ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

 

আসুন আমরা ধন্যবাদ জানাই আমাদের সৃষ্টিকর্তাকে, আমাদেরকে অমিত সহ্য ক্ষমতা দানের জন্য। যদিও দিন দিন আমরা একটু একটু করে ক্ষয়ে যাচ্ছি। তবু তো বেচে বর্তে আছি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শক্তির বিচারে, কর্মক্ষমতার বিচারে কিংবা সুস্থতার বিচারে ক্রমশ: নিচের দিকেই নামছে সূচক। ক্রমশই কমে আসছে জীবনীশক্তি। এর সত্যতা বিচারে কোথাও যেতে হবে না। আপনার প্রপিতামহ, পিতামহ, পিতা এবং আপনি । চার পুরুষের দৈহিক শক্তি, কর্মক্ষমতা, সুস্থতার তুলনামূলক চিত্র আঁকুন। সম্ভবত আমার সাথে একমত হবেন। কিন্তু এর কারণটা কি? আমাদের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ছে। জীবনমান উন্নত হচ্ছে। মাছ-মাংস, শাকসবজি, ফলমূল এর সরবরাহ বাড়ছে। আমাদের খাবারের মেনুতে যোগ হচ্ছে দেশি বিদেশি নিত্য নতুন আইটেম তবু কেন এই অবস্থা?

আসুন একটু তলিয়ে দেখি: কোন গবেষণা নয়, খোলা চোখে দেখি গাঁটের টাকা খরচ করে প্রতিদিন কতটুকু “আমি জেনেশুনে বিষ করেছি পান”।

*আমরা মাছের সাথে, ফলের সাথে খাচ্ছি ফর্মালিন, কার্বাইড এটা কোন নতুন তথ্য নয়।
*মুড়ির সাথে খাচ্ছি ট্যানারির বিষাক্ত রাসায়নিক সোডিয়াম হাইড্রা সালফাইড যা মুড়িকে সাদা করতে প্রয়োজন, খাচ্ছি রাসায়নিক সার যা মুড়ির দানাকে বড় করতে প্রয়োজন।
*জিলাপির সঙ্গে মবিল যা জিলাপিকে দীর্ঘক্ষণ মচমচে রাখতে দরকার।
*রমজানে বেগুনি, পিয়াজ, চপ ছাড়া ইফতার কি সম্ভব? মোটেই না। তাই অসংখ্যবার ব্যবহৃত ভোজ্য তেলে ভাজা সুস্বাদু ঐ সব খাবারের সাথে খাচ্ছি রাস্তার ধুলাবালি, নোংরা। খাচ্ছি কেমিক্যাল রঙ। যেখানে ৩০০ টাকায় এক কেজি টেক্সটাইল কালার মেলে সেখানে ১০,০০০হাজার টাকা খরচের কি কোন মানে হয়? যেখানে দেখারই কেউ নেই।
*সোডিয়াম সাইক্লামেট নামটি শুনেছেন কখনো? স্যাকারিন? সুকরালেস? শোনেননি? এসবই আপনাকে খাচ্ছেন মিষ্টি জাতীয় দ্রব্যের সাথে।
*১নং খাটি গাওয়া ঘি (পুরোটাই ভেজাল) তৈরি হয় ঢাকারই চিহ্নিত কয়েকটি স্থানে। যা ছাড়া আমাদের চলেই না!
*হলুদ-মরিচের গুড়ায় ইটের গুড়া,
*ধনিয়ার সাথে কাঠের গুড়া,
*পোকা যুক্ত ডালের বেসন। এগুলো পুরনো খবর।

নতুন খবর হল : মুগদাপাড়ায় মুহিত হোটেলে মাংসের উচ্ছিষ্ট আর পরিত্যক্ত ডাল দিয়ে তৈরি হালিম বেচাকেনা নিয়ে নানা ঝুট-ঝামেলা হচ্ছে প্রতিদিন।

আরেকটি চমকপ্রদ খবর হল : বাসাবো টেম্পো স্ট্যান্ডে মুরগির গিলা-কলিজা দিয়ে তৈরি মামা হালিম কেনাবেচা চলে মাত্র ১০ টাকা বাটি। সন্ধ্যার আগে সেখানে ক্রেতার দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। প্রশ্নটা হল মুরগীর মাংসটা হালাল-তো!

