ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

আমাদের নেতৃবৃন্দ একটি বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন। না ঠিক পরেছেন বল্লে হয়ত ভুল হবে, বলা উচিত বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন। যা থেকে বেড়িয়ে আসতে হলে তাদের ঝেরে কাশতে হবে। যদিও তা তাদের জন্য বুমেরাং হবে সন্দেহ নেই। তথাপিও এটা এখন সময়ের দাবী। স্বাভাবিকভাবেই তাদের যারা সমর্থক তারাও দারুন বিব্রত, সেইসাথে বিভ্রান্তও বটে।

বিষয়টি হল ধর্ম। বিশেষ করে ইসলাম ধর্ম। আমাদের নেতৃবৃন্দ এর প্রায়োগিকতা এবং প্রশ্রয়ের মাত্রা কখনোই স্থির করতে পারেননি বা করেননি। যার মুলে রয়েছে তাদের ক্ষমতায় আরোহণ এবং ক্ষমতা ধরে রাখার হিসেব-নিকেশ। যা তাদের বারবার দ্বিধান্বিত করেছে, কেউ বলছেন ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা। কেউ বলছেন ধর্মভিত্তিক রাজনীতির কথা। আবার কেউ কোনটাই বলছেন না। সময় অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এই যে প্রতারণা, এর থেকে তারা কিছুটা হয়ত সুবিধা পাচ্ছেন, তবে আসল সুবিধাভোগী তারা, যারা ধর্মকে পুঁজি করে ব্যবসা করছেন।

যারা ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা বলছেন তারা খোলাসা করছেন না যে, ধর্ম নিরপেক্ষতা বলতে তারা কি বোঝাতে চাইছেন। তারা কি ব্যক্তিকে ধর্ম নিরপেক্ষ হতে বলছেন নাকি রাষ্ট্রকে? যদি ব্যক্তিকে বলেন তা যেমন হবে অত্যন্ত গর্হিত। আবার রাষ্ট্রকে বল্লে তা কার্যক্ষেত্রে প্রমাণ করতে হবে। অথচ আমরা দেখতে পাই। ধর্ম নিরপেক্ষ বল্লেও এ দেশের প্রধান ধর্ম ইসলাম। সংবিধানের প্রথমেই “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” অন্তর্ভুক্তি করন এবং পরবর্তীতেও বাদ না দেয়া ইত্যাদি। আবার সরকারী ছুটির ক্ষেত্রেও ইসলামী অনুষ্ঠান সমূহের প্রাধান্য। অর্থাৎ তারা এগুলো মুখেই বলছেন নিজেরাই বিশ্বাস করেন না। সেটাও গর্হিত বৈ কি? এমনকি তারাও নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে হাতে তসবি নিয়ে ছবি ছাপিয়ে পোষ্টারিং করেন!!

আবার, যারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতির কথা বলছেন। তারাও যে ধার্মিক বলেই এটা বলছেন তা কিন্তু নয়। তারাও ধর্মের নামে মানুষের আবেগকে ব্যবহার করে ফায়দা লোটার মানসেই এটা বলছেন। এটা বলছি এই জন্যই যে, ইসলামের আবির্ভাব থেকে শুরু করে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর ক্ষমতারোহন পর্যন্ত সময়ের ঘটনাবলী পর্যালোচনা করলে দেখতে পাই তিনি যে আদর্শ বা মতবাদকে ধারণ করতেন। প্রথমে তা তিনি অন্যের মধ্যে সঞ্চালনের চেষ্টা করেন। তিনি যতগুলি যুদ্ধ করেছেন তাঁর প্রতিটিই আত্মরক্ষামূলক। একটিও রাজ্য দখলের নিমিত্তে ছিল না। যখন সাধারণ মানুষ তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে; তাঁর প্রচারিত ধর্মকে স্বেচ্ছায় গ্রহণ করে নিল। তখন তারাই তাকে নেতা নির্বাচন করল। যদি ইসলাম ধর্ম ভিত্তিক দলগুলি সেই আদর্শেই অনুপ্রাণিত হত; তাহলে তারাও ধর্ম প্রচারেই ব্যপত থাকত এবং যথাসময়ে সাধারণ মানুষ স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই তাদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করত। ঠিক তেমনি অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য।

