ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

এখন এমন এক সময় যখন শোষণের জন্যও শোষিতকে খানিকটা শিক্ষিত না হলে শোষকের পক্ষে শোষণ সর্বোচ্চ হয় না ।যদিও রক্ত চোষার কথা বলা হয় কিন্তু শোষক আক্ষরিক অর্থে রক্ত চোষে না ।শোষক শোষণ করে শোষিতের সৃষ্টি,তার শ্রম ।সৃষ্টি করতে হলে শিক্ষার প্রয়োজন ।কামার, কুমোর , তাঁতী, জেলে , কৃষক, কাঠুরে সবারই শিক্ষা আছে । পরম্পরায় তাঁরা সবাই শিক্ষিত ।যদিও শিক্ষা সম্পর্কে প্রচলিত যে ধারণা সে অর্থে তাঁদেরকে শিক্ষিত ধরা হয় না ।প্রচলিত অর্থে শিক্ষিত মানুষ তাদেরকেই বলা হয় যাদের অক্ষর জ্ঞান আছে ।একসময় পরম্পরায় অর্জিত পেশাগতভাবে শিক্ষিত মানুষদেরকে শোষকেরা সর্বোচ্চ শোষণ করতে পারত । তখন শোষণের খুব বেশি বৈচিত্র ছিল না । শোষণটাও ছিল খুবই সরাসরি ।দিনে দিনে শোষণের বৈচিত্র বেড়েছে । শোষণের পথও হয়েছে বহুমাত্রিক ।শোষক চায় মানব জমিন থেকে সর্বোচ্চ শোষণ নিশ্চিত করতে ।শুধুই পরম্পরায় অর্জিত পেশাগতভাবে শিক্ষিত মানুষের সর্বস্ব শোষণ করলেও শোষকের শোষণ সর্বোচ্চ হয় না ।সেজন্য শোষিতকে অন্ততঃ অক্ষর জ্ঞানে শিক্ষিত করতে হয় ।

সাধারণভাবে জনগণের শিক্ষিত হওয়ার বিপদ শোষক শ্রেণি, যারা আবার শাসক শ্রেণিও বটে বুঝতে পারে । জনগণকে সর্বোচ্চ শোষণের জন্য অক্ষর জ্ঞান প্রয়োজন বটে কিন্তু তারা শিক্ষিত হয়ে গেলে আবার বিপদ । তাই শিক্ষা ক্ষেত্রে শোষক শাসক শ্রেণিকে এমন পদক্ষেপ নিতে হয় যাতে মানুষ অক্ষর জ্ঞান পাবে বটে কিন্তু শিক্ষিত হতে পারবে না ।কারণ শিক্ষা মানেই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হওয়া, প্রশ্ন তোলা ।শিক্ষিত মানুষকে দীর্ঘদিন শোষণ করা কঠিন । সে জন্য শোষক শাসক শ্রেণির শিক্ষানীতি এবং শিক্ষা কৌশল এমন হতে হয় যাতে ‘শিক্ষিত’ মানুষ প্রশ্নহীন থাকতে পারে ।শোষক শাসক শ্রেণি জনশিক্ষার আওয়াজ যত বড় করে দিয়েছে তার শিক্ষানীতির মধ্যে প্রশ্নহীন শিক্ষার ডিজাইনও ততই প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে ।

