ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

গত ২৯ জানুয়ারি রাতে সময় টেলিভিশনে ‘সম্পাদকীয়’ নামক এক অনুষ্ঠানে প্রশ্নকর্তার প্রশ্ন এবং শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের পরিশীলিত উত্তরের মধ্যদিয়ে তাঁরা উভয়ে মিলে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিরাট সরকারি সাফল্য এবং অগ্রগতির চিত্র আঁকবার চেষ্টা করলেন।একথা শুধুমাত্র এ অনুষ্ঠানে নয় প্রায়ই শোনা যায় যে ,বর্তমান মহাজোট সরকারের অন্য অনেক ব্যর্থতার মধ্যেও এর শত্রুরাও নাকি বলতে বাধ্য যে, শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাট সাফল্য এবং অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।কিন্তু অত্যন্ত ব্যতিক্রম ছাড়া এ প্রশ্নটা উঠতে দেখা যায় না যে,এই যে সাফল্যের কথা বলা হচ্ছে , এ সাফল্য কার সাফল্য এবং এ সাফল্যে সুবিধা পাচ্ছে কারা ।আর একটি প্রশ্নও উঠতে দেখা যায় না,তা’ হলো অগ্রগতি গুলো কি কি ।

একথা খুবই ঠিক যে ,সংবাদ পত্র এবং টেলিভিশনে যেসব প্রশ্ন উত্তর , টক-শো ইত্যাদি আয়োজন এবং অনুষ্ঠানে সরকারি দায়ীত্বশীল লোকদেরকে প্রশ্নকর্তা যে সব প্রশ্ন করে থাকেন খুব ব্যতিক্রম ছাড়া ধরণে এবং লক্ষ্যে তা থাকে এসব সরকারি লোকদের বক্তব্য প্রচার করার এক অন্য রকমের কার্যকরী উপায় মাত্র ।উত্তর কিভাবে দিতে হবে তার নির্দেশনাও যেন এসব প্রশ্নের মধ্যে থেকে যায় । এ অনেকটাই ‘সৃজনশীল’ প্রশ্নের ধারার মত !সেদিনকার আলোচনাতেও এর ব্যতিক্রম কিছু ঘটেনি ।

এদিনের আলোচনা বা প্রশ্ন উত্তরে তাঁরা শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নয়নের বা অগ্রগতির যে চিত্র আঁকবার চেষ্টা করলেন তার শৈল্পিক মূল্য থাকলেও থাকতে পারে কিন্তু বাস্তব মূল্য তাতে নেই।শৈল্পিক মূল্য থাকা খুবই স্বাভাবিক । কারণ শিক্ষা মন্ত্রী মহোদয়ের আছে দীর্ঘদিনের অন্য রকমের রাজনীতির অভিজ্ঞতা ।এদিক দিয়ে তিনি একজন রাজনৈতিক শিল্পী।শাসক শ্রেণির বিভিন্ন দলের মধ্যে এমন রাজনৈতিক শিল্পীদের সমারোহ এখন বেশ ভালই ।এতে জনগণের প্রকৃত কোন লাভ না থাকলেও অন্য এক ধরণের লাভ আছে । বায়োলজিক্যালি শাসক শ্রেণির দলগুলোর যারা মালিক ,তাদের খিস্তিখেউর মার্কা কথাবার্তায় মানুষের কর্ণে নোংরা লেগে যাওয়ার যে চাপ প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে সেখান থেকে জনগণের কর্ণকে একটুখানি স্বস্তি দেওয়ার কাজ অন্ততঃ এসব রাজনৈতিক শিল্পীরা করে থাকেন ।বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে জনগণের দিক থেকে দেখলে এ পাওনাটাকে খাটো করে দেখা যায় না ।এ দিক দিয়ে দেখলে শিক্ষা ক্ষেত্রে যে উন্নয়ন এবং অগ্রগতির কথা বলা হয়ে থাকে তাকেও সেই বিচারে খাটো করে দেখা যায় না ।

