ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

বাংলাভাষায় “ই” বা “আ” প্রত্যয়যোগে যতটা সহজেই নারী নির্দেশিত হয়। ঠিক তত সহজেই কিছু কিছু বহুল ব্যবহৃত শব্দ নারীদের বিশেষণ হিসেবেই উচ্চারিত হয় দ্বিধাহীনভাবে। যেমন নষ্টা, পতিতা, নর্তকী ইত্যাদি। এই শব্দগুলির পুং লিঙ্গ আছে ঠিকই কিন্তু বলতে গেলে একেবারেই অব্যবহৃত। অথচ এর একটি শব্দও পুরুষের অংশগ্রহন ব্যাতীত অর্থপূর্ণ নয়। ব্যাবহারিক দিক দিয়ে প্রতিটিতেই পুরুষের ভূমিকা রয়েছে। শুধুমাত্র ভূমিকা রয়েছে বললে ভুল হবে বরং বলা উচিৎ পুরুষের ভূমিকাই বেশি। তথাপি নারীদেরকে ঘিরেই এর যত ব্যাবহার? এটা কি শুধুই পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থার ফল? নাকি নারীদের অসচেতনতাও এর জন্য বহুলাংশে দায়ী তা আলোচনার দাবী রাখে। বহুল ব্যবহৃত একটি কথা, পাপকে ঘৃনা কর পাপিকে নয়। কথাটি মুখে সবাই বলি ঠিকই কার্য্যক্ষেত্রে উল্টোটা করি। আমরা পাপ করি আর পাপিকে এড়িয়ে চলি। কখনো তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর কথা ভাবিইনা। কেউ নারীর সমস্যা নিয়ে কথা বললে তাকে চিহ্নিত করা হয় নারীবাদী বলে মানবতাবাদী বল নয়। কেন?

কারন নারী মা হতে পারেন ঠিকই কিন্ত বিশেষনবিহীন মানূষ হতে পারেন না। পুরুষেরর এই দাবীয়ে রাখার প্রবনতা হয়ত সভ্যতার শুরু থেকেই কিন্ত আশ্চর্যজনক বিষয় হল মাঝে মাঝেই পুরুষের এই মহৎ কাজের সহযোগী হিসেবে নারীকেই দেখতে পাওয়া যায়। আর তখন খুব সহজেই অনুমিত হয় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নিষ্পেষনের স্বিকার হয়ে নারী আজ নিজেদের অজান্তেই পুরুষের ক্রিড়ানকে পরিনত হয়েছে। পালটে গেছে তাদের আত্নসম্মানের ব্যাখ্যা। তাই হয়ত স্যুটেট-বুটেট কেতাদূরস্ত পুরুষের পাশে মিনি স্কাটে তারা হয় চরম পুলকীত। একবারও এই প্রশ্নটা কেউ করে না সুন্দরী প্রতিযোগীতায় মেকআপম্যান, ফটোগ্রাফার, করিওগ্রাফার এমনকি বিচারকের আসনে পুরুষ কেন। কেন “সুন্দর” এর (পুরুষদের অংশগ্রহনে) প্রতিযোগীতার আয়োজন হয় না? নারী যদি আত্নসম্মানে বলীয়ান হত তাহলেই কেবল এইসব প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারত। আজ তাদের অধিকারের সীমা নতুনভাবে নির্নিত হচ্ছে। তারই প্রমান মেলে যখন দেখা যায়। নেতৃত্বের দিক দিয়ে, সামাজিক অবস্থানের দিক দিয়ে শিক্ষা-দীক্ষায় অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে নারীরা অনেক এগিয়ে এবং সুবিধাজনক অবস্থায় থাকা সত্যেও সামগ্রিকভাবে নারীর বঞ্চনার বিরুদ্ধে তারা ততটা সোচ্চার নন। বরং নিজেদের যাহির করার প্রবনতাই বেশি। এমনকি প্রতিবাদের ভূমিকায় অবতীর্ন হলেও লক্ষ থাকে প্রচার। ফলে প্রতিবাদটিও প্রচার স্বর্বস্বই হয়ে পরে। কাংখিত লক্ষ অর্জন আর হয়ে ওঠে না। আর তাই শত প্রতিকূলতার মাঝেও একজন বেগম রোকেয়ার দেখা মিল্লেও প্রতিকুল পরিবেশেও মিলছে না তার উত্তরসুরী।

