ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

একটি অণু গল্প দিয়ে শুরু করি। যদিও মেয়েটির বয়স এখন বিশ কিন্তু সঙ্গত কারণেই আমাদের পেছনে ফিরে তাকাতে হচ্ছে। ফিরে যেতে হচ্ছে মেয়েটির পৃথিবীর আলো গায়ে মাখা প্রথম দিনটিতে। পরিবারের প্রথম সন্তানের জন্ম হল। আনন্দ উৎসবের যতটা আশা করা হয়েছিল তার ছিটেফোঁটাও দেখা গেল না। কারণটা কি? খোজ নিয়ে জানা গেল, আর দশজনের বেলায় যা হত। এখানে তার ব্যতিক্রম কিছু হয়নি। এটাই স্বাভাবিক। তার মানে হল,
– পরিবারের প্রথম সন্তান কোথায় একটি ছেলে হবে তা না; হল মেয়ে। কি হবে এই মেয়ে দিয়ে?
– হ্যাঁ তাইতো। খাবে দাবে বড় হবে। বিয়ের পরে অন্যের ঘরে গিয়ে দাসীপনা করবে, এই তো।
– এতে আর আনন্দের কি আছে বলেন!
– তাহলে আপনারা মেয়ে চান নি এই তো?
– মেয়ে চাইনি তা কে বলেছে? মেয়ে হলে হবে; তাই বলে প্রথম সন্তানই মেয়ে!
– এমন তো নয় যে, ছেলেপুলেতে ঘর ভরপুর এখন একটি শখের মেয়ে চাই?
– পরিবারের তো একটি ভবিষ্যৎ আছে তাই না?
কথা হচ্ছিল পরিবারের বরকর্তা মানে মেয়ের দাদা সহ অন্যান্য পুরাতন সদস্যদের সাথে। মেয়ের বাবা কি বলে শুনি।
– কি বলব ভাই আল্লাহর দান।
– তার মানে আপনিও খুশি নন?
– খুশি নই তাও না। তবে ছেলে হলে আর একটু ভাল লাগত।
পাঠক, মেয়েটি ঠিক অনাকাঙ্ক্ষিত নয় তবে কাঙ্ক্ষিতও যে নয়। তা বেশ বোঝা গেল। এভাবেই সে পৃথিবীর এক বৈরী রূপ দেখতে পেল প্রথম চোখ মেলে।
পরিবারে প্রথমেই মেয়ে, ছেলে তো একটা চাই-ই চাই। অগত্যা যতদ্রুত সম্ভব নতুন মুখের আগমন। বিধাতা এবার নিরাশ করলেন না। এবারের চাঁদপানা মুখখানা ছেলে সন্তানের। মেয়ে শিশুটি অবধারিতভাবেই তার প্রাপ্য অধিকারটুকু বুঝে পেতে না পেতেই দেখল তার আদরে ভাগ বসাতে মায়ের কোলে নতুন অতিথি।
যা ঘটল তাতে ভাগ বসানো বললে ভুল হবে। বলা যায় যৎসামান্য যা তার জন্য নির্ধারিত ছিল এবার তাও গেল। এই বৈষম্যের মাঝেই সে বড় হতে লাগল। মেয়েটি বুঝতে পারল পরিবারে ছেলেদের কদরটি একটু বেশি। তার অভিযোগের উত্তরে মা শিখিয়েছেন মেয়েদের মেনে নিতে হয়। মানিয়ে চলতে হয়।
সময়ের সাথে সাথে গত হয় পুরাতনরা। সেই সাথে কিছুটা পরিবর্তিত হয় বৈরি পরিবেশ। শিশুকালের বৈষম্য থেকে বেড়িয়ে সদ্য কৈশোরে পা রেখে এক ভিন্ন জগতের স্বাদ তাকে যেন কিছুটা উন্মাতাল করে তোলে। সাধারণ কিছু প্রাপ্তি যেমন আনন্দে উদ্বেল করে তোলে তেমনি সামান্য অপ্রাপ্তিতে বড় বেশি মুষড়ে পড়ে। সব ছাপিয়ে কি এক অদ্ভুত কষ্টে চোখ ফেটে বেড়িয়ে আসে জল বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মত। যখন