ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

ভাষা আন্দোলনের মাস ফাল্গুন না ফেব্রুয়ারি? ভাষা দিবস ৮ ফাল্গুন না ২১ ফেব্রুয়ারি? জটের শুরু তো এখান থেকে। যে ভাষাকে আন্দোলন সংগ্রাম করে প্রাণের বিনিময়ে অর্জন করতে হয়। যে দিবসটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। সেই ভাষার যারা অভিভাবক তারাই যখন এই ভাষাটিকে চরম অবহেলা করেন তখন সাধারণ ভাষাভাষীর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হওয়াই স্বাভাবিক। সর্বস্তরের বাংলার প্রচলনের নিমিত্তেই ভাষা শহীদরা নিজেদের আত্মোৎসর্গ করেছিলেন। সংবিধান রক্ষা করার গুরুদায়িত্ব যে বিচার বিভাগের ওপর ন্যস্ত সেই সর্বোচ্চ আদালতই বাংলা ভাষার চর্চায় চরম উদাসীন। দেশের আইন বিভাগ এবং বিচার বিভাগের দায়িত্ব ভাষা শহীদদের চেতনাকে সমুন্নত রাখা।

আমাদের উচ্চ আদালতে যেখানে বাংলার ব্যবহার দু’একজন বিচারপতির বাংলায় রায় লেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সেখানে আমাদের পাশের দেশ নেপাল থেকে শুরু করে ফ্রান্স, জাপান, চীনের মত অনেক দেশে তাদের জাতীয় ভাষায়ই আদালতের কার্যক্রম চলছে। আমাদের উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে যুক্তি হল, মামলা রুজুর ক্ষেত্রে এবং অনেক রায় বিদেশের আদালতগুলোর দেয়া রায়ের নজির নিতে বাংলা ভাষা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। এটা কতখানি যৌক্তিক তা এ বিষয়ে অভিজ্ঞজন ভাল বলতে পারবেন। তবে এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় এই প্রতিবন্ধকতা দূর করা খুব কঠিন কিছু নয়। প্রয়োজন আন্তরিকতা। বাংলাকে সর্বান্তকরণে ধারণ করা। জনস্বার্থে দায়ের করা মামলাগুলোতে দেয়া যুগান্তকারী রায়ের সুফল যদি কেবলমাত্র ভাষা গত সমস্যার কারণে সাধারণ মানুষ ভোগ করতেই না পারল তাহলে সে রায়েরই বা সাফল্য কোথায়? জনমানুষের জন্য আইন ও বিচারের রায় সহজবোধ্য করতেই উচ্চ আদালতে বাংলার ব্যাবহার জরুরী।

সহজ বাংলার ব্যবহার একদিকে যেমন আইনকে মাধুর্য মণ্ডিত করবে-প্রাণহীন আইনকে করবে সরস। অন্যদিকে আদালত উচ্চবিত্তের ঘেরাটোপ থেকে বেড়িয়ে সাধারণ মানুষকে অধিকার বঞ্চনার হাত থেকে রক্ষা করবে। সাধারণ মানুষ সহজেই আইনের আশ্রয় নিতে পারবে। যা আইনের শাসনকে করবে সুপ্রতিষ্ঠিত। আর তাই, যে সব আইনি শব্দের বাংলা পরিভাষা নেই সে শব শব্দের পারিভাষিক শব্দের অভিধান তৈরি করে হলেও এর সমাধান একান্ত প্রয়োজন।

উচ্চ আদালতে বাংলা প্রচলনে কোন আইনি বাধা নেই, যা রয়েছে তা মানসিক সমস্যা। প্রয়োজন ইচ্ছার প্রতিফলন। আদালত বাংলার সঠিক ব্যবহারের রায় পর্যন্ত দেন ইংরেজিতে(!) এটা কি হতাশাজনক নয়? বাংলা ভাষা প্রচলন করার ক্ষেত্রে আদালতকে বাধ্যবাধকতার বাইরে রাখা মানে তাদের উপর কোন কিছু চাপিয়ে না দেয়া। কেননা উচ্চ আদালত স্ব-প্রণোদিত হয়েই বাংলা ভাষার ব্যাবহার নিশ্চিত করবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যখন তারা তা করছেন না তখন মাননীয় আইনমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, “দেওয়ানি কার্যবিধির ১৩৭ ধারার প্রয়োজনীয় সংশোধন দরকার হলে তা করা হবে। সংবিধান অনুযায়ী আদালতে বাংলা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ওই কার্যবিধি বাধা হতে পারে না”। কিন্তু কথা হচ্ছে ১৩৭ ধারা তো বাংলা ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক নয়। যদি এই ধারা সংশোধন করে আদালতে বাংলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয় তা নিশ্চয়ই উচ্চ আদালতের জন্য সম্মানজনক হবে না?

kmgmehadi@yahoo.com
সূত্র: প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ব্লগ রাইসুলসৌরভ।
blog.bdnews24.com/RaisuLSourav/65907
http://www.prothom-alo.com/detail/news/43934
http://www.bd-pratidin.com