আজ আমাদের নারী নেত্রীরা বিচ্ছিন্নভাবে দু’একটি বিষয়ের উপর নামকাওয়াস্তে কিছুটা প্রতিবাদী হলেও তাতে পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। হওয়ার কথাও নয়। কারণ যে কোন পরিবর্তনের জন্য গড়ে ওঠা আন্দোলনের মূল চালিকা শক্তি ভুক্তভোগীরা। এ ক্ষেত্রে আমাদের সমাজের সুবিধাভোগী নারীরা হয়ত তুলনামূলক ভাবে কম নির্যাতনের স্বীকার হন বলেই নারি নির্যাতন নিয়ে মাথাও কম ঘামান। অথচ তারা ইচ্ছে করলেই সুসংগঠিত ভাবে আন্দোলনের সূচনা করতে পারতেন। সে সুযোগও তাদের রয়েছে। অন্যদিকে সমাজের সব থেকে অবহেলিত, দরিদ্র, অশিক্ষিত তথা পশ্চাৎপদরাই নির্যাতনের স্বীকার হন বেশি। কিন্তু তাদের সুসংগঠিত ভাবে আন্দোলনের ক্ষমতা নেই। যদিও তারা এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন সবথেকে বেশি। কিন্তু নেতৃত্বের অভাবে তারা সংগঠিত হতে পারছেন না।

আমাদের সামাজিক ব্যবস্থাটাই এমন যে, এখানে নারীকেই নিগৃহীত হতে হয় নানাভাবে। এসিড সন্ত্রাস থেকে শুরু করে পাচার হয়ে যাওয়া এর সবই নারী কেন্দ্রিক সন্ত্রাস। কারা চালাচ্ছে ? কতিপয় পুরুষ নামের জানোয়ার। প্রতিটি সন্ত্রাসের পেছনে একটি ছোট খাট ইতিহাস থাকে। যা ঘাঁটলে দেখা যায় এর পেছনে হাত থাকে আরও অনেকের। আর এই অনেকের মধ্যে নারীদের অংশগ্রহণের হার একেবারে কম নয়! আমার এই লেখার মূল উদ্দেশ্য নারী নির্যাতনে নারীদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা নয়। বরং এর হাত থেকে মুক্তি পেতে নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন কিন্ত করছেন না। সেটাই আলোচনা করা।

