ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

যাকাতের কাপড় বলতে কি বোঝায়, বলতে পারেন?
এখানে সুলভে যাকাতের কাপড় পাওয়া যায়?
কখনো দেখেছেন সে কাপড়?
তা কি পরিধানের যোগ্য?

ইসলামী শরীয়তের পাঁচটি ভিত্তির অন্যতম হল যাকাত। ইসলামে এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম, মহান আল্লাহ-তায়ালা যেখানেই নামাজের কথা বলেছেন সেখানেই যাকাতের কথাও উল্লেখ করেছেন। শরীয়তের পরিভাষায় যাকাত হল ধনীর সম্পদের ওপর গরিবের আল্লাহ প্রদত্ত অধিকার।

তাই যদি হয় তাহলে সেই গরিবের হককে নিজেদের ইচ্ছেমত নষ্ট করার অধিকার কি আমাদের আছে? নষ্ট করার কথা বলছি এজন্য, কারণ যাকাতের কাপড় বলতে যে কাপড়কে বোঝানো হয়। তা তৈরি হয় সবথেকে নিকৃষ্ট মানের সুতা দিয়ে। যে সুতা গামছা তৈরিতেও ব্যাবহার করা হয় না। স্বাভাবিকভাবেই দু/একবার ধৌত করার পর তা আর পরিধানযোগ্য থাকে না। তার মানে যিনি এটা ক্রয় করলেন এবং যিনি পেলেন কেউই লাভবান হলেন না। টাকাটাই বৃথা গেল। এখন কথা হল। আমরা নিজেদের জন্য যখন যা কিছু ক্রয় করি, আমাদের মূল লক্ষ থাকে ক্রয়কৃত পণ্যটি কতটা বেশি সময় ধরে ব্যাবহার করা যায় অর্থাৎ পণ্যের মান। অথচ এ ক্ষেত্রে লক্ষ থাকে পণ্যের মান যাই হোক না কেন কত কম মূল্যে বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়।

তার কারণ হল বেশি লোককে দেয়া যাবে। লোকজন বলবে আপনি এত পিস কাপড় দান করেছেন। এটা কি দান করার বিষয়?

দানের কোন বাধ্যবাধকতা থাকেনা। যাকাতের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এমনও দেখা যায় কয়েকদিন ধরে মাইকিং করা হয়। অমুক বাড়িতে এত তারিখ যাকাতের কাপড় দেয়া হবে। সকাল থেকে অভাবী মানুষ এক বুক আশা নিয়ে অপেক্ষায় থেকে সন্ধ্যায় যে কাপড়খানা পায় তার বাজার মূল্য, তার সারাদিনের মজুরীর অর্ধেক। এই মানুষগুলো কাউকে ধোঁকা দিতে শেখেনি। আর তাই আমাদের যাকাত প্রদানকারীদের ধোঁকা তারা বুঝতেও পারেনা। সবথেকে মর্মান্তিক বিষয়, যখন এই যাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে মানুষ পদপিষ্ট হয়। এমন কি মৃত্যুবরণ করে। তারপরেও আমাদের বিবেক জাগ্রত হয় না। যাকাত প্রদানের নামে আপনি সুনাম কুড়ানোর চেষ্টা করবেন। এটা কি কখনো বৈধ হতে পারে?

দয়া করে যাকাত দেয়ার নামে এই প্রহসন বন্ধ করুন। আমি ইসলামি স্কলার নই। তবে সাদামাটা ভাবে যা বুঝি তা হল যাকাত প্রদানের উদ্দেশ্য হল, কাউকে বা সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু লোককে, আয়ের উৎস তৈরি করে দেয়া। যাতে পরবর্তীতে তাদের আর কারো কাছে হাত পাততে না হয়। হতে পারে একদিন তারাই আবার অন্যকে যাকাত প্রদান করে স্বাবলম্বী করে তুলবেন।
ধরুন আপনি এ বছর ১ লক্ষ টাকা যাকাত দিবেন। আপনি যদি প্রত্যেকের জন্য শাড়ি/লুঙ্গী এবং নগদ অর্থ সব মিলিয়ে ৫০০ টাকা করে নির্ধারণ করেন। তাহলে ২০০জনকে দিতে পারবেন। যা তাদের কোন কাজেই আসবে না। অথচ এই এক লক্ষ টাকা যদি ১জন বা ২জনকে দিতেন তারা ঐ টাকা দিয়ে কেউ ঋণমুক্ত হতে পারতেন, কেউ ছোট একটি ব্যবসা শুরু করতে পাড়তেন, কেউ চিকিৎসা করাতে পারতেন। টাকাটা কাজে লাগত। যাকাত প্রদানের উদ্দেশ্যও সফল হত। যদি যাকাতের অর্থের পরিমান ৫০,০০০ হয় যদি ২৫,০০০ হয় তবু তা এমন ভাবে বন্টন করুন যাতে এর গ্রহিতা সর্ব্বোচ্চ লাভবান হতে পারে।

অনেকে বলেন, অনেক লোক আশা করে থাকে একজন দুজনকে দেয়া ঠিক নয়। যারা আশা করে থাকেন তারা যদি জানতে পারতেন আপনি এভাবে তাদেরই কাউকে সাহায্য করেছেন তাহলে নিশ্চয়ই তারাও সাধুবাদ জানাবেন। আর তার থেকে বড় কথা হল, এবাদত হচ্ছে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। তাই এবাদত কখনোই লোক দেখানো হতে পারেনা। কিন্তু যদি যাকাত প্রদান করার পেছনে আল্লাহর সন্তুষ্টি দিকে লক্ষ্য না রেখে বাহবা কুড়ান হয় তাহলে তা নিশ্চয়ই এবাদতের পর্যায়ে পড়ে না। এই হীন মানসিকতার পরিবর্তন করুন।

তারপরেও যারা কাপড়/লুঙ্গীই দিতে চান তাদের কাছে অনুরোধ। যা সাধারণত আপনার বাসার লোকজন পরিধান করে অন্তত আপনার গৃহকর্মীরা যা পরিধান করে তার থেকে নিন্মমানের কাপড় (যাকে আপনি যাকাতের কাপড় বলেন) যাকাত হিসেবে প্রদান করবেন না। যাকাতের অর্থ গরীবের হক যা আপনার কাছে আমানত। আপনি ইচ্ছে করলেই তার খেয়ানত করতে পারেন না।

আজ যিনি যাকাত গ্রহণ করছেন তিনিও মানুষ। তাকে মানুষ বলে ভাবুন। দয়া করে যাকাত প্রদানের নামে প্রহসন করবেন না। কাজি নজরুল ইসলামের গানটি মনে করুন,

“চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়
আজিকে যে রাজাধীরাজ কাল সে ভিক্ষা চায় ………………”

আমরা দেখতে চাইনা যাকাতের কাপড় নামে আলাদা কোন কাপড়, আমরা শুনতে চাইনা যাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে……জন পদপিষ্ট।
রমাদান শরীফ-এর একটি অন্যতম আমল হল যাকাত প্রদান করা। কেউ সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্যের মালিক হলে তার জন্য যাকাত আদায় করা ফরয। আর এই যাকাত গরিবের হক। তা আদায় করুন। যাকাত দেয়া মানে দান করা নয়। যাকাত হচ্ছে গরিবের হক; গরিবের দারিদ্র্য থেকে মুক্তি লাভের মাধ্যম, ভালো জামা-কাপড় পাওয়া তাদের অধিকার। যাকাত দেয়ার নামে নিজেকে উচ্চতায় তোলার চেষ্টা প্রকারান্তরে নিচেই নামিয়ে আনে।