ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

ইন্টারনেটে খারাপ কনটেন্টের অভাব নেই। রয়েছে সাইবার অপরাধীদের অপকর্ম। রাস্তার মোরে মোরে সাইবার ক্যাফের বদ্ধ ঘরে নীল বিষ ছড়ানো উপকরণ যা আমাদের তরুণ সমাজকে অধঃপাতে নিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। সেদিকে আমাদের সরকারের নজর পড়ল না। নজরটা গিয়ে পড়ল “নিউ মিডিয়া” নামক একটি সম্ভাবনাময় তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উপর!!

যখন সরকারের নীতিনির্ধারকেরাই ব্লগ বলতে বোঝেন পর্ণ (!) সাইট। তখন আমরা সংগত কারণেই সুস্থ ব্লগ পরিচালনাকারীদের আহবান জানাই এই বলে যে, আপনারা আপনাদের ব্লগের প্রচারণা করুন। আর ঠিক তখনই অসংখ্য অসুস্থ পর্ণ সাইটের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নিয়ে একটি বিকাশমান তথ্য মাধ্যমকে গলা টিপে ধরার ইচ্ছা হল আমাদের ডিজিটাল সরকারের!! এই ইচ্ছা যে তাদের ডিজিটাল বুলির সাথে কতটা মানানসই তা আলোচনার দাবী রাখে।

অনলাইন গণমাধ্যম পরিচালনা নীতিমালা ২০১২ নামক যে খসড়া নীতিমালা প্রকাশ করা হয়েছে। গত ২২ সেপ্টেম্বর ছিল সে ব্যাপারে মতামত দেবার শেষ দিন। দেশের অনলাইন বিশেষজ্ঞরা
সংশ্লিষ্ট জনেরা নিশ্চয়ই তাদের মূল্যবান মতামত দিয়েছেন। যদিও সরকার তা মানতে বাধ্য নন বা কখনোই মানেন বলে মনে হয় না। আমি এমনিতেই একটু কম বোঝা মানুষ। তাই প্রথমেই জানতে চাইলাম অনলাইন গণমাধ্যম এর সংজ্ঞাটা কি। কিছুতেই খুঁজে পেলাম না। পরে বিশিষ্ট জনদের লেখা পড়ে জানলাম এই সংজ্ঞাটিই তারা দেননি। নীতিমালাটির উদ্দেশ্য বুঝতেও অক্ষম হলাম যখন দেখলাম যা কিছুই বলা হচ্ছে সবই এক পক্ষ অর্থাৎ প্রকাশক-প্রকাশনা কেন্দ্র করে। অনলাইন সংবাদে যে পাঠকের মতামত উঠে আসে একথাটা তারা বেমালুম ভুলেই গেছেন।
পাঠক মতামত নিয়ে কিছুই বলা হয়নি। অথচ যারা এর পরিচালনার সাথে যুক্ত তারা স্বভাবতই অনেক বেশি সংবেদনশীল এবং দায়বদ্ধতার পরিচয় দিয়ে থাকেন।

যে সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ এর কথা বলে ক্ষমতারোহণ করে সেই সরকার আবেদন, লাইসেন্সিং, আর্নেস্ট মানি, নবায়ন ফিস এর নামে কি করে অনলাইন গণমাধ্যমের প্রসারকে বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হতে পারে। সে প্রশ্নের উত্তর তাদের কাছেই আছে কিনা সন্দেহ। খসড়া নীতিমালাটি নাকি কমিউনিটি রেডিওর নীতিমালারই কপি। কমিউনিটি রেডিও আর অনলাইন গণমাধ্যম কি এক?

আমাদের দুর্ভাগ্য এই নীতিমালাটি প্রণয়ন করার সময় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের চোখে অনলাইন গণমাধ্যম বা ইন্টারনেট সম্পর্কে সম্যক ধারনা সম্পন্ন একজন মানুষও ধরা পরল না। আর তাই খসড়ায় বলা হল, “এর প্রতিটি কপিতে সম্পাদক-প্রকাশকের নাম থাকতে হবে”। অনলাইনে প্রকাশিত গণমাধ্যমের প্রতি কপি মানে কী?

