ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

গত ৯ ডিসেম্বর বিএনপি সহ ১৮ দলের অবরোধ চলাকালে রাজধানীর বাহাদুর শাহ্ পার্কের নিকটে সরকারী দলের ‘অবরোধ প্রতিহতকারী ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের হাতে বিশ্বজিৎ নামের একজন নিরীহ পথচারী নির্মমভাবে খুন হন ।বিশ্বজিৎ খুন হতে থাকেন আর সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে থাকেন ।খুন হওয়ার সাথে সাথে বিশ্বজিৎ বিশ্বময় হয়ে ওঠেন ।খুন হওয়ার সাথে সাথে বিশ্বজিতের প্রতিটি রক্ত কণা সারা বিশ্বের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে আর বলেছে-“ আমি বিশ্বজিৎ ।আমার জন্ম হয়েছিল সভ্যতার দাবিদার মানব সমাজ কার্যত কতটা নির্মম,নিষ্ঠুর,বর্বর আর অসভ্য রয়ে গিয়েছে তা বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দেওয়ার জন্য।আমি বিশ্বজিৎ ।আমার জন্ম হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতার ‘চেতনা’র ধ্বজাধারীরা নির্মমতায় ,নিষ্ঠুরতায় আর বর্বরতার কতটা স্বাধীন তা’ দেখিয়ে দেওয়ার জন্য ।’’বিশ্বজিতের রক্ত কণিকাগুলো এরকম আরো অনেক কথা বলে গিয়েছে , বলে চলেছে এবং বলতেই থাকবে ।বিশ্বজিতের রক্তকণিকা থেকে উচ্চারিত সেই কথাগুলো নিয়ে যে মহাকাব্য রচিত হতে থাকবে তা’ মাইকেল মধুসূদনের ‘মেঘনাদ বধ’,ফেরদৌসির ‘শাহানামা’, হোমারের ‘ওডিসি’ সব কিছুকে ছাড়িয়ে যাবে এবং যেতেই থাকবে ।

অনেক নির্মমতাই, নিষ্ঠুরতাই বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর মানুষকে স্তম্ভিত করেছে , নির্বাক করেছে ।কিন্তু সেসব নির্মম ঘটনার বেশিরভাগই ঘটেছে মানুষের চোখের আড়ালে ।নির্মমতা মানুষের কাছে পরে বর্ণিত হয়েছে । যুদ্ধের নির্মমতায় স্থুপিকৃত লাশ, নিষ্ঠুরতার নিদারুণ চিহ্ন,বর্বরতায় ধ্বংসাবশেষ মানুষ দেখেছে। কিন্তু নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা সংঘটিত হচ্ছে এমন ভয়াল দৃশ্য এত ব্যাপক সংখ্যক মানুষ আগে আর কখনো দেখেনি ।তাইতো বিশ্বজিৎ গোটা সমাজেরই নিষ্ঠুরতা আর নির্মমতাকে জানান দিয়ে যায়। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন চারদিকে এতসব মানুষ উপস্থিত থাকতে এমন বর্বরোচিত ঘটনা সংঘটিত হতে পারে কিভাবে? সেখানে উপস্থিত ছিল পুলিশ, যাদেরকে বলা হয় মানুষের জান-মালের নিরাপত্তার রক্ষক! আরো উপস্থিত ছিল সাংবাদিক,ছাত্র সহ বিভিন্ন শ্রেণির বিভিন্ন পেশার অনেক মানুষ। এতসব মানুষের মধ্যে এত সময় ধরে এমন নিষ্ঠুর , নির্মম , বর্বর ঘটনা ঘটতে পারার মধ্য দিয়ে গোটা সমাজেরই একদিকে ভয়াল চেহারা এবং অপরদিকে অসহায় চেহারা ফুটে ওঠে ।এই ভয়াবহতা ঘন কালো অন্ধকারে আরো জমাট, আরো অনড় ভয়াল রূপ ধারণ করে যখন রাষ্ট্র যন্ত্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আর্তের পাশে না দাঁড়িয়ে ভয়াল উচ্চারণে বলে ওঠেন ‘ওরা কেউ ছাত্রলীগের নয়’, তখন অসংখ্য ভয়ার্ত মানুষ আর্তনাদও করতে না পেরে তা গিলে ফেলেন ।