ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

২০১০ সালে শিক্ষানীতি প্রণয়নের পর সরকার যে বাগাড়ম্বর এবং ঢাক-ঢোল পিটিয়েছিল তা যে ফাঁপা এবং জনগণের সাথে মস্তবড় প্রতারণা ছিল তা এখন জনগণের কাছে সাধারণভাবেই উন্মোচিত হতে শুরু করেছে।যদিও শিক্ষার পরিকল্পনা এবং শিক্ষা সংক্রান্ত কোন নীতি শুরু থেকেই জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এ ছিল না ।শিক্ষার সমস্ত পশ্চাদপদ,বৈষম্যমূলক ধারা এবং পদ্ধতি অক্ষুন্ন রেখে তার মধ্যে শুধুমাত্র পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়েই কথা বলা হয়েছে বিস্তর ।কাজেই এ নীতিকে একটি পরীক্ষানীতি ছাড়া আর কিছুই বলা চলে না ।যদিও সেই পরীক্ষা নিয়েও কোন সুচিন্তিত মত বা গবেষণার ছাপ সেখানে নেই ।সেখানে ফাঁকা বুলির মত করে শিক্ষার মান বৃদ্ধির জন্য ভিত্তিহীন বাক্য বিস্তার করা হয়েছে ।শিক্ষার মান বৃদ্ধির জন্য কি কি পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে সে নিয়ে কোন দিক নির্দেশনা বা সুপারিশ শিক্ষানীতির মধ্যে নেই ।

শিক্ষার মান যে হাওয়া থেকে বৃদ্ধি পায় না ,শিক্ষার বেহাল দশার মধ্যদিয়ে তা প্রকাশ পাচ্ছে ।আনুষ্ঠানিক বাগাড়ম্বরের মধ্যদিয়ে শিক্ষাকে প্রাথমিক স্তর থেকেই সম্পূর্ণরূপে বাণিজ্যিকীরণ করতে প্রাথমিক স্তরেই দুটি পাবলিক পরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ।প্রাথমিক স্তরে পাবলিক পরীক্ষার আয়োজনের মধ্যদিয়ে সরকার তার নিজের মতলব সফল করছেতো বটেই এর মধ্যদিয়ে সরকার প্রমাণ করে দিয়েছে তাদের ঘরানার মধ্যে তাবেদার বরকন্দাজ ছাড়া কোন শিক্ষিত লোক নেই ।শিক্ষিত লোক থাকলে ভিতর থেকে প্রতিবাদ উঠতো ।প্রাথমিক শিক্ষা হওয়া চাই পুরোটাই নিরেট শিক্ষা ।এর মধ্যে কোন ফাঁপা বা ফাঁকির কোন অবকাশ থাকা চলে না ।এই শিক্ষাকে সার্টিফিকেট দিয়ে বিচার করা চলে না ।আগে থেকেই প্রাথমিক শিক্ষার মধ্যে যে ফাঁপা অবস্থা এবং ফাঁকি ছিল ২০০৯ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এসে দুটি পাবলিক পরীক্ষার আয়োজনের মধ্যদিয়ে তার পুরোটাকেই ফাঁকিতে পরিণত করেছে ।পৃথিবীর কোন দেশেই এ স্তরে পাবলিক পরীক্ষার আয়োজন করে জনগণের সাথে প্রতারণা করা হয় না ।পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কয়েকটি রাজ্যে প্রাথমিক স্তরে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলের শ্র্র্র্রেণি উত্তোরণের জন্যও পরীক্ষা নেওয়া হয় না ।প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে মূল্যায়ন হতে হয় সার্বক্ষণিক ।সেখানে একটি পাবলিক পরীক্ষার মধ্যদিয়ে শিক্ষার্থীর শিক্ষার মান মূল্যায়নের আয়োজনই দেখিয়ে দেয় শিক্ষাদানে সরকারের দায়ীত্বহীনতা ।এ স্তরেই শিক্ষাকে পরীক্ষা এবং সার্টিফিকেট নির্ভর করা একটি জাতীয় বিপদের আলামত ।