নিত্য নতুন পুরুষালি নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়। এটা কি তার সাথে অন্যায় আচরণ? না কি তার ভাল না লাগা। বুঝে উঠতে পারেনা ছোট্ট অবুঝ মন। চেনা মানুষগুলো স্বজন থেকে যেন দুর্জন হয়ে যাচ্ছে। বলার মত আছে এক মা। কিন্তু কিভাবে বলবে, ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা। এড়ায় না মায়ের চোখ। মেয়ে বিষণ্ণতায় ভুগছে। একটু আত্মকেন্দ্রিক মেয়ে সহসা মুখ ফুটে বলেও না। তবু তো মা, এ সমাজেরই যাঁতাকলে পিষ্ট। না বোঝার কথাও নয়। পরামর্শ চান স্বামীর। উত্তর পুরাতন।
– কি আর করবে। চোখে চোখে রাখ। বাইরে যেতে দিও না।
– তার মানে কি? ওকে কি বন্দি করে রাখব? আর ওর দোষই বা কি?
– দোষ ওর হতে যাবে কেন। দোষ সমাজ ব্যবস্থার। পুরুষের হীনমন্যতার। তাই বলে কি আমি সবার সাথে বিবাদে জড়াব? তার চেয়ে সামলে চলাই কি ভাল নয়?
– দীর্ঘনিঃশ্বাস মা’র।
মেয়েটি শুনতে পায় এই কথোপকথন। বুঝতে পারে বাবা-মায়ের সীমাবদ্ধতা। নিজের উপর নিজের ক্ষোভ জন্মে যায়। বাড়ির কাজের লোক থেকে শুরু করে মোরের দোকানের বৃদ্ধ। সরল চাহনি যেন সবাই ভুলে গেছে। সব সময় মনে হয় কেউ তাকে দেখছে। সে কি চিড়িয়া নাকি! কথা বলতে বলতে গায়ে হাত দেয়া। যা একসময় খুব স্বাভাবিক লাগলেও এখন কেন যেন অস্বস্তি লাগে।
– ওরা কি এটা বুঝতে পারে না? নাকি বুঝে শুনেই এমন করে?
ওর ভাল লাগে না। সবাই যে এমন তাও নয়। তবে মাঝে মাঝেই এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। কখনো মাকে বলে। কখনো দোর বন্ধ ঘরে কেঁদে হালকা করে মনের ভার। পুরুষ জাতটাকে ওর কাছে বহুরূপী মনে হয়। মাঝে মাঝে বাবা-ভাই আরও কিছু পরিচিত মুখের ছবি মনের পর্দায় পাশাপাশি সাজিয়ে দেখে কোন মিল নেই। কোন কোন মুখ করে শ্রদ্ধাবনত, কোন মুখ বিশুদ্ধ করে মন। আবার কোন মুখ ভালোলাগা মিশ্রিত লাজে করে সিক্ত। কিন্তু সব ছাপিয়ে যখন কোন কোন মুখের ছবি পৈশাচিক মনে হয়। শত চেষ্টাতেও এই মুখচ্ছবি গুলি কিছুতেই মুছতে পারে না মন থেকে। মনে মনে ভাবে; ওর চোখে যে যেমন অন্য মেয়ের চোখে সে কেমন। এই বাবা, ভাই, ভাল লাগার মানুষগুলো অন্যত্র কতটা তেমন। মেয়েটি আর ভাবতে চায় না। এই মুখগুলো যেন সবার কাছে এমন থাকে মনেপ্রাণে ও তাই চায়।
মা প্রবোধ দেন মেয়েকে, বোঝাতে চেষ্টা করেন। মেয়েদের অনেক কিছুই মেনে নিতে হয়। মানিয়ে চলতে হয়। এটা যে ও বোঝেনা তা নয় তবু মাঝে মাঝে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে মন।
– মেয়ে বলেই সব মেনে নিতে হবে কেন?