অধ্যাপক গোলাম আযম যেমন পবিত্র কুরআনের তাফসির করতে গিয়ে বলেন এই তাফসির করতে গিয়ে তাঁর মনে যে ভাবের উদয় হয়েছে তিনি তাই ব্যক্ত করেছেন! এটা যেমন অবৈধ। ঠিক তেমনি অবৈধ তিনি বা জামাত-শিবিরের মনে যে ভাবের উদয় হয় সেমত ইসলামের আদর্শ ব্যখ্যা করে, মানুষকে ধোঁকা দিয়ে নিজেদের ইসলামের কাণ্ডারি রূপে প্রকাশ করার চেষ্টা। জামাত-শিবির তাদের সদস্য করে নিতে শিশুমনেই প্রভাব ফেলার চেষ্টা করে। আজ থেকে তিরিশ বছর পূর্বে ঝালকাঠির মফস্বলে যে চিত্রের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলাম তিরিশ বছর পরে ঢাকার খ্যাতনামা স্কুলের চিত্র দেখি আরও বিস্ফোরিত চোখে। কোমল মতি শিশুদের স্কন্ধে সাংগঠনিক যে বোঝা চাপিয়েছে তা আরো ভয়াবহ। হয়ত এরাই একদিন বাংলা ভাইরুপে আত্নপ্রকাশ করবে।

তিরিশ বছর পূর্বেও বাম ঘরানার দলগুলি তাদের ঠেকাতে একই রকম তৎপর ছিল। কিন্তু সেদিনের সেই ছোট্ট চারাটিকে যেমন তারা উপরে ফেলতে পারেনি ক্ষমতাসীনদের অসহযোগিতায়। তেমনি ক্ষমতাসীনদের পৃষ্টপোষকতায় আজ মহীরুহে পরিণত হওয়াও আটকাতে পারেনি। আজ এই বিষবৃক্ষটিকে বিনাশ করা যে আরও কঠিন হয়ে পরেছে তা বলাই বাহুল্য।

এই ব্যর্থতার কারণ প্রধানত দুটি: প্রথমত- ক্ষমতাসীনদের অসহযোগিতা । দ্বিতীয়ত- সরলমনা সাধারণ মানুষের জামাত-শিবিরের আসল উদ্দেশ্য ধরতে না পারা।
জামাত-শিবিরকে বাড়তে কারা সহযোগিতা করেছে এ প্রশ্ন না করে, করা উচিত কে সহযোগিতা করেনি? আমাদের একটা জাতীয় সমস্যা হল; যতক্ষণ না নিজে আক্রান্ত হই ততক্ষণ পর্যন্ত সয়ে যাই। আর এটা আমাদের নেতৃবৃন্দের বেলায় ষোলআনাই প্রযোজ্য।

ইসলামী ব্যাংকের আজকের অবস্থানে আসার পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে তাদের সুদ মুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা। এ দেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান আর ইসলামী বিধান মতে সুদ নেয়া বা দেয়া অত্যন্ত গর্হিত কাজ বলে গণ্য হয়। স্বাভাবিকভাবেই তারা পারলৌকিক মুক্তির আশায় ইসলামী ব্যাংকের প্রতি ঝুকেছে। তারা যদি মিথ্যে কথা বলে সাধারণ মানুষকে ধোঁকাই দিয়ে থাকে তাহলে বাংলাদেশ সরকার কেন আসল সত্যটা মানুষকে অবহিত করল না?

সারাবিশ্বে একটা প্রচারণা লক্ষ করা যায় কোকাকোলার লভ্যাংশ ইহুদিরা ফিলিস্তিনদের নিধনে ব্যাবহার করছে তাই কোকাকোলা কেনা থেকে বিরত থাকুন। আমাদের দেশে কেন এই প্রচারণা করা হয় না যে, জামাতের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ জঙ্গিবাদে ব্যবহৃত হয় অতএব এদের পণ্য বর্জন করুন। এই প্রচারণাটা কেউই করবেন না। কারণ, এদের অর্থ অনেকেই(!) গ্রহণ করেন। যা বিশেষ অনুদান বলে বিবেচিত।

