ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

 

বাংলাদেশে তথ্য-প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা আশাব্যাঞ্জক। চলমান এই গতিশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারিভাবে বিভিন্ন কার্যক্রমও হাতে নেয়া হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে আইসিটি বাদ দিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ অকল্পনীয়। এক্ষেত্রে সম্পদের প্রয়োজনীয়তা অনেক কম থাকায় দেশের বিশাল অলস শ্রমকে প্রযুক্তির সাথে সম্পৃক্ত করা গেলে আইসিটিতে অগ্রগামী দেশগুলোর তালিকায় আমাদের দেশের অবস্থান ইর্ষনীয় উত্তরণ ঘটানো সম্ভব।

সরকার চেষ্টা করছে খুব কম সময়ের মধ্যেই পুরোপুরি ই-গভর্নেন্সের আওতায় চলে আসার। অর্থাৎ অচিরেই আমরা সম্পূর্ণ রূপেই সাইবার জগতে প্রবেশ করতে যাচ্ছি।

ব্যক্তিগত এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ইতিমধ্যেই ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিডি-সিএসআইআরটি’র গত ৩১ মার্চ ১২ইং পর্যন্ত তথ্য সংবলিত দেশভিত্তিক রিপোর্টে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দেখানো হয়েছে ১৪ লাখ ২৯ হাজার ২০০ জন প্রকৃতপক্ষে এর সংখ্যা অনেক বেশি। এ ছাড়া রয়েছে সেল ফোনে অসংখ্য ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। ইতিমধ্যে বেশ কিছু সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমা কোম্পানি ইন্টারনেটের মাধ্যমে জনগণকে সেবা দেওয়ার কর্মসূচি চালু করেছে। হয়ত অচিরেই উন্নত বিশ্বের মত আমরাও আইসিটি নির্ভর হয়ে যাব। কিন্তু সে অনুযায়ী এর অপব্যবহারের দিকটি নিয়ে কতটুকু সচেতন আমরা?

সাইবার অপরাধের রকমফেরঃ

সকল সম্ভাবনারই সাথে থাকে সমস্যার ভ্রুকুটি। তেমনি অপার সম্ভাবনার আইসিটির কলঙ্ক তিলক সাইবার অপরাধ। আর তাই তথ্যপ্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান এই অগ্রগতির সাথে সাথে এর অপব্যবহার তথা সাইবার অপরাধ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও তা নিয়ন্ত্রণে সামর্থ্য অর্জনে সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন। যদিও (বিডি-সিএসআইআরটি) বিশেষজ্ঞদের গবেষণা অনুযায়ী সাইবার হুমকির দিক দিয়ে বাংলাদেশ এখনো গ্রিন লেভেলে রয়েছে। তথাপি সরকার ইতোমধ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (সংশোধন) আইন-২০০৯ এবং জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালা-২০০৯ অনুমোদন করেছেন।

সাইবার অপরাধের ক্ষেত্র অনেক বড়। এর স্বীকার হতে পারে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার গোপন নথিপত্র থেকে শুরু করে ব্যাংক-বীমার মত আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তিগতভাবেও যে কেউই এর স্বীকার হতে পারেন। আমেরিকা-ইউরোপের উন্নত দেশগুলোতে ঘটছে ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাক’ থেকে শুরু করে বিভিন্ন অফিসের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরি, নানান সব ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়ে কম্পিউটার বা কোন অফিসের পুরো কম্পিউটার প্রোগ্রামিং সিস্টেমকে বিকল করে দেবার মতো মারাত্মক ঘটনা। সাইবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে অনলাইন ব্যাংকিং।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইর আইসিটি বিশেষজ্ঞদের মতে সাইবার অপরাধীরা সাধারণত চার ভাগে বিভক্ত।
এক- প্রতিষ্ঠানের আভ্যন্তরীণ লোক,
দুই-প্রতিষ্ঠানের বাহিরের বা অনুপ্রবেশকারী,
তিন-ভাইরাস সৃষ্টিকারী
চার-বিভিন্ন অপরাধী চক্র।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বর্তমান বা সাবেক কর্মচারীরা লোভে পড়ে বা অর্থের জন্য প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত দুর্বলতাগুলো হ্যাকারদের কাছে প্রকাশ করে। হ্যাকাররা তাদের কারিগরি জ্ঞান ব্যবহার করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কের পাসওয়ার্ড ভেঙ্গে প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ বা প্রয়োজনীয় তথ্য সরিয়ে নেয়। যা কখনো কখনো একটি প্রতিষ্ঠানের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিতে যথেষ্ট।