– কারণ এটা পুরুষ শাসিত সমাজ।
– তাই বলে মুখ বুঝে সহ্য করে যাব?
– মুখ বুঝে সহ্য করতে তো বলছি না, বলছি এড়িয়ে চলতে।
– মা তুমি ভাবতেও পারবে না। ভাল সেজে থাকা মুখগুলির আড়ালেও যে কি পরিমাণ কুৎসিত মানসিকতা লুকিয়ে থাকে ।
– কেন বুঝতে পারব না, আমি কি এই সময়টা পার করে আসিনি। সবাই এক নয়। তোমাকে মুখোশের আড়ালের মানুষটিকে জানতে হবে। তবেই না তুমি নিরাপদ।
মায়ের ক্রমাগত চেষ্টায় এতদিনে মেয়েও মেনে নিয়েছে। শিখেছে মানিয়ে চলার কৌশল। এভাবেই পার হয়ে যায় তার ১৯ টি বসন্ত বা বরষা। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন থেমে যায় বাবার সিদ্ধান্তে। তাকে বিয়ে করতে হবে। মেয়ের অনুরোধে বাবা হবু জামাতা এবং তার পরিবারকে শর্ত দেন মেয়ের লেখাপড়া বন্ধ করা যাবে না। তারা এক বাক্যে রাজি হয়ে যান।
যথাসময়ে আনন্দোৎসবের মধ্য দিয়ে তার বিয়ে হয়। এক নতুন জীবন নতুন আশা। সাথে মায়ের দেয়া সহস্র সতর্কবাণী নিয়ে সে বরের অপেক্ষারত। যথাসময়ে বর এলেন। তার কুশল জানতে চাইলেন। এর পরে জুরে দিলেন এক আবদার-
– “ তুমি তো জান বিয়েতে তিন লক্ষ টাকা দেনমোহর ধার্য করা হয়েছে। আমি মেনে নিয়েছি তোমার সম্মানের কথা ভেবে। আর তা ছাড়া আমার যা কিছু সবই তো তোমার। তুমি যদি এই টাকার দাবীটা ছেরে না দাও তাহলে তো আমাকে এখন এই টাকার সন্ধানে নামতে হয়। তুমি কি তাই চাও?”
মেনে নেয়া আর মানিয়ে চলার শিক্ষা তাকে দেয়া হয়েছিল। এবার সে, সেই শিক্ষার মান রাখতে ভুল করল না। আর তাছাড়া মা তো আগেই শিখিয়েছেন এই কথার উত্তরে ভাল(!) মেয়েদের কি বলতে হয়। নতুন বরও তার মনের মত উত্তর পেয়ে যার পর নাই আনন্দিত।
শাশুড়ি তো আর মা নন তাকে একটু বুঝে শুনেই ঘরের বউদের চলতে হয় এ শিক্ষা তার মা তাকে দিয়েছেন। আর সে শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে অবলীলায় সে হজম করে গেল শাশুড়ির সব অনুযোগ। এমনকি যখন শাশুড়ি এও বলল যে, আমরা না হয় ভদ্রতা করে বলেছি আমরা বিয়েতে কোন কিছু চাই না। তাই বলে তোমার বাবা কি সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তোমায় এভাবে পাঠাতে পারেন?
– কি দিয়েছে বল? সব কিছু হিসেব করলে সাকুল্যে ৫ লাখ টাকাও খরচ করেননি তিনি।
তখনো মেয়েটি হজম করে গেল যদিও সে বলতে পারত ৫ লাখ নয় প্রায় ৮ লাখ টাকা তার বাবা খরচ করেছেন। যার প্রায় অর্ধেকই ধার করে। এত কিছু সয়েও নতুন জীবন কাটছিল এক রকম। গোলটা বাধল যখন শশুর মহাশয় বেকে বসলেন তাকে উচ্চশিক্ষা নিতে ভার্সিটিতে ভর্তি হতে দিতে চাইলেন না। তাকে কোনমতেই রাজি করানো গেল না। আশ্চর্যের বিষয় স্বামী ধনও তার বাবার সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে বলছেন।
– আমাদের তো অভাব নেই। তোমাকে চাকরী করতে হবে না। তাহলে আর লেখাপড়া কেন?
