ক্যাটেগরিঃ ব্লগালোচনা

 

ব্লগ/ Blog শব্দটি ইংরেজি Weblog এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এর বাংলা প্রতিশব্দ অনলাইন ব্যক্তিগত দিনলিপি বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক পত্রিকা। যিনি ব্লগে লেখা সংযুক্ত বা পোস্ট করেন তাকে বলা হয় ব্লগার। ব্লগাররা প্রতিনিয়ত তাদের ওয়েবসাইটে বিভিন্ন কনটেন্ট যুক্ত করছেন আর ব্লগের পাঠক এবং এর ব্যবহারকারীরা প্রতিটি কনটেন্টের পক্ষে বিপক্ষে যুক্তিতর্ক তুলে ধরছেন যা একটি ব্লগ সাইটকে প্রাণবন্ত করে রাখছে। সাম্প্রতিক কালে ব্লগ ফ্রিলান্স সাংবাদিকতারও একটা মাধ্যম হয়ে উঠছে। এক সময়ের আন্তর্জালিক ডায়েরীটি আজ আর সে সীমানায় আবদ্ধ নেই। এর ব্যাপক ব্যবহার এবং প্রচার একে বিকল্প গণমাধ্যমের স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। এমনকি ব্লগকে ভাবা হচ্ছে নাগরিক সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। তত্ত্ব, তথ্য, সাহিত্য এবং সচেতনতার আহবান সম্বলিত এটি এখন একটি অনন্য তথ্যভাণ্ডার।

ব্লগ মূলত লেখা, ছবি, অন্য ব্লগ, ওয়েব পেজ বিভিন্ন লিংকের সমষ্টি মাত্র। ব্লগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে পাঠকের মন্তব্য করার সুবিধা। যার মাধ্যমে লেখক ও পাঠকদের মিথষ্ক্রিয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। বেশিরভাগ ব্লগই মূলত লেখনী নির্ভর। তবে লেখনী নির্ভর ব্লগ ছাড়াও কিছু কিছু ব্লগ রয়েছে; যা শিল্প (আর্ট ব্লগ), ছবি (ফটো ব্লগ), ভিডিও (ভিডিও ব্লগিং), সঙ্গীত (এমপিথ্রিব্লগ) বা অডিও (পডকাস্টিং) নির্ভর। এ ছাড়াও রয়েছে মাইক্রো ব্লগ; যেখানে খুব ছোট ছোট পোস্ট থাকে।

ব্লগিং এর শুরু:

অনলাইন দিনপত্রী “ওয়েবলগ” শব্দটা প্রথম ব্যবহার করেন জোম বার্গার। পিটার মেরহোলজ ১৯৯৭-এ “ওয়েবলগ” শব্দটার ছোট্ট সংস্করণ “ব্লগ” চালু করেন, তার ঠিক পরপরই, পাইরা ল্যাবস-এ ইভান উইলিয়ামস “ব্লগ” শব্দটা বিশেষ্য এবং ক্রিয়া দুটো হিসেবেই ব্যবহার করা শুরু করেন যেখানে “ব্লগ করা” মানে দাঁড়ায় “কারোর ওয়েবলগ সম্পাদনা করা বা কারোর ওয়েবলগে নিজের লেখা সংযুক্ত করা।

প্রথম দিকে ব্লগগুলো ছিল স্রেফ সাধারণ ওয়েবসাইটের হাতে-বানানো উন্নততর উপকরণ হলেও পরবর্তীতে এর বিবর্তিত কৌশলগুলো এর প্রকাশ ব্যবস্থাটা সাধারণ মানুষের কাছে সহজে ব্যবহারযোগ্য করে তোলে। ফলে ব্লগকে কেন্দ্র করে একটি ভিন্ন ধরনের অনলাইন প্রকাশনা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। কিছু কিছু ব্রাউজার-নির্ভর সফটওয়্যারের ব্যবহার এখন ব্লগের একটা নিতান্তই সাধারণ ব্যাপার। ব্লগ হোস্ট করার জন্যে আছে নির্ধারিত ব্লগ হোস্টিং সার্ভিস, এছাড়াও ওগুলো ব্লগ সফটওয়্যার কিংবা নিয়মিত ওয়েব হোস্টিং সার্ভিস ব্যবহার করেও চালানো যায়।

জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি:

শুরুটা ধীরগতির হলেও ১৯৯৯ এর পর থেকেই ব্লগিং দ্রুতই জনপ্রিয়তা পায়। ক্রমশ বাড়তে থাকে এর ব্যবহার। প্রথম দিককার কিছু ব্লগ হাতিয়ারের প্রায়-সমসাময়িক আবির্ভাব এর ব্যবহারে মানুষকে আরও উৎসাহী করে।
যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য-

