ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 
01_Protest_Tuba+Group_BGMEA_050814_0016

ঈদের আগের দিন থেকে পরিবার পরিজন নিয়ে অনাহারী এবং আবাস থেকে উচ্ছ্বেদ হওয়া শ্রমিকরা তাদের কর্মস্থলে এসে জড়ো হন ।পোষাক নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান তোবা গ্রুপের ৫টি কারখানার ১৬০০ শ্রমিককে তিনমাস ধরে বেতন দেওয়া হয়নি। শ্রমিকদের যে বেতন দেওয়া হয় , তাতে নিয়মিত বেতন পেলেও পরিবার পরিজন নিয়ে তাঁদের মান সম্পন্ন খাবার এবং আবাস জোটে না। কষ্ট করে অ-স্বাস্থ্যকর পরিবেশে থেকে শুধুমাত্র জীবন ধারণের জন্য খাবার খেয়ে কোন রকমে তাঁরা জীবনটাকে চালিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। বেতন বন্ধ হলে স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের উপোস থাকতে হয় । তোবা গ্রুপের শ্রমিকদের পরিবার পরিজন নিয়ে এই অবস্থা চলছে তিনমাস ধরে । গোপনে এটা ঘটে চলেছে তা নয় । তাঁরা বার বার রাস্তায় নেমেছেন । অবশেষে ঈদের আগের দিন থেকে অনাহারী শ্রমিকরা সেখানে অবস্থান করছেন। সরকার এবং সরকারী লোকেরা, মালিক পক্ষের লোকেরা যাকে অনশন বলে শ্রমিকদের অনশন তেমন নয় । অনশন নিয়ে শাসক শ্রেণির লোকেরা যে ভন্ডামি করে শ্রমিকদের সেই অভিমানি অনশন নয় । যেদিন থেকে তাঁদের বেতন বন্ধ করা হয়েছে সেদিন থেকেই তাঁদের উপোস শুরু হয়ে গেছে । তাঁদের অনেককেই আবাস ছাড়তে হয়েছে ভাড়া দিতে না পেরে ।তাঁরা যেখানেই থাকুন অনাহার তাঁদের সাথী। রাষ্ট্র, সরকার কোন উদ্যোগ নেয়নি। মালিকের উপর কোন চাপ সৃষ্টি করেনি । মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এর ওপর কোন চাপ সৃষ্টি করেনি ।এখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কোন নির্দেশ নেই, অন্য অনেক ক্ষেত্রে তিনি বহু নির্দেশ দেন । উপরন্তু শ্রমিকরা যখন বিজিএমইএ ভবন ঘেরাও করতে গিয়েছেন সরকারের পুলিশ সরকারের নির্দেশে মালিকদের রক্ষার জন্য আন্দোলনরত শ্রমিকদের লাঠিপেটা করেছে । তিনমাস ধরে বেতন বঞ্চিত অনাহারী শ্রমিকদের এবং তাঁদের পক্ষের লোকদের ওপর পুলিশ চড়াও হয়েছে ,তাঁদেরকে নানাভাবে নাজেহাল করেছে ।

সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক ঘটনা হলো সরকার শ্রমিকদের ন্যায্য বেতন আদায় করে দিতে আসেনি । সরকার কাজ করিয়ে বেতন না দেওয়ার কারণে মালিককে দুষতে আসেনি, মালিককে শাস্তি দিতে আসেনি ।সরাকারের পুলিশ এসেছে কারখানা থেকে অনাহারী শ্রমিকদের ,বাসস্থান থেকে উচ্ছ্বেদ হওয়া শ্রমিকদের উচ্ছ্বেদ করতে ।যেখানে শ্রমিকরা জড়ো হয়েছিলেন সেই কারখানার গেটে পুলিশ তালা লাগিয়ে দিয়েছে। বাড্ডার হোসেন মার্কেট এখন পুলিশের দখলে ।