পাঠক এটি একটি বাস্তব কাহিনী। এর সাথে কোন না কোন অংশ অথবা একাধিক অংশ আপনার পরিচিত যে কোন নারীর জীবনের সাথে মিলে যাবে। এটাই বাস্তবতা। এখানে কিছু বৈষম্য, কিছু প্রতারণা এবং নির্যাতনের চিত্র ফুটে উঠেছে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এটা একটি অংশ মাত্র। পারিবারিক নারী নির্যাতনের প্রকৃত রূপ, পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্নতর হতে দেখা যায়। এর ফলাফল সুদূরপ্রসারী। আর এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায়ী পুরুষের হীনমন্যতা, দাবিয়ে রাখার প্রবণতা এবং সংকীর্ণতা। তবে পারিবারিক নারী নির্যাতনটি সহিংসতার পর্যায়ে পৌছুতে নারীদের একটি ভূমিকা লক্ষণীয়।
আমাদের সামাজিক ব্যবস্থাটাই এমন যে, এখানে নারীকেই নিগৃহীত হতে হয় নানাভাবে। এসিড সন্ত্রাস থেকে শুরু করে পাচার হয়ে যাওয়া, এর সবই নারী কেন্দ্রিক সন্ত্রাস। পুরুষ কর্তৃক সংগঠিত এইসব সন্ত্রাসের পেছনের গল্পটি ঘাঁটলে দেখা যায় এর পেছনে অন্য যাদের প্ররোচনা এবং সহযোগিতা থাকে তাদের মধ্যে নারীদের অংশগ্রহণের হার একেবারে কম নয়!
ইদানীং আমাদের সমাজে নারী নির্যাতনের হার বেড়েছে। যার বেশিরভাগই পারিবারিক নির্যাতন। একজন নারী যখন তার শশুড় বাড়ীর লোকজন কর্তৃক নির্যাতনের স্বীকার হন। তখন তিনি যে শুধু পুরুষ কর্তৃকই নির্যাতিত হন তা নয় বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর সাথে সম্পৃক্ত থাকেন নারীরা। আমাদের দেশে বউ-শাশুড়ি, ননদ-ভাবী’র যুদ্ধ সর্বজনবিদিত। পারিবারিক নির্যাতনের বীজটি এখানেই নিহিত। বউ-শাশুড়ির পারস্পরীক শ্রদ্ধা বোধ এবং মমত্বের যে ঘাটতি, তা কখনোই তাদের মা-মেয়ের সম্পর্কে উন্নীত হতে দেয়না। তেমনি পারস্পরিক আস্থা-ভালবাসার অভাব ননদ-ভাবী’র সম্পর্ককে বোনের মর্যাদায় উন্নীত না করে সাপে-নেউলে করে রাখে। এভাবেই একটি মেয়ে কোন ঘরের বউ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই ঐ পরিবারের সদস্যরা দুটিভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। স্বাভাবিকভাবেই পরের মেয়ে পরই থাকে। সাথে ঘরের ছেলেটাও পর হয়ে যায়। এখানে নির্দিষ্টভাবে কেউই দোষী নয়। দোষ আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির। একই ঘরে শত্রুভাবাপন্ন মানসিকতা নিয়ে থাকার ফলে ঝগড়া বিবাদ নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। যার প্রভাব