শিক্ষা মন্ত্রী মহাশয় এবং তার মন্ত্রণালয় তাঁর কালে জনগণকে যেসব শব্দ উপহার দিয়েছেন সেগুলোর শৈল্পিক মূল্য আছে ।যেমন, ‘ মানসিকতার পরিবর্তন’,পরীক্ষা পদ্ধতিতে ‘সৃজনশীল’ প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, ‘পুস্তক উৎসব’ , ‘মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরুম’ । এসব শব্দাবলীর অন্তঃসারশূণ্যতা যতই থাক্ ,এগুলোতে জনগণের ক্ষতির যে এজেন্ডাই থাক আপাততঃ এগুলোর শব্দ সৌন্দর্য্য এবং তার শিল্পমূল্যকেই জনগণের বড় প্রাপ্তি হিসাবে নিতে হবে !যেখানে বাংলাদেশে শাসক শ্রেণির পূর্বাপর নীতি প্রণেতা এবং নির্বাহীদের মধ্যে ভাল-মন্দের তুলনা চলে এভাবে যে, জনগণের টাকা কেউ সম্পূর্ণ মেরে দিয়েছে এবং কেউ মারলেও সম্পূর্ণ সম্পূর্ণ মারে নাই অথবা কেউ মারতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে ।এভাবে তুলনা এখন শাসক শ্রেণির লোকেরাই করে থাকে ।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর সংষ্কৃতি এখন এমন করা হয়েছে যে,সেখানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা ছাড়া তাদের মধ্যে নির্মোহ হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ঘটার মত কোন কর্মকান্ড আর নাই ।সেখানে সাধারণভাবে খেলাধূলার ব্যবস্থা,সাংষ্কৃতিক কর্মকান্ডের ব্যবস্থা ,বিজ্ঞান চর্চার ব্যবস্থা এসব সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত ।শিক্ষার্থীদের নির্মল এবং নির্মোহ আনন্দের কোন রকম ব্যবস্থা শিক্ষাঙ্গনে নেই ।এগুলোর এই যে অনুপস্থিতি , তার দায় যে শিক্ষা মন্ত্রী বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় এড়াতে পারে না ,এদের কথাবার্তায় এর লেশ মাত্র পাওয়া যায় না।এমন যখন অবস্থা তখন ‘পুস্তক উৎসবে’র মত এমন উৎসব শিক্ষার্থীদের কাছে অবশ্যই এক বিরাট পাওয়া !সরকারি লোকদের এমন সাফল্য প্রচারের আয়োজনে জনগণের অর্থ খরচ হলেও এসবের মাধ্যমে ‘অজ্ঞ’ জনগণের মধ্যে তার সন্তানকে শিক্ষিত করার সচেতনতা তৈরী হবে!!জনগণের টাকায় জনগণের সন্তানদের বই দেওয়া হবে এবং এই দায়ীত্ব পালনের এবং তত্ত্বাবধানের জন্য নির্বাহী কর্তারা জনগণের টাকায় বেতন নিলেও সেই কাজ যদি তারা খানিকটা অবহেলার সাথেও করে তাতে কি সেই কৃতিত্ব থেকে তারা বঞ্চিত হবে ?সে কৃতীত্ব প্রচারেও জনগণের কল্যাণ অবশ্যই আছে!সেই কল্যাণ করতেই শিক্ষামন্ত্রী তাঁর সাফল্য বর্ণনা করতে জনগণের টাকায় আপাতঃ আত্নপ্রচারণামূলক বলে মনে হলেও উন্নত কাগজে ঝকঝকে ছবি সম্বলিত লক্ষ লক্ষ পুস্তিকা ছেপে যে ‘বিনামূল্যে’ জনগণের মধ্যে বিতরণ করেছেন তা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরাট সাফল্যই বটে !!

উল্লেখিত আলোচনায় শিক্ষা ক্ষেত্রে বিরাট সাফল্যের যে চিত্র আঁকা হলো এবং সে চিত্রের মধ্যে যখন নির্দিষ্ট করে কোন কিছু পাওয়া গেল না তখন আমাদেরকে এসব সাফল্যের চিত্রগুলোই বুঝতে হবে ।এ আলোচনার মধ্যদিয়ে শিক্ষামন্ত্রী মহাশয় যে তথ্যগুলো তুলে ধরলেন তাতে যা বুঝা যায় তা হলো শিক্ষা ক্ষেত্রে না আছে সরকারের নিয়ন্ত্রণ না আছে সাফল্য ।তাঁর কথা থেকেই জানা গেল শিক্ষা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের সামগ্রিক বাজেট হলো ১১ হাজার কোটি টাকা ।অপরদিকে তাঁর কাছ থেকেই তথ্য পাওয়া গেল দেশে কোচিং বাণিজ্য হয় ৩২ হাজার কোটি টাকা!অর্থাৎ সরকারের মোট শিক্ষা বাজেটের তিন গুণ হয় কোচিং বাণিজ্য!তা’ হলে এ প্রশ্নতো তোলাই যায় যে ,বাংলাদেশের শিক্ষা কে নিয়ন্ত্রণ করছে?এ ক্ষেত্রে সরকারের নিয়ন্ত্রণ কতটুকু এবং বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ কতটুকু?এখানে আরও একটি বিষয় হলো ‘শিক্ষা’ বাণিজ্যের কবলে কতখানি তার হিসাব শুধুমাত্র প্রচলিত কোচিং বাণিজ্যের হিসাব থেকে নির্ণয় করা সম্ভব নয় ।এখানে প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বত্রই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোই প্রধান হয়ে উঠছে ।সেদিক দিয়ে দেখলে শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারের ভুমিকা নিয়ন্ত্রকেরতো নয়ই এমনকি হিসাব রক্ষকেরও নয় ।এমত অবস্থায় যদি শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারের সাফল্যের দাবি তোলা হয় , তবে বলা যায় সরকার শিক্ষাকে প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রে বাণিজ্যিকীকরণে দারুণভাবে সফল এবং অন্ততঃ এ নিয়ে বিতর্কের কিছু নেই ।

শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণের জন্য শাসক শ্রেণির সকল সরকারগুলোই ধারাবাহিকভাবে কাজ করে চলেছে ।প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যসূচীতে শেখ মুজিবুর রহমান এবং জিয়াউর রহমান বিতর্ক ছাড়া শিক্ষা ক্ষেত্রে অন্য কোন মূল নীতিতে শাসক শ্রেণির দলগুলোর মধ্যে কোন বিরোধ কার্যতঃ নেই ।তারা ধারাবাহিকভাবে শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারী প্রতিষ্ঠানের প্রভাব নানা কৌশলে খর্ব করে চলেছে ।এ ক্ষেত্রে এদের শিল্প নীতি এবং শিক্ষা নীতি হাত ধরাধরি করে চলে ।যে প্রক্রিয়ায় এরা সরকারি সকল শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করেছে ঠিক একই প্রক্রিয়ায় শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব সম্পূর্ণরূপে নিঃশেষ করার দিকে নিয়ে যাচ্ছে ।

শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণের যত কৌশল শাসক শ্রেণির নীতিনির্ধারকরা গ্রহন করে থাকে তার মধ্যে দৃশ্যমান অন্যতম কৌশল সরকারের পরীক্ষা নীতি এবং ফলাফল নীতি ।অস্বাভাবিকভাবে পরীক্ষার সংখ্যা বাড়নো , এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরকারের [‘ইচ্ছাকৃত এবং পরিকল্পিত’?] নিয়ন্ত্রনহীনতা ,শিক্ষাকে সম্পূর্ণরূপে পরীক্ষাকেন্দ্রীক এবং ফলাফলমূখী করে তোলা,শিক্ষার্থীদের ফলাফলমূখী প্রতিযোগিতায় তাড়িত করা শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণের কার্যকরী উপায় ।শিক্ষা গ্রহন করে সমৃদ্ধ হওয়া নয় ফলাফলের প্রতিযোগিতা এমন তীব্র এবং লাগামহীন করা হয়েছে যে ,সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া সামর্থ্য অনুযায়ী সকল অভিভাবকদের তার সন্তানের জন্য ফলাফল ‘ক্রয়’ করতে বাধ্য হতে হচ্ছে ।আর এ করতে গিয়ে শিক্ষা নয় , ‘টিপস’ নেওয়ার জন্য তাঁদেরকে দুয়ারে দুয়ারে ধর্ণা দিতে হচ্ছে । শিক্ষা মন্ত্রীর তথ্যমতে যার মোট ব্যয় ৩২ হাজার কোটি টাকা ।মন্ত্রী মহাশয় যখন এই কোচিং বাণিজ্যের কথা বলেন তখন এমনভাবে বলতে চান যেন মনে হয় এতে তাদের শিক্ষানীতির কোন ভূমিকাই নেই!তাদের শিক্ষানীতি তথা পরীক্ষানীতিই যে এ বাণিজ্য বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধির মূল কারণ তা বুঝতে ভুক্তভোগীদের কোন অসুবিধা নেই ।প্রাথমিক স্তরে দুটি পাবলিক পরীক্ষা প্রণয়ন এ বাণিজ্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে ।এতে শিক্ষা ব্যয় এমন বৃদ্ধি পেয়েছে যে,গরীব এবং প্রান্তিক মানুষদের কাছে শিক্ষা গ্রহন এখন এক অস্বাভাবিক এবং অসম্ভব ব্যপার হয়ে দাঁড়াচ্ছে ।দীর্ঘদিন ধরেই সরকারগুলোর শিক্ষানীতির মধ্যে গরীবদের শিক্ষাকে অসম্ভব এবং অস্বাভাবিক তারাই মনে করে ।তারা এমনই অস্বাভাবিক মনে করে যে ,গরীবদের মধ্য থেকে দুই একজন যদি পরীক্ষায় সামান্য ভাল ফলাফল করে তবে তা তাদের কাছে এতই অবাক লাগে যে , সেই খবরটাকে পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত করে দেয় !এমন দুই একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক খবরকে অস্বাভাবিক করে পাঠ্যসূচীতে স্থান দিয়ে এরা শিক্ষা ক্ষেত্রে গরীবের উপস্থিতি জানান দিতে চায় ।অপরদিকে শিক্ষা ক্ষেত্র থেকে গরীবদের ঝেটিয়ে বিদায় করার সকল কৌশলই তারা নিচ্ছে ।২০১৩ সালে এস.এস.সি সহ সম মানের পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ২০১২ সালের পরীক্ষার্থীর সংখ্যা অপেক্ষা লক্ষাধিক কম !বাংলাদেশের জনসংখ্যা কি ২০১২ সাল থেকে ২০১৩ সালে এসে কমে গিয়েছে? তা হলে এস. এস. সি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কোন্ সূত্র মতে কমে যেতে পারে ? যেখানে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ২০১২ এর সমান থাকলেই বলা যেতে পারত ঝরে পড়ার হার বেড়েছ , সেখানে লক্ষাধিক কমে যাওয়াতে কি বলা যাবে ?এমন অবস্থায়ও মন্ত্রী মহাশয় শুধু মাত্র পরিশীলিত শব্দ গুণে বলে বেড়াচ্ছেন ‘ঝরে পড়ার হার কমেছে’!একেই বলে রাজনৈতিক শিল্পী!!বাস্তবতঃ সরকারি নীতির কারণে প্রাথমিক স্তর থেকেই এখন শিক্ষা্ ব্যয় এখন এমন মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে যে,পঞ্চম শ্রেণিতে এবং অষ্টম শ্রেণিতে ঝরে পড়ার হার অনেকগুণে বেড়ে গিয়েছে ।