ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান তার জীবনে অনেক অন্যায় করেছেন! যার প্রথমটি হল একটি জাতিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখান, ব্যক্তিগত স্বার্থকে উপেক্ষা করে ভেবেছেন দেশকে নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদান করে একটি জাতিকে মুক্তির স্বাদ পাইয়ে দিয়েছেন। সর্বোপরি ২০০ বছরের শোষিত-বঞ্চিত ভেঙেপড়া অর্থনীতির সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত একটি দেশকে নিয়ে দেখেছেন স্বনির্ভরতার স্বপ্ন । বৈরী বিশ্ব পরাশক্তিকে আশ্বস্ত করে বাংলাকে উপস্থাপন করেছেন সর্বোচচ বিশ্ব সংস্থায় । তার অন্যায়ের ফিরিস্তিটা অনেক বড়। যার প্রতিফল তিনি পেয়েছেন ৭৫ এর ১৫ই আগস্ট।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন যদি বিশ্বাসঘাতকতার চরম নমুনা হয়ে থাকে তাহলে ১৫ই আগস্টকে আমরা কি বলব কৃতঘ্নতার চরম উদাহরণ? আমার মতে, এক কথায় প্রকাশ করার মত এর সঠিক বাক্য সংকোচন বাংলা ব্যাকরণে এখনো সন্নিবেশিত হয়নি।

বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ দৌলা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলার এই দুই মহান পুরুষ একই নির্মমতার স্বীকার। এ জাতী প্রকৃত বীরকে যোগ্য সম্মান দিতে জানে না।
দুজনার বেলায়ই আমরা দেখতে পাই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি । নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা যেমন তারই পরিবারের আনূকুল্যে মানুষ হওয়া মিরনের হাতে নৃশংসভাবে মৃত্যু বরণ করেন। তেমনি বঙ্গবন্ধুও সপরিবারে তাদের হাতেই মৃত্যু বরন করেন। যারা তারই হাতে গড়া একটি স্বাধীন ভু-খন্ডে তারই আনুকূল্যে সর্বাধিক সুবিধা প্রাপ্ত। দুই মহা নায়ক একই অপরাধে অপরাধী। আর তা হল দেশকে ভালবাসা।

চুল পরিমাণ আদর্শচ্যুত হননি দুজনের কেউই। যদি হতেন ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত।
মৃত্যুর পরেও দুজনকে নিয়ে সমান তালে টানা হেঁচড়া হয়েছে।
একের পর এক অপবাদ দেয়া হয়েছে।

সে কলঙ্ক মোচনও হয়েছে তাদের নিজস্ব আলোক দ্যুতিতেই।
দুজনেই সমান ষড়যন্ত্রের স্বীকার।
উভয় ঘটনার পেছনে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন দূরবর্তী ষড়যন্ত্রকারীরা। স্বাভাবিকভাবে তারাই লাভবান হয়েছেন। সরাসরি অংশগ্রহণকারীরা নয়।
এমনকি উভয় ঘটনার ষড়যন্ত্রকারীদের নিয়তিও প্রায় একই রকম। যদিও দু’একটি ক্ষেত্র এর ভিন্নতাও রয়েছে। যা হয়ত তাদের পাপের তারতম্যকেই নির্দেশ করে।