আজকের দিনে ইন্টারনেটকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান! এই না হলে ডিজিটাল সরকার! অনলাইন বলতে তথ্য প্রকাশের জন্য ইন্টারনেটকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করাকেই বুঝি। আর তাই ইন্টারনেটে প্রকাশিত ওয়েবসাইট, ফেসবুক, গুগল, টুইটার, ব্লগ সাইট বা পত্রিকা এমনকি টেলিভিশনের অনলাইন সংস্করণ সবই এই গণমাধ্যমের আওতায়। এর প্রতিটিই যে প্রবল প্রভাব বিস্তারে সক্ষম তা সরকারের কর্তাব্যক্তিরাও ভালই জানেন। আর জানেন বলেই আজ এই ব্যবস্থা গ্রহণ। তারা মুখে স্বীকার না করলেও অচিরেই ব্লগও যে এই নিবর্তনের আওতায় আসবে তা বলাই বাহুল্য। কেননা ব্লগে যেসব মন্তব্য প্রকাশ করা হয় প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে তার সক্ষমতা কোনভাবেই প্রকাশ্য মাধ্যমের চাইতে কম নয়।

অনলাইন গণমাধ্যম পরিচালনা নীতিমালা রচয়িতাদের সুপারিশ অনুযায়ী যেভাবে আইন প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে হলে পুরো সাইটকে বাংলাদেশে হোস্ট করা থাকতে হবে। এটা কি সম্ভব? যদি এমন হয় বাংলাদেশের নাগরিক গণমাধ্যম উদ্যোক্তারা কোন বিদেশি সার্ভারে তাদের সাইট হোস্ট করে এবং সেখান থেকেই তা পরিচালনা করেন(যতদূর জানি তা আমাদের সংবিধান স্বীকৃত) তখন কি তারা এই আইনের আওতায় থাকবেন? সাইটটি তখন কোন দেশের আইন মেনে চলবে? আর সরকারই বা তখন কি করবে?

দেশ থেকে সাইট ব্লক করে দিবে? ব্লক হওয়া গণমাধ্যমে জনগণ নানা পদ্ধতিতে প্রবেশ করতে পারবে। তাছাড়া ব্লক হওয়া সাইটের পরিচালনাকারীরাও চাইলেই ইউআরএল পরিবর্তন করতে পারেন এর রচয়িতারা কি তা ভেবে দেখেছেন?

একটি ধারায় বলা হয়েছে “অনলাইন গণমাধ্যমে অন্য কোন দেশি বা বিদেশী গণমাধ্যম লিংক করা যাবে না।” পাঠক এবার আপনিই বলুন। ব্যবসার সকল পথ বন্ধ করে দিয়ে বলা হচ্ছে ফিস দাও। এটা কি ধরনের আবদার। আর তাছাড়া লিংক ছাড়া তথ্যের ভিত্তি কি?

বিশিষ্ট অনলাইন বিশেষজ্ঞ মোস্তাফা জব্বার এর মতে “ইন্টারনেটের এই যুগে সামাজিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক, ব্লগ, অনলাইন সম্প্রচার, ওয়েবসাইট ইত্যাদি কোনটাই নীতিমালার আওতায় নিবন্ধিত হবার মতো বিষয় নয়। দুনিয়ার যে কোন প্রান্ত থেকে যে কেউ একটি ডোমেইন নাম নিবন্ধিত করে এ ধরনের প্রকাশনা চালিয়ে যেতে পারে। ফলে তথাকথিত নীতিমালা দিয়ে বা লাইসেন্সিং আরোপ করে এইসব মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা মোটেই সমীচীন নয়। বরং দেশের প্রচলিত আইন অনুসারে মানহানিকর, রাষ্ট্রবিরোধী বা ক্ষতিকর উপাদানগুলো কাগজে প্রকাশিত হলে যেভাবে আইনের আওতায় আনা যায় ইন্টারনেটের প্রকাশনাকেও সেই আইনের আওতাতেই আনা যায়। এজন্য আলাদা কোন নিবন্ধন, লাইসেন্স বা অন্য কোন ব্যবস্থা নেবার প্রয়োজন নেই”।

কেন এই দ্বৈত নীতি গ্রহণ? যেখানে দেশে একটি পত্রিকা বের করতে বা কোন নিউজ সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করতে বাড়তি খরচ নেই বললেই চলে সেখানে ছোট একটি ওয়েব পোর্টাল বা নিউজ চ্যানেলের জন্য লাখ লাখ টাকা ফিস ও অন্যান্য ব্যয় ধরা কি ছোট প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকা বা জন্ম নেওয়া বন্ধ করার জন্যেই নয়? নয়ত এটা দিতে হবে, ওটা মানতে হবে, এভাবে নয়-ওভাবে সবই বলা হল। যা বলা হল না তা হল সরকার কতোটা সুযোগ সুবিধা দিবে। তা উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ফ্রি ইন্টারনেট কানেকশনের মাধ্যমে হোক আর সরকারী বিজ্ঞাপন দিয়েই হোক। নেবার বেলায় ষোল আনা দেবার বেলা কানা কড়িও নয় এ কেমন কথা! সকল আয়ের উৎস বন্ধ করে দিয়ে প্রতিষ্ঠিতদের সাথে ছোট উদ্যোক্তাদের অসম প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেয়া নিশ্চয়ই কোন শুভবুদ্ধির পরিচায়ক নয়।

পরিশেষে বলব, দেশের সংবিধান ও নাগরিকের অধিকার সমুন্নত রেখে অনলাইন গণমাধ্যমগুলো পরিচালিত হচ্ছে কীনা তা দেখভালের জন্য একটি আদর্শ, অংশগ্রহণমূলক, গণতান্ত্রিক ও মিডিয়াবান্ধব নীতিমালা দরকার। এই খসরা নীতিমালায় তার প্রতিফলন দেখা যায়, সেই সাথে ঋণ ও বিল খেলাপিদের রোধ করা, পেশাগত ও কারিগরি মান নির্ধারণ, শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ সহ আয়কর প্রদানের বাধ্যবাধকতা আরোপ, ভাষার দূষণ রোধে ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক অখণ্ডতা ও স্থিতিশীলতা ক্ষুন্ন করে এমন অনুষ্ঠান প্রচারে নিরুৎসাহিত করার মত কিছু ভাল দিক থাকলেও অনলাইন গণমাধ্যমের সুষ্ঠু বিকাশেই বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছে এই খসরা নীতিমালার অন্যান্য বিধি। অথচ এই মুহূর্তে প্রয়োজন একটি গনমাধ্যম বান্ধব নীতিমালা। আর তা হতে হবে এই “নিউ মিডিয়া’র” প্রসারকে বিবেচনায় রেখেই। যাতে এই মাধ্যমটি আরও বিকশিত হতে পারে । নিবর্তনমূলক নয় প্রয়োজন প্রণোদনামূলক নীতিমালা। কোন
গোষ্ঠীস্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিন। সেই সাথে জনসাধারণের তথ্য অধিকারের দিকটি বিবেচনায় রেখেই এই নীতিমালা তৈরি করুন।

kmgmehadi@yahoo.com

তথ্যসূত্রঃ বিডিনিউজ২৪.কম, মানবজমিন, বাংলানিউজ২৪.কম, শ্যামল বাংলা, সচলায়তন।

http://shyamolbangla.com/?p=7338
http://www.sachalayatan.com/haseeb/46233
http://www.bdnews24.com/bangla
http://www.mzamin.com
http://www.banglanews24.com