ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

একবার ভাবুন আমাদের শিশুরা কি শিখে বড় হচ্ছে। সকালে ঘুম থেকে জেগে সে ভিন্ন ভাষার, ভিন্ন সংস্কৃতির কার্টুন নিয়ে বসে। সে আধো আধো বাংলা বলে তবে তার চেয়ে ভাল হিন্দি বলে। মা খুশিতে আটখানা। এই খুশি সেলিব্রেট করতে, সন্তানের সাথে সেও হিন্দিতে বাৎচিত করে যা তিনি আবার শিখেছেন স্টার প্লাসের ঝকমকি সিরিয়াল দেখে। না ভাই আমি সংস্কৃতি বোদ্ধা নই যে এর মান এবং আমাদের সমাজে এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করব। আমি যা বলতে চাই তা হল শিশুদের যে ভাষাগত বৈকল্যের সৃষ্টি হচ্ছে তার কি হবে। আমি বাধ্য হয়ে আমার ছেলের জন্য ইউটিউব থেকে বাংলায় ডাবিংকৃ্ত টম এনড জেরি এবং মিনা কার্টুন ডাউনলোড করে দেখাতে চেষ্টা করি। সমস্যা হচ্ছে এটা টেলিভিশনের বিকল্প নয় আর তা ছারা তার বন্ধুরা তার সাথে গল্প করে “ডরিমনের”।

সন্তানকে কোন বিকল্প না দিয়ে এটা করনা, ওটা করনা এমন বাধা প্রদানও তার স্বাভাবিক বুদ্ধিবৃ্দ্ধিকে ব্যাহত করে। তাকে একগুয়ে করে তোলে। কিন্ত বিকল্পটা কোথায় পাই। আমাদের দেশে এতগুলি টিভি চ্যানেল থাকতেও নিত্য নতুন চ্যানেল যোগ হচ্ছে। একই অনুষ্ঠান ভিন্ন ব্যানারে ভিন্ন উপস্থাপনায় প্রদর্শিত হচ্ছে, নতুন কিছু নেই। আর শিশুতোষ অনুষ্ঠান তো নেই বললেই চলে। যাও বা দু’একটা হয় তাও নাচ বা গানের। আমাদের নির্মাতারা কি শিশুতোষ অনুষ্ঠান বানাতে জানেন না। নাকি বানাতে চান না। পাশাপাশি প্রযোজোকগন কি আর্থিক ক্ষতির আশংকায় এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হন না? তাহলে এই যে তারা কথায় কথায় বলেন তারা শুধু ব্যাবসায়িক চিন্তাই করেন না, সেই সাথে সামাজিক দায়বদ্ধতার দিকটাও সমান গুরুত্বে্র সাথে ভাবেন। তা কি শুধু রাজনীতিবীদদের মত, বলতে হয় বলেই বলা?

একদিন বাসায় বসে নেটে কাজ করছি হঠাৎই আমার ছোট্ট বাবুটা এসে গলা জরিয়ে ধরে বল্ল “বাজান কথাতো……”। বারবার বলার পড়েও বুঝতে পারছিলাম না ও কি বলছে। অগত্যা ওর মায়ের দ্বারস্ত হলাম। ওর মা বল্ল; ও বলছে “কথা তো সব মুছে গেছে বাজান” এটি একটি বিজ্ঞাপনে করা একটি বাচ্চার উক্তি। কথাটি ওর খুব পছন্দের। এরপর থেকেই লক্ষ করছি ওর প্রীয় হচ্ছে বাচ্চাদের অংশগ্রহনে করা বিজ্ঞাপনগুলো। খুব খারাপ লাগে যখন ওকে দেখি রিমোট নিয়ে চ্যানেল পালটে পালটে এই বিজ্ঞাপনগুলিই শুধু দেখে। ঐটুকুই ওর জন্য টিভি বিনোদন।