সরকার শিক্ষাকে কোন ভয়াল অন্ধকারের মধ্যে নিক্ষেপ করেছে তা বুঝতে অন্য কোন কিছুই দেখার প্রয়োজন নেই ।পঞ্চম এবং অষ্টম শ্রেণি শেষে পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের মধ্যদিয়েই সেই ভয়াবহতা বুঝা যায় ।কারণ এই স্তরের শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন পত্র ফাঁসকে নিছক প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা বলে দেখলে ঠিক বুঝা যাবে না এটা কতবড় জাতীয় সংকট এবং বিপর্যয় ।সরকার সেই বিপর্যয়ের মধ্যেই শিক্ষাকে ঠেলে দিয়েছে ।
পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস পাবলিক পরীক্ষার এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে ।সর্বশেষ ২০১৪ সালের এইচ.এস.সি পরীক্ষার প্রায় সবগুলো প্রশ্নপত্র ফাঁসের মধ্যদিয়ে এখানকার শিক্ষাচিত্রের ভয়াবহ বেহাল অবস্থাকে সামনে নিয়ে এসেছে ।শিক্ষামন্ত্রীর আবোল-তাবোল অসংলগ্ন কথার মধ্যদিয়ে এ ভয়াবহ অবস্থাকে আড়াল করা যাচ্ছে না ।তিনি বলেছেন আগামী বছর প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করতে ৩২ সেট প্রশ্ন প্রণয়ন করা হবে ।২০১১ সালে নিজের মিথ্যা ঢোল পেটাতে জনগণের টাকায় –‘শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে মান বৃদ্ধির প্রক্রিয়া জোরদার হচ্ছে’ শিরোনামে তিনি একটি বই ছেপে বিতরণ করেন ।২০১৪ সালে এসে তিনিই প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে জনগণেরই টাকায় ৩২ সেট প্রশ্ন প্রণয়নের কথা বলছেন!এই হলো শিক্ষার মান বৃদ্ধির গল্প।

পাবলিক পরীক্ষার ফরাফলকেই শিক্ষাক্ষেত্র্রে সরকারী সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে সরকার এ নিয়েই ঢাক-ঢোল পেটায় । এখানেই শিক্ষা নিয়ে সরকারের জনগণের সাথে প্রতারণার সবচেয়ে বড় রাজনীতি।এ এমন এক প্রতারণা যে, প্রাথমিকভাবে এবং আক্রান্ত না হয়ে এ প্রতারণার কেউ বিরোধিতা করে না ।এমন কেউ কি আছে যে পাশের হার বৃদ্ধির বিরোধিতা করবে?এমনকি কেউ আছে যে সর্বোচ্চ ফলাফল জিপিএ ৫ প্রাপ্তির বিরোধিতা করবে ? সরকারের শিক্ষা নিয়ে প্রতারণার রাজনীতির ভিত্তি এখানেই ।এ বছর এইস.এস.সি পরীক্ষায় পাশের হার সবচেয়ে বেশি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে । সেখানে পাশের হার ৯৪.০৬% এবং সাধারণ শিক্ষার ক্ষেত্রে পাশের হার ৭৫.৭৪% । সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে –তাহলে কি মাদরাসা শিক্ষাই বাংলাদেশে মান সন্মত শিক্ষার নের্তৃত্ব দিচ্ছে ?সরকার যে বেপরোয়াভাবে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে রাজনীতি করছে তা আড়াল করা সম্ভব হচ্ছে না । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে ,সেখানে নির্ধারিত পাশ নম্বর পেয়েছে মাত্র ৪% থেকে সর্বোচ্চ ২০% শিক্ষার্থী ।উল্লেখ্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহনকারীর প্রায় সবাই পাবলিক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ফলাফল জিপিএ ৫ প্রাপ্ত । এই চিত্র শিক্ষার মানের গল্পকে সমর্থন করে না ।তবে এর মধ্যেও শিক্ষা নিয়ে জনগণের সাথে প্রতারণার রাজনীতি আছে ।

শিক্ষা নিয়ে সরকারের প্রতারণার রাজনীতি বহুমূখী। এর মধ্যে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে সরকার পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল এবং উচ্চ শিক্ষা ক্ষেত্র্রে ভর্তি দুই ক্ষেত্রেই জনগণের সাথে প্রতারণার রাজনীতি করছে।পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল সরকারের প্রয়োজন অনুসারে নির্ধারণ করা হচ্ছে।যে কোন অতিরঞ্জন গল্পকে টেকসই করতে গল্প সৃষ্টিকারীরাই ধুম্রজাল সৃষ্টির জন্য এর বিরূদ্ধে বয়ানের পথ তৈরী করে ।সবকিছুই যেহেতু জনগণের সামনে ঘটে তাই ধুম্রজালবিহীন বিশুদ্ধ অতিরঞ্জন কখনোই টেকসই হয় না ।পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসকে এবং সরকারের ইচ্ছাকৃত ব্যর্থতাকে সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে ।সরকারের নীতি এবং রাজনীতি হলো যেখানে যেমন করলে সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়া যাবে সেখানে তাই করতে হবে বলে তার কার্যক্রমে প্রতীয়মান হচ্ছে ।পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের সময় সর্বোচ্চ পাশের হার এবং সর্বোচ্চ ফল জিপিএ ৫ প্রাপ্তির সংখ্যা বৃদ্ধি সরকারের সাফল্যের প্রমাণ ।

