ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

বর্তমানে ঢাকা শহরে প্রায় দেড় কোটি লোক বাস করে যার ৯০ শতাংশই ভাড়াটিয়া। জনসংখ্যার ভারে ভারাক্রান্ত এই শহরের ভাড়াটিয়াদের সমস্যার অন্ত নেই। বিদ্যুৎ বিভ্রাট, যানজট তো নিত্য সঙ্গী। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে এমনিতেই নাভিশ্বাস অবস্থা। এর সাথে যখন বাড়ীওয়ালারা অত্যাচার শুরু করেন তখন এই শহরে থাকাটাই মনে হয় কোন পাপের ফলভোগ। আপনি যে পেশায়ই নিয়োজিত থাকুন না কেন। যে অবস্থানেই থাকুন, সে অনুযায়ী আপনাকে একটি নির্দিষ্ট জীবনমান বজায় রেখে চলতে হয়। আর তা মাথায় রেখেই আপনাকে বাড়ী ভাড়া নিতে হয়। সেইসাথে ভাড়া নেয়ার আগে আপনার কর্মস্থলের দূরত্ব, আপনার সন্তানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবস্থান চিন্তা করে তবেই সুবিধাজনক স্থানে বাসা ভাড়া নিতে হবে। আর এত সব দিক চিন্তা করে বাড়ী ভাড়া নিতে গিয়ে দেখা যায় নিম্ন আয়ের মানুষকে তার বেতনের দুই তৃতীয়াংশই দিয়ে দিতে হয় মাথা গোজার ঠাই যোগার করতে গিয়ে। আজকাল কিছু কিছু স্কুলে বাচ্চাদের ভর্তি ফর্মে উল্লেখ করে দিতে হয় তার অভিভাবকের মাসিক আয় কত। ঠিক তেমনি বাড়ীওয়ালার প্রথম প্রশ্ন: কি করেন? কত টাকা বেতন পান? অর্থাৎ আপনি তার বাসায় থাকার উপযুক্ত কিনা এটা আগে নিশ্চিত করতে হবে। এতে আপনার অহমে আঘাত লাগলে তার কিছুই করার নেই। আপনি যে যেনে শুনেই বাসাটা ভাড়া নিতে গিয়েছেন এটা তার মাথায় আসে না। যদি তিনি সন্তুষ্ট হন তখন তিনি তার নির্ধারিত ভাড়া এবং শর্তাবলীর কথা জানাবেন। আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন। মাত্রই যে ভাড়াটিয়া বাসাটা ছাড়লেন তিনি যে ভাড়া দিতেন তার থেকে ভাড়ার অংকটা কম করে হলেও এক পঞ্চমাংশ বেরে গেছে। যা স্থানভেদে পূর্বের ভাড়ার এক তৃতীয়াংশও হতে পারে। অর্থাৎ কমপক্ষে ৫০০০টাকার স্থলে ৬০০০, ১০০০০টাকার স্থলে ১২০০০থেকে ১৩০০০, ১৫০০০ টাকার স্থলে ১৮০০০ টাকা। এই ভাড়া বৃদ্ধি যে, ভাড়াটে বদল হল বলে। তা কিন্তু নয়। এ যন্ত্রণা প্রতি বছর অন্তত একবার হলেও ভাড়াটিয়াদের ভোগ করতে হয়। এ তো গেল মূল ভাড়া। এর সাথে বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, পানির বিল আলাদা। মজার বিষয় হল প্রতিমাসে বাড়ীওয়ালা আপনার কাছে একটি নোট পাঠাবেন যাতে বাড়ী ভাড়ার সাথে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা বিদ্যুৎ বিল, ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পানির বিল এবং ৪৫০/- টাকা গ্যাস বিলের হিসাব করে মোট টাকার একটি হিসেব দেয়া থাকবে। কিন্তু কোন বিল কপি দেয়া থাকবে না। যদি আপনি বিলের কপি চান তাহলে ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করবেন, আপনি কি আমায় বিশ্বাস করছেন না?