এজন্য তাদেরকে যেসব পদক্ষেপ নিতে হয় তার মধ্যে প্রধান হলো শিক্ষার বহুধারা । বলাই বাহুল্য যে এই ধারাগুলো হলো শ্রেণিগত ।উচ্চ ধনিক শ্রেণির জন্য এক রকমের শিক্ষা ব্যবস্থা । শোষক শাসক শ্রেণির বুদ্ধিবৃত্তিক যোগানের উপযোগি করে সেখানে শিক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয় ।একেবারে গরীবদের জন্য রাখা হয়েছে ধর্মীয় শিক্ষাদানের ,মাদ্রাসা-মক্তবের মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।এই শিক্ষায় শিক্ষিতদেরকে শোষক শাসক শ্রেণির মোসাহেবী কাজে ব্যবহার করা যায় অত্যন্ত সহজে ।গরীব এই মানুষদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংষ্কৃতিই হলো অন্যের মুখাপেক্ষি হওয়ার সংষ্কৃতি,দয়া , দান –দক্ষিনার সংষ্কৃতি । এই সংষ্কৃতি এ ধরণের একজন শিক্ষার্থীর মনে যে ভিত্তিভূমি তৈরী করে তাতে অত্যন্ত ব্যতিক্রম ছাড়া তাদের শোষক শাসক শ্রেণির মোসাহেবী কাজে নিয়োজিত থাকা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না ।

সাধারণ শিক্ষা বা মূলধারার শিক্ষা নামে যা পরিচিত তা’ একই রকমের নয় । সেখানেও নানা রকমের বৈষম্যে বিভাজিত ।সে আলোচনা ভিন্ন ।এই মূল ধারার শিক্ষার মধ্যে যে বিষয়টি লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা হলো এই ধারার শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্নহীনতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে ।প্রশ্ন করে এবং তা’ জানার মধ্যদিয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের সবটুকু সময়ই ব্যয় হয় পরীক্ষার চাপ সামাল দিতে ।প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানেই সেখানে অবশ্যই পরীক্ষা থাকবে কিন্তু সেই পরীক্ষার সংখ্যা,পর্যায় এবং পাঠ্যক্রম নির্ধারণ হতে হবে বৈজ্ঞানিক। আবোল-তাবোলভাবে পরীক্ষার সংখ্যা, পাঠ্যক্রম এবং পর্যায় নির্ধারণ করা হলে শিক্ষার্থীদের প্রশ্নহীনভাবে মূখস্ত করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না ।সেখানে প্রশ্ন পত্র প্রণয়ন তথাকথিত ‘সৃজনশীল’ হোক বা না হোক তাতে কিছুই এসে যায় না ।

প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার স্তর পর্যন্ত শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রশ্নহীনতা এমন মাত্রায় পৌঁছেছে এবং তা’ এমনই মূখস্ত নির্ভর হয়ে পড়েছে যে ,শাসক শ্রেণির পক্ষে শিক্ষানীতি প্রণেতাদেরও তা অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছে ।যদিও তাঁরা শিক্ষাকে প্রশ্ন করে অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে প্রশ্নহীন করেই রাখতে চান।কিন্তু তা এত এমন প্রকাশ্যে নয় । প্রশ্নহীনতা অবশ্যই থাকতে হবে তবে তা হতে হবে ফাঁকা প্রশ্নের আবরণে ঢাকা ।সেজন্য শিক্ষাকে প্রশ্ন করে অগ্রসর হওয়ার সকল শর্ত বন্ধ করে পরীক্ষার প্রশ্ন কেমন হবে তা’ নিয়ে তাঁরা বাগাড়ম্বরের আশ্রয় গহন করে থাকেন ।শিক্ষা পদ্ধতি যদি শিক্ষাকে প্রশ্ন করে অগ্রসর হওয়ার শর্ত তৈরী করে তবে সে ক্ষেত্রে পরীক্ষার প্রশ্নও সেরকমই তৈরী হতে বাধ্য ।আবার শিক্ষা পদ্ধতি যদি শিক্ষাকে প্রশ্নহীন করে রাখে তবে পরীক্ষার প্রশ্ন যে নামেই করা হোক না কেন তার জবাবও সেই পথেই হবে ।

