ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

 

ভুলে যাব বিদায়ের সাথে সাথে ২০১২। ভুলে যাব সয়েছি যত শোক-তাপ, ন্যায়ের পৃষ্ট দেশে ছুরিকাঘাত অথবা পৈশাচিক উন্মাদনা। সব ভুলে যাব যেমন ইতিমধ্যে ভুলে গেছি তাজরিন গার্মেন্টস হত্যাকাণ্ড। মানুষ পোড়া দুর্গন্ধ ঢাকতে খরচ হয়ে গেছে কতগুলি এয়ার ফ্রেশনার তাও। ভুলে গেছি বহদ্দারহাট উড়াল সেতুর নিচে চাপা পরে মৃত্যুবরণ করা সেই হতভাগ্যদের। মায়ান ক্যালেন্ডারের না বলা ভবিষ্যৎবাণী খুঁজে খুঁজে ফুরিয়েছি শোকের আয়ু।

ভিকারুন্নেসার সেই মেয়েটি বা ডাঃ ইভার কথা জানার আগ্রহ আজ আর অবশিষ্ট নেই একটুও। যখন দিল্লিতে ধর্ষিতার মৃত্যুতে শোকাবহ দিন কাটে। এমনকি পরিমলদের শাস্তি নিশ্চিত হল কিনা তাও জানতে চাইনা, পশু আর মানুষের ভেদ কোথায় খুঁজতে গিয়ে যখন দেখি বারবার পরাজিত সৃষ্টির সেরা জীব।

পঙ্গু লিমনের উপর থেকে প্রশাসনিক খড়গ তিরোহিত হল কি? কিংবা সত্যিই কি সে পাবে ন্যায় বিচার? সে প্রশ্ন করি কি করে, যখন থানা হাজতে চাপাতির ধার পরীক্ষা করতে বেছে নেয়া হয় তর তাজা যুবকের পায়ের রগ।

বিশ্বজিৎ? যে পতাকা বানিয়ে রেখেছিল, দেশের বিজয়ে বিজয় মিছিল করবে বলে। তার সাদা শার্ট রক্তে ভেজা লাল। হায়েনার হাত থেকে বাচতে যে মানুষ নয় হিন্দু বলে নিজেকে চেনাতে চায়। হিন্দু কি মানুষের থেকে বড় কোন সম্প্রদায়? হবে হয়ত। তবু যদি পেত রক্ষা! তখনো পিশাচের রক্ষকের ভূমিকায় জন নন্দিত দেশ হিতৈষীরা খুঁজে ষড়যন্ত্র! ভুলে যাই।

ভুলে গেছি ইলিয়াস আলী নামের কোন এক জন হঠাৎ গুম হয়েছিল। সে কি আর ফিরে আসবে কোনদিন? সে প্রশ্নও জাগে না মনে আর, মিথ্যে হয়ে যান যখন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। গুমের এ তালিকাও তো খুব ছোট নয়। এমনই হওয়ার কথা বুঝি! এভাবেই বুঝি হারাতে হয়, অতঃপর অপেক্ষা প্রিয়জনের। কি নিদারুণ সে প্রহরগুলো। আমি ভুলে গিয়ে বেচে যাই। অপেক্ষায় থাকি নতুন অঘটনের। পুরাতন ঝেরে ফেলে কাঁদতে বসে যাই নতুন যন্ত্রণায়। আহ: যন্ত্রণারও কি অভিনবত্ব!

মেঘ এসে যদি না ভেজাত অন্তর; কত সহজেই ভুলে যেতে পারতাম সাগর-রুনীকে! এই যে রেখে যাওয়া উত্তরসূরিরা কিছুতেই দেয়না সুস্থির হতে। কত যে ফেলানী ঝুলে থাকে কাপুরুষত্বের সীমান্ত বেড়ায়; কি এমন জরুরত মনের খাতায় তার বীভৎসতা ফুটিয়ে তোলা। চলমান দৃশ্যপটে হারিয়ে যেতে দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলাই কি নয় শ্রেয়?

অগণিত ব্লাড ব্যাংকে রক্তের সাথে মেশে লবণ পানি। স্যালাইন আর ময়দা উপাদান প্রাণ রক্ষাকারী ঔষধের। শপিং মলের চাকচিক্যের সেলফে ফরমালিনযুক্ত ফল আর মাছ। একে বিরক্তিকর মাছি তাড়ানোর কৌশল হিসেবে দেখলেই বা কি ক্ষতি? সিঙ্গাপুরের ব্যাংকে কিছু টাকা গচ্ছিত রাখায়ই বা কি এসে যায়? যখন চার হাজার কোটিও কিছুই নয়? শেয়ার বাজারের লক্ষ বিনিয়োগকারীর হাহাকার শুনে থাকি নির্লিপ্ত। বলি ফটকা বাজারে কেন যাস?

ডেসটিনির জোচ্চুরি আর নেতাদের মিথ্যের তফাৎ না পেয়ে পদ্মার মাঝিরে বলি। এবার গান ধর তো মাঝি, মাঝি বেসুরো গলায় ধরে- “হায় হাসান হায় হোসেন তোমাদের বাঁচাতে দেই বলি সাধের সেতুরে মোর”।

হায়! হায়! কি গাও মাঝি? ধরে মাথা একটা যে, কেন ভুলে যাও রাবণ তো নও তুমি। এসো হিসেব মেলাই, কি করে মুছে গেল যুবরাজের গায়ের দাগ। সময়ের স্রোতে সেও যে সাফ শুদ্ধ আজ।

প্রতিনিয়ত থেঁতলানো লাশের ভিড়ে চলে দর কষাকষি ড্রাইভিং অথবা মানবতা পিষে মারার লাইসেন্সের। দেখেও দেখি না অনিয়মকে নিয়ম বানানোর কারসাজিতে সিদ্ধ হস্ত যখন হয় জুতোপেটা। তখন তাঁর সাফাই শুনতে করি হাপিত্যেশ।

বড় বেশি ব্যস্ত আজ আমি পচা গলা এ সময়কে দিতে বিদায়। পচা পাঁকে ডুব দিয়েই পরিশুদ্ধ হতে প্রাণান্ত প্রচেষ্টা আমার। হায় এ অভাগার ভ্রান্তিবিলাস!

তারপর? আমিই হব শিরোনাম। কোন এক সড়ক দুর্ঘটনার থেঁতলানো লাশ, কিংবা হরতালের আগের রাতে দেয়া আগুনে পোড়া বীভৎস ইতিহাস। কিছুই যায় আসে না তাতে। মহাকালের স্রোতে নিত্য ভেসে যায় কত সম্ভাবনা। কে রাখে খোঁজ তার। এত যে দীর্ঘশ্বাসে ভারি বাতাস। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে পায় কি প্রবেশাধিকার?

kmgmehadi@yahoo.com