ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

রাষ্ট্রকে সকল সম্পদের মালিক, আর রাষ্ট্রের সকল সম্পদ নাগরিকদের মাঝে সমভাবে বন্টিত হওয়ার কথা বললেও যখন কম্যুনিস্ট রাষ্ট্রগুলো নাগরিকদের ব্যক্তিসত্তাকে শোষণ করে এক নায়কত্ব জারী করে। একটি এলিট গ্রুপ কর্তৃক পরিচালিত হয়ে পরিণীত হয় পুলিশি রাষ্ট্রে। আর তখনই এই শাসকদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। এক পর্যায়ে নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে দুই একটা ব্যতিক্রম ছাড়া বিশ্বজুড়ে পতন হল কমিউনিজম এর। আর সে স্থানটি দখল করে নিলো পুঁজিবাদ। যেখানে জনগণ রাষ্ট্রের বন্ধন এর বাহিরে থেকে আপন কর্ম উদ্দীপনায় এবং সুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সম্পদ সৃষ্টি করার অবাধ সুযোগ পায়। কিন্তু দেখা গেল সমস্যার সমাধান তো হলই না বরং বেড়েছে শোষণ-বঞ্চনা। তৈরি হয়েছে শ্রেণী বৈষম্য।
এখন এটা দিবালোকের মতই স্পষ্ট যে, রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ হীন ঢালাও পুঁজিবাদ ভাল কোন সমাধান নয়। এই ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগে এনটারপ্রেনাররা শ্রমিককে শোষণ করতে শুরু করে। শ্রমিক বঞ্চিত হয় ন্যায্য মজুরী থেকে। বাধ্য হয় অতিরিক্ত শ্রম ঘণ্টা কাজ করতে। এনটারপ্রেনার শ্রম আইনের তোয়াক্কা করেন না। রাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা পালন তো করছেই না বরং শিল্পের দোহাই দিয়ে প্রণোদনা, রেয়াত সহ নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা প্রদান করে এনটারপ্রেনারদেরই পকেট ভারী করে চলছে। বিনিময়ে রাজনীতিবীদগন তাদের কাছ থেকে পাচ্ছেন মোটা অংকের চাঁদা। যা তাদের দল চালাতে সহায়তা করছে। স্বাভাবিকভাবেই তাদের মধ্যে একটি লেন-দেনের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আর এই সুবিধাবাদী সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে গিয়ে উভয়ই একে অন্যকে প্রশ্রয় দিয়ে চলেন। যার ফলশ্রুতিতে সরাসরি ক্ষতির স্বীকার হয় সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ। তাদের দিকটি দেখার আর কেউ থাকেনা। এ তো গেল একটি দিক আর একটি ভয়াবহ ব্যাপার হল পুজিবাদকে আশ্রয় করে দেশে দেশে মাথাচারা দিয়ে উঠল উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি। যা বিশ্বরাজনীতির গতিপ্রকৃতিই পালটে দিয়েছে। রক্তাক্ত হচ্ছে একের পর এক জনপদ। মোহভঙ্গ হল। শুরু হল দুটি ব্যবস্থার মধ্যে তুলনামুলক বিচার বিশ্লেষন। দেখা গেল কোনটিই ত্রুটিমুক্ত নয়।

এর থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে প্রয়োজন; হয় বামদের নিজস্ব মতবাদের সাথে পুঁজিবাদের ধরনার কৌশলী মিথস্ক্রীয়া সাধন। নতুবা পুঁজিবাদের ধারকদের বামদের কাছ থেকে উদারতা-নৈতিকতা ধার করে নিয়ে গন-বান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা। তবে বর্তমান বিশ্বের শোষিত শ্রেণীর দিকে তাকালে বাম পন্থিদের প্রয়োজন অনেক বেশি অনুভূত হয়। কিন্তু এটাও ঠিক, বাম রাজনীতির সুফল নির্ভর করে এর প্রায়োগিকতার উপর। আমরা ফিদেল কাস্ত্রোকে কোথায় পাব? যিনি গণহত্যা, ম্যানিপুলেশন না চালিয়েও দেশ শাষন করেছেন, আজকের কিউবাকে তৈরি করেছেন।

বাংলাদেশে বাম রাজনিতিঃ

আমাদের দেশের জন্ম ও তাঁর প্রেক্ষাপটে বাম রাজনীতির অবদান অনেকটাই। বলতে গেলে এ দেশের জন্মটাই হয়েছিল বাম রাজনীতির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে। বাম রাজনীতির আদর্শ যদি হয়, শ্রেণী শোষণ থেকে মুক্তি ও সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করন তাহলে বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের আকাঙ্ক্ষার সাথে এর কোন পার্থক্য থাকে না। তা ছাড়া স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত এ দেশের প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলন সংগ্রামে সামনের সাড়িতে থেকে কখনো কখনো এককভাবে ভূমিকা পালন করেছে। তথাপিও শুধুমাত্র আন্তবিবেধ, পুড়নো ধ্যান ধারনাকে আঁকড়ে থাকা। বিশেষকরে আওয়ামীলীগের তল্পিবাহক হয়ে নিজস্ব স্বকীয়তা বিসর্জন দেয়ার ফলেই, আজ যখন এ দেশের কাণ্ডারির ভূমিকা পালন করার কথা বামদের তখন এর নেতারা নিজেদের অস্তিত্ব সংকটে ভুগছেন। বামদের এই শোচনীয় পরাজয় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে।