এখন আপনার উভয় সংকট। বাড়ীওয়ালাকে ক্ষেপীয়ে তার বাসায় থাকতে পারবেন? পারবেন না। আপনাকে বিদ্যুতে মারবে, পানিতে মারবে, পারলে দু একটা অপবাদও দিয়ে দিতে পারবে। তখন মানে মানে সরে যাওয়াটাই হবে আত্মরক্ষার উত্তম কৌশল। এবার হিসেব করে দেখুন আপনি আপনার বেতনের দুই তৃতীয়াংশ খরচ করছেন বা করতে বাধ্য হচ্ছেন বাড়ী ভাড়া দিতেই। এটা কি গলাকাটা ছাড়া আর কিছু? এরপরে আসুন শর্তাবলীতে, সব বাড়ীওয়ালাই প্রশ্ন করেন পরিবারের সদস্য সংখ্যা কত। বলাই বাহুল্য যত কম হবে ততই মঙ্গল। এর পড়ে তিনি যখন যানতে চান মেহমান কেমন আসবে। তখন কি করে সহ্য করবেন? করতে হবে। কারণ আপনি ভাড়াটে। আর বাড়ীওয়ালার দৃষ্টিতে যারপরনাই এক বাঁদর। নিতান্ত মহৎ বলেই তিনি থাকতে দিয়েছেন। অথচ আপনার ঘাম ঝরানো টাকায় তিনি আয়েশ করে বেড়ান। এই যে অনাচার দেখার কে আছে? আছেন, আপনি জানেনই না। ভাড়াটিয়াদের রক্ষা‍য় আইন আছে। যে আইন সম্পর্কে দুপক্ষের কেউই জানেন না। যারা জানেন তারা এটাও জানেন আইনের আশ্রয় এ দেশে কতটা মেলে!! শেষে না মাথাগোঁজার ঠাইটুকুও হাঁড়াতে হয়। আরও আছেন; ঢাকায় এখন মোট ১০ জন সহকারী জজকে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রক হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া আছে। যারা বাড়ির মালিক বা ভাড়াটের দরখাস্তের ভিত্তিতে মানসম্মত ভাড়া নির্ধারণ করতে পারবেন। জজ আদালতে এ ধরনের এলাকাভিত্তিক নিয়ন্ত্রক আছেন। আপনি ভাড়াটিয়া আপনি কি জানেন? জানেন না। বোধকরি তারাও চান না এই তথ্যটি কোটি ভাড়াটিয়া জানুক। সরকার হয়ত মুখ রক্ষার্থেই তাদের দায়িত্ব দিয়েছেন। কোন কাজ করতে নয়। নয়ত দেড় কোটি মানুষের এই শহরে পাঁচ-ছয়জন নিয়ন্ত্রক কেন? কি করবেন তারা? বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনে বলা হয়েছে কোনও বাড়ীওয়ালা ভাড়াটের কাছে জামানত বা কোনও টাকা দাবি করতে পারবেন না। এক মাসের বেশি অগ্রিম ভাড়া নেওয়া যাবে না। প্রতি মাসে ভাড়া নেওয়ার রসিদ দিতে হবে, নইলে বাড়িওয়ালা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। দুই বছর পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো যাবে না। কেউ অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে দ্বিগুণ অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আপনি যদি এই আইনের কথা বলতে যান নিশ্চিত থাকুন বাড়িভাড়া আপনি পাচ্ছেন না। কারণ এর একটিও বাড়ীওয়ালারা মানেন না। আইন অনুযায়ী, ভাড়াটে বাড়িতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়িওয়ালার সঙ্গে চুক্তি করবেন। ভাড়া কত টাকা, কত বছর পর ভাড়া বাড়বে—এসবই উল্লেখ থাকবে চুক্তিতে। বাড়িওয়ালা চুক্তি না করলে ভাড়াটে তাঁকে আইনি নোটিশ দিতে পারবেন। আপনি কি এই চুক্তি করেছেন? করেন নি। দেখুন করতে পারেন কিনা!!

বাড়ীওয়ালারা ইদানীং নিজেদের জমিদার বলে পরিচয় দিতে শুরু করেছেন। এতে নাকি তাদের সম্মান বারে। আমি বলি শুধু সম্মান নয়। তাদের স্ট্যাটাসও বাড়ে আর সেইসাথে আচরণগত মিলও খুঁজে পাওয়া যায়। আপনি যদি ভাড়াটে হন- • আপনাকে সারাক্ষন তটস্থ থাকতে হয় কখন আপনার বাচ্চা খেলতে গিয়ে শব্দ করে ফেলল। বাড়ীওয়ালার শান্তিতে ব্যাঘাত ঘটাল। • রাতে ঘুমাতে যাবেন মশার যন্ত্রনা, মশারী খাটাবেন কি করে, পেড়েক ঠুকতে মানা। • মাঝরাতে জরুরী প্রয়োজনে বাহিরে যেতে হবে। অথবা কোন আত্নীয় এসেছেন কলাপসিবল খুলে ঘরে নিয়ে আসবেন। কি করে আনবেন চাবি তো নেই। অপরাধীর মত বাড়ীওয়ালার কাছে গিয়ে চাবি চাইতে হবে। যদি তিনি দয়া করে দেন, পাবেন। না দিলেও কিছু করার নেই। • বাড়ি ভাড়া নিয়ে দেখলেন শাওয়ার কাজ করছে না। অথবা দরজার একটি পাল্লা নড়বড়ে। বাড়ীওয়ালাকে বললেন। তিনি অনেক ব্যস্ত। অগত্যা নিজের ব্যবস্থা নিজেই করুন। • আমি এক বাড়ীওয়ালাকে জানি যিনি সর্বদাই তার বাসায় টু – লেট লেখা একখানা নোটিশ ঝুলিয়ে রাখেন ভাড়া নেয়ার জন্য কেউ এলে বর্তমান ভাড়ার চেয়ে ১০০০ টাকা বাড়ীয়ে বলেন, এখন যারা আছেন তারা তো ১১০০০টাকা দেন আপনিও তাই দিয়েন।