এখানে এই সংখ্যা বৃদ্ধির মধ্যেই সরকারের লাভ ।কিন্তু সত্যিকারের পাশের হার বৃধ্ধির জন্য এবং সর্বোচ্চ ফল প্রাপ্তির সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য সরকারের যে পরিকল্পনা এবং পদক্ষেপ থাকা প্রয়োজন সরকার তা করছে না ।তাই এই হার বৃদ্ধির মধ্যে ফাঁকি আছে ।এই ফাঁকির মধ্যদিয়ে যখন ব্যাপক সংখ্যক শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যাচ্ছে তখন সরকারকেই অধিকাংশ শিক্ষার্থীদের বাদ দেওয়ার বৈধ পথ খুঁজতে হচ্ছে ।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ক’ ইউনিটের জন্য দেখা যাচ্ছে প্রতি ১০০জন জিপিএ ৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ২জন শিক্ষার্থী সেখানে ভর্তি হতে পারবে ।৯৮ জন জিপিএ ৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী সেখানে ভর্তি হতে পারবে না ।এখানে উল্লেখ করার বিষয় হলো সরকারের সাফল্যের গল্প এবং নানা কারসাজির মধ্যদিয়েও জিপিএ ৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বড় হলেও মোট শিক্ষার্থীর তুলনায় তা ৭% এর বেশি নয় । অর্থাৎ ৯৩% এর অধিক শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ প্রাপ্তির বাইরে আছে । যখন জিপিএ ৫ প্রাপ্ত ব্যাপক শিক্ষার্থীকে উচ্চ শিক্ষায় ভর্তির সুযোগ বঞ্চিত রাখার প্রয়োজন পড়ছে তখন সরকারের শিক্ষার ব্যাপক উন্নয়নের গল্প ধ্বসে পড়ে ।এ ক্ষেত্রে সরকারের দিক থেকে অনিবার্য হয়ে পড়ে শিক্ষার্থীদের ব্যাক্তিগতভাবে ব্যর্থ প্রমাণ করা।বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় পাশের হার কম হলে যতটা সরকার প্রশ্নবিদ্ধ হয় তার চেয়ে অধিক প্রশ্ন বিদ্ধ হয় ব্যাক্তি শিক্ষার্থী ।

একথা ঠিক যে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সরকার শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান নিশ্চিত না করে ফলাফল নিয়ে তাদের সাথে প্রতারণা করলেও শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ প্রচেষ্টার কমতি নেই ।প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এবং শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের নানা প্রতিবণ্ধকতার মধ্যদিয়েও শিক্ষার্থীরা পারিবারিক এবং ব্যাক্তিগত উদ্যোগে শিক্ষালাভের চেষ্টা করছে ।বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ভর্তি পরীক্ষায় তাদের নিম্ন পাশের হারের গল্পের মধ্যে এক ধরণের সত্যতা থাকলেও তা সরল নয় ।এ ক্ষেত্রে সরকারের অসুবিধা থাকলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তাবেদার ভিসিগুলো এবং সরকারের আজ্ঞাবাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসণ তা এমন ফলাও করে প্রচার করত না ।কয়েকবছর ধরেই পাশের এই হার প্রচার করা হচ্ছে যা আগে এমন ফলাও করে প্রচার করা হতো না ।এভাবে শিক্ষার্থীদের ঘাড়ে ব্যাক্তিগত ব্যর্থতার দায় চাপিয়ে দেওয়ার আরেক অর্থ হলো এদেরকে মুখ বন্ধ করে শুধুমাত্র সার্টিফিকেট বিতরণের জন্য গড়ে ওঠা শিক্ষাা নিয়ে রমরমা বণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাড়িত করা । মজার ব্যাপার হলো এখানে আবার শিক্ষার্থীদের মান প্রমাণ করতে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং রীতিমত ভাল মানের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে !

২৪/৯/১৪