অষ্টম শ্রেণিতে ঝরে পড়ার হার যে কি মাত্রায় বেড়েছে তা এবারের এস.এস.সি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা থেকেই জানা যায় ।পঞ্চম শ্রেণিতে ঝরে পড়ার হার কি মাত্রায় বেড়েছে তার পরিসংখ্যান নেই ।তবে সেটা যে অষ্টম শ্রেণির তুলনায় বেশি তা স্বাভাবিক বিচার বোধ দিয়ে বুঝতে কোন অসুবিধা হয় না ।

পরীক্ষা কেন্দ্রীক এবং ফলাফলমূখী শিক্ষানীতির ফলে যে শিক্ষা সংষ্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছে তাতে ‘শিক্ষা’ হাসিল করতে প্রতিষ্ঠান এবং কোচিং সকল ক্ষেত্রেই ‘টিপসে’র আশ্রয় নিলেই চলে ।প্রশ্নের মধ্য দিয়ে শিক্ষার অগ্রসর হওয়ার সামান্য যে শর্তটুকু ছিল এখন তা সম্পূর্ণরূপে অন্তর্হিত হয়ে ‘শিক্ষাকে’ই টিপস দেওয়া হচ্ছে ।বাংলাদেশে প্রাইভেটতো বটেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও বহু আগেই শিক্ষা টিপস পদ্ধতিতে চলে গিয়েছে ।জরাজীর্ণ হলেও প্রাথমিক , মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক (খুবই কম) পর্যায়ে কিছু ‘বোকা’ শিক্ষক এবং ‘অর্বাচিন’ প্রতিষ্ঠান টিপস পদ্ধতির বাইরে ছিল ।বর্তমান পরীক্ষা নীতি এবং ফলাফল নীতির কারণে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই তাদের আর সে অবস্থানে থাকা চলছে না ।এই টিপস পদ্ধতি এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যে,এমন এজেন্ডা থাকা সত্ত্বেও এ নিয়ে শাসক শ্রেণির নীতি নির্ধারকদেরকেও বিব্রত হতে হচ্ছে ।তাতেতো আর এজেন্ডা বাদ দেওয়া চলে না । তাই তাদেরকে মোড়ক খুঁজতে হয় । যে মোড়কে এই টিপস পদ্ধতি আবৃত করলে এজেন্ডাও বাস্তবায়িত হবে এবং বিব্রত হওয়া থেকেও নিষ্কৃতি মিলবে ।এদিক দিয়ে এ নীতি নির্ধারকদের মাথাও বেশ উর্বর ।উর্বর মস্তিষ্ক থেকে বের হয়ে এলো এক মহান শব্দ । ‘সৃজনশীল’।মহা আবিষ্কার এখন থেকে পরীক্ষা হবে ‘সৃজনশীল’পদ্ধতিতে । এ নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী এবং নীতি নির্ধারকদের বাগাড়ম্বরের শেষ নেই ।একদিনতো এক টক-শোতে এমনই এক নীতিনির্ধারক এবং এ ক্ষেত্রে এই মহান শব্দটির অন্যতম স্রষ্ঠা বলতে বলতে এমনই বলে ফেললেন যে, এর আগে একশতে মাত্র দশ ভাগ শেখা হতো ! এতে যে তাঁর নিজের অবস্থানও হেলে যায় তাতেও তাঁর কোন ভ্রুক্ষেপ নেই!!শিক্ষামন্ত্রী মহাশয়ের ২৯ জানুয়ারির আলোচনায় অবশ্য এ বিষয়ে আরো খানিকটা জানা গেল । এই ‘সৃজনশীল’ পদ্ধতির পরীক্ষার জন্য নাকি লাখের কাছাকাছি শিক্ষককে তাঁর ভাষায় ‘বিদেশ’ থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে ।এর চেয়ে উদ্ভট এবং অবাক কান্ড আর কি হতে পারে?শিক্ষাদানের জন্য প্রশিক্ষণ এক কথা কিন্তু তথাকথিত ‘সৃজনশীল’ পদ্ধতিতে প্রশ্ন প্রণয়নের জন্য ‘বিদেশ’ থেকে শিক্ষক প্রশিক্ষণ!!খুবই জানতে ইচ্ছে করে এমন প্রশ্ন প্রণয়ন পদ্ধতি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ‘বিদেশে’র কোন্ দেশ খুলে বসে আছে ?শিক্ষা যদি প্রশ্ন করে অগ্রসর হয় তাহলে পরীক্ষার প্রশ্ন নিয়ে সমস্যা কিসের?পরীক্ষার প্রশ্ন নিয়ে সমস্যা তখনই হয় যখন পাঠদান হয় টিপস পদ্ধতিতে ।তাদের এই পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণয়নের পদ্ধতির উদ্ভটত্ব থেকেই বুঝা যায় এখন পাঠদানে টিপস পদ্ধতি কোন মাত্রায় পৌঁছেছে ।এই ‘সৃজনশীল’ পদ্ধতি এখনই এমন এক নির্বোধ অবস্থার সৃষ্টি করছে যে, তা না দেখলে এবং না শুনলে বিশ্বাস করা যায় না । একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রের নিকট থেকে জানা গেল কলেজের শিক্ষক নাকি তাদের বলেছেন এখন আর ‘প্রতিপাদন’ এবং ‘প্রমাণ’ গোছের কোন প্রশ্ন পরীক্ষায় আসা সম্ভব নয় !বুঝতে চেয়ে জানা গেল বিজ্ঞান বিষয়ে ‘প্রতিপাদন’ এবং ‘প্রমাণ’ যেমন , নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র থেকে বল ও ভরের সাথে ত্বরণের সম্পর্ক প্রতিপাদন বা শব্দ উৎস ও শ্রোতা পরস্পরের দিকে অগ্রসর হলে শ্রুত শব্দের কম্পাংক বেড়ে যাওয়ার ডপলার ক্রিয়ার সাহায্যে প্রমাণ –এমন সব প্রশ্ন নাকি আর পরীক্ষায় আসবে না ।কেন? প্রশ্ন করায় জানা গেল প্রশ্নের যে ধরণ তার মধ্যে এমন প্রশ্ন করা নাকি সম্ভব নয়।এখনই ‘সৃজনশীলতা’ নিয়ে শিক্ষার্থীরা এমন নির্বোধ কথাবার্তা শুরু করে দিয়েছে । কয়েক বছর পর এর অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার অগ্রগতির চিত্র আঁকাতে গিয়ে বললেন অনেক বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরুম স্থাপন করা হয়েছে। শুনতে ভালই লাগে।কিন্তু মন্ত্রী মহোদয় কি বলবেন দেশে কতগুলো বিদ্যালয়ে এমন একটি সাধারণ বিজ্ঞানাগার আছে যেখানে চাইলেই একজন শিক্ষার্থী একটি অণুবীক্ষণ যন্ত্রে একটি মাছির চোখ পর্যবেক্ষণ করতে পারে?তিনি কি বলবেন কয়টা বিদ্যালয়ে এমন লাইব্রেরী আছে যেখানে একজন শিক্ষার্থী তার পছন্দের একটি বই নিযে বসে পড়তে পারে?তিনি কি বলতে পারবেন কয়টা বিদ্যালয়ে খেলাধূলার জন্য একটি মাঠ আছে ?এসব প্রশ্নের উত্তর তাঁর দেওয়ার আগেই মানুষের জানা হয়ে যায় ।তাই শিক্ষামন্ত্রী এসব সাধারণ বিষয়ের হিসাব দিয়ে শিক্ষার অগ্রগতির চিত্র আঁকতে পারেন না । তাঁকে অসাধারণ বিষয় ‘মাল্টিমিডিয়া’ আমদানি করতে হয় শিক্ষার অগ্রগতির চিত্র আঁকবার জন্য ।

এই হলো এখানকার শিক্ষা চিত্রের অত্যন্ত ক্ষুদ্র খন্ডাংশ । শিক্ষার বেহাল অবস্থার সমগ্র আলোচনা বিশাল ।এ অবস্থায় শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারি এজেন্ডার সাফল্য বুঝা গেলেও শিক্ষার অগ্রগতি বুঝা মুশকিল। তাহলে শিক্ষার অগ্রগতি বলতে কতগুলো পাবলিক পরীক্ষা বাড়িয়ে দেওয়াকে বুঝতে হবে?শিক্ষিতের সংখ্যা বৃদ্ধিকে বুঝতে হবে ? সে সংখ্যা বৃদ্ধির কৃতিত্বের দাবিদার কি সরকার? নাকি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো আর জনগণের পকেট?