যদি জানতে চান বর্তমান ভাড়াটিয়া বাড়ী ছারছেন কেন। তখন তার হাজারটা দোষ দেখিয়ে বলবেন। ওদেরকে আর রাখব না। যদি আপনি ঐ ভাড়ায় থাকতে সম্মত হন তাহলে তিনি বর্তমান ভাড়াটিয়াকে বলবেন আগামী মাস থেকে ভাড়া ১০০০ বেশি দিতে হবে অথবা বাসা ছাড়তে হবে। উনি এভাবেই বাসা ভাড়া বাড়ান। এ ছাড়াও যে কত ধরনের নির্যাতন সইতে হয় তা ভুক্তভোগীমাত্রই জানেন। যার ফিরিস্তি দিলে শেষ হবার নয়। বাড়ির মালিকের এহেন অমানবিক এবং বেআইনি কর্মকাণ্ডে ভাড়াটেরা প্রতিনিয়ত চরমভাবে নিগৃহীত হচ্ছেন। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ বছরে (১৯৯০-২০১১) ঢাকা শহরে বাড়ি ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৩৫০ শতাংশ। আর ২০১০ সালের তুলনায় ২০১১ সালে বাড়িভাড়া বেড়েছে ১৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ। লাগামহীন এই বাড়ি ভাড়ায় মানুষের জীবন বিপর্যস্ত।

ঢাকা সিটি কর্পোরেশন যদি সব বাড়ির হোল্ডিং কর নির্ধারণ করে দিতে পারে তারা কেন ঐ বাড়ীর প্রতিটি ফ্লাটের বা ইউনিটের ভাড়া নির্ধারণ করে দেন না? সিটি কর্পোরেশন ইচ্ছে করলেই বাড়ীওয়ালাদের এই অত্যাচার থেকে ভাড়াটেদের খুব সহজেই রক্ষা করতে পারে । কিন্তু করছে না। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনও সরকারই উদ্যোগ নেয়নি। জাতীয় ভোক্তা অধিকার আইনেও বাড়িভাড়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়নি। কারণটা কি? অথচ ঢাকার মোট অধিবাসীর ৯০ শতাংশই ভাড়াটে। কিন্তু সরকার ভাড়াটেদের ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন। ভাড়াটিয়ারা কি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী যে রাষ্ট্রের কোন দ্বায় দায়িত্ব নেই? ক্যাবের জরিপ অনুযায়ী, ১৯৯০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা শহরে বাড়িভাড়া বেড়েছে প্রায় ৩২১ দশমিক ০৬ শতাংশ। জরিপে বলা হয়েছে, ১৯৯০ সালে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির হার ছিল ২৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ, ১৯৯১ সালে ২১ দশমিক ৬৫, ১৯৯২ সালে ১৩ দশমিক ৪৩, ১৯৯৩ সালে ১২ দশমিক ১৬, ১৯৯৪ সালে ১৬ দশমিক ৪৪, ১৯৯৫ সালে ২২ দশমিক ৬১, ১৯৯৬ সালে ১৭ দশমিক ৮৬, ১৯৯৭ সালে ১৫ দশমিক ০৩, ১৯৯৮ সালে ১৪ দশমিক ০৯, ১৯৯৯ সালে ১৮ দশমিক ২৪, ২০০০ সালে ১৫ দশমিক ০৮, ২০০১ সালে ১৭ দশমিক ৪০, ২০০২ সালে ১৩ দশমিক ৪৯, ২০০৩ সালে ৮ দশমিক ৪০, ২০০৪ সালে ৯ দশমিক ৯৬, ২০০৫ সালে ৭ দশমিক ৮৯, ২০০৬ সালে ১৪ দশমিক ১৪, ২০০৭ সালে ২১ দশমিক ৪৮, ২০০৮ সালে ২১ দশমিক ০৭, ২০০৯ সালে ১৪ দশমিক ৮৫ এবং ২০১০ সালে ২০ দশমিক ২৭ শতাংশ বাড়িভাড়া বেড়েছে। বেশির ভাগ বাড়িওয়ালাই বাড়িভাড়া বাড়ানোর কারণ দর্শাতে গিয়ে বলেন অস্বাভাবিকভাবে নিত্যব্যবহার্য পণ্য, বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার কথা। সেটা কি শুধু বাড়ীওয়ালাদের বেলায়ই বেড়েছে? ক্যাবের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভাড়া দিতে দেরি হলে রাজধানীর ২৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ বাড়িওয়ালা ভাড়াটেদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। ভাড়াটিয়ারাই ভাল জানেন এর পরিমান অনেক বেশি। গৃহহীন মানুষের তুলনায় বাড়ির সংখ্যা কম হওয়ায় বাড়িওয়ালারা ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়াচ্ছেন। বাড়ছে ভাড়াটিয়াদের দুর্ভোগ। এর সমাধানে প্রয়োজন আশু পদক্ষেপ গ্রহণ। আর তাই বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ চাই এবং তা এখনই।

সুত্রঃ প্রথম আলো।