ইদানীং আমাদের সমাজে নারী নির্যাতনের হার বেড়েছে। যার বেশিরভাগই পারিবারিক নির্যাতন। একজন নারী যখন তার শশুড় বাড়ীর লোকজন কর্তৃক নির্যাতনের স্বীকার হন। তখন তিনি যে শুধু পুরুষ কর্তৃকই নির্যাতিত হন। তা নয় বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর সাথে সম্পৃক্ত থাকেন নারীরা। আমাদের দেশে বউ-শাশুড়ি, ননদ-ভাবী’র যুদ্ধ সর্বজনবিদিত। পারিবারিক নির্যাতনের বীজটি এখানেই নিহিত। বউ-শাশুড়ির পারস্পরীক শ্রদ্ধা বোধ এবং মমত্বের যে ঘাটতি, তা কখনোই তাদের মা-মেয়ের সম্পর্কে উন্নীত হতে দেয়না। তেমনি পারস্পরিক আস্থা-ভালবাসার অভাব ননদ-ভাবী’র সম্পর্ককে বোনের মর্যাদায় উন্নীত না করে সাপে-নেউলে করে রাখে। এভাবেই একটি মেয়ে কোন ঘরের বউ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই ঐ পরিবারের সদস্যরা দুটিভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। স্বাভাবিকভাবেই পরের মেয়ে পরই থাকে। সাথে ঘরের ছেলেটাও পর হয়ে যায়। এখানে নির্দিষ্টভাবে কেউই দোষী নয়। দোষ আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির। একই ঘরে শত্রুভাবাপন্ন মানসিকতা নিয়ে থাকার ফলে ঝগড়া বিবাদ নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। যার প্রভাব পড়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কেও। শুরু হয় তাদের মধ্যে মনোমালিন্য। আর তারই সুযোগ নেয় অন্যরা। আর যদি তার সাথে অর্থের লোভ যোগ হয় তাহলে তো কথাই নেই। এক সময় দেখা যায় নতুন বউটি সম্পূর্ণরূপে একা। অভিভাবকহীন, অনিরাপদ। যাকে বহুগুণ নিরাপত্তাহীন করে তোলে আমাদের সামাজিক সংস্কার! যা তাকে বাধা দেয় প্রতিবাদী হতে। বাধা দেয় বাবার বাড়ি চলে যেতে। যদি সে এ দুটোর একটি পথ বেছে নেয় এ সমাজ তখন তাকে অচ্ছুত করে ছারে। যে কারণে সে পরে পরে মার খায়। অথবা স্বীকার হয় আগুনে পুড়ে অথবা বিষপানে বা গলায় ফাঁস লাগিয়ে মৃত্যুর। কিংবা আত্মহত্যা করে জুড়ায় সব জ্বালা।

আমাদের হীন এই সমাজ ব্যবস্থা, মৃতার পরিবারকে একঘরে করে রেখে সেই জানোয়ার রুপী স্বামীর জন্য করে ২য় বিয়ের আয়োজন। গ্রামের পটভূমিতে এই হল পারিবারিক ভাবে নারী নির্যাতনের স্বরূপ। আর শহরে তো প্রায়শই দেখা যায় বিয়ের পর পরই আলাদা হয়ে যায় ছেলে। বউকে নিয়ে বাধে আলাদা সংসার। তখন একটু একটু করে আলগা হতে থাকে সম্পর্কের বাঁধন। যা একসময় ভুলিয়ে দেয় রক্তের এবং নাড়ীর টানও। সন্তান, সংসারের চাপে মা-বাবাকে বাধ্য করে সম্পত্তির ভাগ বুঝিয়ে দিতে। বৃদ্ধ মা-বাবার ঠাই মেলে বৃদ্ধাশ্রমে। গ্রামে মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে যেতে না হলেও শেষ জীবনে তারা খুব একটা ভালও থাকেন না। কেননা এ সময় পুত্রবধূ শোধ নেয়ার চেষ্টা করে পূর্বে সহ্য করা লাঞ্ছনার। কিন্তু কথা হল এর জন্য কি সেই মা-বাবাও দায়ী নন। তারা যদি পুত্রবধূকে মেয়ের আসনে বসাতে পারতেন। ননদ যদি ভাবিকে বোনের আসনে বসাতে পারত। তাহলে তাদের মধ্যে যে পারিবারিক বন্ধন সৃষ্টি হত তা কি কখনো তাদের বৃদ্ধ মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রম মুখী করত?

