ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

দেশপ্রেমিক জিন বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম
প্রথম আলোতে বাংলাদেশের সফল জিন বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম এর সাক্ষাৎকারটি পড়ে নিজের অজান্তেই চোখ ভিজে উঠছিল। পাটের জীবনরহস্য উন্মোচনের পর এবার পাটসহ বিশ্বের ৫০০টি উদ্ভিদের জন্য ক্ষতিকর ছত্রাকের জীবনরহস্য উন্মোচন করলেন তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশি বিজ্ঞানীরা। এই মহৎপ্রাণ নিভৃতচারী মানুষটির কাছে যখন জানতে চাওয়া হল যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হওয়া সত্যেও এবং এত সুযোগ-সুবিধা ছেড়ে দেশের জিনোম গবেষণায় নতুন প্রজন্ম তৈরি করতে দেশে আসবেন কিনা। তিনি উত্তরে বলেন “সন্তান যত বড়ই হোক, সে কি মাকে ছেড়ে থাকতে পারে। দেশটা তো মায়েরই মতো। এখানে আমার জন্ম। শিক্ষা ও গবেষণার প্রয়োজনে আমি বিশ্বের অনেক দেশে গিয়েছি। কিন্তু আমি কখনো দেশকে ভুলে থাকতে পারি না”।
“আমি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতাগুলো অর্জন করেছি তার নির্যাস আমি আমার মাতৃভূমিকে দিতে চাই। আমি যে গবেষক দল তৈরি করেছি তাদের নিয়ে আমি আরও নতুন নতুন গবেষণা ও গবেষক তৈরি করতে চাই। সুযোগ ও কাজের পরিবেশ পেলে যে অনেক কিছু সম্ভব তা আমাদের গবেষকেরা প্রমাণ করে দিয়েছেন। এখানেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। এদের নিয়েই আমরা চলুন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। আসুন দেশকে মায়ের মতোই ভালোবাসি”।

এই মহান ব্যক্তিকে এ দেশ কতটুকু সন্মান দিতে পারবে জানিনা। তবে এদেশের সাধারন মানুষ তাকে ভালবাসবে শ্রদ্ধা করবে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে তাতে সন্দেহ নেই। আর সেটাই হয়ত তার একান্ত কাম্য। সাধারণত এই ধরনের কীর্তিমানেরা নোবেল প্রাইজে ভূষিত হন না। তার পরিবর্তে তারা পান সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ ভালবাসা। আর আত্মতৃপ্তি। তা নিশ্চয়ই নোবেল প্রাপ্তির থেকে ঢেঁড় বেশি কিছু। অন্যদিকে নোবেল প্রাইজে কেউ ভূষিত হলেন ঠিকই কিন্তু বঞ্চিত হলেন সাধারণ মানুষের ভালবাসা থেকে। প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকল তার আচরণ। সেটা নিশ্চয়ই তাকে বড় করেনা। বরং তার কৃতিত্বকে অনুজ্জ্বল করে। ইতিহাসের নির্মোহ বিচারে একদিন প্রত্যেকেই আবির্ভূত হন স্ব মহিমায়। স্বীকৃতি পান আপন কৃতিত্বের।

