ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

মানুষের জীবনের মূল্য কত? তা নির্ধারণের পূর্বে জানতে হবে মানুষের সংজ্ঞা। কারণ মানুষ বলতে সাধারণত আমরা যাদেরকে বুঝি; পুঁজিবাদী এ সমাজ ব্যবস্থার কাছে তা নিতান্তই হাস্যকর। এখানে মানুষ হতে হলে তাকে প্রথমেই বিত্তবান হতে হবে। তার সামাজিক অবস্থান থাকতে হবে। সর্বোপরি অধীনস্থদের এবং নির্ভরশীলদের অমানুষ ভাবতে পারতে হবে। তবেই সে মানুষ। শুধু মানুষ নয় মহা মানুষও বটে। দাসত্বের যে জিঞ্জির মানব সভ্যতার প্রাক্কালে বেশিরভাগ মানুষকে আবদ্ধ করে রেখেছিল বিংশ শতাব্দীতে এসে তা কেবল খোলস পাল্টেছে মাত্র। আজো সাধারণ-অসাধারণ, মালিক-শ্রমিকের নামে মানবতাকে ভূলুণ্ঠিত করা হয় পদে পদে। আমরা বলতে পারি, দাসপ্রথার অমানবিক চিত্রটি শৈল্পিক ভাবে উপস্থাপনের অক্লান্ত প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। মাঝেমাঝেই যার শরীর থেকে আবরণ খসে পরে। তখন আমাদের চোখে কিছুক্ষণের জন্য বড় বেশি অমানবিক হয়ে তা ধরা পড়ে। তখন কর্তাব্যক্তিদের হাহুতাস সাধারণ মানুষের কষ্টের সাথে একাত্ম হতে চাওয়া কিংবা অর্থ দিয়ে মানুষ হত্যার দায় মেটানোকে মোটেই মানবিক মনে হয় না। বরং হায়েনার ফাদে পরার পর দায়মুক্তির চেষ্টা বলে তাকে আরও বেশি কুৎসিত মনে হয়।

একটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার কোন গাড়িতে চড়েন বা কতটা সৌখিন জীবন যাপন করেন তা আমার বিবেচ্য নয় কিন্তু তাঁর প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রতিটি শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তারই। তিনি যেমন তার প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। তেমনি প্রতিটি শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা প্রদান, উন্নত কাজের পরিবেশ নিশ্চিতকরণ। সঠিক সময়ে প্রাপ্য মজুরী প্রদানের দায়িত্ব তারই। একজন শ্রমিক তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠতর সময়ের সর্বচ্চ শ্রম বিক্রি করে জীবনের নিরাপত্তার খাতিরে। তার দায়িত্ববোধে তাড়িত হয়ে। অনাকাংখিতভাবে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে নয়। অথচ দুর্ভাগ্যজনকভাবে বার বার তাই হয়। এই সব প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা ভুলে যান এই শ্রমিকের রক্ত ঘামে আয় করা অর্থেই তারা বিলাস ব্যসনে মত্ত থাকেন। এমনকি এই সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সকল ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতেও এই শ্রমিকেরাই রাজপথে নেমে আসে।

তাজরীন ফ্যাশনস এর মত ঘটনা এ দেশে এই প্রথম নয়। এর আগেও বহুবার এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। এমন অগ্নিকান্ডে ১৯৯০ থেকে এ ঘটনার পূর্ব পর্যন্ত ২১২ টি ঘটনায় ২৭৫ জন শ্রমিক অগ্নিদগ্ধ হয়ে মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করেছেন। অনেক কথা হয়েছে। প্রতিশ্রুতির জোয়ারে ভেসে গেছে স্বজন হারানদের আর্তনাদ। অবস্থার পরিবর্তন হয়নি এতটুকু। কারণ একটাই, শ্রমিক শ্রমিকই মানুষ নয়। শ্রমিকের দোহাই দিয়ে রাজনীতিবিদ হওয়া যায়। শ্রমিকের ভোটে নেতা হওয়া যায়। শ্রমিককে দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটা যায়। শ্রমিকের রক্ত ঘামে অর্জিত অর্থে বিপুল বিত্তের মালিক বনে যাওয়া যায়। কিন্তু শ্রমিককে মানুষ বলে ভাবা যায় না। মাননীয় অর্থমন্ত্রী এই শ্রমিকের রক্ত জল করা অর্থে দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির সূচক বৃদ্ধিতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। একবার খোজ নিয়ে দেখেন না তারা কেমন আছে। সে সময় তাঁর কোথায়?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন এটা নাশকতা। মানছি, নাশকতা করে আগুন লাগানো হয়েছে। কিন্তু আগুন লাগার পড়েও কেন গেটে তালা লাগিয়ে দেয়া হল। কেন কর্মকর্তারা বললেন আগুন লাগেনি এটা মহড়া মাত্র? কেন কারখানাটিতে আগুন নেভাতে ৩০০ জনের প্রশিক্ষিত কর্মী থাকতেও তাদের কোন কর্মকাণ্ড ছিল না? নাকি এসবই ছিল কাগুজে? অগ্নি নির্বাপনযন্ত্রগুলি অব্যবহৃত থেকে গেল? কেন শ্রমিকদের কাছে গ্যাস মাস্ক পৌঁছুল না? কেন সাদের দরজা বন্ধ ছিল? এমন অজস্র প্রশ্নের উত্তর একটাই। মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা থাকে, বাংলাদেশে শ্রমিক কখনোই মানুষের পর্যায়ে উন্নীত হয় না। তা না হলে তাজরীন ফ্যাশনস একটি ‘কমপ্লায়েন্ট ফ্যাক্টরী’ (!) অথচ এর ভবন তৈরীতে নির্মানবিধি মানা হয়নি। কারখানার তিনটি সিড়ি সাদে গিয়ে মিলেছে কিন্তু সাদ বন্ধ। নিচের ডিকটি এসে মিলেছে নিচতলার গোডাউনে। একে মৃত্যুকূপ বৈ আর কি-ই বা বলা যায়। বিজিএমইএ এবং সরকার কেউই কি এর দায় এড়াতে পারে? ২২ বছরে ২১২ টি ঘটনা ২৭৫ জন শ্রমিকের লাশ কি টনক নড়ার জন্য যথেষ্ট ছিলনা, যে আজ আবার একই সাথে ১১১ টি তাজা প্রাণের পুড়ে অঙ্গার হতে হল? এ দেশে মানুষের থেকে সস্তা আর কিছুই নেই। তবু তারা মানুষ। মিথ্যে করে হলেও আপনারা এই সাধারণ মানুষদেরই মাঝে মাঝে অসাধারণ বলে সম্বোধন করতে বাধ্য হন। কারন তাদের ঘারে চড়েই আপনারা সমৃদ্ধির রথে চড়ে বসেন। আর তাই এদেরকে বাঁচিয়ে রাখাও আপনাদেরই প্রয়োজন।