বৈসাদৃশ্য একটাই, আর তা হল ইংরেজরা ব্যাবহার করলেও কখনোই এই সব ষড়যন্ত্রকারীদের বিশ্বাস করেনি। কিন্তু আমরা আমাদের ক্ষুদ্র স্বার্থে আমরা তাদের শুধু বিশ্বাস করেই ক্ষান্ত হইনা। সম্মানের সাথে পুনর্বাসন পর্যন্ত করি। আর তাই ষড়যন্ত্রকারীরা আজো বাংলার পিছু ছারেনি। আমরা ভুলে যাই ষড়যন্ত্রকারীরা সেই কালসাপ যে সুযোগ পেলে ছোবল মারবেই। কারণ ওটাই তাদের ধর্ম।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের ব্লু প্রিন্ট ১৯৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বরেই তৈরি হয়েছিল। যা কার্যকর করতে লেগেছিল সারে চার বছর। দেশি-বিদেশী যে সব মিডিয়া শেখ মজিবের একনায়কতন্ত্র, তার প্রশাসনের দুর্নীতি, দলীয় নেতাকর্মী কর্তৃক বাংলার মানুষের অত্যাচারিত হওয়া, রক্ষী-বাহিনী ইত্যাদিকে ১৫ আগস্টের অনিবার্য কারণ বলে প্রচার করে তারা প্রকারান্তরে ইতিহাসের এই বর্বর হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করতেই তা প্রচার করে।

সদ্য স্বাধীন হওয়া একটি দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সচল করে যে রাতারাতি সোনায় মোড়ানো সম্ভব নয় তা যে কেউই স্বীকার করতে বাধ্য। তার বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ তোলা হয়েছিল তা যে অন্তঃসারশূন্য তা তখনকার পরিস্থিতিতে তার গৃহীত পদক্ষেপগুলোর নির্মোহ পর্যালোচনা করলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

শেখ মুজিব একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেননি। তবে করা উচিৎ ছিল। এখানেও তার সাথে সিরাজ-উদ দৌলার মানসিকতার যথেষ্ট মিল পাওয়া যায়। নরম মনের স্নেহ বৎসল একজন পিতার ভূমিকায় তিনই ছিলেন। যারা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন তিনি তাদেরকে পিতৃ স্নেহে পরম বিশ্বাসে কাছে টেনে নিয়েছেন। অথচ তিনি যদি তা না করে; ফিদেল কাস্ত্রো, সাদ্দাম হোসেন অথবা মাহাথীর মোহাম্মাদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন তাহলে এ দেশের ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত। স্বাধীনতার ৪০ বছর পড়েও সোনার বাংলাদেশের স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে যেত না।

বলা হয় তার প্রশাসনের দুর্নীতির কথা। যদি তাই হত তাহলে তো ঐ হত্যাকাণ্ডের পড়ে প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর কথা। তা কি করা হয়েছিল? হয়নি। প্রশাসনের দুর্নীতি স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তা বেড়েছে। যা আজো অব্যাহত রয়েছে। সেখানে ব্যক্তি মুজিব ছিলেন পরিচ্ছন্ন। শত চেষ্টা করেও কেউ তাকে অভিযুক্ত করতে পারেনি। অতএব এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে যে এটা নিতান্তই খোরা যুক্তি তা সহজেই অনুমেয়। শেখ কামালের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হয়। তার মৃত্যু পরবর্তী সময়ে তাও সবৈব মিথ্যা বলেই প্রমাণিত হয়েছে।

দলীয় নেতাকর্মী কর্তৃক বাংলার মানুষের অত্যাচারিত হওয়ার কথা বলা হয়। তাই যদি হবে ১৫ই আগস্টের পরে কতজন আওয়ামী নেতাকর্মীর বিচার হয়েছে? হ্যাঁ হয়েছে, জাতীয় চার নেতাকে জেলখানার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু তারা যে বাংলার মানুষকে অত্যাচারে জর্জরিত করেছেন এ কথা তাদের চরম শত্রুও বলতে পারেনি। অতএব এটিও যে একটি জলজ্যান্ত মিথ্যার আশ্রয় ছাড়া আর কিছুই নয় তা প্রমাণিত।

রক্ষী বাহিনীর কথা বলা হয় দেশ যখন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করে। তখন সরকার বিশেষ পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। এত এত বাহিনী থাকতেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে র‌্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং তার সুফলও মিলেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে র‌্যাব প্রতিষ্ঠা যদি যৌক্তিক হয় তাহলে তখনকার প্রেক্ষাপটে রক্ষীবাহিনী কেন অযৌক্তিক হবে? আর তা যে তিনি আত্নরক্ষার্থে করেননি তার প্রমাণ তিনি তার জীবন দিয়েই দিয়ে গেছেন।