আমাদের মহান মুক্তিযোদ্ধারা নিশ্চয়ই ২২ পরিবারের হাত থেকে ২২,০০০ হাজার পরিবারের হাতে সম্পদের পূনঃবন্টনের জন্য আত্মাহুতি দেননি? সব ধরনের শোষণ থেকে মুক্তি ও সম্পদের সুসম বণ্টন নিশ্চিত করে দেশের প্রতিটি ঘরে স্বাধীনতার সুফল পৌঁছে দেয়াই ছিল লক্ষ। অথচ হয়েছে ঠিক তাঁর উল্টো। স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারীদের রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে দ্বিধান্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ। পরবর্তীতে জাতিকে নেতৃত্বশূন্য করে ফেলা ইত্যাদি আজ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ভিয়েতনামের পর্যায়ে উন্নীত হতে দেয়নি। আর এ ক্ষেত্রে বাম নেতৃত্বও তার দায় এড়াতে পারেন না। জাতীর ক্রান্তিকালে বামদেরই উচিত ছিল ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার। তারা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের এই ব্যর্থতার প্রধান কারণ আন্তবিরোধ, একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকা, চলমান পরিবর্তনের সাথে নিজেদের মানিয়ে না নেয়া। সব মতবাদই বাস্তবতার নিরিখে বিবর্তন এর মধ্যে দিয়ে পূর্ণতা লাভ করে। এটা তারা উপলব্ধি করতে পারেননি। বোধকরি আজো বুঝতে চান না। অথচ আজ অবধি যে কয়টি দেশে বামদের শাসন চলছে তা প্রয়োজনীয় পরিবর্ধন পরিমার্জনের মধ্য দিয়েই এগিয়েছে।

আমাদের দেশের বাম রাজনীতিকে অভীষ্ট লক্ষে পৌঁছানোর জন্যেও বাজার অর্থনীতির বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে এবং প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করে, বঞ্চিতদের অধিকার আদায় এর জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। আর এটাই যদি শুরু থেকে করা হত তাহলে হয়ত আজ দেশের এবং তাদের অবস্থা অন্যরকম হতে পারত। আজ যখন সবাই তৃতীয় শক্তির ভয়ে ভীত তখন তার অবকাশ থাকত না। এ দেশের রাজনীতিতে বাম রাজনীতিই তৃতীয় ধারার শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারত। সাধারণ মানুষও সর্বান্তকরণেই তাদের গ্রহণ করে নিত। অন্যরকম হতে পারত এ দেশের রাজনৈতিক চিত্র।

পূর্বেই বলেছি বাম রাজনীতির সফলতা নির্ভর করে এর নেতৃত্বের দৃঢ়তা ও সততার উপর। আমরা যদি একই সাথে ভারত এবং চীনের অর্থনীতির দিকে তাকাই। পাশাপাশি বাংলাদেশ এবং ভিয়েতনামের অর্থনীতির তুলনা করি তাহলে সহজেই চোখে পড়ে বাম-ডানের সফলতা ও ব্যর্থতা। তবে এটা অনস্বীকার্য এ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব অন্যতম প্রধান একটি বিষয়।

বামদের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা করেছে অতি বামরা। যাদের আমরা সর্বহারা বলে জানি। আমার মতে এদের অতিবাম না বলে নীতিহিন বলাই শ্রেয়। সেইসাথে মিডিয়ার পক্ষপাতিত্বও বামদের কোণঠাসা করে রেখেছে সব সময়। এখন আবার সময় এসেছে, বামদের মাথা তুলে দাঁড়ানোর। তবে কম্যুনিজম নয় সোশ্যালিজম রূপে। প্রয়োজন সোশ্যাল ডেমোক্রেসি ও ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিজম। আর তা করতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন বাম নেতাদের আদর্শের জায়গায় ফিরে এসে একতাবদ্ধ হওয়া। সামান্য হালুয়া রুটির আকাঙ্ক্ষা ছেড়ে গনমানুষের পাশে এসে দাঁড়ানো, তাদের কথা বলা। পুঁজিবাদের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার লাভ করেছে বলেই পুঁজিবাদের ভয়াল রূপটিও প্রকাশ পেয়েছে। আর তাই বঞ্চিতদের রক্ষা করতেই বামের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে। বাম রাজনীতিবিদদের উচিত এই প্রয়োজনকে আশ্রয় করেই আন্দোলন গড়ে তোলা। কুক্ষিগত সম্পদ এর সুসম বণ্টনের জন্য আন্দোলন গড়ে তোলা। তা ধনিদের উপর উচ্চ ট্যাক্স বসিয়ে হোক বা অন্য কোনভাবে।

দরিদ্রদের মুক্তি দিতে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সার্বজনীন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, চাকুরীর নিশ্চয়তা বিধান, সর্ব নিন্ম মজুরি এবং শ্রমঘন্টা নির্ধারণ, ধনিক শ্রেণীর উপর উচ্চহারে কর বসানো, ট্রেড ইউনিয়নের মত দারিদ্র বান্ধব ব্যবস্থাসমূহের কথা বামদেরই চিন্তার ফসল। আর তাই বারাক ওবামার কণ্ঠেও এর প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। আমাদের বাম নেতাদের উচিত এক মঞ্চে উঠে এই বিষয়গুলো নিয়ে আন্দোলন করা। পুঁজিবাদকে গালি দেয়া নয় বরং এখন প্রয়োজন পুঁজিবাদকে মেনে নিয়ে। এর মধ্য থেকে দারিদ্র বিমোচনের রূপরেখা তৈরি করা। মার্কসবাদও স্বিকার করে নিয়েছে পুঁজিবাদ সামাজিক বিবর্তনের একটা ধাপ মাত্র। এটি উত্পাদনের হাতিয়ারের শ্রেণীকরণের একটা বিশেষ পর্যায়। যাকে অস্বিকার করা মানে জটিলতা তৈরি করা এর বেশি কিছু নয়।

চলমান……………।

kmgmehadi@yahoo.com