বিগত দশ বছরকে যদি তার আগের সময়ের সাথে তুলনা করা যায় তবে লক্ষ্য করা যাবে যে , শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর তৎপরতা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে ।অবাক ব্যাপার হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর এই তৎপরতা যে মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্নহীনতাও ঠিক সেই মাত্রায় বেড়েছে ।এর কারণ হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের শেখানোর পরিবর্তে তাদের থেকে ফলাফল পাওয়াতে বেশি তৎপর । তার চেয়েও বেশি তৎপর সে ফলাফল প্রচারে ।শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এমন আচরণ কেন করবে না ?সরকারগুলো এবং তাদের তৈরি শিক্ষানীতির মূল ভিত্তি হচ্ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বেপরোয়া প্রতিযোগিতা ।এই প্রতিযোগিতা হলো প্রশ্নহীন শিক্ষার মূল চালিকা শক্তি ।শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ফলাফল কেন্দ্রীক প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করা এবং এ নিয়ে হৈচৈ-বাগাড়ম্বর হলো শিক্ষাকে প্রতিষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিকীকরণের শাসক শ্রেণির কৌশল ।সে কারণে দেখা যায় যে,অবকাঠামো, অবস্থান ,পরিবেশের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা’ একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান নির্ণয়ের জন্য অপরিহার্য , সেসবের চিহ্নমাত্র না থাকা সত্ত্বেও শুধু ফলাফলের ভিত্তিতে যখন সরকারিভাবে প্রথম দ্বিতীয় ইত্যাদি হওয়ার স্বিকৃতি মেলে তখন সেই ফলাফল করার জন্য যত রকমের হিসাব কষা সম্ভব প্রতিষ্ঠানগুলো এখন তাই করছে ।ফলাফলের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বেপরোয়া । শিক্ষা এমন একটি বিষয় যা’ বেপরোয়া অবস্থার মধ্যে দেওয়াও সম্ভব নয় এবং পাওয়াও সম্ভব নয় ।কাজেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোর ফলাফল কেন্দ্রীক যে তৎপরতা দেখা যাচ্ছে তা শিক্ষা কেন্দ্রীক নয় ।শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর এই ফলাফল কেন্দ্রীক বেপরোয়া অবস্থা্র দশা এখন এমনই যে,কোন প্রতিষ্ঠানকে যদি এখন শুধু তার শিক্ষার্থীদের কোন পাবলিক পরীক্ষার তত্বাবধায়ক নিয়োগ করা হয় তাহলে বুঝি সকল শিক্ষার্থীর উত্তর পত্র তৈরীর দায়ীত্বও প্রতিষ্ঠানই নিয়ে নেবে!তার নিজের প্রতিষ্ঠান তার পাবলিক পরীক্ষার একচ্ছত্র তত্বাবধায়ক, এখন একজন শিক্ষার্থী এ কল্পনা করতে পারে না ।অথচ একটা সময়ে এটা খুবই স্বাভাবিক এক ব্যাপার ছিল ।এর মধ্যদিয়ে বুঝতে কোন অসুবিধা হয় না যে, একজন শিক্ষার্থীর কাছে তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষকের মর্যাদা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে ।শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষকগণ শিক্ষার্থীর সমৃদ্ধ জীবনবোধ তৈরীর সংষ্কৃতি গড়ে দেবে একথা এখন আর সত্য নয় । মতলববাজী করে হলেও পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে ভাল ফলাফল তৈরী করে দেবে এমন প্রতিষ্ঠানই এখন সবচেয়ে মর্যাদার আসনে আসীন ।সেজন্য দেখা যাচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কোন প্রাচীনত্ব এবং ঐতিহ্য বলে কোন কিছু আর আমাদের দেশে থাকছে না ।মতলববাজির ফলাফল সৃষ্টিতে সেসব প্রতিষ্ঠান অনেক পিছনে ।যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত নিম্ন সংষ্কৃতির কেন্দ্র সেগুলোই এখন সারা দেশের মধ্যে সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ তালিকায় স্থান করে নিচ্ছে। শাসক শ্রেণির নিম্ন সংষ্কৃতি এবং তাদের নিকৃষ্ট শিক্ষানীতির কারণেই সেটা সম্ভব হচ্ছে ।