খাদ্য পরীক্ষাগারের দুরাবস্থা: এই অনিয়ম ঠেকানোর দায়িত্ব যাদের কাঁধে রাজধানীর সেই খাদ্য পরীক্ষাগারের রয়েছে কয়েক রুমের একটি ভবন, হাফ ডজন কর্মকর্তা-কর্মচারী, পরীক্ষার যন্ত্রপাতি নামের কিছু লক্কড় ঝক্কর লোহা লক্কড়। যেখানে শুধুমাত্র দুগ্ধজাত ও চর্বিজাতীয় খাদ্যপন্যগুলোই পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। এই প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্য বিভাগের রয়েছে সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। যাদের মূল কাজ হল রাজধানীর অলি-গলি, কলোনি-বস্তিতে গড়ে ওঠা ছোট বড় হোটেল-রেস্তোরাঁর তালিকা ধরে ধরে প্রতিটিতে হাজির হয়ে মাসোয়ারার টাকা নিয়ে আসা। আর এই মাসোয়ারা পেতে সমস্যা হলেই তারা ঠুকে দেন মামলা। এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে ডিসিসির স্বাস্থ্য পরিদর্শকেরা মাঝে মাঝে নকল ও ভেজাল পণ্য জব্দ করলেও তা কখনোই স্বাস্থ্য বিভাগের পদস্থ কর্মকর্তা পর্যন্ত না গিয়ে বিক্রি হয়ে চলে যায় অন্য কোন প্রতিষ্ঠানে। শেষ পর্যন্ত ভোক্তার রান্নাঘরে। এই অবস্থায় ডিসিসির স্বাস্থ্য বিভাগটি রাখা না রাখা সমান কথা কারণ হাফ ডজন কর্মকর্তা-কর্মচারী আর গোটা দশেক স্বাস্থ্য পরিদর্শক থাকা আর না থাকা সমান কথা। ডিসিসির স্বাস্থ্য বিভাগ বলবে চিঠি দিয়েও পুলিশি সহায়তা পাওয়া যায়নি, আর ডি এম পি বলবে তারা পুলিশি সহায়তা চেয়ে চিঠি লেখে ঠিকই কিন্তু তারিখ সময় স্থানের উল্লেখ থাকে না। এতে যে শুধু তাদের কর্মকাণ্ডের সমন্বয়হীনতাই ফুটে ওঠে তাই নয় সেইসাথে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাদের চরম অবহেলা, গাফিলতি।

চলমান ভেজাল বিরোধী অভিযানও লোক দেখানো বৈ আর কিছু নয়। মাঝে মাঝে টেলিভিশন ক্যামেরা সাথে নিয়ে ভেজাল বিরোধী অভিযান চালানো যে নিজেদের হাইলাইটেড করার প্রয়াসমাত্র তা সহজেই অনুমেয়। আর এ সব অভিযান যে এই ভয়াবহ খাদ্য সন্ত্রাসীদের রুখতে কোন ভূমিকাই পালন করতে পারে না তা বলাই বাহুল্য। এ ক্ষেত্রে আমাদের সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা ডিসিসির স্বাস্থ্য বিভাগ যে খুব উদ্বিগ্ন তাও ভাবার কোন কারণ নেই। তাই আসুন আমরা সর্বশক্তিমানের কাছে এই কামনা করি তিনি যেন আমাদের শরীরকে সর্বংসহা করে দেন। আর বিবেককে করেন বিকল।

kmgmehadi@yahoo.com

তথ্যসূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন। প্রকাশঃ ২৭।৭।১২ইং।