সরকার উন্নয়নের জিকির করে । সরকারের এ জিকির সত্য । সরকার যতটুকু বলে তার চেয়েও বেশি সত্য । এই করাণে যে,সরকার এবং মালিক পক্ষের লোকেদের যে উন্নয়ন চোখে দেখা যায় তাদের প্রকৃত উন্নয়ন তার চেয়েও অনেক বেশি ।সরকার এই সত্য যেমন গোপন করে তেমনই গোপন করে এই উন্নয়নের নেপথ্যের কারিগরের কথা। কারা তাদের এই উন্নয়নের চাকা সচল রাখে? সরকার , মালিক পক্ষ জানে । জানে বলেই তারা শ্রমিকদের সাথে তামাশা-মষ্করা করে ।এমনভাবে এই তামাশা তারা করে যেন শ্রমিকদের দয়া করে তারা বাঁচিয়ে রেখেছে। শোষকদের দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান উন্নয়নসহ গোটা দেশের চলার চাকা যাঁদের কাঁধে, সেই শ্রমিকদের সাথে মালিক পক্ষ এবং তাদের পাহারাদার সরকার হামেশাই তামাশা করে । তোবা গ্রুপের শ্রমিকদের তিনমাস বেতন দেওয়া হয় না । তাঁদের পরিবার পরিজন নিয়ে আবাস ছাড়তে হচ্ছে। ঘরের সামান্য জিনিসপত্র বিক্রি করেও তাঁরা থাকার জায়গাটি টিকিয়ে রাখতে পারছেন না ।বাসস্থান থেকে উচ্ছ্বেদ হয়ে এবং আনাহারে পরিবার পরিজন নিয়ে তাঁদের জীবন যখন সংকটাপন্ন তখন বিজিএমইএ এক মস্ত বড় তামাশা খাড়া করেছে ।জুন মাসের বেতন দেওয়ার এক ভনিতা করছে ।তাদের এ্‌ই ভনিতা তাদের কথা থেকেই বুঝা যায়।তারা বলেছে আজ ৬ আগষ্টে যারা বেতন না নেবে তাদের দায়ীত্ব তারা নেবে না ।তারা এই ঐদ্ধত্যপূর্ণ ,শয়তানি কথার মধ্যদিয়ে নিজেরাই বুঝিয়ে দিচ্ছে তাদের এই ভন্ডামি মার্কা আয়োজন শ্রমিকদের পক্ষে মেনে নেওয়ার নয় ।কেন মেনে নেবে ? তাঁরা কি ভিক্ষা চাচ্ছে ?ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়ে শ্রমিকরা বাসস্থানচ্যুত .তাঁদের জীবন সংকটাপন্ন । এ অবস্থায় তাঁদেরই পাওনার এক সামান্য অংশ তাঁদের সামনে ঝুলিয়ে মালিক পক্ষ শ্রমিকদের সাথে ঐদ্ধত্যপূর্ণ এবং নির্মম তামাশায় মেতে উঠেছে ।