সংবাদ সংস্থা এ এফ পি বাংলাদেশের পোশাক কারখানায় অগ্নিকান্ডের পেছনে পশ্চিমা ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের দুর্বল নিরাপত্তা নিরীক্ষা প্রতিবেদনকে দায়ী করেছে। তাহলে কি এদেশের শ্রমিকের নিরাপত্তা দেখভালের দায়িত্ব বিদেশি ক্রেতার? সরকারের নয়? বাংলাদেশের পোশাক কারখানার শ্রমিকের নিরাপত্তা দেখভালের দায়িত্ব বিজিএমইএ’র নয়?

আসলেই তাই। আমাদের দেশে পোশাকশিল্পে যেটুকু নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে তাঁর পুরোটাই এর ক্রেতা গোষ্ঠীর চাপে। আর তাই এর বেশিরভাগই কাগজে কলমে। বাস্তবে অনেকাংশেই অস্তিত্বহীন। এর দায় সরকারও এড়াতে পারে? যেখানে এত বড় একটি কারখানায় একটি জরুরী বহির্গমন পথ পর্যন্ত থাকেনা। থাকেনা পর্যাপ্ত পানি প্রবাহের সুবিধা। পোশাক কারখানাগুলোতে অগ্নিনির্বাপণের যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মালিকদের বাধ্য করতে হাইকোর্টের রুল দেয়া থাকলেও তা বাস্তবায়নে কেন প্রশাসন বার্থ হল সে জবাব সরকারকেই দিতে হবে। দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরে যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে তাদের দেখভালের প্রতি বাড়তি মনোযোগ দেয়া সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।

এই মুহূর্তে যে সব প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ জরুরী:

## প্রতিটি শিল্পকারখানায় প্রতি ফ্লোরে অন্তত একজন করে ফায়ার সার্ভিস এবং সিভিল ডিফেন্সের সদস্যের প্রয়োজনীয়
অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জামাদিসহ দায়িত্বপালন এবং প্রতিটি কারখানায় ফায়ার সার্ভিস এবং সিভিল ডিফেন্সের
সরাসরি তত্ত্বাবধানে কমপক্ষে দশজন সদস্যের সার্বক্ষণিক দায়িত্বপালন নিশ্চিত করা।
## প্রতিটি কারখানা থেকে এর গোডাউন নিরাপদ দূরত্বে প্রতিস্থাপন।
## ফায়ার সার্ভিস এবং সিভিল ডিফেন্সের সরাসরি তত্ত্বাবধানে প্রতি মাসে অগ্নিনির্বাপণ মহড়া নিশ্চিত করা।
## প্রতিটি শিল্পকারখানায় জরুরী বহির্গমনের জন্য প্রশস্ত সিরির ব্যবস্থা করা।
## প্রতিটি শিল্পকারখানার সাদের অংশ যে কোন সময়ে ব্যাবহার উপযোগী রাখা।
## প্রতিটি ফ্লোরের সকল অংশে সহজ পানি প্রবাহ নিশ্চিত করন।
## সর্বোপরি শ্রমিককে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে স্বীকার করে নেয়া।

আমাদের প্রত্যেকের মনে রাখা উচিত পোশাক শিল্প বাংলাদেশের উন্নয়নে যে ভুমিকা পালন করছে। এবং লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের পরিবারকে যে আর্থিক নিরাপত্তা দিয়েছে। তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে এ দেশের অর্থনীতিতে অমানিশা নেমে আসবে। সামাজিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হবে। আর তাই এ ক্ষেত্রে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সরকারের কঠোর নজরদারী এবং আইনের সঠিক বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরী। সেইসাথে এর সঠিক তদন্ত এবং সুষ্ঠ বিচার এই শিল্পকে বাচিয়ে রাখতে এখন সময়ের দাবী।

kmgmehadi@yahoo.com