সমৃদ্ধ জীবনবোধতো দুরে থাক এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠানগতভাবে পাঠ্যক্রমের বিষয়গুলোও শেখায় না ।এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রমের বিষয়গুলো শেখার কাজ বাইরেই সেরে নিতে হয় ।প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ শুধু পরীক্ষা নেওয়া ।শিক্ষা নীতির মধ্যেই পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে ।আমরা যখন বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছি তখন প্রত্যেক শ্রেণিতে বছরে দুটি পরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল । এখন সরকারি ভাবেই তা বাড়িয়ে তিনটি করা হয়েছে ।যেহেতু শিক্ষা ব্যবস্থাটাই এখন পরীক্ষাকেন্দ্রীক তাই ‘যত পরীক্ষা তত ভালো’ এটাই এখন শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক ভালো সংষ্কৃতি । তাই যত ‘ভালো’ প্রতিষ্ঠান সেখানে পরীক্ষার সংখ্যা তত বেশি । এসব ‘ভালো’ অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে বছরে চারটি বড় পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয় ।এসব পরীক্ষা ছাড়াও শ্রেণি পরীক্ষা, সাপ্তাহিক পরীক্ষা,পাক্ষিক পরীক্ষা, মাসিক পরীক্ষা নামে পরীক্ষার আয়োজন করা হয় । বাংলাদেশে পাবলিক পরীক্ষার যে ধরণ তাতে প্রতিষ্ঠানগুলোর এ প্রক্রিয়া অত্যন্ত কার্যকর ।এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শেখানোর কষ্টসাধ্য দায়ীত্ব এড়িয়ে গিয়েও ভালো ফলাফল করিয়ে দেওয়ার কৃতিত্ব মেলে এবং পুরষ্কারও মেলে ।এর মাধ্যমে ‘ভালো’ প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্য যেসব সুবিধা হয় তার মধ্যে আছে বিরাট অর্থ বাণিজ্য ।এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বেতন অনেক । সে বেতনের চেয়েও বেশি পরীক্ষার ফি ।এক একটি পরীক্ষা মানেই বিপুল অংকের অর্থ বাণিজ্য ।অনেক প্রতিষ্ঠান অবকাঠামোগত অসুবিধার কারণে ক্লাশের পরিবর্তে বেশি বেশি পরীক্ষা নিয়ে থাকে ।উচ্চ মাধ্যমিকের ক্ষেত্রে এই ঘটনা বেশি দেখা যায় ।অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যেগুলো ছয় মাসের মধ্যে সকল পরীক্ষা নিয়ে একাদশ শ্রেণি শেষ করে দেয় এবং পরবর্তী একাদশ শ্রেণির ভর্তির আগেই কার্যত দ্বাদশ শ্রেণির ক্লাশ শেষ করে দেয় । তার পর তাদের শুধুমাত্র পরীক্ষার মধ্যে রাখা হয় । শেখানোর জন্য ক্লাশ আর হয় না ।

সরকার এবং শিক্ষামন্ত্রণালয়ের শিক্ষা বিষয়ক যে নীতি , তাতে পরীক্ষাকেন্দ্রীক এ ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরই এখন জয়জয়কার অবস্থা ।যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাস্তার পর থেকেই শ্রেণিকক্ষ শুরু , যেখানে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার জন্য মাঠতো দুরের কথা সামান্য ফাঁকা জায়গাও নেই সেই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন শিক্ষা ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার !অন্য কথা বাদ দিলেও জনগণের টাকায় নির্মিত অপেক্ষাকৃত বড় অবকাঠামোর সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো, যেখানকার শিক্ষকরাও অন্ততঃ হিসেবী যোগ্যতায় সেরা , সেগুলোর সরকারি মাপকাঠিতেই কেন বেহাল দশা ,তা নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষামন্ত্রীর কোন লজ্জাবোধ নেই !!যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অবকাঠামো,শিক্ষকদের যোগ্যতা , শিক্ষা সংষ্কৃতি ,শিক্ষা সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি,দুর্নীতি,কপটতা সব কিছুর নিরিখে দেখলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই বলা চলে না ,সেগুলোই যখন সারা দেশের মধ্যে শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় স্থান পায় তখন এখানকার সামগ্রিক শিক্ষাচিত্রও তার মধ্যদিয়ে ফুটে ওঠে ।

এখন সম্পূর্ণরূপে নির্বোধ ফলাফলমূখী অত্যন্ত নিম্নমানের এমনসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিন দিন দাপটের সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে ।সরকারের ফলাফলমূখী শিক্ষা নীতির কারণে দেশের যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষা ক্ষেত্রে ঐতিহ্য বহন করে আসছিল এখন তাদেরকেও এই কাতারে নেমে আসতে হচ্ছে ।পরীক্ষার বাইরে খেলাধুলা,সাংষ্কৃতিক চর্চা,বিজ্ঞান চর্চা এখন প্রায় নিষিদ্ধ হতে চলেছে ।প্রতিষ্ঠানগুলো এগুলোকে এখন শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে অপচয় বলেই জ্ঞান করছে ।
ষষ্ঠ শ্রেণির বাচ্চারা তাদের বয়সের কারণেই যা’ বুঝতে চায় না এবং যা’ তাদের বুঝবার প্রয়োজনও নেই, তাই জোরেশোরে বুঝানোর জন্য পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করা হয়েছে ।এমন অল্প বয়সের বাচ্চাদের পাঠ্যক্রমে যৌতুক,তালাক , দুর্নীতি ইত্যাদি বিষয় থাকলেও বড়দের পাঠ্যক্রমেও সাধারণভাবে রাজনীতি বিষয়ে কোন কিছুই নেই ।এখানে পাঠ্যক্রমের মধ্যে যা থাকে তাতে সাধারণভাবে রাজনৈতিক শিক্ষার পরিবর্তে আছে গালগপ্প এবং ফুলানো-ফাঁপানো এবং অতিরঞ্জিত কথার ছড়াছড়ি ।যার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে একজন রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব হিসেবে বিকশিত হওয়ার পরিবর্তে সম্পূর্ণরূপে গালগপ্পে চাটুকারই হওয়া সম্ভব ।সরকারের শিক্ষানীতির মধ্যে একজন ‘ভালো ছাত্র’র যে চিত্র পাওয়া যায় তা হলো, সম্পূর্ণরূপে অরাজনৈতিক,প্রশ্নহীন, শাসক শ্রেণির সম্পূর্ণ অনুগত ,মুখগুজে পরীক্ষাকেন্দ্রীক পড়া মূখস্তকারী ,চাটুকারীতায় শ্রেষ্ঠ একজন অসাধারণ মেধাবি । শিক্ষা থেকে ইতিহাস এবং রাজনীতিকে সম্পূর্ণরূপে নির্বাসনে পাঠানোর উদ্দেশ্য সহজেই অনুমেয় ।সাধারণভাবে সকল প্রশ্নের গোড়ায় থাকে রাজনীতি ।রাজনীতিই হলো সকল কিছুর নিয়ন্ত্রক ।বিজ্ঞান কোন্ পথে চলবে , বিজ্ঞানের দ্বারা মানুষের কল্যাণ হবে নাকি তা মানুষের জীবনে অভিশাপ হয়ে উঠবে এসব প্রশ্নেরও মীমাংসা রাজনীতিই করতে পারে ।সরকারের শিক্ষানীতির মূল লক্ষ্য হলো প্রশ্নহীন অনুগত শিক্ষিত শ্রেণি তৈরী । এ কাজ করার জন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন শিক্ষা ক্ষেত্রে এখন সেসব পদক্ষেপই জোর কদমে চলছে ।