পড়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কেও। শুরু হয় তাদের মধ্যে মনোমালিন্য। আর তারই সুযোগ নেয় অন্যরা। আর যদি তার সাথে অর্থের লোভ যোগ হয় তাহলে তো কথাই নেই। এক সময় দেখা যায় নতুন বউটি সম্পূর্ণরূপে একা। অভিভাবকহীন, অনিরাপদ। যাকে বহুগুণ নিরাপত্তা হীন করে তোলে আমাদের সামাজিক সংস্কার! যা তাকে বাধা দেয় প্রতিবাদী হতে। বাধা দেয় বাবার বাড়ি চলে যেতে। যদি সে এ দুটোর একটি পথ বেছে নেয় এ সমাজ তখন তাকে অচ্ছুত করে ছারে। যে কারণে সে পরে পরে মার খায়। সে স্বীকার হয় আগুনে পুড়ে মৃত্যুর মত বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের। কিংবা আত্মহত্যা করে জুড়ায় সব জ্বালা।
এই সব সমস্যার আধুনিক দাওয়াই বিয়ের পর পরই আলাদা হয়ে যাওয়া। মা-বাবা ভাই-বোন ছেড়ে বউকে নিয়ে আলাদা সংসার বাধা। এ ব্যবস্থায় সমস্যার সমাধান হচ্ছে, না সমস্যাকে আর জটিল করে তুলছে তা আলোচনার দাবী রাখে। কেননা এতে যদি নারীর প্রতি সহিংসতা কমত তাহলে আমরা একে নির্দ্বিধায় সঠিক সমাধান বলে মেনে নিতাম। অভিভাবকহীন নতুন সংসারে সহসাই কালো ছায়া নেমে আসছে। কথায় কথায় ঝগড়া-ঝাটি সৃষ্টি করছে পারিবারিক অশান্তি। মেটানোর কেউ নেই। ফলাফল; নেহাতই মামুলি বিষয় থেকে ঘটছে সহিংসতা। পাশের ফ্লাটে একজন খুন হয়ে যাচ্ছে আমরা উকি মেরেও দেখিনা। অথচ একটা সময় ছিল প্রতিবেশির ভূমিকাতেই অনেক বড় সহিংসতার হাত থেকে রক্ষা পেত ভুক্তভুগিরা। পারিবারিক নির্যাতনের ফলে ছোট্ট শিশুটি ভুগছে চরম নিরাপত্তা হীনতায়, স্বামী-স্ত্রী জরিয়ে পড়ছে অনৈতিক সম্পর্কে।
আলাদা থাকার এই প্রবণতা একটু একটু করে আলগা করে দিচ্ছে সম্পর্কের বাঁধন। যা একসময় ভুলিয়ে দেয় রক্তের এবং নাড়ীর টানও। সন্তান, সংসারের চাপে বৃদ্ধ মা-বাবাকে বাধ্য করে সম্পত্তির ভাগ বুঝিয়ে দিতে। বৃদ্ধ মা-বাবার ঠাই মেলে বৃদ্ধাশ্রমে। (গ্রামে মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে যেতে না হলেও শেষ জীবনে তারাও খুব একটা ভালও থাকেন না।)
শহর বা গ্রাম দু জায়গাতেই শেষ বয়সে পুত্রবধূ শোধ নেয়ার চেষ্টা করে পূর্বে সহ্য করা লাঞ্ছনার। কিন্তু কথা হল এর জন্য কি সেই মা-বাবাও দায়ী নন। তারা যদি পুত্রবধূকে মেয়ের আসনে বসাতে পারতেন। ননদ যদি ভাবিকে বোনের আসনে বসাতে পারত। তাহলে তাদের মধ্যে যে পারিবারিক বন্ধন সৃষ্টি হত তা কি কখনো তাদের বৃদ্ধ মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রম মুখী করত?