আমাদের জন্য খবর, টক শো, ঝাল শো(রান্নার অনুষ্ঠান), খেলা বা গান, নাটক-সিরিয়াল এককথায় কিছু না কিছু বিনোদনের ব্যবস্থা চ্যানেলগুলিতে থাকেই। উপেক্ষিত হয় শিশু-কিশোররা। অথচ বিজ্ঞাপনগুলি লক্ষ করলে দেখা যায়। মোট বিজ্ঞাপনের এক তৃ্তিয়াংশই শিশু-কিশোরদের আকৃষ্ট করার জন্য তৈরি এবং প্রচারিত। তাহলে শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মানে বাধাটা কোথায়? যদি এমন হয় আমাদের নির্মাতারা এ ধরনের অনুষ্ঠান নির্মানে সত্যিই ব্যার্থ তাহলে বিভিন্ন ভাষায় নির্মিত অনুষ্ঠান, কার্টুন ইত্যাদি বাংলায় ডাবিং করেও তো বাচ্চাদের আমরা আমাদের মত করে শেখাতে পারি। আনন্দ দিতে পারি। আসলে আমরা ওদের চাহিদাগুলি নিয়ে মোটেই ভাবছি না। আমরা সব কিছুই চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করি। চিত্ত বিনোদন মৌ্লিক চাহিদার একটি, তা কি শুধুই বড়দের জন্য? আমরা বাচ্চাদের খাওয়া-পরা, স্কুল, পড়ালেখা এর বাইরে কোন কিছু নিয়ে ভাবতে রাজি নই। যেন একটি রোবটিক প্রজন্ম তৈ্রীর জন্য উঠে পরে লেগেছি।

একদিকে বাচ্চাদের খেলার মাঠগুলি দখল করে নিয়েছি, অন্যদিকে নিরুৎসাহীত করছি ভিডিও গেম(যা যৌক্তিক), ঘরের বাইরে যাওয়া ইত্যাদি যা না করে উপায়ও নেই। তাহলে ওরা করবেটা কি? মা-বাবা অফিসে, সন্তান বড় হয় অশিক্ষিত/অর্ধশিক্ষিত গৃহপরিচারীকার হাতে। আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি একক পরিবারে বসবাসে। যা হয়ত স্বার্থপর বড়দের জন্য সুখদায়ক কিন্ত বাচ্চাদের জন্য মোটেই তা নয়। আজকাল কারো সন্তান গল্প শোনার আব্দার করে না। ওরা হয়ত জানেই না একসময় শিশুদের সবচেয়ে বড় বিনোদনের জায়গাটি ছিল পারিবারিক গল্পের আসর। যেখানে দাদা-দাদী’র কাছে বসে শুনত মন ভূলান কত না গল্প। তারা নিছক গল্পই শুনত না। এই গল্পের মধ্যেই শিখত। নীতিবোধ, শিখত আদব, ভালবাসা, মমত্ববোধ, ভ্রাতৃত্ব এক কথায় শিশুমনে রোপিত হত মানবীয় সকল গুনাবলী যা সে বয়ে বেড়াত তার সমগ্র জীবনব্যাপী।

আমরা অনুন্নত দেশ থেকে আজ স্বল্পোন্নত; কাল মধ্যম আয়ের দেশে উন্নিত হব। কিন্ত যে প্রজন্ম আজ তৈ্রী হচ্ছে তারা একটি শংকর জাতিতে পরিনত হচ্ছে নাতো?

গনমাধ্যম চাইলেই পরিবর্তন করে দিতে পারে একটি প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গী, তাদের মননশীলতাকে। সে সুযোগও আমাদের রয়েছে। যা দরকার তা হল সুচিন্তার প্রসারন। উপকরণের যথোপযুক্ত ব্যবহার। আমি জানি না বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি শিশুতোষ টিভি চ্যানেল চালানো অসম্ভব কিনা। সেটা যারা এর সাথে যুক্ত তারা ভাল বলতে পারবেন। তবে এটা বলতে পারি আগামী প্রজন্মকে বাঙ্গালী ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে দেখতে চাইলে এখনই ব্যবস্থা নেয়া জরুরী। যার জন্য প্রয়োজন ষোল আনা বাঙ্গালী ধাঁচের শিশুতোষ গনমাধ্যম। আর যদি তা একান্তই অসম্ভব হয় তাহলে এ দেশের সকল চ্যানেল কর্তৃপক্ষের কাছে আমার আকুল আবেদন- আপনাদের চ্যানেলগুলোতে শিশুদের জন্য একটি সময় নির্দিষ্ট করুন। যেখানে তারা পাবে নির্মল আনন্দের উপকরন। যেখান থেকে তারা নিবে সত্যিকারের মানুষ হওয়ার দিক্ষা। অভিভাবকগণ নিঃসন্দেহে এই চ্যানেল কর্তৃপক্ষকে অকুণ্ঠচিত্তে সাধুবাদ জানাবেন চেষ্টা করবেন তাদের সাথে থাকার। আজকের এই ব্যস্ত সময়ে গনমাধ্যম পারে অভিভাবকদের অনেক উদ্বেগ থেকে মুক্তি দিতে। পারে একটি সুন্দর প্রজন্ম তৈ্রী করতে। সংশ্লিষ্টরা কি একবার ভেবে দেখবেন?