তবে ভাইরাস সৃষ্টিকারীরা আর্থিক লোভে এ সব করেনা। তারা মূলত কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে এবং কখনো কখনো বিকৃত মানসিকতা থেকেই এসব করে থাকে। এটা এমনি একটি অপরাধ যা সংগঠিত করা যায় বিশ্বের যে কোন প্রান্তে বসে, যে কোন অবস্থান বা ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে। অনেকটা বায়বীয় হওয়ায় এর আলামত সংগ্রহও অসম্ভব। ফলে অপরাধী শনাক্ত করা এবং আইনের হাতে সোপর্দ করা খুবই দূরহ। সেইসাথে আমাদের দেশের পুলিশ প্রশাসনের কারিগরি জ্ঞানের তুলনায় এইসব সাইবার অপরাধীরা অনেক বেশি আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তিগত জ্ঞানসম্পন্ন।
আমাদের দেশের সাইবার অপরাধের বর্তমান চিত্র:
• মোবাইলে চাঁদাবাজি-ভয়ভীতি প্রদর্শন,
• অশ্লীল বার্তা প্রেরণ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
• মাঝে মাঝেই ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির মত সাইবার অপরাধের কথা শোনা যায় ।
• ফেসবুকে অন্যের নাম এবং ছবি ব্যবহার করে ভুয়া প্রোফাইল খোলে অশ্লীল ছবি এবং বিভিন্ন পর্ণ-সাইটের লিংক দেয়ার মত সাইবার অপরাধ এ দেশে অনেকদিন ধরেই চলছে।
• স্বনামখ্যাত মডেল প্রভার বিষয়টি তোলপাড় তোলে সারা দেশে। এর রেশ মিটতে না মিটতেই আরও কয়েকটি একই ধরনের সাইবার অপরাধ সংগঠিত হয়। আশ্চর্যজনক বিষয় হল প্রতিটি ঘটনাকে স্ক্যান্ডাল বলে চালিয়ে দেয়া হয়। যা অপরাধীকেই প্রশ্রয় দেয়ার শামিল।
• সম্প্রতি একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা যায় ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় এক স্কুলছাত্রীর বেলায়। প্রেমের সম্পর্কে অবনতি ঘটায় ছেলেটি প্রতিহিংসা বশত কাজটি করেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মেয়েটির বাবা মামলা করলেও মূল আসামি এখনো ধরা পড়েনি।
• কয়েকদিন পূর্বে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার দেয়াড়া নতুন বাজার থেকে আমিনুর রহমান ওরফে বাবলা নামে একজনকে গ্রেফতার করে ৩ দিনের পুলিশ রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি দুইজন নারী মন্ত্রীর মুখের ছবির সঙ্গে অন্যের নগ্ন ছবির নিচের অংশ লাগিয়ে আপত্তিকর ছবি তৈরি করে তা এলাকায় বিভিন্ন মানুষের মোবাইল ফোনে এমএমএস করে পাঠাচ্ছিলেন।

বোঝাই যাচ্ছে আমরা কতটা সাইবার অপরাধের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছি।

সাইবার অপরাধের প্রতিরোধে সরকারি উদ্যোগ:

সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে সহায়তার জন্য সরকারি উদ্যোগে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) অধীনে ২৫ জানুয়ারি ২০১২ ইং তারিখে বিভিন্ন মোবাইল ফোন অপারেটর, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (আইএসপি), পিএসটিএন, ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে ও সাইবার ক্যাফের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে, বাংলাদেশ কম্পিউটার সিকিউরিটি ইন্সিডেন্ট রেসপন্স টিম (বিডি-সিএসআইআরটি) গঠন করা হয়েছে। বিশেষ দলটি রাষ্ট্র, সমাজবিরোধী বিভিন্ন ওয়েবসাইট শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কাজ করছে। এ-সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য ও পরামর্শ নতুন এই ওয়েবসাইটটির মাধ্যমে পাওয়া যায়। কম্পিউটার ও সাইবার অপরাধ বিষয়ে সহায়তা ও পরামর্শের জন্য- http://www.csirt.gov.bd/ ঠিকানায় যোগাযোগ করা যাবে আর contact@csirt.gov.bd ঠিকানায় মেইল করা যাবে।

সরাসরি যোগাযোগের ঠিকানা-
Bangladesh Computer Security Incident Response Team (BD-CSIRT) IEB Bhaban (5th Floor) Ramna, Dhaka 1000 Tel: +880 2 7162277 ext. 444 (9:00 am – 5:00 pm BST on working days; on call for emergencies during other hours and on weekends and holidays) Mobile: +880 1552202768 Fax: +880 2 9556677 E-mail: contact@csirt.gov.bd (Before reporting an incident please visit the link Incident Reporting for more details)

সব ধরনের সাইবার অপরাধের শিকার যেকোনো ভিক টিমের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা করেই সমস্যা অনুযায়ী এখান থেকে পরামর্শ দেয়া হয়। জানা যায় কিছুদিন আগে একটি মেয়ে জানায়, তার প্রেমিক তার অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিয়েছে।

তখন এখান থেকে পরামর্শ দেয়া হয়- তার জন্য দুটি দিক আছে।

প্রথমত, মেয়েটি চাইলে আইনের শরণাপন্ন হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ইন্টারনেট থেকে সেসব ছবি ও ভিডিও তারা মুছে ফেলতে পারে।

মেয়েটি দ্বিতীয় সুযোগটি বেছে নেয়। তবে এ ক্ষেত্রে ইংলিশ প্রবচনটি বেশি যৌক্তিক- “প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর” এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যাতে না ঘটতে পারে সে জন্য আগে থেকে সচেতন থাকাই যুক্তিযুক্ত। সেই সাথে এটাও মনে রাখা উচিৎ সাধারণ মেলামেশা কখনোই কেউ ভিডিওতে ধারণ করেনা। আর করলেও তা খুব বেশি বিপদ ডেকে আনে না। যে পর্যায়ের ঘটনাগুলো বিপদের কারণ হতে পারে সে ধরনের অনৈতিক সম্পর্কে জড়ানো আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যারা আধুনিকতা বা নান্দনিকতার দোহাই দিয়ে এ সব জায়েজ করার চেষ্টা করেন তারা হয় নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য করছেন নয়ত আগে পিছে চিন্তা না করেই করছেন।

সাইবার অপরাধের প্রতিরোধে বর্তমান আইন-
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (সংশোধন) আইন-২০০৯ এর ৮ম অধ্যায়ে (ধারা ৫৪ থেকে ৮৪) কম্পিউটার সম্পর্কিত অপরাধ, তদন্ত, বিচার ও দণ্ড ইত্যাদি বিষয়ে বিশদ নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এই আইনের ৭৬নং ধারা অনুসারে-

‘অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা (১) ফৌজদারি কার্যবিধিতে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, নিয়ন্ত্রক বা নিয়ন্ত্রক হইতে এতুদদ্দেশ্যে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোন কর্মকর্তা বা সাব-ইন্সপেক্টরের পদমর্যাদার নিম্নে নহেন এমন কোন পুলিশ কর্মকর্তা এই আইনের অধীন কোন অপরাধ তদন্ত করিবেন।

(২) এই আইনের অধীন অপরাধসমূহ অ-আমলযোগ্য (non-cognizable) হইবে।’
এ আইনের সঠিক উপস্থাপন ও আইনের বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা অপরিহার্য। যা সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে।

তথ্য সূত্র: ডয়ে-চ এ ভেলে, খুলনা নিউজ.কম, বিডি-সিএসআইআরটি এবং অন্যান্য।