একজন গৃহবধূ যখন নির্যাতনের স্বীকার হন সেক্ষেত্রে বেশিরভাগ পরিবারের মেয়ে এবং গৃহকর্ত্রীর একটি বড় ভূমিকা থাকে। কখনো কখনো তাদের প্ররোচনাতেই নির্যাতন শুরু হয় এবং নির্যাতনের মাত্রা নির্ণীত হয়। অথচ পুরো চিত্রটা ভিন্ন হতে পারত যদি ঐ পরিবারের মেয়ে এবং গৃহকর্ত্রী ভিন্ন ভূমিকা পালন করতেন। কেননা একই পরিবারে থেকে একজন পুরুষের পক্ষে তার মা-বাবা, ভাই-বোন সকলের বিরুদ্ধাচরণ করে স্ত্রী নির্যাতনের সুযোগ খুব একটা পাওয়ার কথা নয়। বিশেষকরে একান্নবর্তী পরিবারে।
পারিবারিক নারী নির্যাতনের এই যে চিত্র, এটা কি শুধুই পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থার ফল? নাকি নারীদের অসচেতনতাও এর জন্য বহুলাংশে দায়ী তা আলোচনার দাবী রাখে।
কেউ নারীর সমস্যা নিয়ে কথা বললে তাকে চিহ্নিত করা হয় নারীবাদী বলে মানবতাবাদী বলে নয়। কেন? আমাদের দৃষ্টিতে নারী মা হতে পারেন ঠিকই কিন্তু পূর্নাঙ্গ মানুষ হয়ে উঠতে পারেন না। ব্যর্থতা কি নারীর না আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির? পুরুষের এই দাবীয়ে রাখার প্রবণতা হয়ত প্রাগৈতিহাসিক কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় হল মাঝে মাঝেই পুরুষের এই মহৎ কাজের সহযোগী হিসেবে নারীকেই দেখতে পাওয়া যায়। আর তখন খুব সহজেই অনুমিত হয় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নিষ্পেষণের স্বীকার হয়ে নারী আজ নিজেদের অজান্তেই পুরুষের ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছে। পালটে গেছে তাদের আত্মসম্মানের ব্যাখ্যা।
একবারও এই প্রশ্নটা কেউ করে না সুন্দরী প্রতিযোগিতায় মেকআপ ম্যান, ফটোগ্রাফার, কোরিওগ্রাফার এমনকি বিচারকের আসনে পুরুষ কেন। নারী যদি আত্মসম্মানে বলীয়ান হত তাহলেই কেবল এইসব প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারত। আজ তাদের অধিকারের সীমা নতুনভাবে নির্ণীত হচ্ছে। তারই প্রমাণ মেলে যখন দেখা যায়। নেতৃত্বের দিক দিয়ে, সামাজিক অবস্থানের দিক দিয়ে শিক্ষা-দীক্ষায় অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে নারীরা অনেক এগিয়ে এবং সুবিধাজনক অবস্থায় থাকা সত্যেও সামগ্রিকভাবে নারীর বঞ্চনার বিরুদ্ধে তারা ততটা সোচ্চার নন। বরং নিজেদের যাহির করার প্রবণতাই বেশি। এমনকি প্রতিবাদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেও লক্ষ থাকে প্রচার। ফলে প্রতিবাদটিও প্রচার সর্বস্বই হয়ে পরে। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ অর্জন আর হয়ে ওঠে না। আর তাই শত প্রতিকূলতার মাঝেও একজন বেগম রোকেয়ার দেখা মিললেও প্রতিকুল পরিবেশেও মিলছে না তার উত্তরসূরি।
সমাজের সুবিধাভোগী নারীরা হয়ত তুলনামূলক ভাবে কম নির্যাতনের স্বীকার হন বলেই নারী নির্যাতন নিয়ে মাথাও কম ঘামান। অথচ তারা ইচ্ছে করলেই সুসংগঠিত ভাবে আন্দোলনের সূচনা করতে পারতেন। সে সুযোগও তাদের রয়েছে। অন্যদিকে সমাজের সব থেকে অবহেলিত, দরিদ্র, অশিক্ষিত তথা পশ্চাৎপদরাই নির্যাতনের স্বীকার হন বেশি। কিন্তু তাদের সুসংগঠিত ভাবে আন্দোলনের ক্ষমতা নেই। যদিও তারাই এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন সবথেকে বেশি। কিন্তু নেতৃত্বের অভাবে তারা সংগঠিত হতে পারছেন না।