একজন মানুষ তার এক জীবনে কয়টি মাইলফলক স্পর্শ করতে পারেন। বঙ্গবন্ধু তা দেখিয়ে গেছেন। আর এখানেই তিনি ছাড়িয়ে গেছেন নবাব সিরাজ-উদ দৌলা সহ অন্য সবাইকে। আর তাই তীনি যথার্থই হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী।
• ৫২’র ভাষা আন্দোলন
• ছয় দফা
• ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান
• ৭০ এর নির্বাচন ।
• ৭ই মার্চের ভাষণ যা ছিল মূলত স্বাধীনতা যুদ্ধেরই ঘোষণা।
• মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব প্রদান।
• সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত একটি দেশকে সফলতার সাথে পরিচালনা।
• সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত একটি দেশকে বিশ্ব দরবারে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করা।

প্রাপ্তি; আস্থা ভাজন স্নেহাস্পদের হাতে স্বপরিবারে নির্মম মৃত্যু। বিশ্ব মানবতার ইতিহাসে যার দ্বিতীয় নজির নেই। এখানেও তিনি আর বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব একাকার।

যে অন্যায় ইংরেজ বেনিয়ারা পর্যন্ত করেনি, চরম অসভ্য এক জাতী আমরা তাই করেছি অবলীলায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কাল রাতে ঘাতকের হাতে নিহত হন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী শেখ ফজিলাতুননেছা, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, জামালের স্ত্রী রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের, এসবি অফিসার সিদ্দিকুর রহমান, কর্ণেল জামিল, সেনা সদস্য সৈয়দ মাহবুবুল হক, প্রায় একই সময়ে ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মণির বাসায় হামলা চালিয়ে শেখ ফজলুল হক মণি, তাঁর অন্ত:সত্তা স্ত্রী আরজু মণি, বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াতের বাসায় হামলা করে সেরনিয়াবাত ও তার কন্যা বেবী, পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত বাবু, আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বড় ভাইয়ের ছেলে সজীব সেরনিয়াবাত এবং এক আত্মীয় বেন্টু খান। এরপরের পর্বে ঘটে জাতীয় চার নেতা হত্যাকাণ্ড। প্রত্যেকেই সেই পৈশাচিকতার বলি হলেন।

কিন্তু কেন? তা কি এই কারণেই নয় যে, এ দেশ গড়ার কোন কারিগরকেই বাঁচিয়ে না রাখা? ঐ হত্যাকাণ্ড এবং এর ধারাবাহিকতায় যারা মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের প্রত্যেকেই স্বাধীনতা যুদ্ধে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন তারা সবাই তাদের কৃতকর্মের ফল ভোগ করেছেন!! তারা ছিলেন দেশকে ভালবাসার অপরাধে অপরাধী। এত বড় এক হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হল অথচ তখনকার সেনা প্রধান, উপ সেনা প্রধানের কেশাগ্র পর্যন্ত ছিন্ন হয়নি।

মুজিব নগর সরকার একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ভূমিষ্ঠ করেছে ঠিকই। কিন্তু যে এ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল সতর্কতা অবলম্বন করার প্রয়োজন ছিল তা তারা গ্রহণ করেননি। স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধু ক্ষমার ব্রত নিয়ে সেই বিষাক্ত জীবাণুকে দিলেন বংশ বিস্তারের সুযোগ। যা আজ এ দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবাহিত।

আর তাই আমরা আজো পাকিস্তানের সমস্ত দল নির্বিশেষে যেমন জিন্নাকে সম্মান করে। ভারত যেমন গান্ধী’জিকে সম্মান করে। নিজ নিজ দেশের স্থপতি বলে স্বীকৃতি দেয়। তেমিনি করে পারিনি সম্মিলিতভাবে জাতির জনককে স্বীকৃতি দিতে। বরং অসভ্যতার চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে সেদিন ৬০/৭০ পাউন্ড ওজনের মিথ্যে জন্মদিনের কেক কেটে জন্মদিনের উৎসব পালন করি। আমরা কি মানুষের পর্যায়ে পড়ি?