তাদেরকে এই ঔদ্ধত্য প্রদর্শণের সাহস এবং এমন বেপরোয়া হতে কে শক্তি যুগাচ্ছে? সরকার । সরকার নির্লজ্জভাবে এই অন্যায়ের পক্ষে কাজ করে চলেছে ।শ্রমিকের বেতনের বঞ্চনাকে সরকার পুঁজি হিসেবে নিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শণ করে দেলোয়ার হোসেনকে মুক্তি দিয়েছে । অতিরিক্ত মুনাফা লুন্ঠনে বিভোর গার্মেন্টস মালিক দেলোয়ার হোসেনের দায়ীত্বহীনতায় এবং অব্যবস্থাপনার কারণে ২০১৩ সালে ২৪ নভেম্বর তাজরিন ফ্যাশনে আগুনে পুড়ে ১২৩জন শ্রমিকের করূণ মৃত্যু হয় । ৩০০ এর উপরে শ্রমিক মারাত্নক আহত হয়ে কাজ করার ক্ষমতা হারান । সরকার তখন দেলোয়ার হোসেনকে রক্ষা করেছে ।তাকে গ্রেপ্তার করেনি, তার কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করেনি ।উপরন্তু সে সময়ে সংসদে ভূয়া ভিডিওর কথা বলে শ্রমিকরাই আগুন লাগিয়েছে বলে শ্রমিকের ওপর দায় চাপানোর অপপ্রয়াস দেখিয়েছে, তামাশা করেছে।শ্রমিকদের রক্ত-ঘামে বাংলাদেশের গার্মেন্ট উৎপাদনের সবচেয়ে বড় বেনিফিশিয়ারী বিদেশীরা, বিশেষ করে আমেরিকা এবং ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো। তাদের নিজেদের স্বার্থ এবং লুটপাটে বেঁহুশ বাংলাদেশের মালিক পক্ষ এবং সরকারের প্রকৃত স্বার্থ রক্ষার জন্য এরা সরকারের ওপর চাপ দেয় দেলোয়ার হোসেনকে গ্রেপ্তারের জন্য । তাদেরই চাপের মুখে সরকার এক বছরেরও বেশি সময় পর দেলোয়ার হোসেনকে গ্রেপ্তার করে । বিচারের কাজ প্রায় বন্ধ রেখে এমন এক সময়ে তাকে মুক্তি দেওয়া হলো যখন তারই মালিকানাধীন তোবা গ্রুপে তিনমাস বেতন না পেয়ে শ্রমিকরা আন্দোলন করছে ।

পুঁজিবাদী রাষ্ট্র , সরকার মালিক শ্রেণির পক্ষে থাকবে এতে আশ্চয হওয়ার কিছু নেই । কিন্তু সেখানে পুঁজিবাদী নিয়মিত শোষণের জন্য উৎপাদনের প্রয়োজন হয় । উৎপাদন এবং তার মধ্যদিয়ে পুঁজিবাদী শোষণ জারি রাখার জন্য নিজেদের স্বার্থেই তারা শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন দেয় ,তাদের ট্রেড ইউনিয়ন করার কিছু অধিকার দেয় ।এটা তারা করে এই কারণে যে, এর মধ্যদিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে তাদের শোষণও বৃদ্ধি পায় । একই কারণে তারা মালিকের নিয়মিত শোষণ ছাড়া অন্য সকল অন্যায়কে নিয়ন্ত্রণ করে ।কিন্তু বাংলাদেশে শুধু পুঁজিবাদী শোষণ নয় , এখানে শাসক শ্রেণি এবং তাদের পাহারাদার সরকার যেটা করে সেটা হলো সরাসরি লুন্ঠন । সে কারণেই মালিক পক্ষের সকল অন্যায়ের অবাধ স্বাধীনতা এখানে আছে । সে কারণেই শ্রমিকের বেতন না দিলেও রাষ্ট্রের কিছু যায় আসে না। রাষ্ট্র শ্রমিকের বেতন আদায় করতে এগিয়ে আসে না । সে কারণেই এখানে গার্মেন্টস শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার কোন অধিকার নেই। সে কারণেই এখানে শ্রমিকের কোন নিয়োগ পত্র দেওয়া হয় না।

মালিকদের বেপরোয়া অন্যায় এবং যে কোন অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার এক নির্লজ্জ উদাহরণ হলো দেলোয়ার হোসেনের মুক্তি ।শ্রমিকদের বেতন না দিয়ে তাদের জীবন নিয়ে তামাশার কোন যুক্তির প্রয়োজন এদের পড়ে না । ন্যায্য হলেও শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবিকে মালিক পক্ষ এবং তাদের পাহারাদার সরকার পাশ কাটিয়ে যাওয়ার জন্য নানা যুক্তি দেখায় । কিন্তু কাজ করিয়েছে অথচ বেতন দিবে না এর পক্ষে এদের কোন্ যুক্তি আছে? সকল প্রকার যুক্তি এবং বিচারবোধের বাইরে এই লুন্ঠকরা এখন বেপরোয়া , ঔদ্ধত্যে এবং নির্লজ্জতায় তারা বেপরোয়া ।

৬/৮/১৪