ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

১ অক্টোবর ১২ তারিখে দেশের সব পত্রিকারই অন্যতম লিড নিউজ ছিল “তাজউদ্দীন-কন্যা বিজয়ী”। প্রয়াত নেতা তাজউদ্দীনের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন পূর্বক বলছি। নিউজ হেড লাইনটি এমন হতে পারত “সিমিন হোসেন রিমি বিজয়ী”। সঙ্গত কারণেই হয়নি। কারণ তাজউদ্দীন-কন্যাই বিজয়ী হয়েছেন রিমি নন।

আমরা দলের বাইরে যেতে পারিনা, আমরা ব্যক্তিকে মনোনীত করিনা, করি দলকে। আমরা মনোনীত করতে ব্যক্তির স্বকীয়তা মূল্যায়ন করিনা; বিচার করি ব্যক্তির কুষ্ঠি। আর তাই আমাদের মহান সংসদে দু’একজনের বেশি স্বতন্ত্র সদস্য পাইনা। আমরা এ দেশের অনেক যোগ্য নেতাকে দূরে ঠেলে দেই শুধুমাত্র দলীয় পরিচয় বহন করেন না বলে বা তারা স্বতন্ত্রভাবে কোন দলের নেতৃত্ব দেন বলে। এমনকি আভ্যন্তরিন কোন্দলের কারনে কোন নেতা দলীয় মনোনয়ন নয়া পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করলেও তিনি যতই সৎ ও যোগ্য হননা কেন আমরা তাকে নির্বাচিত করিনা। বলহারি আমাদের চরিত্র। আর তাই আমরা মহান সংসদকে দেখি প্রায়শই অকার্যকর। দলের টিকিটে যারা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন তারা চলেন দলের আদর্শে। আর আমাদের দেশের বড় দলগুলো চলে ব্যক্তি নির্দেশে।

আর এই ব্যক্তিরা চলেন প্রয়াত নেতাদের ইমেজকে পুঁজি করে। অথচ তারা নিজেরাই তাঁদের মতাদর্শ অনুযায়ী চলেন না। আজ যদি আমাদের মহান সংসদে ২০/২৫ জন স্বতন্ত্র সাংসদ থাকতেন। তাহলে হয়ত এদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ অন্যরকম হতে পারত। আজ যারা পরামর্শ দিতে গিয়ে উল্টো হেনস্থা হন তখন তাদের কথা হত মূল্যবান। স্বতন্ত্র সাংসদরা হয়ত সরকারি দলের আইন প্রণয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারতেন না। প্রতিবাদ তো করতে পারতেন। অন্তত সাধারণ মানুষের কথাগুলো তো তুলে ধরতে পারতেন। আমরাও সান্ত্বনা পেতাম এই ভেবে যে, যাদের মনোনীত করেছি তারা আমাদের কথারই প্রতিধ্বনি করছে। বিরোধী দলও তখন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই আর কথায় কথায় সংসদের বাইরে থাকতেন না।

আজ দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও আমাদের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল দুই মেরুতে। কেন? আদর্শগত ভিন্নতা থাকতেই পারে। ভিন্ন মত থাকাই স্বাভাবিক তাই বলে দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে? কেন পদ্মা সেতু নিয়ে সর্বদলীয় একটি কমিটি গঠন করা হয় না? যখন বন্ধু রাষ্ট্র, দাতা সংস্থা সমুহও আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে এর সুরাহা করতে তখনো বিরোধীদলীয় মনোভাব নিয়েই থাকে বিরোধীদল। সরকারও চেষ্টা করেনা তাদের ব্যবহার করতে। কেন? কেউ বলেন নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু তৈরি করবেন। কেউ বলে আমরা দুটো পদ্মা সেতু তৈরি করবেন যদিও উৎস উহ্য। এগুলো কি দায়িত্বশীল আচরণ?

কেন বাংলাদেশের এত কষ্টে অর্জিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য সাফল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে দেশি বিদেশি চক্রান্ত আজ যখন বাস্তবায়নের পথে। তখনো তারা একে অপরকে দোষারোপের মাধ্যমে চক্রান্তকারীদের সুযোগ করে দিচ্ছে। শুধু তাই নয় একসময়ে বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক কর্মসূচী দিয়ে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যস্ত রাখছে।

পূর্বাপর বেশ কিছু ঘটনা ঘটতে দেখেছি যেখানে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শুধু ব্যর্থতারই পরিচয় দেননি দুষ্কৃতিকারীদের প্রশ্রয়ও দিয়েছেন এটা শুধুমাত্র রাজনৈতিক নিয়োগেরই ফলেই হয়েছে। অন্য কোন কারণে নয়। সেইসাথে ছাত্র রাজনীতির নামে রাজনৈতিক ক্যাডার পোষণের যে নীতি আমাদের রাজনৈতিক নেতারা লালন করেন তা আর যাই হোক দেশের স্বার্থে যে নয় তা দিবালোকের মতই স্পষ্ট। খালি চোখেই আমরা দেখতে পাই তাদের রাজনীতি দেশের স্বার্থে নয়; একান্তই নিজেদের স্বার্থে পরিচালিত হয়। যাকে সহজ কথায় বলা যায় ক্ষমতারোহনের রাজনীতি। মুখে যাই বলুন না কেন দেশের স্বার্থ তাদের কাছে গৌণ।

এই যে তাদের স্বেচ্ছাচারী মনোভাব এর পেছনে কি আমরাই দায়ী নই। লেখার শুরুতেই আবার ফিরে যেতে হয়। আমরা নৌকায়, ধানের শীষে, লাঙ্গলে বা দাড়ী পাল্লায় ভোট দেই। একটিবার দেখিনা এই প্রার্থীটা কে। তার পরিচয় কি? আদৌ আমি কি তাকে চাই বা সে কি যোগ্য? কি এক মোহে পড়ে আমরা এখনো ভোট দিয়ে আত্মপ্রসাদ লাভ করি এই ভেবে যে, শেখ মুজিবুর রহমান বা জিয়াউর রহমানকে শ্রদ্ধা নিবেদন করে এলাম। এই নেতারা জীবিত থাকলে কি আজকের এই দলগুলি যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে সেভাবে চালাতেন বা একে সমর্থন করতেন? তদুপরি যাকে ভোট দিলেন তার আদর্শ কি? দুদিন আগেও তো সে ভিন্ন সুরে কথা বলত।

আমরা সব ভুলে যাই।
সহজেই ভুলে যাই।
অত্যন্ত দ্রুত ভুলে যাই।
তাই বারবার তারা আসে।
তারাই ফিরে ফিরে আসে।
আমাদের ঘারে সওয়ার হয়েই আসে।
আমরা কি আমাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছি?
না করছি না। যদি করতাম তাহলে মার্কা নয় ব্যক্তিকে মনোনীত করতাম। একটি ভোট দেয়ার আগে প্রার্থীকে দশবার যাচাই করে নিতাম। ঐ একটিই তো সুযোগ একজন আদর্শ নেতা নির্বাচনের। আর এ সুযোগটি কাজে লাগানোর দায়িত্ব সকল নাগরিকের। আজ এ দেশে গণতন্ত্রের খোলসে যে একনায়কতন্ত্র চলছে; তার দায়ভার আমাদেরই।

kmgmehadi@yahoo.com