দোহাই পাঠক, আমি আওয়ামীলীগের সমর্থক নই। আমি মানবতাবাদী। আমি বাপকে অস্বীকার করতে পারিনা। হতে পারে এ আমার মনুষত্ববোধ বা অক্ষমতা। আমি শশ্রদ্ধ সালাম জানাই শেখ সেলিমকে। যিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনেই মেজর জেনারেল (অব.) কেএম সফিউল্লাহর কাছে জবাব চাইলেন। সাবেক সেনাপ্রধান হিসেবে ‘৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ডাকা সত্ত্বেও সফিউল্লাহ কেন নীরব ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হয়ে থাকলে সেদিন কেন মরে তা প্রমাণ করেননি? শেখ সেলিম সেদিন জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা সেনা কর্মকর্তারা কেন নীরব ছিলেন সে প্রশ্নও রাখেন।

বঙ্গবন্ধু ডাকা সত্ত্বেও কেন তারা তাকে বাঁচাতে উদ্যোগ নেননি? এ প্রশ্ন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আছে কিনা জানিনা। তবে সাধারণ মানুষ এ প্রশ্ন খুঁজবেনই। কারন বঙ্গবন্ধু কোন দলের সম্পদ নন। তিনি সমগ্র বাংলাদেশের। দল মত ধর্ম নির্বিশেষে সকল বাংলাদেশীর। এ জাতির জনক। তা কেউ স্বিকার করুক আর নাই করুক। পিতাকে অস্বিকার করে তাকে অসম্মান করা যায় না। নিজেই পিতৃপরিচয়হীন হয়ে ধিকৃত হন। ‘৭৫-এর ১৫ আগস্ট সেনাপ্রধানসহ যারা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল ছিলেন। কমিশন গঠন করে তাদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান সেখ সেলিম। এটাই কি যৌক্তিক নয়? এ দেশের প্রতিটি সৎ নাগরিকের উচিত তার এই দাবীর পক্ষে জোরালো সমর্থন জানানো। এইটুকু সম্মান বা শ্রদ্ধা তাদের প্রাপ্য। সম্মানিতকে অসম্মান করে তাঁর কৃতিত্বকে খাট করা যায়না। উলটো নিজেই অকৃতজ্ঞ বলে বিবেচিত হয়।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পরে আওয়ামী লীগ ছাড়া সব সরকারই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতে চাকরি দিয়ে খুনিদের দেশের প্রতিনিধিত্ব করার ‘বিরল সম্মান’ দিয়েছে জিয়াউর রহমান, এরশাদ ও খালেদা জিয়ার সরকার। চাকরির পাশাপাশি পদোন্নতি, ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ, রাজনীতিতে অংশগ্রহণ, দল গঠন ও সংসদ সদস্য হওয়ার সুযোগ। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ইনডিমিনিটি(দায়মুক্তি) দিয়ে এর বিচার প্রক্রিয়া পর্যন্ত তারা বন্ধ করে দেন। এ লজ্জা শুধু তাদের নয়, সমগ্র জাতির।

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দূতাবাসে চাকরি দেয়ার বিষয়টি অনেক দেশ মেনে নিলেও ভিয়েতনাম, পোল্যান্ড কোন খুনিকে গ্রহণ করেনি। এমনকি পরবর্তীতে পাকিস্তানও একজনকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়।
অথচ এ দেশের ক্ষমতাধররা তাদের সম্মানের সাথে পূনর্বাসন করেছেন। তারা কেন এই হত্যাকারীদের এত সুযোগ করে দিয়েছিলেন?