আমার এই নিবন্ধের মূল উদ্দেশ্য হল জামাত-শিবিরকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানানো। তাদের বর্তমান সহিংস কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য। কারণ একটাই, গত কয়েক দশকের দীর্ঘ সময় জুড়ে আমাদের নেতৃবৃন্দ চরম অনৈতিকভাবে জামাত-শিবিরকে নৈতিক সমর্থন জুগিয়ে এবং তাদের মিডিয়া সেলের অব্যাহত প্রচারণায় সাধারণ মানুষের চোখে জামাত-শিবিরের যে মহামানবীয় চরিত্র চিত্রায়িত হয়েছে। তা ভেদ করে সত্যিকারের চেহারা ফুটিয়ে তোলা অত্যন্ত দূরহ হয়ে পড়েছিল। এ অবস্থায় আজ তারা নিজেরাই স্বরূপে আবির্ভূত হয়ে বড় উপকার করল। ধন্যবাদ তারা পেতেই পারে।

আজ যারা ধর্ম ভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের দাবী জানাচ্ছে তারা এটা করে বরং জামাতকে নিষিদ্ধকরণকে আরও কঠিন বা অসম্ভব করে তুলছেন। সেইসাথে এটা গ্রহণযোগ্যও নয়। জামাত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করতে হবে তাদের কার্যকলাপের জন্য, ধর্মভিত্তিক বলে নয়।

তাদের নিষিদ্ধ করতে হবে তাদের জঙ্গি সম্পৃক্ততার কারণে। দেখা যায় সব জঙ্গিই সাবেক জামাতি। তাহলে আমরা কি এটা ধরে নিতে পারি না যে, এটাও তাদের একটি কৌশল। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ শেষে দল থেকে বহিষ্কৃত করে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত করা। যাতে জামাত কলংকমুক্ত থাকতে পারে।

জামাত-শিবিরের সদস্যদের ইহ লৌকিক-পারলৌকিক সব দায়িত্বই সংগঠন নিয়ে থাকে। আর তার (মগজ ধোলাই কৃত) সদস্যরা সংগঠনের উপর সার্বিক দায় চাপিয়ে সাংগঠনিক কার্যকলাপে মত্ত হয় কোন বিচার বিবেচনা ছাড়াই। তারা জানে বেচে থাকলে সংগঠন তাদের আয়ের উৎস করে দিবে। আর মৃত্যুবরণ করলে তো অবধারিত বেহেশত। কেননা তারা তো শহিদ(!) অতএব এর থেকে লাভজনক ব্যবসা আর কীইবা হতে পারে। মানুষকে এভাবে বিভ্রান্ত করার কারণেই জামাত-শিবির নিষিদ্ধ হতে পারে।

জামাত-শিবির নিষিদ্ধ হতে পারে রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার অভিযোগে; আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপর হামলার অভিযোগে। তাদের আগ্নেয়াশ্র কেড়ে নেয়ার অভিযোগে। জামাত-শিবির নিষিদ্ধ হতে পারে দেশে গৃহযুদ্ধের ঘোষণা দেয়ার মত ধৃষ্টতা দেখানোর অভিযোগে। জামাত-শিবির আর হিযবুত তাওহীদ বা জামায়েতুল মুজাহেদিন এর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। সব একই ব্রেন চাইল্ড। আর তাই এদেরকে নিষিদ্ধ করতে ধর্ম কোনভাবেই বাধা হতে পারে না। হিযবুত তাওহীদ বা জামায়েতুল মুজাহেদিনকে যে যুক্তিতে নিষিদ্ধ করা হয়েছে সেই একই যুক্তিতে নিষিদ্ধ করা হোক জামাত-শিবির। বিএনপি কেন, কেউই বাধা হয়ে দাড়াতে পারবে না। প্রয়োজন সদিচ্ছা। আওয়ামী লীগের আগামীর হিসেব-নিকেশ।

সেই সাথে আজ প্রতিটি দলের অবস্থান পরিষ্কার করার সময় এসেছে। দলীয় প্রধানদের সরাসরি বলতে হবে। তার দলে ধর্মের অবস্থান কোথায়? তারা কতটা ধর্মাশ্রয়ী হতে চায়, কতটা নয়। সাধারণ জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে তারা কাদের সমর্থন করবে, কাদের করবে না। অন্যথায় ধর্ম ব্যবসায়ীরা সর্বদাই বড় দলগুলোর প্রশ্রয় পাবে। আর আমাদের বার বারই এই নিষিদ্ধ ব্রেন চাইল্ডের হিংস্রতায় রক্তাক্ত হতে হবে।

kmgmehadi@yahoo.com