অসংখ্য মানুষের মনের মধ্যে গুমরে ওঠে প্রশ্ন-বিশ্বজিৎ নির্মম-নিষ্ঠুরভাবে খুন হয়েছেন এটাই সত্য, তাঁর হন্তারক এই নিষ্ঠুর দানবগুলোর ছাত্রলীগ হওয়া বা না হওয়ার সাথে কি বিশ্বজিতের খূন হওয়া বা না হওয়ার আর কোন সম্পর্ক থাকতে পারে?তা হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী একজন মানুষের প্রকাশ্য দিবালোকে অসংখ্য মানুষের সামনে এমনভাবে খুন হয়ে যাওয়ার পর খুনিরা কোন্ ঘরানার তা প্রমাণ করতে যাওয়ার অর্থ কি?অনেক পরে প্রধান মন্ত্রীও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর ভাষায়ই কথা বললেন ।প্রধান মন্ত্রীর প্রেস সচিব জানালেন বিশ্বজিতের হন্তারকদের খবর নিয়ে নাকি জানা গেছে তারা শিবির এবং ছাত্রদলের কর্মী যারা ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশকারী।আরো খবর জানা গেল এসব হন্তারকদের পরিবারের লোকজন নাকি সব জামাত এবং বিএনপি করে।এসব খবর সারা দেশ বাসীকে নিশ্চয় আতংকিত করবে । শিবির , ছাত্রদল এরা সন্ত্রাস করে তা’ মানুষের অজানা নয়। নানা সময়ে তাদের তান্ডব এদেশের মানুষ দেখেছেন। এদেশের মানুষ ছাত্রলীগেরও তান্ডব দেখেনি তা নয় । প্রায় প্রতিদিনই সংবাদ পত্র খুললে এদের কারো না কারো তান্ডবের নতুন নতুন কাহিনীর সাথে মানুষ পরিচিত হচ্ছেন এবং আতংকিত হচ্ছেন ।এসব খবর শুধু রাষ্ট্র যন্ত্র এবং তাদের পরিচালকরাই ‘জানে না’! এ দেশের মানুষের অভিজ্ঞতা হলো এ যন্ত্রটি যখন যাদের হাতে থাকে তখন নির্মম , নিষ্ঠুর , দানবীয় কর্ম করা সত্বেও তারা নিজেদের লোকদেরকে, নিজেদের সংগঠনকে ‘ফেরেশতা’ হিসাবে পরিচয় দিতে থাকে ।যতই দিন যাচ্ছে মানুষের এ অভিজ্ঞতা নিদারুন থেকে নিদারুন এবং করুণ হচ্ছে ।হাজারো অপকর্ম করলেও নিজেদের লোকদের এবং সংগঠনকে সকল অপকর্মের অভিযোগ থেকে নিষ্কৃতি দানই যেন রাষ্ট্র যন্ত্রের প্রধান কাজ ।এসব খুনিরা যদি ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশকারীই হয় এবং ছাত্রলীগ যদি ফেরেশতাদের সংগঠনই হয় তবে এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তারা পার পেল কিভাবে? সেখানে তো ছাত্রলীগের আরো অনেক ‘ফেরেশতা’ উপস্থিত ছিল ,তারা তো সবাই আর অনুপ্রবেশকারী নয়?সংবাদ পত্রে দেখা গেল এসব খুনিরা এ ঘটনার পরদিন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রলীগ নেতার জন্মদিনে সেখানে কেক কাটার অনুষ্ঠানে থেকেছে।তারা অনুপ্রবেশকারী হলে এসব কি করে সম্ভব হলো ?স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী কেন তাদের গ্রেফতারের ব্যাপারে বার বার মিথ্যাচার করলেন?তাহলে কি তিনি অনুপ্রবেশকারী শিবির চক্রকেই বাঁচানোর চেষ্টা করছেন? শুধু বিশ্বজিতের খুনিদের ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র যন্ত্রের এই নিকৃষ্ট খেলা তাই নয় । শাসক শ্রেণির সংগঠন এবং লোকদের প্রায় প্রতিটি অপরাধ কর্মের ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র যন্ত্রের পরিচালকদের এমন ভুমিকা দেখা যায় ।