ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

অতীতকে ভুলে যাওয়া উচিত। সত্যিই তাই, ন্যক্কারজনক ঘটনা কেউই মনে রাখতে চায় না। বোধকরি উচিতও নয়। কিন্তু সোনালী অতীত? যে অতীতের সাথে জড়িয়ে থাকে জাতীয় সম্মান। যা একটি জাতীর শৌর্য-বীর্যের পরিচায়ক। তাকেও ভুলে যাওয়া উচিত? নাকি কেটে ছেঁটে সুবিধা মত ভুলে যাওয়া উচিত? হীনা রাব্বানি, কৃতার্থ হতাম যদি সে ছবকটুকুও দিয়ে যেতেন। আপনাদের ক্ষমা চাইতে লজ্জা করে, না আদৌ ক্ষমা চাওয়া উচিৎ বলেই মনে করেন না। সেটাও বোধগম্য হল না।

যৌবনের নিতীবানের বার্ধক্যে ভ্রষ্টতা এ উদাহরণ নতুন নয়। মুক্তিযোদ্ধারা সবাই মহামানবও নয়। সবাই কি পেরেছেন সেই আদর্শ ধরে রাখতে? যদি পারতেন তাহলে তো এদেশের সকল মুক্তিযোদ্ধা একই ছাতার তলে থাকতে পারতেন পরস্পরবিরোধী অবস্থানে থাকতেন না। তারা ব্যবহৃত হতেন না। নিজের সম্মান নিজেকেই ধরে রাখতে হয়। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্মকে কারা দ্বিধান্বিত করেছে? কারা মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তিকে পুনর্বাসিত করেছে? তারা কি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না? কত সস্তায় নীতি বিক্রি হয় এ দেশ তাঁর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। খন্দকার মুশতাকও এ দেশের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন অন্যান্য প্রেসিডেন্টদের সাথে তার সম্মানে, স্মরণে, ঘৃণায় যোজন যোজন দূরত্ব।

জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ আজ যে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এমনকি যে জনসমর্থনের ভিত্তির উপরে দাঁড়ানো তা যে কোন দলের কাছে ঈর্ষনীয়। তাদের এ অবস্থানে কারা এনেছে কারা তাদের অব্যাহত ভাবে সহযোগিতা করে চলেছে। তারা আমাদের অনেকের কাছেই কি পরম পূজনীয় নয়?

বিপ্লবের পিঠেই থাকে প্রতিবিপ্লবের সম্ভাবনা। যে কারণে অনেক বিপ্লবের সফল সমাপ্তির পরেও দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি ঘটতে দেখা যায়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বটি যিনি দিয়েছিলেন তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং গ্রহণযোগ্যতার সামনে প্রতিবিপ্লবের সুযোগ ছিল না। আর সে সুযোগটি ছিল নয়া বলেই ষড়যন্ত্রের নীলনকশা আঁকতে হয়েছিল। বুদ্ধিজীবী নিধনের মধ্য দিয়ে যা বাস্তবায়নের শুরু। আর তারপর একে একে ১৫ আগস্ট, ৩ নভেম্বর, ৭ নভেম্বর একের পর এক চলে ষড়যন্ত্রের বাস্তবায়ন। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে ফ্রিডম পার্টি, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ এর জন্ম, পরিচর্যা এবং মহীরুহে পরিণত হওয়া। আজো আমরা চলছি একই ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে। যতদিন না আমরা সবার উপরে দেশকে নিয়ে যেতে পারব। ততদিন এমনিই চলবে। যা একসময় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকেই করবে প্রশ্নবিদ্ধ। কিছু জ্ঞানপাপী, কিছু স্বার্থান্ধের অপপ্রচারে প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত হচ্ছে স্বাধীনতা উত্তর প্রজন্মটি। আমরা ভুলে যাই, অন্ধভক্তি বেকুবের কম্ম।

আজ যখন পাকিস্তানের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক দ্য ডন এর সম্পাদকীয়তে মন্তব্য করা হয়, “১৯৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনের জন্য দেশটিকে বাংলাদেশের কাছে নিছক দুঃখ প্রকাশ নয়, পরিপূর্ণ ক্ষমা চাওয়া উচিত। এতে করে পাকিস্তানও দেখাতে পারবে, তাদের ভুল স্বীকার করার ‘সৎ সাহস’ রয়েছে”।

ঠিক তখনই বাংলাদেশের প্রধান বিরোধীদল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধের কথা বলে। ষড়যন্ত্রের কলটি কিভাবে চলে এরপরেও কি তা অগোচরে থাকে?

জামায়াত ইসলামী বাংলাদেশ এর সদস্যরা যদি মনে করে থাকে যুদ্ধাপরাধে জড়িতরা ছাড়া তাদের সংগঠন অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে। তাহলে তাদের উচিত অনতিবিলম্বে এর সদস্যপদে ইস্তফা প্রদান করে কালিমা মুক্ত হওয়া। আর তারা যদি মনে করে তারা ছাড়াও তাদের দল চলবে। ব্যক্তির চেয়ে দল বড় বলে মনে করে তাহলে তাদের উচিত যুদ্ধাপরাধের বিচারকে বাধাগ্রস্ত না করে বরং যুদ্ধাপরাধীদের সদস্যপদ স্থগিত করা। বা দল থেকে বহিষ্কার করা। একটি প্রজন্মের অন্যায়ের দায়ভার প্রজন্মের পড় প্রজন্ম কেন বয়ে বেড়াবে?

হিনা রাব্বানি কী বলে গেলেন অতীতকে ভুলে যেতে না এ দেশের অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে? তিনি যে বিষয়গুলিকে নির্দেশ করে ভুলে যেতে বলেছেন তাঁর সাথে জড়িত ত্রিশ লক্ষ শহীদের সর্বোচ্চ ত্যাগ, লক্ষ লক্ষ বোনের আত্মত্যাগ। হয়ত অনেকে তা ভুলে গেছেনও। তা না হলে এতদিন পরে এ সাহস তিনি কোথায় পেলেন। আজ যাদের জন্য তিনি এ ধৃষ্টতা দেখানোর সাহস পেলেন। তাদের পরিণতি কি খন্দকার মোশতাকের মত হবে না? ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। দয়া করে ইতিহাসের আস্তা কুরে নিক্ষিপ্ত হবেন না। নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে যেমন মানুষ স্মরণ করে তেমনি মীরজাফরকেও। একজন পূজনীয় অন্যজন ঘৃণিত। সামান্যর বিনিময়ে আত্মাবিক্রী নিতান্তই লজ্জার।

kmgmehadi@yahoo.com