পরবর্তীতে এসব খুনিরা এরশাদ ও খালেদা জিয়া সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় রাজনীতিতে অংশ নেয় এবং রাজনৈতিক দল গঠন করে। শাহরিয়ার রশিদ ও বজলুল হুদা ১৯৮০ সালের পর প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তি নামের একটি দল গঠন করে। ১৯৮৭ সালে ফারুক রহমান ও আব্দুর রশিদ গঠন করে ফ্রিডম পার্টি। পরে বজলুল হুদাও ফ্রিডম পার্টিতে যোগ দেয়। এর আগে ১৯৮৬ সালে এরশাদের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন করে লে. কর্নেল ফারুক। বজলুল হুদা ফ্রিডম পার্টির হয়ে ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে মেহেরপুর থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়। আর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার ভোটার বিহীন এক তরফা নির্বাচনে কুমিল্লা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয় লে. কর্নেল রশিদ। এভাবে এরশাদ ও খালেদা জিয়ার আমলে খুনিরা সংসদে বসে। খুনিদের এভাবে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য দেয়া, দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে দেয়া এ জাতির এক লজ্জাজনক অধ্যায়। আনোয়ার সাদাত বেঁচে থাকাকালীন একজন রাষ্ট্রদূত পরিচয়পত্র পেশ করতে গেলে তাকে প্রকাশ্যেই তিনি বলেছিলেন, ‘আমার ট্যাংক দিয়েই তোমরা আমার বন্ধুকে হত্যা করেছ’। এ কথা শুনে কি আমরা লজ্জা পেয়েছিলাম? পাইনি কারন ঐ বস্তুটির যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে আমাদের।

৭৫ এর ১৬ আগস্ট ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠায় একটি ছবি ছাপা হয় সেখানে দেখা যায় খুশিতে জনগণ মিষ্টিমুখ করছে। যা ছিল অনেকটা ১/১১ র সরকারকে জনগণের প্রথমে স্বাগত জানানোর মত। যা আমাদের চারিত্রিক দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ মাত্র। কারা সেদিন মিষ্টিমুখ করিয়েছিল?

সারে সাত কোটি বাংলাদেশির শতভাগ স্বাধীনতা চায়নি এটা প্রমাণিত। আর যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তারাও যে সবাই লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে নন এটাও আমাদের বোঝা উচিত। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সাথে যারা জড়িত ছিলেন তাদের প্রায় সকলেই বিভিন্ন খেতাব প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। যা ছিল তাদের ঢাল স্বরূপ। আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ধারনা আছে মুক্তিযোদ্ধা মানেই ত্রাণকর্তা । তারা ফেরেশতা গোছের কিছু। আর এই সুযোগটিই তারা গ্রহণ করেছেন। অথচ স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সংগঠিত অনেকগুলি বিয়োগান্তক ঘটনার কুশীলব কতিপয় স্বনামখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা। যাদের অগণতান্ত্রিক আচরণে আজ অতিষ্ঠ হয়ে জাতির সঠিক ইতিহাসের সংরক্ষণের তাগিদে সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনীতে জাতির পিতার স্বীকৃতি,স্বাধীনতার ঘোষণা,৭ মার্চের ভাষণ ইত্যাদি কতগুলি ব্যাপার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং এগুলির রক্ষাকবচ হিসাবে অনুচ্ছেদ ‘৭ এর ক’ করা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদকে যারা “গণতন্ত্র পরিপন্থী, বাক-স্বাধীনতা বিরোধী” বলে সমালোচনা করে করে ঘর্মাক্ত হচ্ছেন তাদের বোঝা উচিত কিছু মৌলিক বিষয়ে কোন আপস চলে না। তাতে অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে। ভবিষ্যতে আর কোন অপশক্তি যাতে ক্ষমতার দাপটে জাতির স্পর্শকাতর গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়গুলি নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়াতে পারে, সে জন্য এই রক্ষাকবচের প্রয়োজন আছে বৈকি।