• ১৯৯৮ সালে ব্রুস আবেলসনের ওপেন ডায়রি, এতে হাজারো অনলাইন দিনপত্রী জন্ম নেয়। ওপেন ডায়রির আবিষ্কার হচ্ছে পাঠক মন্তব্য, এটাই ছিল প্রথম ব্লগ কমিউনিটি যেখানে পাঠকেরা অন্য লেখকের ব্লগ অন্তর্ভুক্তিতে মন্তব্য করতে পারতেন।

• ১৯৯৯-এর মার্চে ব্র্যাড ফিটজপ্যাট্রিক শুরু করেন লাইভ জার্নাল।

• জুলাই, ১৯৯৯-এ এন্ড্রু স্মেলস কোন ওয়েবসাইটে একটা “খবর পাতা” রাখার বিকল্প হিসেবে জন্ম দেন পিটাস.কম-এর, এর পর ঐবছরই আসে ডায়েরিল্যান্ড, যেখানে ব্যক্তিগত দিনপত্রীমূলক কমিউনিটির ওপর জোর দেওয়া হয়।একই বছর ইভান উইলিয়ামস এবং মেগ হুরিহান ব্লগার.কম চালু করেন। যেটা ২০০৩-এ গুগল কিনে নেয়।

ব্লগের প্রকারভেদ:

কোন ব্লগে কি ধরনের পোস্ট দেওয়া হয় তার উপর ভিত্তি করে ব্লগকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
১। ব্যক্তিগত ব্লগ
২। সামাজিক ব্লগ
৩। কোম্পানি/প্রাতিষ্ঠানিক ব্লগ।
এ ছারাও রয়েছে প্রশ্ন ব্লগ,খবর ব্লগ ইত্যাদি।
১। ব্যক্তিগত ব্লগ
এখানে ব্যক্তি কোন একটি বিষয়ের উপর তার মতামত পোষ্ট আকারে তুলে ধরেন এবং পাঠকদের সাথে এর উপর মতামত আদান প্রদান করেন।
২। সামাজিক ব্লগ
সামাজিক ব্লগ হচ্ছে যেখানে বহু সংখ্যক ইন্টারনেট ব্যবহারকারী তাদের সুচিন্তিত মতামত ও লেখনীর মাধ্যমে একটি প্লাটফর্ম গড়ে তোলেন।
৩। ব্যবসায়ী বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্লগ
এই ব্লগে ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠান তাদের কোন পণ্য বা সেবার উপর নতুন নতুন তথ্য প্রদান করেন এবং পাঠক তাদের মতামত প্রদান করতে পারেন।

কাগুজে পত্রিকা ও ব্লগের পার্থক্যঃ

কাগুজে পত্রিকার কলেবর ছোট ব্লগ সীমাহীন। কাগুজে পত্রিকায় সাধারণত শুধুমাত্র প্রফেশনাল সাংবাদিকদের পাঠানো তথ্য প্রকাশ করা হয়। সেইসাথে সমাজের উচ্চমার্গিয় কিছু ব্যক্তি বর্গের সেখানে অবাধ সুযোগ থাকলেও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ নেই বললেই চলে। পক্ষান্তরে অন লাইন ভিত্তিক ব্লগে যে কেউ যে কোন বিষয় তাঁর মতামত তুলে ধরতে পারেন। এমনকি এখানে লেখক-পাঠক লাইভ মিথস্ক্রিয়ার সুযোগ পান।

ব্লগের গুরুত্বঃ

পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও গণতান্ত্রিক মানসিকতা তৈরিতে ব্লগ রাখছে বিশেষ ভূমিকা। ব্লগের মাধ্যমে একজন সচেতন মানুষ যেমন সমাজের অসঙ্গতিগুলি জনসম্মুখে তুলে ধরতে পারে তেমনি এর বিরুদ্ধে জনমত গঠন করে তা দূর করে একটি উন্নত সমাজ গঠনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকাও রাখতে পারে।

ব্লগকে বলা যায় আলোকিত মানুষ তৈরির একটি প্লাটফর্ম । একটি ভাল ব্লগ সাইটে নিয়মিত ব্লগিং আমূল বদলে দিতে পারে একজনের দৃষ্টভঙ্গী। ভাল কিছু মানুষের সংস্পর্শে থাকার এটা একটি সুবর্ণ সুযোগ। সেইসাথে একজন অন্তর্মুখী মানুষকে ব্লগ করে তুলতে পারে সরব এবং প্রতিবাদী। একটি আত্ম নির্ভরশীল জাতী গঠনে ব্লগ রাখতে পারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা।

ইতিমধ্যে বেশ কিছু বাংলা ব্লগ আত্মপ্রকাশ করায় এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন শ্রেণীর ব্লগার যারা প্রায় প্রতিদিনই সামনে নিয়ে আসছেন বিভিন্ন বিষয়। তৈরি হয়েছে বাংলা লেখার নতুন পাঠক।
ব্লগাররা সমষ্টিগতভাবে সম্পৃক্ত হচ্ছে বিভিন্ন সেবামুলক কর্মকাণ্ডে। বেশ কয়েকটি ব্লগে ব্লগাররা স্ব উদ্যোগে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে দুঃস্থ শিশুর চিকিৎসার সাহায্যে, শীতার্ত মানুষের সহযোগিতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে। যা ব্লগের একটি ভাল দিককেই নির্দেশ করে।
তা ছারা অনেক ব্লগই ব্লগারদের লেখা নিয়ে প্রায় প্রতি বছরই বই প্রকাশ করছে যা নতুন লেখক তৈরিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