একজন গৃহবধূ যখন নির্যাতনের স্বীকার হন সেক্ষেত্রে বেশিরভাগ পরিবারের মেয়ে এবং গৃহকর্ত্রীর একটি বড় ভূমিকা থাকে। কখনো কখনো তাদের প্ররোচনাতেই নির্যাতন শুরু হয় এবং নির্যাতনের মাত্রা নির্ণীত হয়। অথচ পুরো চিত্রটা ভিন্ন হতে পারত যদি ঐ পরিবারের মেয়ে এবং গৃহকর্ত্রী ভিন্ন ভূমিকা পালন করতেন। কেননা একই পরিবারে থেকে একজন পুরুষের পক্ষে তার মা ভাই বোন সকলের বিরুদ্ধাচরণ করে স্ত্রী নির্যাতনের সুযোগ খুব একটা পাওয়ার কথা নয়। বিশেষকরে একান্নবর্তী পরিবারে।

নারী নির্যাতন বিরোধী সংগঠনগুলোর পক্ষে হয়ত ঘরে ঘরে গিয়ে এ ব্যাপারে জনসচেতনতা সৃষ্টি সম্ভব নয় তথাপিও তাদের আরও অনেক বেশি জন সম্পৃক্ততার প্রয়োজন রয়েছে। নির্যাতিতা নারীকে সহায়তা প্রদানের প্রয়োজন রয়েছে। সেইসাথে এর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ আরও অনেক বেশি জরুরী। আমাদের সমাজে পারিবারিক নারী নির্যাতন যতটা হয় তার নগণ্য একটি সংখ্যা প্রচারণায় আসে। সামাজিক সম্মান, সংসার টিকিয়ে রাখা বিভিন্ন কারণে অনেকেই এর কথা জানাতে চান না। যার প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী। বিষয়টি আমরা বুঝেও না বোঝার, জেনেও না জানার ভান করে থাকি। হয়ত কার কথা কার কাছে বলব। বা উপরে থুঁ থুঁ ছেটালে নিজের গায়েই পরে। এ ধরনের মানসিকতা থেকেই এই চেপে রাখার প্রয়াস। কিন্তু কথা হচ্ছে এই চেপে রাখার প্রবণতা পরিহার করে সমস্যার সমাধানই কি শ্রেয় নয়?

মা কেন অন্ধ হবেন? ছেলের দোষ তো তিনি জানেন। তিনি কেন তার ছেলের পক্ষ হয়ে পুত্রবধূর সাথে অন্যায় আচরণ করবেন? কেন তিনি এই মেয়েটিরও মা হতে পারবেন না? গর্ভধারিণী মা যেমন তার মেয়েকে আগলে রাখেন মেয়ের সব দোষ ত্রুটি ঢেকে রাখার চেষ্টা করেন পুত্রবধূর বেলায় তিনি কেন সে ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন না?

ঠিক একই ভাবে বিয়ের পরেই ঘরের বউ কেন শশুড়-শাশুড়িকে নিজের মা-বাবা ভাবতে পারেন না? কেন আপন করে নিতে পারেন না? স্ত্রী কেন ভাবতে শুরু করবে তার স্বামী শুধুই তার। পক্ষান্তরে মা-বাবাই বা কেন মুষড়ে পরেন ছেলেটা পর হয়ে গেল এই ভেবে। কেন এই হীনমন্যতা? মানুষ আজ সভ্যতার চরম শিখরে দারিয়ে। এতটা স্বার্থপর কেন হবে। তাহলে এই সভ্যতারই বা কি প্রয়োজন? হিংস্রতা যদি পশুকেও হার মানায়। সভ্যতার ফাকা বুলি আওরে কি লাভ। সর্বোপরি এই হীনমন্যতা এই স্বার্থপরতা আমাদের তো কিছু দিতে পারছে না তাহলে কেন আমরা সেই পারিবারিক মূল্যবোধ সামাজিক দায়বদ্ধতা পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ স্নেহ ভালবাসায় ঘেরা আমাদের সংস্কৃতির সুতিকাগারে ফিরে যাইনা? এই যে সর্ব্বোগ্রাসি অবক্ষয় পরিবার থেকে নিত্য সংক্রমিত হচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। আমরা কি ভেবে দেখেছি। আমাদের এই সংকীর্ণতা ক্রমশ কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। মানুষ যদি মানুষের জন্য না হয় তাহলে মানুষের সাথে জানোয়ারের তফাৎটা থাকল কোথায়?