সম্প্রতি তোবা গ্রুপের একটি তৈরি পোষাক কারখানা তাজরিন ফ্যাশনে আগুনে পুড়ে শত শত শ্রমিক ছাই হয়ে গেলেন ।শ্রমিকদের এই আগুনে পুড়ে ছাই হওয়া নিতান্তই দুর্ঘটনা নয় ।কারখানার চরম অব্যবস্থাপনা এবং বরাবরের মতই আগুন লাগার সময় কলাপসিবল গেটে তালা বন্ধ রাখা এবং জোরপূর্বক শ্রমিকদের নামতে না দেওয়াই এত শ্রমিকের মৃত্যুর কারণ হলেও সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের পাশে না দাঁড়িয়ে মালিককে বাঁচানোর জন্য নানা রকমের উদ্যোগ সবাই দেখেছে ।এটা যে নিছক দুর্ঘটনা ছিল না, তা সরকা্রও বুঝেছিল ।সে কারণেই এর পিছনে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সহ নানা তত্ত্ব হাজির করা হলো । প্রকারান্তরে প্রধান মন্ত্রী স্বয়ং শ্রমিকদেরই দুষলেন এবং এখনও নানা অনুষ্ঠানে তিনি শ্রমিকদেরই দুষে চলেছেন । এ পর্যন্ত সে কারখানা মালিককে গ্রেফতার তো করা হয়ইনি এমনকি তাকে সামান্য জরিমানা পর্যন্ত করা হয়নি !এভাবে রাষ্ট্র জনগণের জান-মাল রক্ষার পরিবর্তে যখন জনগণের ওপর ঘটে চলা প্রতিটি অন্যায়কে প্রতিটি নির্মমতাকে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে প্রকৃত পক্ষে তদন্ত পর্যন্ত করে না তখন গোটা দেশের মানুষ আতংকিত না হয়ে পারে না ।

রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, প্রধান মন্ত্রী সহ এর সকল পরিচালকদের কথা এবং আচরণ থেকে কয়েকজন বর্বর নিষ্ঠুর মানুষের নির্মমতার সামনে অসংখ্য মানুষের নিষ্ক্রিয় থাকার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় ।১৯৭১ সালের আগে গোটা দেশটি ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের কারাগার । মানুষ ছিল পরাধীন ।দীর্ঘ দিনের সংগ্রামে ,বিক্ষোভে-বিদ্রোহে ১৯৭১ সালে মানুষ পাকিস্তান নামক সেই কারাগার ভেঙে ফেলেছিলেন ।স্বাধীন একটি রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিলেন ।কিন্তু জন্ম লগ্ন থেকেই সেই রাষ্ট্রটি ‘রাষ্ট্র যন্ত্রে’ পরিণত হয়েছিল । জন্ম লগ্ন থেকেই রাষ্ট্র যন্ত্রটি তার জন্মের যারা বিরোধিতা করেছিল, মানুষের ওপর নির্মমতা ,নিষ্ঠুরতা করেছিল তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেও যারা তার জন্মে ভুমিকা রেখেছিলেন তাঁদের অনেককে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল।ক্ষমতাসীনরা শাসক শ্রেণিতে পরিণত হয়েছিল ।তারা জনগণের জন্য গোটা দেশে নতুন কারা প্রাচীর তুলেছিল ।প্রথমে আওয়ামী লীগ, তারপর মিলিটারির পোষাকে এবং গণতন্ত্রের মুখোশে জিয়াউর রহমান , তার পর সামরিক জান্তা এরশাদ এবং তার পর গণতন্ত্রের নামে বি.এন.পি, আওয়ামী লীগ এবং তাদের ডান-বামের সাঙ্গপাঙ্গরা সেই কারাপ্রাচীরকে মজবুত করতে করতে গোটা দেশকে এক নিরাপত্তাহীন ভয়াল কারাগারে পরিণত করেছে ।এখানে মানুষ পরাধীন এবং ভয়ার্ত । পরাধীন এবং ভয়ার্ত মানুষের এককভাবে করার কিছু থাকে না ।তার সামনে যতই নির্দয় , নিষ্ঠুর , নির্মম আর বর্বর ঘটনাই ঘটুক না কেন সে থাকে অসহায়ভাবে নির্লিপ্ত এবং নিষ্ক্রিয় ।বিশেষ করে সে যখন চেতনে –অবচেতনে জানে যে , সে যে কারাগারে আছে তার পরিচালকদের কাছে ‘ভালো সে তো ভালো নয়, মন্দ সে তো মন্দ নয়’ অবস্থা, সেখানে নির্লিপ্ততায়, নিষ্ক্রিয়তায় সে পিছনের দিকে যায় সক্রিয়তায় সামনে এগোনোর সাহস পায় না ।

মানুষের এই নির্লিপ্ততা, নিস্পৃহতা, নিষ্ক্রিয়তা কি চিরস্থায়ী ?ইতিহাস তা বলে না। ইতিহাস তার বিভিন্ন বাঁকের দিকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দেয় মানুষ সব সময় নির্লিপ্ত, নিষ্ক্রিয়, নিস্পৃহ থাকে না। কারাগার, পরাধীনতা আর শৃঙ্খল কিছু মানুষকে দাসত্বে মাথা নুইয়ে রাখতে পারলেও সকল মানুষকে দাসত্বের শৃঙ্খলে দীর্ঘদিন বেঁধে রাখা যায় না । মানুষ একদিন শৃঙ্খল ভেঙ্গে মাথা তুলে দাঁড়ায়। ইতিহাস তাঁর বাঁকে বাঁকে বহু প্রমাণ লিখে রেখেছে । শোষক শাসক শ্রেণীও তা জানে । তাইতো তারা সমাজকে কারাগার বানিয়ে , মানুষকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে একে অপরের থেকে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে চায় ।সমষ্টি মানুষের ‘মানুষের’ নেতৃত্বে দাঁড়ানোতে শাসক শ্রেণির সব চেয়ে বেশি ভয় ।তারা জানে সংগঠিত মানুষের কাছে দাসত্ব চিন্তার কোন জায়গা হয় না ।সংগঠিত মানুষই হল প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন মানুষ । সংগঠিত মানুষ অন্যায় অবিচার মেনে নেয় না ।নির্মমতা নিষ্ঠুরতায় ভীতসন্ত্রস্ত হয় না ।সকল নিষ্ঠুরতাকে সমষ্টির শক্তিতে প্রতিহত করে ।

বিশ্বজিতের নির্মম-নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের সময় অনেক মানুষ সেখানে উপস্থিত ছিল বটে কিন্তু সে মানুষ ছিল প্রত্যেকে থেকে প্রত্যেকে বিচ্ছিন্ন এবং পরাধীন বন্দি মানুষ । বিচ্ছিন্ন মানুষ, পরাধীন মানুষ শক্তিহীন অসহায় । তাই এমন নির্মমতার বিরূদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস তার হয় না ।বিশ্বজিৎ জীবন দিয়ে বুঝিয়ে দিয়ে যায় আমরা মানুষেরা কতটা বিচ্ছিন্ন এবং পরাধীন আর দানবেরা কতটা বেপরোয়া এবং স্বাধীন। বিশ্বজিতের রক্ত কণিকাগুলো বিচ্ছিন্ন সব মানুষগুলোকে কাছাকাছি আনবার জন্য, তাদেরকে ঐক্যের বন্ধনে বাঁধবার জন্য ধেয়ে চলে অবিরাম ।এভাবে গ্রাম থেকে শহরে ভাগ্যের অন্বেষণে আসা একটি ছেলে সামান্য দর্জির পরিচয় থেকে বের হয়ে বিশ্বজিৎ হয়ে যায়। হয়ত এ বিশ্বজিতেই হবে না ।বিচ্ছিন্ন মানুষের মাঝে দানবেরা এখন বড়ই বেপরোয়া এবং স্বাধীন। মানুষকে ঐক্যের বন্ধনে বাঁধতে হয়তো আরো অনেক বিশ্বজিতের রক্ত লাগবে ।