• নারী নির্যাতন বিরোধী সংগঠনগুলোর পক্ষে হয়ত ঘরে ঘরে গিয়ে এ ব্যাপারে জনসচেতনতা সৃষ্টি সম্ভব নয় তথাপিও তাদের আরও অনেক বেশি জন সম্পৃক্ততার প্রয়োজন রয়েছে।
• নির্যাতিতা নারীকে সহায়তা প্রদানের প্রয়োজন রয়েছে।
• সেইসাথে এর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ আরও অনেক বেশি জরুরী। আমাদের সমাজে পারিবারিক নারী নির্যাতন যতটা হয় তার নগণ্য একটি সংখ্যা প্রচারণায় আসে। সামাজিক সম্মান, সংসার টিকিয়ে রাখা বিভিন্ন কারণে অনেকেই এর কথা জানাতে চান না। যার প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী। বিষয়টি আমরা বুঝেও না বোঝার, জেনেও না জানার ভান করে থাকি।
• কার কথা কার কাছে বলব। বা উপরে থুঃ থুঃ ছেটালে নিজের গায়েই পরে। এ ধরনের মানসিকতা থেকেই এই চেপে রাখার প্রয়াস। কিন্তু কথা হচ্ছে এই চেপে রাখার প্রবণতা পরিহার করে সমস্যার সমাধানই কি শ্রেয় নয়?
• মা কেন অন্ধ হবেন? ছেলের দোষ তো তিনি জানেন। তিনি কেন তার ছেলের পক্ষ হয়ে পুত্রবধূর সাথে অন্যায় আচরণ করবেন?
• কেন শাশুরী পূত্রবধুর মা হতে পারেন না? গর্ভধারিণী মা যেমন তার মেয়েকে আগলে রাখেন মেয়ের সব দোষ ত্রুটি ঢেকে রাখার চেষ্টা করেন পুত্রবধূর বেলায় তিনি কেন সে ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন না?
• ঘরের বউ-ই বা কেন শশুড়-শাশুড়িকে নিজের মা-বাবা ভাবতে পারেন না? কেন আপন করে নিতে পারেন না?
• স্ত্রী কেন ভাবেন স্বামী শুধুই তারই। পক্ষান্তরে মা-বাবাই বা কেন মুষড়ে পরেন ছেলেটা পর হয়ে গেল এই ভেবে।
কেন এই হীনমন্যতা?
আজ সভ্যতার চরম শিখরে দারিয়ে মানুষ এতটা স্বার্থপর কেন হবে।
তাহলে এই সভ্যতারই বা কি প্রয়োজন?
মানুষের হিংস্রতা যদি পশুকেও হার মানায়। সভ্যতার ফাকা বুলি আওড়ে কি লাভ?
সর্বোপরি এই হীনমন্যতা, এই স্বার্থপরতা আমাদের তো কিছু দিতে পারছে না তাহলে কেন আমরা সেই পারিবারিক মূল্যবোধ সামাজিক দায়বদ্ধতা পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ স্নেহ ভালবাসায় ঘেরা আমাদের সংস্কৃতির সূতিকাগারে ফিরে যাইনা?
এই যে সর্বগ্রাসী অবক্ষয় পরিবার থেকে নিত্য সংক্রমিত হচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। আমরা কি ভেবে দেখেছি। আমাদের এই সংকীর্ণতা ক্রমশ কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। আজ আপনার সন্তান অভিভাবক সংকটে ভুগছে। আপনার স্ত্রী আস্থাহীনতায় ভুগছে, আপনার মা- বাবার দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠছে বাতাস। আপনি নিজে পুড়ে মরছেন অশান্তির অনলে। অথচ আপনার সুবিবেচনা, আপনার দ্বায়িত্ববোধ আপনার আন্তরিকতা খুব সহজেই পারে পারিবারিক এই অসুস্থ্যতা দূর করে একটি সুখি সুন্দর শান্তির নীড় উপহার দিতে। যা এই সমাজের এখন খুব বেশি প্রয়োজন।

kmgmehadi@yahoo.com