মধ্যে নিক্ষেপ করার দায়ে অবশ্যই এ সময়ের সকল চিন্তাশীল মানুষ একদিন ধিকৃত হবেন ।

আমাদের দেশের আমাদের মত সাধারণ মানুষের দারুণ দুর্ভাগ্য এই যে,আমাদের সন্তানদের জন্য যাঁরা শিক্ষানীতি তৈরী করেন তাঁদের সন্তানেরা এবং জ্ঞাতিরা সেই শিক্ষানীতির মধ্যে পাঠ গ্রহন করে না ।অধিকাংশই শিশুকাল থেকেই শিক্ষা গ্রহন করে হয় বিদেশে নয়তো দেশের মধ্যে মূল ধারার বাইরে এলিট শ্রেণির স্কুলে ।এখানে যাঁরা আলোকিত মানুষ আছেন তাঁদের অনেকেই কেউ বয়সে কেউবা চিন্তায় বুড়ো হয়ে গিয়েছেন । তাঁদের আলো আর সব জায়গায় পৌঁছায় না ।উঠতি যাঁরা আলোকিত তাঁদের মধ্যে জ্ঞানের আলোর চেয়ে ধনের আলো বেশি। যে ধনের আবার উৎস ঠিকানা বড়ই অন্ধকার ।এই অজ্ঞান ধনি অলোকিতগণও তাঁদের সন্তানদের এবং জ্ঞাতিদের সাধারণ বিদ্যালয়ে পাঠান না ।তাঁরা আবার এই সব তামাশার পৃষ্ঠপোষক ।

যাঁরা নীতি তৈরী করেন তাঁদের এসব তৈরীর সময় ব্যাখ্যার কোন প্রয়োজন পড়ে না ।জনগণের কোন্ প্রয়োজনে করছেন তাও ভাববার কোন প্রয়োজন পড়ে না ।মতলবে বা খামখেয়ালিতে তাঁদের মাথায় আসলেই হয়ে গেল । সেটাই নীতিতে পরিণত হয় জনগণের জন্য ।এটা যে কত বড় সত্য তার প্রমাণ জে.এস.সি পরীক্ষার শুরুর দিন যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল সারা পৃথিবীতে দেশে দেশে যখন পাবলিক পরীক্ষা কমিয়ে আনা হচ্ছে তখন বাংলাদেশে নতুন করে দুটি পাবলিক পরীক্ষা চালু করার কারণ কি ? তখন এক শিক্ষা কর্তাব্যক্তির সাফ জবাব ‘ জনগণ এ পরীক্ষা দুটি গ্রহন করেছে’।কি প্রশ্নের কি জবাব ! এই হলো এদেশের কর্তাব্যক্তিদের অবস্থা!

এ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন ,পরীক্ষা বাড়নি বরং কমানো হয়েছে ।এক সময়ে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পরীক্ষা হতো।এর বাইরে বার্ষিক পরীক্ষাও ছিল। বৃত্তি পরীক্ষার নামে স্কুলে স্কুলে বৈষম্যমূলক পরিবেশ তৈরি হতো।কিছু ছাত্রছাত্রীকে আলাদা করে পড়ানো হতো। কিন্তু সে অবস্থা এখন নেই।এমনকি এই পরীক্ষার জন্য কোন নির্বাচনী পরীক্ষাও নেয়া হয় না।এই পরীক্ষার সবচেয়ে বড় উপকারিতা হলো শিক্ষার মানের উন্নয়ন।পরীক্ষায় ভালো করানোর জন্য শিক্ষার্থীর নিজের পরিশ্রমের বাইরে শিক্ষক ও অভিভাবকরাও উদ্যম বিনিয়োগ করে থাকেন।(যুগান্তর ৪ নভেম্বর,২০১২)

শিক্ষামন্ত্রী ‘পরীক্ষা বাড়েনি বরং কমানো হয়েছে’ এই কথা বলার মাধ্যমে মেনে নিচ্ছেন পরীক্ষা বাড়ানো ভাল নয় ।তার পরও দুটি পাবলিক পরীক্ষা নতুন যুক্ত করা হয়েছে ।শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে , তিনি সব পরীক্ষাকে একাকার করে ফেলছেন ।এখানে প্রশ্ন ছিল পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে ।পরীক্ষা নেওয়াই যাবে না এ কথা নিশ্চই কেউ বলবেন না ।একটি গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শিক্ষা ব্যবস্থায় সর্বজনীন শিক্ষার ক্ষেত্রে পরীক্ষার অর্থ হলো প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা । অর্থাৎ যাঁরা শিক্ষা দিবেন তাঁদের পরীক্ষা ।আর এই পরীক্ষার মূল্যায়নও তাঁদেরকেই করতে হবে । সেটা করা সম্ভব না হলে সেটাই শিক্ষা ব্যবস্থার মস্ত বড় সমস্যা । অবশ্য জনগণের সমস্যাকে তাঁরা যদি সমস্যা বলে মনে করেন ।এ ব্যাপারে শিক্ষা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা বলেছেন,যেখানে পাবলিক পরীক্ষা নেই,সেখানে শিক্ষকনির্ভর প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন পদ্ধতি রয়েছে।কিন্তু দেশে একশ্রেণির শিক্ষকের নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে সেটার বাস্তবতা এই মুহুর্তে নেই (যুগান্তর ৪ নভেম্বর ২০১২)।এসব বক্তব্য থেকে সুজাসুজি একটি কথাই বলা যায় এসব কর্তাব্যক্তিরা পাবলিক পরীক্ষা বাড়ানের পক্ষে কোন যৌক্তিক কারণ দেখাতে পারছেন না এবং নীতিগতভাবে স্বীকার করে নিচ্ছেন যে পাবলিক পরীক্ষা কমানোর প্রয়োজন , তারপরও যা’ ছিলই না কোন্ বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তা যুক্ত করছেন?শিক্ষা কর্তাব্যক্তিরা এক শ্রেণির শিক্ষকের ‘নৈতিক অবক্ষয়ের’ জন্য শিক্ষকনির্ভর প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন পদ্ধতির মধ্যে যেতে পারছেন না , বলছেন ।এখানে প্রশ্ন খুবই স্বাভাবিক যে,কর্তাব্যক্তিরূপে তাঁদের থাকার একমাত্র শর্তই হলো এসব পরীক্ষার আয়োজন করা এবং এ নিয়ে কিছু কাজ-গবেষণা করছেন দেখিয়ে জনগণের টাকায় যে বেতন খাচ্ছেন তা’ জায়েজ করা।তা না হলে এক শ্রেণির শিক্ষকদের জন্য পারছেন না এ অযুহাতে শিশুদের ভয়াবহ এক প্রতিযোগিতার মধ্যে ঠেলে দেওয়ার অর্থ কি ?এ দুটি পাবলিক পরীক্ষা নতুন করে যুক্ত করার পক্ষে কোন যুক্তি বা প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করতে না পেরে শিক্ষামন্ত্রী থেকে নিয়ে সবাই আবোলতাবোল বলছেন ।শিক্ষামন্ত্রী বৃত্তি পরীক্ষার কথা বলেছেন। বৃত্তি পরীক্ষা কি পাবলিক পরীক্ষা ছিল ।প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে কি বৃত্তি দেওয়া যায় না ?এ ক্ষেত্রেও বলবেন শিক্ষকদের ‘নৈতিক অবক্ষয়ের’ কারণে সেটা সম্ভব নয় । নৈতিক অবক্ষয় কে সৃষ্টি করেছে?নিচের দিকে সবই চোর আর উপরের দিকে সবাই ভাল?কর্তাব্যক্তিরা চোর নন , শিক্ষকরা যত চোর!সবচেয়ে বড় কথা হলো সর্বজনীন শিক্ষার ক্ষেত্রে বৃত্তির ভনিতাই বা কেন? বৃত্তি পরীক্ষা উঠিয়ে দিলেই তো পারতেন ।

শিক্ষামন্ত্রী পরীক্ষা বাড়েনি বলে যে অবস্থানে উঠে গেলেন তা আমাদের বিদ্যালয়গুলো থেকে অনেক উপরে । এ থেকে মনে হয় বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাচিত্র হয় তিনি দায়িত্ব অবহেলা করার কারণে দেখেন না অথবা কোন গভীর উদ্দেশ্য থেকে দেখতে চান না।তা না হলে পরীক্ষা কমেছে এমন কথা তিনি কখনোই বলতে পারতেন না ।আমরা দেখছি এই পি.এস. সি এবং জে. এস.সি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে আমাদের বাচ্চারা সারা বছরই পরীক্ষার চাপে দম ফেলবার সময় পাচ্ছে না ।শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষক এবং অভিভাবকদের যে বাড়তি উদ্যম বিনিয়োগের কথা বলেছেন তা যে পরীক্ষাকেন্দ্রিক এবং সে উদ্যমও যে পরীক্ষা ছাড়া আর কিছুই নয় তাকি তিনি জানেন না ?ছাঁচ তৈরী করবেন পেরেকের আর চাইবেন কলম তাই কি হয় ?

শিশুদের পাবলিক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার মান বেড়েছে এমন কথা আর যেই বলুক একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক(?) রাষ্ট্রের একজন শিক্ষামন্ত্রী বলতে পারেন না । এর চেয়ে গড় কথা আর হতে পারে না ।ছোট ছোট বাচ্চারা এতবড় পাবলিক পরীক্ষার ভয়ে দিশেহারা হয়ে পরিশ্রম করতে গিয়ে ভবিষ্যতে চিন্তা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে।বাচ্চাদের চাপের মধ্যে ফেলে পরিশ্রম করালেই কি শিক্ষার মান বৃদ্ধি পায় ?আমাদের দেশে শিক্ষা বঞ্চিত বহু মানুষ আছেন যাঁরা শিক্ষা বলতে পরীক্ষা এবং বাচ্চাদের ওপর চাপ দেওয়াকেই বুঝে থাকেন ।একটি দেশের মানুষের শিক্ষার হার প্রকৃতপক্ষে বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে শিক্ষা সম্পর্কে এমন ধারণা পাল্টানোর কথা ।কিন্তু শিক্ষা নিয়ে যাঁরা ব্যবসা করে তাঁরা এবং তার সাথে সাথে শিক্ষামন্ত্রী থেকে নিয়ে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরাও শিক্ষা বঞ্চিত সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের এই ধারণা পাল্টানোর পরিবর্তে তা’ আরো বাড়িয়ে দিয়ে ফায়দা নিচ্ছেন। তাঁরা এ কাজ খুব সচেতনভাবেই করছেন তার প্রমাণ তাঁদের কথা থেকেই স্পষ্ট হয় ।যখন শিক্ষা কর্তাব্যক্তিরা বলেন ‘জনগণ কর্তৃক এ পরীক্ষা সমাদৃত হয়েছে’।বিচ্ছিন্নভাবে না দেখলে সামগ্রিকভাবে শিক্ষার মান বৃদ্ধি নির্ভর করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর এবং শিক্ষা দানের পদ্ধতির ওপর । পরীক্ষার ওপর কখনোই শিক্ষার মান নির্ভর করে না । পৃথিবীর কোন মানুষের কোন গবেষণা থেকেই এ তথ্য পাওয়া যাবে না ।অথচ আধুনিক গণতান্ত্রিক(?) রাষ্ট্রের একজন শিক্ষিত শিক্ষামন্ত্রীর মুখ থেকে আমাদের এ কথা শুনতে হচ্ছে !

শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য অধক্ষ্য কাজী ফারুক আহমেদ বলেন,এটা ঠিক যে সারাবিশ্বই এখন পাবলিক পরীক্ষা কমিয়ে আনার নীতি গ্রহন করেছে ।সে লক্ষ্যে কাজও চলছে।কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ নব প্রবর্তিত পরীক্ষা দুটি গ্রহন করেছে।শিক্ষার্থীদের মাঝে যে পরীক্ষা ভীতি রয়েছে তাও দূর করবে এই পরীক্ষা ।তিনি বলেন, শিক্ষাবিদদের বড় অংশও মনে করেন যে ,পাবলিক পরীক্ষার সংখ্যা হ্রাস পাওয়া দরকার।ভবিষ্যতে পরিস্থিতি যদি মনে করে,তাহলে হয়তো এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আসবে ।(যুগান্তর, ৪ নভেম্বর ২০১২)

শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির একজন কর্তাব্যক্তির যে বক্তব্য এখানে পাওয়া গেল তা’ এতই স্ববিরোধিতায় ভরা । এ পর্যায়ের একজন সুস্থ ব্যক্তির পক্ষে এমন বক্তব্য দেওয়া কি করে সম্ভব? তিনি একদিকে বলছেন সারাবিশ্বই এখন পাবলিক পরীক্ষা কমিয়ে আনার নীতি গ্রহন করেছে এবং সে লক্ষ্যে নাকি কাজও চলছে । আবার অপরদিকে বলছেন বাংলাদেশের মানুষ নাকি নব প্রবর্তিত এই পরীক্ষা দুটি গ্রহন করেছেন! ‘সে লক্ষ্যে কাজ চলছে’ কথাটির যথার্থতা থাকতো যদি দেখা যেত আগে যে সব পাবলিক পরীক্ষা ছিল তা থেকে কিছু কমানোর উদ্যোগ গ্রহন করা হচ্ছে ।আমরাও তেমনটি জেনেছিলাম ।শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণীত হওয়ারও আগে থেকে শুনে আসছিলাম এস.এস.সি নামক পাবলিক পরীক্ষা উঠিয়ে দেওয়া হবে । মাধ্যমিক কলেজগুলোকে স্কুলগুলোর সাথে যুক্ত করা হবে । দশম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত একটি ধারাবাহিক পাঠ্যক্রম শেষে একবারে পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ।কিন্তু শিক্ষানীতির মধ্যে সেরকম কিছু দেখা গেল না । কে বাধা দিয়েছিলেন ? জনগণ নাকি শিক্ষা ব্যবসায়ী মহল? তাঁর ভাষায় ‘নবপ্রবর্তিত’ পরীক্ষা দুটির দাবি কারা করেছিলেন?জনগণ নাকি শিক্ষাব্যবসায়ী মহল ? শিক্ষা ব্যবসা এখন রমরমা। প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষা সর্বজনীন হওয়ায় সেখানে শিক্ষা নিয়ে সাধারণভাবে ব্যবসার সুযোগ থাকার কথা নয় ।কিন্তু এ্‌ই দুটি নতুন পাবলিক পরীক্ষাকে ঘিরে এ পর্যায়েই শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা এখন সবচেয়ে বেশি ।

আমাদের দেশে অনেক সরল মানুষ বিশ্বাস করেন যে ,রোগের একটি সর্বোচ্চ সীমা আছে। সেই সীমায় না উঠে রোগ নিরাময় হওয়া ভাল নয় । কাজেই ডাক্তারের ঔষধ খেয়ে প্রথমে রোগকে সেই সর্বোচ্চ সীমায় উঠতে হবে ।মানুষের শারিরীক রোগের ক্ষেত্রে একথা ঠিক না হলেও সমাজের ক্ষেত্রে দেখা যায় সামাজিক রোগের সর্বোচ্চ সীমায় যাওয়ার পর সমাজ ঘুরে দাঁড়ায় ।তবে যারা সেই রোগ বাড়ায় তাদের বিরূদ্ধে ঘুরে দাঁড়ায় । তাদের দ্বারা কখনোই সমাজের রোগ নির্মূল হয় না ।কর্তাব্যক্তিটি যেমন বলেছেন “ভবিষ্যতে পরিস্থিতি যদি মনে করে,তাহলে হয়তো এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আসবে”। সিদ্ধান্ত অবশ্যই আসতেই হবে । এদেশের মানুষ একদিন সেই পরিস্থিতি অবশ্যই সৃষ্টি করবেন এবং তাদেরকে ধিক্কার দেওয়ার মধ্য দিয়েই শুধুমাত্র ব্যবসায়ীক উদ্দেশ্যে গৃহীত এসব গণবিরোধী এবং শিক্ষা বিরোধী কর্মকাণ্ড বাতিল করবেন ।

এই কর্তাব্যক্তিটি পরীক্ষা নিয়ে যা বলেছেন তার সবই আবোলতাবোল।তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের লোক না হলে তাঁর এসব কথা আলোচনারও যোগ্য হতো না ।এই আবোলতাবোল বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, “শিক্ষার্থীদের মাঝে যে পরীক্ষা ভীতি রয়েছে তাও দূর করবে এই পরীক্ষা” ।যে পরীক্ষাকে তিনি নিজেই ঠিক মনে করছেন না তা দিয়ে আবার শিক্ষার্থীদের ‘পরীক্ষা ভীতি’ দুর করার প্রেসক্রিপ্শন দিচ্ছেন!এমন ট্রিটমেন্ট গ্রাম্য ওঝারা করেন বলেও মনে হয় না ।

শিক্ষা সচিব ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী বলেন ,এই পরীক্ষার বিভিন্ন উপকারিতার একটি হচ্ছে শিক্ষার্থীর মাঝে আত্নবিশ্বাস সৃষ্টি ।তরুন বয়সেই একজন ব্যক্তি একটি সুশৃঙ্খল পরীক্ষার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে । এটা তার পুরো শিক্ষাজীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে ।(যুগান্তর ৪ নভেম্বর ২০১২)

তিনি শিক্ষা সচিব। তাঁর দায়িত্ব বিদ্যালয়গুলোর কি অবস্থা তা দেখার ।সেখানে বাচ্চাদের কি শিক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে তার তত্বাবধানে করা ।সেসবের বেহাল দশাচিত্র আমরা দেখতে পাই ।অথচ তিনি শিশুদের পরীক্ষার মাধ্যমে আত্নবিশ্বাসী করে তোলার ফর্মূলা দিচ্ছেন ।শিক্ষাই পারে বাচ্চাদের আত্মবিশ্বাসী করতে । তিনি যে ফর্মূলায় পরীক্ষার মাধ্যমে বাচ্চাদের আত্মবিশ্বাসের কথা বলছেন মনোবিজ্ঞান কিন্তু ভিন্ন কথা বলে । মনোবিজ্ঞান যে কথা বলে তার নিরিখেই কিন্তু সারা বিশ্বের কোথায়ও এ পর্যায়ে এমন বিশাল আয়োজনের সচিব মহাশয়ের ভাষায় ‘সুশৃঙ্খল’ পরীক্ষা নেওয়ার কথা চিন্তাও করতে পারে না ।যাঁরা শিক্ষা নিয়ে ভাবেন তাঁরা সেই বিড়ালের ওপর চালানো পরীক্ষার কথা কে না জানেন ? বিড়াল বাচ্চা যখন ইঁদুর ধরতে ইচ্ছা করে মা বিড়াল কেবল তখনই তাকে ইঁদুর ধরার শিক্ষা দেয় ।কিন্তু একটি বিড়াল বাচ্চাকে সে যখন ইঁদুর ধরার ইচ্ছা প্রকাশ করেনি অর্থাৎ তার বয়স হওয়ার আগেই তাকে ইঁদুর ধরার তাড়না দেওয়া হয় । তার সামনে ইঁদুর রেখে তাকে তাড়িত করা হয় ।কাজ হয় না ।এই অবস্থা চালাতে চালাতে তার ইঁদুর ধরতে চাওয়ার স্বাভাবিক বয়সও পার হয়ে বিড়ালটি একটি পূর্ণাঙ্গ বয়সের বিড়ালে পরিণত হয় । এতদিনে তার ভিতরে এ সম্পর্কে এক বুঝ তৈরী হয়েছে ।সে এখন সামনে ইঁদুর দেখলে উল্টোদিকে দৌড় দেয় । কারণ সে এতদিনের অভিজ্ঞতায় জেনেছে সামনে ইঁদুর মানেই পিঠে লাঠির বাড়ি ।আমাদের দেশে এমন ভয়াবহ এবং দুঃখজনক অবস্থা অনেক আগে থেকেই অসংখ্য শিক্ষার্থীদের জীবনে ঘটে চলেছে এমনই হুজুরি, কাপালিক এবং তান্ত্রিক পদ্ধতির আত্মবিশ্বাসী বানানোর প্রক্রিয়ায় ।বর্তমানে এমনই ভয়াবহ এবং দুঃখজনক অবস্থা সকল শিশুর জন্য ঘটানোর জন্যই শিক্ষা ব্যবসায়ী মহলের স্বার্থে সরকারী এই আয়োজন ।

শিক্ষা নীতির মধ্যে বা শিক্ষা কর্তাব্যক্তিদের মুখে এমন সব আবোলতাবোল কথা ছাড়া এই দুটি নতুন পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে একটিও যুক্তি পাওয়া যায়নি ।তাঁরা বলছেন জনগণ কর্তৃক ‘গৃহীত’ হয়েছে কিন্তু এ পরীক্ষা দুটি কোন্ প্রয়োজন থেকে প্রবর্তন করলেন তা বলছেন না ।শিক্ষা নীতির মধ্যেও এর প্রয়োজন সম্পর্কে বলা হয়নি ।শিক্ষা নীতির মধ্যে অবশ্য জে. এস. সি পরীক্ষাকে পাবলিক পরীক্ষা বলা হয়েছে । পি.এস.সি পরীক্ষাকে পাবলিক পরীক্ষা বলা হয়নি এবং এ পরীক্ষাকে জাতীয় পর্যায়ে নেওয়ার কথাও বলা হয়নি । এ পরীক্ষাকে উপজেলা/পৌরসভা /থানা(বড় বড় শহর) পর্যায়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে । অথচ এখন এ পরীক্ষা জাতীয় পর্যায়ে পাবলিক পরীক্ষা হিসেবে নেওয়া হচ্ছে । একে খোদার ওপর খোদ্দারী বলা যাবে নাকি শিক্ষানীতির চাতুরী বলা যাবে তা শিক্ষামন্ত্রী এবং শিক্ষা কর্তাব্যক্তিরাই বলতে পারবেন।

এ পরীক্ষা দুটির কারণে বর্তমানে সন্তানের শিক্ষা ব্যয়ে অভিবাবকদের পর্যুদস্ত হওয়া সহ অনেক অসুবিধা তো আছেই । এর সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো শিশুদের চিন্তা করার ক্ষমতা লোপ পেয়ে ভবিষ্যতে বোধবুদ্ধিহীন এক যন্ত্রে পরণত হওয়া ।আর এই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে শিশুদের শৈশব বলে কিছু থাকছে না ।এসব শাসক শ্রেণির সরকারগুলো শিশুদের সকল খেলার মাঠ দখল করেছে । এদের শিক্ষামন্ত্রী , শিক্ষা কর্তাব্যক্তিরা শিশুদের খেলাধুলা কেড়ে নিয়েছে ।ঠেলতে ঠেলতে শিশুদেরকে ছোট্ট এক শ্রেণি কক্ষে স্থান দিয়েছে । মুক্ত আকাশ , মুক্ত বাতাস তাদের থেকে অনেক দুরে ।এখন আবার শিক্ষা ব্যবসায়ীদের স্বার্থে তাদের ওপর দুটি পাবলিক পরীক্ষা চাপিয়ে দিয়ে তাদের মাথার মধ্যে যে শিশুসুলভ বৈশিষ্ট্যটুকু অবশেষ ছিল তাও কেড়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছে ।ঘুমিয়ে না থেকে আগামী প্রজন্মকে নির্বোধ বানানোর এই আয়োজনের বিরূদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে ।

১৯/১১/১২