গরীব প্রেমিক নোবেল বিজয়ী ডঃ মুহাম্মদ ইউনুস
ডঃ মুহাম্মদ ইউনুস নোবেল পুরস্কারে ভূষিত সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। আমরা যারা এ দেশের নাগরিক তারা এই প্রাপ্তির আনন্দে উদ্বেলিত। তবে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই এই আনন্দটা কর্পূরের মতই উবে যায় যখন জানতে পারি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদানের দায়িত্বটি যে শান্তি কমিটি পালন করেন তারা সকলেই কোন না কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত। আর এটা তো বলাই বাহুল্য সুবিধাবাদী আর রাজনীতিবিদ শব্দ দুটি বিশ্বজুড়েই সমার্থক। ২০০৬ সালে পাঁচ সদস্যের কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সদস্য ওলে ড্যানবোল্ট যিনি ডঃ ইউনূসকে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করেন। কমিটির বাকি চারজন সদস্যদের মধ্যে ক্যাসি কুলম্যান ফাইভ একাধারে একজন ব্যবসায়ী এবং কনজারভেটিভ পার্টির সদস্য। চরম বিতর্কিত উগ্র মার্কিন পন্থী এই সদস্যের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ২০০৭ সালে সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর কে এবং ২০০৯ সালে বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কে নোবেল শান্তি পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়। সিসেল রনবেক হলেন কমিটির অপর সদস্য যিনি একজন রাজনৈতিক এবং সাবেক মন্ত্রী। ইঙ্গার ম্যারি ইটারহর্ন এবং এগোট ভেইল যথাক্রমে নরওয়েজিয়ান প্রগ্রেস ও সোশ্যালিস্ট লেফট পার্টির সদস্য, পেশায় যথাক্রমে পার্লামেন্টের ডেপুটি রিপ্রেজেন্টিটিভ এবং ফিজিওথেরাপিস্ট। রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, ফিজিওথেরাপিস্টরা মিলে যখন এমন একটি পুরস্কার প্রদান করেন তখন দুটো প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়। এক, নরওয়ের কি এই ধরনের কমিটি পরিচালনার মত আর কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি নেই? নাকি তারা এই পুরস্কার প্রদানকে একটি সাধারণ বিষয় বলে মনে করেন। প্রশ্ন দুটি আরও বেশি জোরালো হয়। যখন শান্তি পুরস্কারে ভূষিত ব্যক্তিদের তালিকায় উঠে আসে।

মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিতে সিদ্ধহস্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নাম। যিনি ২০০৮ সালে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে মাত্র ১ বছরের মধ্যে ২০০৯ সালে বিশ্ব কূটনীতি এবং বিশ্ব সহযোগিতায় অসামান্য অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ (!) নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন।

আরেকটু পেছনে তাকালে দেখতে পাই কার্বন বিলিয়নিয়ার বলে কুখ্যাত সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোরের নাম। বর্ণবাদী ওয়াঙ্গারি মাথাই, সন্ত্রাসী ও যুদ্ধাপরাধী আইজ্যাক রবীন, শিমন পেরেজ। বিভ্রান্তিকর এবং নির্জলা মিথ্যা তথ্যসংবলিত বইএর লেখক রিগোবার্তা মেঞ্চু, এমনকি হেনরি কিসিঞ্জারের নাম।

তারপরেও তো আমরা পেলাম(!) এই বা কম কিসে। বিশ্ববাসী আরেকবার এর মাধ্যমে একটি উন্নয়নশীল ক্ষুদ্র রাষ্ট্রকে দেখল পজেটিভ দৃষ্টিভঙ্গিতে। কথা হচ্ছে কি পেল দেশ, এই পুরস্কারের মাধ্যমে?

আজ যখন পদ্মা সেতু নিয়ে এত হুলুস্থুল। ক্ষমতাসীন সরকার মুখে যাই বলুক না কেন এই সমস্যা থেকে যে শত চেষ্টায়ও বেড়িয়ে আসতে পারছে না। এটা তো দিবালোকের মত স্পষ্ট। যখন ভারত, জাপান, ইসলামি উন্নয়ন সংস্থা পর্যন্ত অচলাবস্থা কাটাতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সেখানে এই মহান মানুষটি একেবারেই চুপ। এমনকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত যখন এই জটিলতার পেছনে তার হাত থাকতে পারে বলে সন্দেহ পোষণ করছেন। তখনও তিনি নিশ্চুপ। অথচ পদ পদবী ধরে রাখতে তার চেষ্টা-বিবৃতি প্রদানের অফুরন্ত ফুরসৎ এ ক্ষেত্রে “নিজেকে পরিষ্কার” বলে একটি বিবৃতি প্রদানেরও সময় পান না!! তবে কি আমরা ধরে নেব মৌনতা সম্মতির লক্ষণ? তবে তো উপরোল্লিখিত নোবেল লরিয়েটদের সাথে তখন আর ডঃ মুহাম্মদ ইউনুসের পার্থক্য থাকবে না। যদিও আমরা কায়মনোবাক্যে এই প্রার্থনা করি যেন এই সন্দেহ সত্য না হয়। বোধকরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও সেই কামনাই করেন। কারণ সবার উপরে দেশের সন্মান। ব্যক্তি তার কর্ম দিয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেন আবার ব্যাক্তিই দেশকে লজ্জায় ডোবান তার কর্মের মাধ্যমে। পার্থক্য গড়ে দেয় দুজনের দেশপ্রেম।