বাংলা ব্লগের ইতিহাস:

ব্যক্তিগত আগ্রহে কিছু মানুষ বিক্ষিপ্তভাবে বাংলায় ব্লগ লেখা শুরু করলেও এটি ব্যাপকতা লাভ করে সামহোয়্যার ইন ব্লগের হাত ধরে। ২০০৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর ‘বাঁধ ভাঙার আওয়াজ’ স্লোগানে ব্লগ-দুনিয়ায় প্রবেশ করে সামহোয়্যার ইন ব্লগ এবং ধীরে ধীরে জনপ্রিয় করে তোলে বাংলা ব্লগকে। ২০০৭ সালে সচলায়তন এরপর আমার ব্লগ ২০০৮ প্রথম আলো ব্লগের যাত্রা শুরু হলে বাংলায় ব্লগ চর্চা আরও বেগবান হয়।
সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অগণিত বাঙালির জন্য বাংলা ব্লগগুলি এখন এক একটি ভার্চুয়াল মিলন মেলা।

বাংলা ব্লগ দিবস:

বাংলা ব্লগকে আর বেশি জনপ্রিয় করে তুলতে এবং বিশ্ব দরবারে বাংলাকে তুলে ধরতেই ১৯ ডিসেম্বরকে বাংলা ব্লগ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

ব্লগিং করবেন যেভাবে:

১। ব্লগিং করতে কম্পিউটারে ইন্টারনেট সংযুক্ত করে নিতে হবে।
২। থাকতে হবে ইমেইল আইডি।
৩। প্রথমেই পছন্দের ব্লগ সাইটে নিজস্ব ব্লগ একাউন্ট করে নিতে হবে।
৪। ব্লগ সাইটে একাউন্ট খোলার সময় ঐ ব্লগের নীতিমালা ভালভাবে জেনে তা মেনে চলে ব্লগিং করতে হবে।

প্রথমেই পছন্দের ব্লগ সাইটে একটি নির্দিষ্ট নামে একাউন্ট খুলতে হবে যেটা হবে ব্লগারের পরিচয়। যেহেতু ঐ নামটি পরিবর্তনযোগ্য নয় তাই সঠিক নামটি ব্যাবহার করাই যুক্তিযুক্ত। কেননা একজন সাধারণ ব্লগারের একটি মৌলিক ধারনাও যোগাতে পারে একটি গবেষণার মূল্যবান সূত্র। এ ক্ষেত্রে নিক নেম অনেক সময়ই রেফারেন্স এর জন্য অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে।

এছাড়া ব্লগ একাউন্টে লগইন করার জন্য প্রয়োজন হবে একটা ইউজার নেম এবং একটি পাসওয়ার্ড। ইউজার নেম হতে হবে ইউনিট অর্থাৎ যা ঐ ব্লগ সাইটে আর কেউ ব্যবহার করছে না এমন। ব্লগ একাউন্ট সফলভাবে খোলার পর নির্দিষ্ট ইউজার নেম এবং পাসওয়ার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে লগইন করে একাউন্টে ঢুকতে হবে। এরপরেই একজন ব্লগার নতুন ব্লগ বা নতুন পোষ্ট লিখতে পারবেন এবং তা ব্লগে প্রকাশ করতে পারবেন। ব্লগে লেখার বিষয়বস্তু হতে পারে নানাবিধ; রাজনীতি, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান থেকে শুরু করে সাহিত্যচর্চা। নিজের কথা বলার আর সবার কথা জানার এমনকি নিজের মতামতের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জায়গা হিসেবে ব্লগের বিকল্প নেই।

বলুন আপনার কথা জানুন অন্যের কথা। নিজেকে প্রকাশ করুণ আপনার পছন্দের ব্লগ সাইটে।
বাংলা ভাষায় বেশ কিছু জনপ্রিয় ব্লগ সাইট রয়েছে তাঁর কিছু লিংক নিচে উল্লেখ করা হল:

http://www.somewhereinblog.net/
http://www.blog.bdnews24.com/
http://prothom-aloblog.com/
http://www.bodlejaobodledao.com/
http://www.sachalayatan.com/
http://www.sonarbangladesh.com/blog/
http://www.techtunes.com.bd/
http://www.prothom-aloblog.com/
http://www.nirmaaan.com/blog/
http://www.biggani.com/
http://www.nishorga.com/
http://www.drishtipat.org/bangla/
http:// http://www.bishorgo.com/
http://www.amarbornomala.com

kmgmehadi@yahoo.com
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে