ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতিতে বর্তমানে মাধ্যমিক পর্যায়ে স্কুলের এবং বোর্ডের পরীক্ষা হয়ে থাকে।সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতির নামে যে পদ্ধতি চলছে শিক্ষার পরিমাপ ও মূল্যায়ণ-এর ভাষায় একে বলা হয় কাঠামোবদ্ধ প্রশ্ন (structured question)।সহজ ভাষায়, এরুপ পদ্ধতিতে একটি দৃশ্যকল্প দেয়া থাকে এবং প্রদত্ত দৃশ্যকল্পের আলোকে কিছু প্রশ্ন দেয়া থাকে। দৃশ্যকল্পটি উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। শিক্ষার্থী মূল্যায়ণের এ পদ্ধতি চালু করার নেপথ্যে একটি অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল না বুঝে মুখস্ত করার প্রতি শিক্ষার্থীদের নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা এবং তাদের মধ্যে সৃষ্টিশীলতার বিকাশ ঘটানো।কিন্তু সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি সৃজনশীলতার সাথে শ্রেণিকক্ষে এবং পরীক্ষার সময় চর্চা এবং প্রয়োগ হচ্ছে কিনা সে বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার। বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং টক-শো-এ সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতির প্রচলন এবং সে অনুযায়ী প্রস্তুতি এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। স্বল্প প্রস্তুতি  নিয়ে এ পদ্ধতি চালু করা এবং সে প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বিক্ষোভ গণমাধ্যমগুলো বেশ গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে ছিল।

বাংলাদেশের মূলধারার মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাক্রম বা কারিকুলাম যোগ্যতাভিত্তিক। যাকে কারিকুলামের ভাষায় বলা হয় objective driven।যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রমে স্তর অনুযায়ী প্রান্তিক যোগ্যতা এবং শ্রেনি অনুযায়ী বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতা সুনির্দিস্ট করে দেয়া আছে।পূর্ব নির্ধারিত যোগ্যতাগুলোকে অর্জন করার জন্য পাঠ্য বিষয়বস্তুও ঠিক করে দেয়া আছে। সংগত কারনে আশা করা যায় যে, শ্রেণিকক্ষের শিখন-শেখানো (teaching-learning) প্রক্রিয়া এসকল যোগ্যতাকে অর্জন করার লক্ষ্যে পরিচালিত হবে এবং মূল্যায়ণ প্রক্রিয়া যোগ্যতাগুলো অর্জিত হলো কিনা সেবিষয়টি খেয়াল রাখবে।কিন্তু সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতির ব্যবহার এবং প্রয়োগ বিশ্লেষণ করলে প্রতীয়মান হয় যে ঠিক যে শুভ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল, সে কাংক্ষিত উদ্দেশ্য সম্পূর্নরুপে অর্জিত হচ্ছে না।অনেকক্ষেত্রে সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতির নামে যেধরনের প্রশ্ন ব্যবহার করা হয়, সেসকল প্রশ্নের কাঠামো, গঠনগত বিন্যাস এবং সামগ্রিক মান সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতির উদ্দেশ্য এবং প্রকৃত মানকে বজায় রেখে প্রণীত হচ্ছে না। সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতির ক্ষেত্রে প্রশ্নগুলো শিখন উদ্দেশ্যের (learning objectives) বিভিন্ন ডোমেন বা ক্ষেত্র (মূলত Bloom’s taxonomy and his revised taxonomy) কে মূল্যায়ণ করার জন্য প্রণয়ন করার কথা। প্রশ্নগুলো এমন হওয়া উচিত যেন সেগুলো   শিক্ষাক্রমে নির্ধারিত যোগ্যতাগুলো শিক্ষার্থীরা অর্জন করছে কিনা সেবিষয়টি মূল্যায়ণ করতে পারে। বর্তমানে বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যানে আমরা দেখছি যে সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরি করার ক্ষেত্রে শিক্ষকরা (সবার কথা বলা হচ্ছে না) বাজারে সহজলভ্য বিভিন্ন কোম্পানির নো্ট বা সৃজনশীল প্রশ্ন পুস্তক ব্যবহার করছেন। এখানে একটি বিষয় অনস্বীকার্য যে, শিক্ষার্থী মূল্যায়ণ এবং প্রশ্ন  (বিশেষভাবে সৃজনশীল প্রশ্ন)প্রণয়ন একটি technical কাজ। এর জন্য প্রয়োজন যথেষ্ট সময়, দক্ষতা, প্রশিক্ষণ এবংপ্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান ও দক্ষতাকে কাজে লাগানোর মনমানসিকতা।

শিক্ষার্থী মূল্যায়ণ এবং শিখন-শেখানো প্রক্রিয়া পরস্পর সম্পর্কযুক্ত।মূল্যায়ণ পদ্ধতি যেমন আধুনিক এবং সৃজনশীল হওয়া দরকার, তেমনি বা তার চেয়ে বেশি দরকার শ্রেণিকক্ষের শিখন-শেখানো প্রক্রিয়াকে সৃজনশীল করা।অর্থবহ এবং অনুসন্ধিৎসু শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে শিক্ষার্থীরা আনন্দদায়ক পরিবেশে শিখতে আগ্রহী হবে।শ্রেণিকক্ষের শিক্ষাকে সৃজনশীল না করে শুধুমাত্র মূল্যায়ণ পদ্ধতিকে সৃজনশীল করে উদ্দেশ্য অর্জনের বিষয়টি বেশ প্রশ্ন সাপেক্ষ। শিক্ষা বিজ্ঞানীরা সবর্দা শ্রেণিকক্ষের শিখন-শেখানোর মান উন্নত করে এবং সেঅনুযায়ী শিক্ষার্থী মূল্যায়ণের প্রক্রিয়া নির্ধারন করার কথা বলে থাকেন। মূল্যায়ণ পদ্ধতি অনুসরন করবে শিখন-শেখানোর প্রক্রিয়াকে, শিক্ষার উদ্দেশ্যকে। কিন্তু সেটা না করে যদি মূল্যায়ণ পদ্ধতি অনুসরন করে  শিখন-শেখানোর ব্যাপারটি নির্ধারন করা হয় তাহলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের কাছে শিক্ষার সামগ্রিক প্রক্রিয়াটি হয়ে পড়ে মূল্যায়ণ নির্ভর যেখানে পরীক্ষায় বেশি নম্বর বা সর্বোচ্চ গ্রেড পাওয়া হয়ে উঠে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য।

শিক্ষাক্রমের আলোকে শিখন উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সৃষ্টিশীল শিখন-শেখানোর প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে, শিক্ষার্থীদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা সৃজনশীল মূল্যায়ণ পদ্ধতি যথাযথভাবে ব্যবহার করে মূল্যায়ণ করতে পারলে শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম হবে।